ভারত বিদ্ধেষীদের উল্লাস: চীন ভারতকে ভরে দিয়েছে!

এই কয়েকদিন বাস, টেম্পু, লোকালয়ে যাতায়তে শুনছি চীন ভারতকে ভালোই মার (যারা বলছে, আসলে তাদের মুখের ভাষায় ছিল চীন ভারতকে ভরে দিয়েছে!) দিয়েছে! একেবারে ২০ জন সেনাকে খতম করে ফেলেছে। চীনের সাথে একবার লেগে দেখুক না, ভারত বুঝবে কত ধানে কত চাল! ভারত বিদ্ধেষী মনোভাব প্রকাশ করতে এই কথাগুলো বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান ভাইরা হরহামেশা বলে থাকেন। এদেশে ভারত বিদ্ধেষী ধর্মপ্রাণ মুসলিমের সংখ্যা নেহাতই কম নয়, বরঞ্চ এদেশে অধিকাংশ মুসলিম তাদের মনে ভারত বিদ্ধেষী মনোভাব পোষন করে থাকেন। এই যে এদেশে অধিকাংশ মুসলিমদের ভারত বিদ্ধেষ মনোভাব, এটা জম্মগত নয়, এটা জাতিগত। ক্রিকেটে ভারত যদি পাকিস্তানের সাথে হারে এদেশের ভারত বিরোধী মুসলিমদের মনে ঈদের আমেজ বয়ে যায়। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান নয় যেন আমাদের বাংলাদেশ জয় লাভ করেছে।পাকিস্তান হানাদাররা ৭১-এ এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষকে গনহত্যা করেছে, কয়েক লক্ষ নারীকে ক্যাম্পে তুলে নিয়ে গনধর্ষন করেছে, তার জন্য পাকিস্তান এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চায়নি। তবুও পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে এদেশীয় ভারত বিদ্ধেষী মুসলমানদের বিবেকের কোণে একটুও লজ্জা নেই। এদেশের কোনো কোনো তরুণী তো পাকিস্তান-প্রেমে ইমোশন হয়ে স্টেডিয়ামে আফ্রিদিকে উদ্দেশ্য করে প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে বলেই ফেলেন, ডিয়ার আফ্রিদি, উইল ইউ মেরি মি? বর্তমান তরুণ্য মুসলিম প্রজম্মের এই হল সোজাসাপ্টা নির্লজ্জ পাকিস্তান-প্রীতি! আর ভারত ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের আহারের ব্যবস্থা করেছে। মাত্র ১২ দিনে (৪ই ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর) বোমারু বিমান দিয়ে এদেশে (তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান) থাকা পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দিয়েছে। ৯৩ হাজার সশস্ত্র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে আটক করে স্যারেন্ডার করতে বাধ্য করেছে ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত সিং অরোরা । পাকিস্তানের এই ৯৩ হাজার ঘাতক সৈন্য যদি ভারতের হাতে আটক না হতো, তখন বাংলাদেশ ৯ মাসে স্বাধীন হওয়া তো দুরের কথা, এদেশে “জয় বাংলা বাংলার জয়” বলার বাঙালীও অবশিষ্ট খুঁজে পাওয়া যেত কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। শুধু তাই নয়, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের সাথে ভারতের শত্রুতার চরম বৈরিতা থাকার পরও ৯৩ হাজার সৈন্যকে না মেরে তার বিনিয়েয়ে শুধু বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ স্থপতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেয়া মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে মুক্তির জন্য তিনি পাকিস্তানের আটককৃত ৯৩ হাজার সৈন্যকেও ছেড়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। তবুও এদেশের তরুন মুসলিম ভাইদের কাছে ভারত খারাপ। ইন্ডিয়াকে এদেশের ভারত বিদ্ধেষী মুসলিম ভাইরা ব্যাঙ্গাত্মক ভাষায় বলেন রেন্ডিয়া। এরা মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিকারে ভুগতে গিয়ে ভারতের প্রতি কি চরম অকৃতজ্ঞতা ও ঘৃণা বঃহিপ্রকাশ করে!

