জন্মান্তর (উপন্যাস: পর্ব-ছয়)

তিন

আজ আবার এক কাণ্ড ঘটে গেছে বাসায়, না আমাকে নিয়ে নয়। পাঁচতলার একটা বাসা খালি হবে আগামী মাস থেকে, টু-লেট টাঙানো হয়েছে। টু-লেট দেখে সকালের দিকে বছর চল্লিশের এক ভদ্রলোক এসেছিলেন বাসা দেখতে। আমাদের বাড়ির দারোয়ান এরশাদুল তাকে বাসা দেখায়, বাসা পছন্দ হওয়ায় ভাড়া নিয়ে কথা বলার জন্য ভদ্রলোক বাবার সঙ্গে কথা বলতে আসেন, ড্রয়িংরুমে বসিয়ে বাবা তার সঙ্গে আলাপ করেন। ভদ্রলোকের নাম ইমন, একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন। ভাড়াটিয়া হিসেবে বাবা ইমনকে পছন্দও করেন। ছোট পরিবার; স্বামী-স্ত্রী আর তাদের এক পুত্রসন্তান। ইমনের অফিস এবং অন্যান্য বিষয়ে কিছুক্ষণ জমানো আলাপও করেন দু-জন। ইমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান যে বিকেলেই তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে আসবেন বাসাটা দেখানোর জন্য আর তখনই অ্যাডভান্স করে যাবেন। ইমন চলে গেলে বাবা তার প্রশংসা করেন এই বলে যে ছেলেটা খুবই ভদ্র, বিনয়ী, সজ্জন; ভাল পরিবারের সন্তান, বাবা হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন ইত্যাদি।

বিকেলে আমি তখন ড্রয়িংরুমে বসে ডিসকাভারি দেখছি। কলিংবেল বাজতেই আমি উঠে পা বাড়াই কিন্তু আমার আগেই দরজার কাছে পৌঁছে যান মা, বোধ হয় তিনি নিজের ঘর থেকে ড্রয়িং কিংবা ডাইনিংয়ের দিকে আসছিলেন। দরজা খুলেই থমকে দাঁড়ান মা, মায়ের সামনে দাঁড়ানো ইমন আর পিছনে তার স্ত্রী। ইমন বলেন, ‘সকালে বাসা দেখে গেছি, অ্যাডভান্স করতে এসেছি।’

সম্ভবত মা কিছুটা ইতস্তত, তাই বেশ কয়েক মুহূর্ত পর বলেন, ‘আসেন।’

মা ঘুরে দাঁড়ালে তার মুখাবয়বের অসন্তুষ্টির ভাষা পড়তে আমার একটুও দেরি হয় না। আমি টেলিভিশন বন্ধ করে নিজের ঘরে প্রবেশ করি। ইমন এবং তার স্ত্রীকে ড্রয়িংরুমে বসতে দিয়ে মা যান নিজের ঘরে, সেখানে বাবা আছেন। স্বাভাবিকের চেয়েও কিছু বেশি সময় পর বাবা আসেন ড্রয়িংরুমে। বাবা কিছুটা বিব্রত, তার এই বিব্রত ভাবের কারণ আগেই আঁচ করতে পেরে আমি আমার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কান সজাগ রাখি।

বাবা বলেন, ‘ব্যাপারটা কীভাবে আপনাদেরকে বলি, বলতে সংকোচও হচ্ছে। আসলে আপনাকে যে ফ্ল্যাটটা দেখিয়েছি সেটায় আমার বড়বোন উঠবে। আমার বড়বোন নাকি মাকে আগেই বলেছে, কিন্তু মা আমাকে জানাতে ভুলে যাওয়ায় টু-লেটটা আর নামানো হয়নি। শুধু শুধু আপনাদেরকে কষ্ট দিলাম, কিছু মনে করবেন না।’

কয়েক মুহূর্তের নীরবতা, তারপর ইমন বলেন, ‘ঠিক আছে…।’

তাকে থামিয়ে দিয়ে ইমনের স্ত্রী বলেন, ‘আপনার কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। হয়তো কোনো কারণে আপনি আমাদেরকে বাসা ভাড়া দিতে চাচ্ছেন না। সেটা আপনি না দিতেই পারেন, কিন্তু সেটা শুরুতে বলাই ভদ্রতা। কেননা, আমাদের সময়ের মূল্য আছে, চলো।’

দারুণ স্মার্টলি কথাগুলো বলেন ইমনের স্ত্রী। বাবার মিথ্যা বলার ধরনটা বেশ অপটু, ফলে ইমনের স্ত্রীর মনে কোনো সন্দেহ দানা বাঁধা অস্বাভাবিক নয়। আবার এমনও হতে পারে যে এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা আগেও পড়েছেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কিছু আঁচ করতে পেরেছেন। উঠে পড়েন দু-জনই। বাবা বলেন, ‘না, না, আপনাদের বাসা ভাড়া দেব না কেন! আসলে আমার মায়ের ভুলেই…।’

‘রোজার দিনে মিথ্যা বলতে হয় না আংকেল। যিনি দরজা খুলে দিলেন তার এবং আপনার দৃষ্টি হোঁচট খেয়েছে আমার হাতে আর কপালে, যা আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। এতো আড়াল করার কি আছে, সোজা কথাটা সোজাভাবে বলে দিলেই তো পারেন যে আপনারা হিন্দুদের বাড়িভাড়া দেন না!’ ইমনের স্ত্রীর ইয়র্কারে বাবা এবার ক্লিনবোল্ড!

