বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কতোটা যৌক্তিক? ও একটি প্রস্তাব।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ একটি অলাভজনক সংগঠন, যা বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার রক্ষা করতে প্রতিষ্ঠিত হয়। দল নিরপেক্ষ এই সংগঠনটি ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল চিত্ত রঞ্জন দত্ত প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৮ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। ঐদিনই ঐক্য পরিষদ গঠিত হয়, যদিও ঘোষণা এসেছিল কিছু দিন পরে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ৯ জুনকে কালো দিবস হিসেবে পালন করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশী ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা নিউ ইয়র্কে ঐক্য পরিষদের একটি শাখা খোলেন। ২০০৫ সালে টরন্টোতে কানাডিয়ান শাখা গঠন করা হয়েছিল। এটি ফ্রান্সের মত ইউরোপীয় দেশগুলিতেও এর শাখা রয়েছে।বর্তমান বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত।

এখন প্রশ্ন হল হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের কতটুকু মানবাধিকার রক্ষা করতে পারছে? বা সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার রক্ষায় আদৌ কতটুকু সক্ষম? এই ঐক্য পরিষদ আদৌ কি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের বিতারণ বা দেশত্যাগ রুখতে পেরেছে? সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘর দখল বা তাদের মন্দির-মুর্তি ভাঙ্গার প্রতিরোধ গড়তে তুলতে পেরেছে? পেরেছে কি বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুদের রাষ্ট্রধর্ম উৎখাত করতে? কথা হল একটা গনপ্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রের আবার ধর্ম কিসের? রাষ্ট্র কি নামাজ বা প্রার্থনা করতে পারে? রাষ্ট্র কি পবিত্র কাবামুখী হয়ে সেজদা দিতে পারে? রাষ্ট কি ব্যক্তি? রাষ্ট্রের কি মানুষের মতো ধর্মীয় অনুভূতি বা ভক্তি আছে? না নেই। ধর্ম তো ব্যক্তির, রাষ্ট্রের কেন ধর্ম থাকবে? একটা দেশের নির্দিষ্ট মানচিত্র ও সেই দেশের মানুষের চলার নিয়ম কানুন নিয়ে একটা রাষ্ট গঠিত। সেই দেশের জড়পদার্থ ভুমির মানচিত্রটির কি করে আবার রাষ্টধর্ম হয়? রাষ্ট কি নামাজি ভাইদের মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে? রাষ্ট্র কি ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ভাইদের মতো দুই হাত তুলে মহান আল্লাহতালার এবাদত করতে পারে? না পারেনা। তারপরও আমাদের রাষ্টধর্ম ইসলাম! একটা রাষ্টে যেকোনো ধর্মের, যেকোনো  বর্ণের মানুষ বসবাস করে, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও বিভিন্ন ধর্মীয় গৌষ্টির মানুষ নিয়ে একটা রাষ্ট্র গঠিত। তো সেই রাষ্ট্র কি করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের হয়ে তার ললাটে রাষ্ট্রধর্ম সেঁটে রাখে? ব্যক্তি সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। কিন্তু একটা রাষ্টকে তো সেক্যুলার হতেই হবে, এবং  রাষ্ট্র তা হতে বাধ্য! একটা সেক্যুলার রাষ্ট্রে (ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে) কখনো একটি গৌষ্ঠির ধর্ম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে চাপিয়ে দেয়া যায় না। এটা অগনতান্ত্রিক, এটা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জা। এটা গনপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের সাথে যায় না, এটা সাংঘর্ষিক। কারণ সেই রাষ্টে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করে। এটাই তো গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিয়ম।

যাক, আমার আলোচ্য বিষয় রাষ্ট্রধর্ম নয়, আমার আলোচ্য বিষয় হলো বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদকে নিয়ে। এই যে ১৯৮৮ সালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল চিত্ত রঞ্জন দত্ত হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন, এই পরিষদটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে একটু সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে না? দিনশেষে আমাদের প্রয়োজন এদেশের সংখ্যালঘুদের জান-মালের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার। এদেশের সব মুসলমান অবশ্যই চান না হিন্দুরা দেশ ছেড়ে চলে যাক,এদেশের সব মুসলমান অবশ্যই চান না দেশটা পুরোপুরি অমুসলিম শুণ্য হোক। এখনো এদেশে অনেক ভালো মুসলিম আছে, যাঁরা হিন্দুদের দেশ ত্যাগ দেখে শুধু ব্যথিতই হয়না, রীতিমতো গলার রগ ফুলিয়ে প্রতিবাদ করেন! যাদের মধ্যে আছেন, -ডঃ আকবর আলী খান, সুলতানা কামাল, শাহরিয়ার কবির, ডঃ আবুল বারাকাত। তাই আমার প্রস্তাবটি হলো, ‘হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ না হয়ে হওয়া উচিত “বাংলাদেশ হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ” এই ঐক্য পরিষদের দায়িত্বে মুসলিমরাও থাকবে। যাঁরা সত্যিকার অর্থে এদেশে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়।৷ এই ঐক্য গঠিত প্রতিবাদের ভারসাম্যও বজায় থাকবে। আমার মতো অতি সাধারণ একজন নাগরিকের এই প্রস্তাবটি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অভিজ্ঞ বিজ্ঞজনেরা ভেবে দেখতে পারেন।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

55 − 49 =