গত বছর ভারত থেকে সামান্য কয়েক মাস পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ছিল বলে বাংলাদেশ সরকার মিশর, চীন, মায়ানমার, পাকিস্তান থেকে পিঁয়াজ আমদানি করেও ১৬ কোটি মানুষের পিঁয়াজের চাহিদা মেটাতে পারছিল না। মনে আছে তো? গত বছর শেষের দিকে পিঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ভারত বাংলাদেশে এক সপ্তাহ গরুর মাংস রপ্তানি না করলে, এদেশের ৯০%দের গরু মাংসের জন্য হাহাকার পড়ে যায়। শালা ভারত আমাদের সাথে ষড়যন্ত্র করছে! এছাড়া অনেক ভারতীয় দ্রব্যপন্য এদেশে রপ্তানি হয়। যা খুব সস্তায় পাওয়া যায়। এদেশের অধিকাংশ মানুষ সর্দি, কাশি, জ্বর, গলাব্যাথা এসব ছাড়া বড় কোনো অসুখে ভুগলে মেডিকেল ভিসার জন্য ভারতীয় এ্যাম্বেসিতে দৌঁড়ায়। যেন সস্তায় স্বল্প খরছে ভারত থেকে চিকিৎসাটা সেরে আসা যায়। তবুও ভারত খারাপ, তবুও ভারত তাদের কাছে রেন্ডিয়া। আরে মশাই অসুখ তো দুরের কথা, আপনি জানেন কি দক্ষিনী ভারতের ব্লকবাস্টার সিনেমা বাহুবলী দ্যা বিগিনিং দেখার পরে ২য় সিরিজ বাহুবলী দ্যা কনক্লুশন সিনেমাটি হলে দেখার জন্য অনেক বাংলাদেশী ভারতে পাড়ি দিয়েছিল? তবুও তাদের দৃষ্টিতে ভারত খারাপ, ভারত রেন্ডিয়া!

এদেশের উচ্চ মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলো ঝাঁক ঝমকপুর্ণ বিয়ের আয়োজন করতে, কনের শাড়ী, বরের শেরোয়ানী কিনতে দৌঁড়ে চলে যান ভারতে। অনেকে ঈদের শপিং করতেও ভিসা লাগিয়ে ভারতে ছুটে যায়। তবুও তাদের দৃষ্টিতে ভারত খারাপ। ভারতীরা রেন্ডিয়া! এসব ভারত বিদ্ধেষী নতুন দম্পতিরাই আবার বিয়ের পর প্ল্যান করেন, হানিমুনের অবকাশ ভারতের কোথায় কোন জায়গায় যাপন করা যায়? দার্জিলিং, গ্যাংটক, শিমলা, মানালী নাকি ভূস্বর্গ কাশ্মীরের মনোরম পরিবেশ ডাল লেকে? তবুও এদের কাছে ভারত খারাপ, ভারতের হিন্দুরা হল রেন্ডিয়া জাতি!

চীন গত কয়েক বছর ধরে জিংজিয়াং প্রদেশের ১০ লক্ষ উইঘুর মুসলিমদের উপর সীমাহীন নির্যাতন চালালেও তা নিয়ে এদেশীয় ভারত বিদ্ধেষী মুসলিম তরুণদের মনে কোনো বিকার নেই। চীন শুধু উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতনই চালাচ্ছে না, এদেরকে বন্দী শিবিরে রেখে, ইসলাম ধর্মীয় রীতি পালনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চৈনিক সভ্যতায় চলতে বাধ্য করেছেন। চীন সরকার এই উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছেন। সেখানে মুসলিমরা মসজিদে আযান পর্যন্ত দিতে পারেনা, রমজানে রোজা রাখতে পারেনা। ইসলামিক জীবন যাপন এমন কি মুসলিমদের পবিত্র আল কোরআনকে পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবুও এদেশীয় ভারত বিদ্ধেষী মুসলমানদের কাছে চীন খুব ভালো। চীন ভারতকে খুব টাইট দিচ্ছে। তাদের কাছে এই ভালোর কারণ হল তাদের পেয়ারের পাকিস্তানের সাথে চীনে ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে তাই।