ইমন স্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘বাদ দাও, চলো। ঠিক আছে আংকেল, আসি।’

বাসা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান দু-জনই। আমি ঘর থেকে ডাইনিংয়ে যাই, টেবিলে রাখা জগ থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে দরজা বন্ধ করি। এরই মধ্যে আড়চোখে তাকিয়ে পড়ে ফেলি বাবার মুখের ভাষা। অপরাধীর মতো বাবা বসে আছেন সোফায়। আমি বলি, ‘কিছু মনে কোরো না বাবা, এর পর থেকে কেউ বাসা ভাড়া নিতে এলে হয় তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা কোরো যে সে সুন্নি মুসলমান নাকি অন্য কোনো সম্প্রদায়ের, অথবা তোমাদের এই ক্ষুদ্রতা ত্যাগ করো। তাহলে মানুষকে হয়রানি করা হবে না আর তোমাদেরকেও অপমানিত হতে হবে না। নিজে না পারো এরশাদুলকে বলে রেখ যাতে টু-লেট দেখে কেউ এলে ও প্রথমেই জেনে নিতে পারে।’

আসলে যতো গোল লেগেছে ভদ্রলোকের ইমন নামটা নিয়ে। ইমন নাম শুনে বাবা ধরে নেন ভদ্রলোক মুসলমান, ইমন নাম যে হিন্দুদেরও হতে পারে বাবা সেটা ভাবেননি। আর ইমনকে দেখে এবং তার কথা শুনে বাবা অপছন্দনীয় কিছু পাননি, ফলে তিনি তাকে বাড়িভাড়া দিতে চান এবং তার প্রশংসাও করেন মা এবং দাদীর কাছে। কিন্তু ইমনের স্ত্রীর কপাল আর সিঁথির সিঁদূর এবং দুই হাতের শাঁখা পাল্টে দিয়েছে সবকিছু। মা ইমনের স্ত্রীর সিঁথির সিঁদুর দেখে দরজায় থমকে দাঁড়ান! তারপর বাবাকে গিয়ে বলার পর বাবা ইমনকে বাড়িভাড়া দেবার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।

কী হতে চলেছে আমি সেটা আগেই আঁচ করতে পেরেছিলাম ভদ্রমহিলার সিঁথির সিঁদুর দেখেই, যদিও এ বিষয়ে কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই; তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে এখন আমি নীরব দর্শক মাত্র। আমাদের বাড়িতে সুন্নি মুসলমান ব্যতিত অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে ভাড়া দেওয়া হয় না। এমনকি আহমদিয়া মুসলমানদেরকেও না। একবার একটা পরিবার উঠেছিল, কিন্তু কিছুদিন পর যখন জানা যায় যে তারা সুন্নি নয় আহমদিয়া, তখন অন্য কারণ দেখিয়ে তাদেরকে বাড়িছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয় এবং তারা বাড়ি ছেড়েও যায়। আহমদিয়া পরিবারটি বাড়ি ছাড়ার পর দাদী ওই ফ্ল্যাটে গোলাপজল ছিটিয়ে দেন আর বলেন, ‘আধা হিন্দুগুলা আমার বাড়িডা নাপাক কইরা দিয়া গেল, হ্যাগো মাইয়া মানুষও নি মসজিদে যায়! নাউজুবিল্লাহ, হিন্দুগো মতো চাল-চলন!’

হিন্দুরা ঘরে দেবদেবীর ছবি-মূর্তি রাখে, পূজা দেয়, শঙ্খ বাজায়, উলু দেয়; বাড়ি নাকি উপাসনালয় বানিয়ে ছাড়ে! বাড়িতে কোরান শরীফ-হাদিস শরীফ আছে, তা যদি নামাক হয়ে যায়, তাই হিন্দুদেরকে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় না! তাছাড়া বাড়িতে দেবদেবীর ছবি-মূর্তি থাকলে নাকি ফেরেশতা আসে না! আমি এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেও ধোপে টেকেনি, এ বাড়িতে আমি নিজেই সংখ্যালঘু! প্রতিবাদ করলে বাবা আর দাদী আমাকে হাদিস শুনিয়েছিলেন। একবার নাকি মুহাম্মদের স্ত্রী আয়েশা বাজার থেকে একটি বালিশ বা গদি কিনে এনেছিলেন যার মধ্যে প্রাণির ছবি ছিল। মুহাম্মদ ঘরে প্রবেশের সময় যখন সেই ছবি দেখেন তখন তিনি ঘরে প্রবেশ না করে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে যান। আয়েশা কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘এই বালিশ কীসের জন্য?’

আয়েশা উত্তর দেন, ‘এটা আপনার জন্য খরিদ করে এনেছি, যাতে আপনি বসে হেলান দিতে পারেন।’

মুহাম্মদ তখন বলেন, ‘এই ছবি নির্মাতাকে কিয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে এবং বলা হবে যা তুমি সৃষ্টি করেছ তার প্রাণ দাও।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে ঘরে প্রাণির ছবি থাকে, সে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।’

অন্য আরেকদিন মুহাম্মদের কাছে জিবরাঈলের আসার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও জিবরাঈল না আসায় মুহাম্মদ তার হাতে থাকা লাঠিটা ফেলে দেন, তবু জিবরাঈল আসে না। এরপর তিনি এদিক-সেদিক তাকিয়ে চৌকির নিচে একটি কুকুরের বাচ্চা দেখতে পান। কুকুরের বাচ্চাটি কখন ঢুকেছে জানতে চাইলে আয়েশা জানান যে তিনি জানেন না। এরপর মুহাম্মদের নির্দেশে কুকুরটিকে বের করে দেওয়া হয়, আর একটু পরই জিবরাঈল আসে। ওয়াদা দিয়েও সময় মতো আসতে না পারার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জিবরাঈল মুহাম্মদকে জানায়, এতোক্ষণ ঘরে যে কুকুরটা ছিল সেটাই তাকে আসতে বাধা দিয়েছিল, কেননা কোনো ঘরে কোনো প্রাণি বা প্রাণির ছবি থাকলে সেই ঘরে সে প্রবেশ করে না।

সঙ্গত কারণেই আমাদের বাড়িতে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান ভাড়াটিয়া তোলা হয় না। আমার ঘরে অবশ্য পেইন্টিং, ভাস্কর্য এবং মুখোশ আছে। তবে এর জন্য আমাকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে হয়েছে। প্রথম যেদিন আমি আমার ঘরের দেয়ালে একটি মুখোশ লাগাই সেদিনই মুখোশটি ফেলে দেবার নির্দেশ জারি করেন বাবা এবং দাদী।

আমিও পিছু হটার পাত্র নই। বলি, ‘তোমরা যদি কোরান-হাদিস অনুযায়ী সহি ইসলামী জীবন-যাপন করো তাহলে আমি অবশ্যই মুখোশটি ফেলে দেব।’

বাবা-মায়ের সামনে খেঁকিয়ে উঠেন দাদী, ‘আমরা সহি ইসলামী জীবন-যাপন করি না তো কি মালাউন গো মতো জীবন-যাপন করি?’

‘অবশ্যই তোমরা সহি ইসলামী জীবন-যাপন করো না। বাড়ি থেকে আগে টেলিভিশনটা বের করে নাটক-সিনেমা দেখা বন্ধ করো; সাবান-শ্যাম্পু-হারপিক থেকে শুরু করে নানা ধরনের যে-সব পণ্যের মোড়ক বা লেবেলে মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণির ছবি থাকে সে-সব পণ্য বর্জন করো; যেসব টাকার ওপর বঙ্গবন্ধুর ছবি, পাখির ছবি, বাঘের জলছাপ আছে সেগুলোর ব্যবহার বন্ধ করো; যদি করতে পারো আমি অবশ্যই মুখোশ ফেলে দেব!’

বাবা হাঁ হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর দাদী গজগজ করতে করতে সামনে থেকে সরে পড়েন। তারপর বাবাকে বলি, ‘বাবা, ধর্ম নিয়ে রোজ রোজ তোমাদের সাথে বাকযুদ্ধ করতে আমার ভাললাগে না। আমার নিজের পছন্দ-রুচি অনুযায়ী আমি থাকতে চাই, এতে যদি তোমাদের অসুবিধা হয় বলো, আমি হলে গিয়ে থাকবো। সাভারের দিকে দুটো টিউশনি করবো, ওতেই আমার খরচ চলে যাবে।’

এই শেষ কথাটায় কাজ হয়, তারপর থেকে আমাকে আর এসব ব্যাপারে ঘাটায় না কেউ। আমার ইসলাম ত্যাগের প্রথম আড়াই বছর আমি মানসিকভাবে ভীষণ রকম নির্যাতিত হয়েছি; এরপর থেকে আমি কৌশল পাল্টেছি, আমাকে মানসিকভাবে পীড়ন করতে এলে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে আমিও পাল্টা আক্রমণ করি। এতে ফলও পেয়েছি, আমার ওপর মানসিক পীড়ন আগের চেয়ে কমেছে। সকলে বুঝেছে যে আমি হাওয়ায় গা ভাসিয়ে কথা বলি না, ধর্মগ্রন্থগুলো রীতিমতো ঘাঁটাঘাঁটি করেই তর্ক করি। তাছাড়া আমি যে আর সেই গোপাল টাইপের ছেলেটি নেই, এখন খুব জেদি হয়ে উঠেছি সেটা বাড়ির সকলেই টের পেয়েছেন। কিন্তু যতোই নাস্তিক হই আমি তো তাদের সন্তান, একমাত্র ছেলে বাড়ি ছাড়া হলে ব্যথাটা যে তাদের বুকেই বাজবে; ফলে আজকাল তারা আমার স্বাধীনতায় আগের মতো ব্যাঘাত ঘটান না। আমি আমার ঘরের দেয়ালে আরও মুখোশ লাগিয়েছি, একটা পেইন্টিং ঝুলিয়েছি, বুক শেলফের ওপর দুটো ভাস্কর্য আর বেশ কয়েকটা পুতুল এনে রেখেছি। আর এরপর থেকেই সম্ভবত গুণাহ হওয়ার ভয়ে ছোট আপু ব্যতিত আমার ঘরে খুব দরকার ছাড়া কেউ আসেন না। আমাদের বাসায় ঠিকা কাজ করে আসমা আপা, সে আমার ঘর ঝাড়ু দিয়ে মোছে। দাদী তো আমার ঘরের ছায়াই মারান না। বাবার আসার প্রয়োজন পড়ে না। খুব দরকার পড়লে মা কখনো-সখনো আসেন। ছোট আপু আসে, ঘরটা এলোমেলো থাকলে ও মাঝে মাঝে গুছিয়ে দেয়।