যে মুসলিম মেয়েটি ভারতীয় তার প্রিয় সিরিয়ালের ১ পর্ব না দেখতে পারলে মুখ ভার করেন, যে মুসলিম তরুনটি দক্ষিনী সুপার স্টার মহেশ বাবু, পবন কল্যান, প্রভাস, জুনিয়র এন টি আর, রাম চরণ, ধানুশ, আল্লু অর্জুন, ন্যানি, বিজয়, অজিত কুমার, বরুণ তেজ, বিজয় দেবোরাকোন্দ্রা, সুরিয়া, শিবরাজ কুমারদের নতুন ছবি কবে মুক্তি পাবে, ডাউনলোড করে কবে দেখবে অস্থির অপেক্ষায় থাকেন, ভারতীয় পিঁয়াজ আসায় এখন পিঁয়াজ কেজি প্রতি ২০-২৫ টাকা। ভারত থেকে আসা গরুর মাংসে কষা কালো ভুনায় অত্যধিক পিঁয়াজ ব্যবহার করে যারা এখন ডাইনিং টেবিলে বসে তৃপ্তি করে ডিনারটা সারছেন, যারা সস্তায় কেমো থেরাপি জন্য নিয়মিত ভারতে দৌঁড়ান, এই তারাই বলেন, ভারত হল রেন্ডিয়া! ভারত তাদের শত্রু! দৈনিন্দন জীবনে চলার পথে এরা ভারতের সমস্ত সুবিধাজনক পন্যকে ব্যবহার করবে। জীবনে বিনোদনের জন্য ভারতীয় চলচ্চিত্র, টিভি, সিরিয়াল মিডিয়া ছাড়া এঁদের চলেনা। আবার চীন-পাকিস্তান দ্বারা ভারতের কোনো ক্ষতি হলে এরা লাফিয়ে লাফিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। সম্প্রতি চীন লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারতের সীমানায় ঢুকে ২০ জন ভারতীয় সেনাকে নির্মম ভাবে হত্যা করায় তাদের দৃষ্টিতে তা হল চীন ভারতকে ভালো করে ভরে দিয়েছে! এতে এদের আনন্দের সীমা নেই! আজ যদি আমাদের চারিদিকে সীমান্ত-প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত না হয়ে চীন বা পাকিস্তান তাহলে বুঝতাম ভারত আসলে আমাদের কতোটা পরম বন্ধু। আমরা পাকিস্তানের সাথে ছিলাম তো ২৩ বছর। বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে শোষণ অত্যাচার ও অবিচার ছাড়া কি পেলাম? ৭১এ পেলাম ৩০ লক্ষ শহীদ, পাকিস্তানি হানাদার দ্বারা কয়েক লক্ষ ধর্ষিতার গনন বিদারী চিৎকার! তারপরও চীন-পাকিস্তান মাঝে মাঝে ভারতকে ভরে দিলে আপনারা উল্লাসে ফেটে পড়েন! কি নির্মম অকৃতজ্ঞতা আপনাদের!

অফ টপিকঃ ও হ্যাঁ, গালওয়ান উপত্যকায় সেদিনের সেই হাতাহাতি (চীনা সেনারা যদিও আগে থেকেই হামলা করার জন্য পেরেক যুক্ত লোহার রড ও কাটা তার রড মজুত রেখেছিল) যুদ্ধে শুধু ভারতীয় ২০ জনয়ানই শহীদ হয়নি, সেদিন রাতে ৪৫ জন চীনা সেনাও নিহত হয়েছিলেন। সেই কথা এদেশের জাতীয়তাবাদী বিকারগ্রস্ত ভারত বিদ্ধেষীরা আর লাফিয়ে লাফিয়ে উঁচুস্বরে বলেনা। হোয়াট কাইন্ড অফ পিউপল আর দে?

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 77 = 82