শৈশব-বাল্যে আমরা ভাই-বোনেরা কোনোদিন পুতুল খেলিনি, মানে আমাদেরকে কোনো ধরনের পুতুল কিনে দেওয়া হয়নি; কারণ পুতুল তো প্রাণির আদলে গড়া, তাই পুতুল খেলাও হারাম! কী আশ্চর্য একটা ধর্ম! বাচ্চারা পুতুল খেলবে না? আমাদেরই মতো আরো হাজার হাজার পরিবারের বাচ্চারা ছেলেবেলায় পুতুল খেলে না, পুতুলের সঙ্গে কথা বলে না, পুতুলের বিয়ে দেয় না, পুতুলকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায় না, কোনোরকম বন্ধুত্ব হয় না পুতুলের সঙ্গে! অথচ পুতুল বাচ্চাদের কল্পনা শক্তি বাড়ায়, মানসিক বিকাশ ঘটায়।

বাবা-মা এখনো স্বপ্ন দেখে যে বয়স বাড়লে হয়তো আমার মাথা থেকে নাস্তিকতার ভূত ছেড়ে যাবে; এই ভেবেই তারা তাদের আল্লাহকে ডাকেন, ইসলামের দিকে আমার মন ফেরানোর জন্য দোয়া-দরূদ পড়েন!

আমার কম্পিউটারের মাউসটা নষ্ট হয়ে যায় হঠাৎ, তাই শেষ বিকেলে বাইরে বেরোই মাউস কিনতে। মিরপুর ১০ নম্বর না গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই ১ নম্বরে, উদ্দেশ্য হেঁটে সন্ধেটা বাইরে কাটিয়ে আসা। ইফতারের কিছুক্ষণ আগে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের তিনতলার একটা দোকান থেকে মাউস কিনে আবার ফেরার পথ ধরি। ২ নম্বর চত্ত্বর, মানে সনি সিনেমা হলের কাছে এসে মনে হয় এখনই বাসায় ফিরে কী করবো? তার চেয়ে ভিড়হীন ফুটপাতে হাঁটি। সোজা না গিয়ে পা বাড়াই চিড়িয়াখানা রোডের দিকে, রাস্তাটা গিয়ে শেষ হয়েছে চিড়িয়াখানা আর বোর্টানিক্যাল গার্ডেনের গেটের মুখে। আমি হাঁটি আর আশপাশের দোকানগুলোর দিকে তাকাই। দোকানের লোকজন মাথায় টুপি পরে ইফতার সামনে নিয়ে বসে আছে আযানের অপেক্ষায়, একটু পরই তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চতুর্দিক থেকে একের পর এক হেঁকে উঠে মসজিদের মাইক।

ফুটপাত ভাঙাচোরা, কোথাওবা তা গাড়ির গ্যারেজগুলোর দখলে, রাস্তারও প্রায় অর্ধেক জুড়ে গাড়ি রাখা। রাস্তা এবং ফুটপাত দখল করেই চিড়িয়াখানা রোডে গাড়ি মেরামত করা হয়। গ্রিলের দোকানগুলো ফুটপাত দখল করেই গ্রিল কাটে-ঝালাই করে, ছিটকে বেরোয় আগুনের ফুলকি; এর ভেতর দিয়েই মানুষকে চলাচল করতে হয়। সারাক্ষণ লোহা-লক্করের শব্দে কানে তালা লেগে যায়। এই যে ফুটপাত আর রাস্তার দখল নিয়ে দিনের পর দিন এরা পথচারীদের অসুবিধায় ফেলে নিজেদের কার্য সম্পাদন করে, এসব দেখার জন্য এই শহরে কেউ আছে বলেই মনে হয় না! এখন অবশ্য বেশ সুনসান, সবাই ইফতারে ব্যস্ত।

রাইনখোলা বাসস্ট্যান্ডের কাছে এসে বটগাছের নিচে দাঁড়াই, যাত্রীর অপেক্ষায় কোনো বাস নেই, যাত্রীও নেই বাসের অপেক্ষায়। অনেকক্ষণ পর পর একটা-দুটো রিক্সা যাচ্ছে-আসছে। রাস্তার ওপাশেই কাঁচা-বাজার, ভিড় নেই ওখানেও। এই ফাঁকা রাস্তা দেখে মনে আফসোস হয়, ইস্, সবসময় যদি রাস্তা এমন ফাঁকা থাকতো! মিরপুরের ভিড়টা আজকাল দুঃসহ লাগে, বছর পাঁচ-ছয় আগেও মিরপুরে এতো মানুষের চাপ ছিল না। আর দশ-বারো বছর আগের আমার কৈশোরের কথা মনে পড়লে তো কেবলই দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়ে বুক থেকে! ১০ নম্বর গোল চত্ত্বর থেকে বাসার দিকে হেঁটে এলে কারো গায়ের সাথে গা লাগতো না, ফুটপাতে এখনকার মতো এতো হকার ছিল না। এতো মার্কেট আর দোকানও ছিল না। এখন গোল চত্ত্বরে গিয়ে দাঁড়ালে কেবল ব্যস্ত মানুষের চতুর্মুখী স্রোত চোখে পড়ে; এ ওকে ঠেলে বা ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে ছোটে। এতো বাস তবু ঠেলাঠেলি করে একে-অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাসে উঠতে হয়। অথচ পাঁচ-ছয় বছর আগেও মিরপুরে এতো বাস ছিল না, এখন নতুন নতুন কতো বাস নেমেছে কিন্তু তাতেও ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই অবস্থা। চতুর্দিকের রাস্তায় যানজট, বাসগুলোর মধ্যে চলে আগে যাবার প্রতিযোগিতা, সংঘর্ষও; প্রাণ যায় মানুষের! পৃথিবীর বসবাসের অযোগ্য বড় শহরগুলোর তালিকায় ঢাকা এখন প্রথম দিকেই থাকে। বাবার মুখে শুনেছি যে আগে মিরপুরের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, একতলা-দু’তলা বা টিনের বাড়ি, ঘরের আশপাশে গাছপালা; রাস্তার মোড়ে মোড়ে বট, আম, জাম আর কৃষ্ণচূড়া গাছ; যেখানে বসে মানুষ চা খেতে খেতে আড্ডা দিতো; বাচ্চাদের খেলার জন্য খোলা জায়গাও ছিল অনেক। বাবার কথা কী বলবো, আমরাও তো কতো খেলার জায়গা পেয়েছি। চোখের সামনে সেইসব জায়গা বৃক্ষশূন্য হয়ে গেছে, গড়ে উঠেছে বিল্ডিং।

দেশের বেশিরভাগ মধু রাজধানীতে এনে জমা করে রেখেছে সরকার, মানুষ তো সারাদেশ থেকে পিঁপড়ার মতো ছুটে আসবেই। কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য সুবিধা সারাদেশে ছড়িয়ে দিলে আজ ঢাকা শহরের এই দূরাবস্থা হতো না। তার ওপর বছর বছর নদী ভাঙনে বিলুপ্ত হচ্ছে জনপদ; সরকার তাদের পুনর্বাসন এবং কর্মসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না। ফলে জমিজমা-ঘরবাড়ি হারানো নিঃস্ব মানুষ দুটো খেয়ে বাঁচার জন্য ছুটে আসছে রাজধানীর দিকে। কোথাও কাজ না পেলে গুলিস্থান কিংবা বঙ্গবাজার থেকে কাপড়-চোপড় বা অন্য কোনো পণ্য কিনে এনে পাতিনেতা আর পুলিশকে টাকা দিয়ে ফুটপাতে যত্র-তত্র বসে যাচ্ছে বিক্রির জন্য। মেইনরোড তো বটেই ক্রমশ ভেতরের দিকের রাস্তার ফুটপাতও হকারদের দখলে চলে যাচ্ছে। তবু তো এরা কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নিচ্ছে, কিন্তু ঢাকামুখী এইসব নিঃস্ব মানুষের আরেকটা অংশ জড়িয়ে পড়ছে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে; পুলিশের প্রশ্রয়েই এই অপরাধ তারা করছে, নাকাল হচ্ছে নগরবাসীর জীবন। এমনিতেই নগরবাসী নাকাল নয়-দশ ঘন্টার দীর্ঘ কর্মঘন্টা, জ্যামে ঠেলে কর্মস্থলে যাতায়াতে তিনচার-ঘন্টা, বছর বছর ঊর্ধ্বমুখী বাড়িভাড়া, লাগামহীন বাসভাড়া, ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ বেতন, হাসপাতাল সেবার অমানবিক মূল্য, ওষুধের উচ্চ মূল্য, ঘন ঘন গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যনৈমিত্তিক পণ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধিতে। তার ওপর চুরি, চিনতাই বা অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা কারো কারো জীবনে মরার ওপর খরার ঘা হয়ে আসে। পুলিশও কী কম হয়রানি করে? এই যে আমি এখানে দাঁড়িয়ে, এখন যদি পুলিশ এসে আমার পকেটে এক পুরিয়া গাঁজা বা গোটাকতক ইয়াবা গুঁজে দিয়ে আমাকে অপরাধী বানিয়ে মামলা করার ভয় দেখিয়ে আমার পরিবারের কাছ থেকে মোটা টাকা খসিয়ে নেয়, তাহলে কারো কিচ্ছু করার নেই; এমন ঘটনা আজকাল হরহামেশাই ঘটে! একটা-দুটো ঘটনা হয়তো মিডিয়ায় আসে, মিডিয়াকে দেখাতে দোষী পুলিশকে প্রত্যাহার করা হয় কিন্তু পুলিশের সাজানো বিচিত্র ধরনের আরো হাজারো ঘটনা ঘটে এবং তা আমাদের অগোচরেই থেকে যায়।

পুরোনো দিনের কথা বলতে বলতে আমার দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন, আবার বাবাও দীর্ঘশ্বাস ফেলেন; বাপ-দাদার সঙ্গে এই ব্যাপারে আমার দারুণ মিল, আমার দেখা শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোর কথা মনে করে আমিও এরই মধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুরু করেছি।

আমি আবার পা চালাই, রাইনখোলা মোড় থেকে ঢাল বেয়ে সোজা হেঁটে বিসিআইসি স্কুলের সামনের অবিভাবকদের জন্য নির্মিত বেঞ্চে বসি। আমি বিসিআইসি স্কুল এবং কলেজে পড়েছি। ঘনীভূত অন্ধকারে এখানে এসে বসতেই হাজারো স্মৃতি বুদ্বুদের মতো ঠেলে ওঠে মনের ভেতর; কতো দুষ্টুমি, মারামারি আর আড্ডায় কেটেছে সময়। কতো বন্ধু-বান্ধব ছিল, এখন মাত্র কয়েকজনের সঙ্গেই যোগাযোগ আছে। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা জায়গায়, কেউবা চলে গেছে দেশের বাইরে।

স্মৃতিকাতর হয়ে অনেকটা সময় বসে থাকার পর আমি উঠে পড়ি, কমার্স কলেজ রোড ধরে পা চালাই বাড়ির দিকে। আজ চতুর্থ রোজা শেষ হলো, এখনও কেনাকাটার ধুম লাগেনি বলে ইফতারের পরও রাস্তা বেশ ফাঁকা।

বাসার সদরগেটের লক খুলে গ্যারেজে প্রবেশ করতেই শোরগোল শুনতে পাই। চাচা-চাচী আর বড়ো ফুফু-মেজো ফুফুর গলা, মনে হয় দোতলায় কিছু হয়েছে। আমাদের দারোয়ান এরশাদুল নিচতলার সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে কান খাঁড়া করে ওপর দিকে তাকিয়ে আছে। এরশাদুল আমার সমবয়সী অথবা এক-আধ বছর এদিক-ওদিক হবে, একটা জাত হারামি! মেজো ফুফুর শ্বশুরবাড়ির গ্রামে ওর বাড়ি। মেজো ফুফু-ই ওকে এনেছে, সেই সূত্রে ও মেজোফুফুর চ্যালা। ভুরি ভুরি মানুষের খবর মেজোফুফুর সংগ্রহে থাকে। আশ-পাশের কার বাড়িতে কী হয়, কার ছেলে কী করে, কার মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছে, কোন বাসার ভাড়াটিয়া কেমন, কোন কোন বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার সঙ্গে ঝগড়া করে, চাচীর দূর সম্পর্কের কোন বোনের ডিভোর্স হয়েছে কিংবা চাচার কোন কলিগের মেয়ের বিয়েতে পঞ্চাশ ভরি গহনা দিয়েছে, মেজো ফুফার কোন খালাতো ভাই ঘুষ খেয়ে হঠাৎ ধনী হয়ে উঠেছে, আমাদের ছয়তলার ভাড়াটিয়া মানে আমার চাচীর বান্ধবী তার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে কেন পরকীয়া করছে, মালিহার কোন বান্ধবীর বাবা-মায়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হতে চলেছে, কার কার সংসারে শান্তি নেই; এইসব খবরে মেজোফুফুর মাথা ঠাসা থাকে। তাই মেজো ফুফুকে আমি বলি সিএনএন, আর মেজো ফুফু সিএনএন হলে এরশাদুল দুঁদে রিপোর্টার! আশপাশের তাবৎ বাড়ির দারোয়ান আর কাজের বুয়াদের সঙ্গে ওর যতো সখ্যতা, সেই সূত্রে ও সংবাদ সংগ্রহ করে এনে সিএনএন এ লোড করে! একটা সহজ বিষয়েও ইনিয়ে-বিনিয়ে প্যাঁচ লাগায়, এর কথা ওর কানে লাগায়। ভাড়াটিয়াদের খুঁত খুঁজে বের করে মেজোফুফু তো বটেই বাবা-মা, চাচা-চাচী এবং দাদীরও কান ভাঙায়। ওর কথায় বাবা বেশ কয়েকটা পরিবারকে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছিলেন।

আমাকে দেখে ও সিঁড়ির কাছ থেকে সরে আসে। আমি মুখে কিছু না বলে শুধু চোখে চোখ রেখে আঙুল দিয়ে ওর ঘরের দিকে নির্দেশ করতেই ও সুড়সুড় করে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আমিও সিঁড়ির দিকে পা বাড়াই। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুনতে পাই চাচার কণ্ঠস্বর, ‘বাড়ি করার টাকা তো মারায়ে আনছিলাম!’

আমি সিঁড়ির বাঁক ঘুরতেই ঘরের ভেতরে দরজার কাছে দাঁড়ানো চাচার বাম গালে ঠাস করে চড় মারেন দরজার বাইরে দাঁড়ানো বড়োফুফু। আমার আশঙ্কা হয় যে চাচা যদি আবার বড়োফুফুর গায়ে হাত তোলে! বদ মেজাজি চাচার পক্ষে সেটা সম্ভব কী অসম্ভব সে ব্যাপারে আমি অবশ্য নিশ্চিত নই। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে বড়োফুফুর পিছনে গিয়ে দাঁড়াই। আমার সামনে বড়োফুফুর হাতে চড় খেয়ে চাচা কিছুটা হতভম্ব এবং নীরব! চাচার হয়ে পিছন থেকে কথার লড়াই চালিয়ে যান চাচী, আর তিনতলায় আমাদের ফ্ল্যাটের সামনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে গলা বাড়িয়ে ফোঁড়ন কাটেন মেজোফুফু। চাচী বলেন, ‘কতো বড়ো সাহস, গায়ে হাত তোলে!’

বড়োফুফু অভিভাবকের গলায় বলেন, ‘আমার ভাই বেয়াদ্দপি করছে আমি মারছি তাতে তোমার কী! মায় তো প্যাটের থেইকা বাইর কইরা দিয়াই খালাস, ত্যালতুল মাইখা, নাওয়াইয়া-খাওয়াইয়া এগুলারে বড়ো করছি তো আমি, তহন কই আছিলা তুমি! জবর দরদ দ্যাহাইতাছো!’

এই কথার পর চাচা আর কোনো কথা বলেন না। দরজার মুখ থেকে সরে গিয়ে ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসেন।

তিনতলার সিঁড়ি থেকে মেজোফুফু গলা চড়ান, ‘আসছো কেন তুমি? আইসাই তো ঝামেলা পাকাও! আম্মা তোমারে আসতে নিষেধ করে তবু নির্লজ্জের মতো কেন আসো তুমি!’

এবার তিনতলার উঠার সিঁড়ির দিকে সরে ওপরের দিকে তাকিয়ে আমি মুখ খুলি, ‘মেজোফুফু, এটা তোমাদের বাবার বাড়ি। তোমার বাবা, তার রোজগারের টাকা আর গ্রাম থেকে পৈত্রিক জমি বিক্রি করে এনে এই বাড়ির জমি কিনেছিলেন। বাড়ির কাজ শুরু করে প্রায় শেষও করে এনেছিলেন তিনি-ই। দাদা মারা যাবার পর বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ বাবা-চাচা করলেও তাদের নিজের রোজগারের টাকায় করেননি, গ্রামের জমি বেচে সেই টাকা দিয়েই করেছেন। বড়োফুফু দাদার বড়ো সন্তান, সুতরাং এই বাড়িতে তার অধিকার আছে, তার যখন খুশি আসবে-যাবে। তাকে আসতে নিষেধ করার অধিকার তোমার নেই।’

আমার মা নিশ্চয় আমাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, মেজোফুফু তার ঝুলন্ত মুখখানা সরিয়ে মায়ের উদ্দেশে বলেন, ‘দেখছো ভাবি, তোমার পোলার কথা শুনছো? দরদ উথলায়ে উঠতাছে!’

মায়ের কণ্ঠ, ‘আমজাদ, বড়োগো কথার মইদ্যে তোর কথা কইতে অইবো না, তুই ওপরে আয়।’

‘বড়োরা কোনো অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা উচিত মা। মেজোফুফু কোনোভাবেই বড়োফুফুকে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করতে পারে না।’

মেজোফুফু আবার কথার কামান দাগান, ‘দুইদিনের পোলা তুই, ওরে কী দিছে না দিছে তুই তার কী জানোস! অহন আইছে বাড়ির ভাগ লইতে!’

‘বড়োফুফুকে কী দিয়েছে তা আমি জানি; এও জানি যে বড়োফুফু তোমার মতো রাজনীতি বোঝেন না, যদি বুঝতেন তাহলে বড়োফুফুও তোমার মতো এই বাড়িতে একটা ফ্ল্যাট পেতেন, বাবার বাড়ি থাকতেও তাকে মাসে মাসে ভাড়া গুনতে হতো না।’

‘আমি রাজনীতি করি, অয় ভাবী তোমার পোলায় কয় কী! আমি নাকি রাজনীতি করি, রাজনীতি করি আমি! ভাই বাজার থেইকা আসুক আগে…!’ এইসব বলতে বলতে মেজোফুফু কেঁদেকেটে একাকার করে ফেলেন।

এদিকে চাচীর মুখ থেকে কথার স্রোত বইতে থাকে। চাচীর দিকে তাকিয়ে বলি, ‘চাচী এবার একটু থামেন তো।’

চাচী তেড়ে ওঠেন, ‘কোন সাহসে উনি তোর চাচার গায়ে হাত তুললো!’

‘চাচা যে ভাষায় বড়োফুফুর সঙ্গে কথা বলেছে, সেই ভাষায় যদি আমি আপনার সঙ্গে কথা বলি, আপনি আমাকে চড় মারবেন না? অন্যায় করলে মুরুব্বি হিসেবে নিশ্চয় আমাকে চড় মারা অসঙ্গত না, তাই না?’

আমি বড়োফুফুর কাঁধে হাত রেখে বলি, ‘চলো, ওপরে চলো।’

‘ওপর থেইকাই তো আইলাম, বাসায় যামু।’

‘তাইলে চলো, আমি আগায়ে দেই।’

বড়োফুফুকে নিয়ে আমি নিচে নামি। ওপরে চাচী আর মেজোফুফু একসঙ্গে কথার ঝড় তুলেছেন; বোধহয় মেজোফুফু দোতলায় নেমেছেন। আমার মা এখন এর মধ্যে আসবেন না তা আমি জানি, কেননা এর মধ্যে আমি জড়িয়ে পড়েছি; এলে আমাকে জন্ম দেওয়া এবং সহি পথে মানুষ করতে না পারার অপরাধে তাকে কথা শুনতে হবে। আমি গেট খুলে বড়োফুফুকে নিয়ে বাইরে বের হই, বড়োফুফুর কাঁধে হাত রেখে পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। বড়োফুফুর বাসা এখানেই, এক মিনিটের রাস্তা। আমার পড়ার টেবিল থেকে বড়োফুফুর বাসা দেখা যায়, বড়োফুফু বারান্দায় এলে আমি তাকে দেখতে পাই।

‘আমার সংসারডা যে কেমনে চলতাছেরে বাবা তা খালি আমি-ই জানি, আম্মারে কোনোভাবেই বোঝাইতে পারতাছি না। কইলাম যে, টু-লেট লাগাইছো, বাসা তো খালি অইবো। টু-লেট নামায়া ফ্যালাও বাসা খালি অইলে আমি উঠি। উঠতে দিবো না আমারে, কয় ভাড়া অইয়া গেছে, এরশাদুল টু-লেট নামানোর কতা ভুইলা গেছে। ডাহা মিছা কতা! আমার আম্মারে আমি চিনি না, সারাজীবন আব্বার লগে মিছা কতা কইয়া সংসার করলো! এরপর কইলাম, তাইলে আমারে নিচতলার হাফ ইউনিটে থাকতে দাও। দুইডা রুম আর এট্টা ডাইনিং, ওতেই আমার অইবো; অহনও তো অমনেই আছি, দরকার অইলে আমি তোমারে অর্ধেক ভাড়া দিমুনে। আম্মা কয়, “ভাড়া দিয়া যেহানে আছিস সেইহানেই থাক; আমার বাড়িতে তরে আইতে অইবো না।” আমি তার সৎ মাইয়ানি ক্যাডা জানে!’ বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন বড়োফুফু।

আমি বড়োফুফুকে আমার শরীরের আরো কাছে টেনে বলি, ‘চুপ করো, কেঁদো না।’

‘আল্লারে, নিজের প্যাটের মাইয়ার লগে কেউ নি এমন করে! আমি পারুম আমার মাইয়া কষ্টে থাকলে এমন চোখ বুইজা থাকতে? মাইয়া আমার কলেজ থেইকা আইতে এট্টু দেরি করলেই উতলা অইয়া আমি ফোন দেই। আর হ্যারা বচ্ছর বচ্ছর কুত্তা-বিলাইর মতোন বিয়াইছে, মইরা-ধইরাও তো কমডি বাইচ্চা নাই নাই; হ্যার লাইগাই দয়া-মায়া কম!’

আঁচলে চোখ মুছে বড়োফুফু আবার বলেন, ‘কতো কইরা বুঝাইলাম, কিছুতেই সে বোঝে না।’

‘তোমার আম্মা কী বোঝার বান্দা যে তুমি বোঝাইলেই সে বুঝবে! সে কী তার বুদ্ধিতে চলে? সে চলে চাচা আর মেজোফুফুর বুদ্ধিতে। আর আমার বাবা-মাও তাদের কথায় তাল দেয়। বললাম যে মামলা করো, তা না করে তুমি বুড়ির কাছে যাও ঘান ঘ্যান করতে, আর সারা বাড়ির মানুষের কাছে অপমানিত হও।’

‘নিজের আম্মা, নিজের ছোট ভাই, তাগো বিরুদ্ধে মামলা করলে মাইনষে কইবো কী! মামলা করুম না বইলাই তো সালিশ ডাকছিলাম। সালিশে আইলো মাত্র দুইজন মুরুব্বি।’

‘আসবে কী, বাবা আর চাচা তো আগেই সবার বাড়ি গিয়ে তাদের আসতে নিষেধ করছিল। বাবা-চাচার ক্ষমতা আছে, তোমার তো ক্ষমতা নাই। কে দাঁড়াবে তোমার পক্ষে? যে দুইজন আসছিল তারা ভাল মানুষ, এজন্যই তো মহল্লার অন্য মানুষ তাদের দেখতে পারে না।’

বড়োফুফুর বাসার সামনে এসে দাঁডাই। বলি, ‘যাও বাসায় যাও।’

‘তুই বাসায় চল, ভাত খাইয়া যাস।’

‘না, এখন আর উপরে উঠবো না। তুমি যাও।’

‘না, তুই চল। লাউ দিয়া শোলমাছ রানছি, তুই তো পছন্দ করস; খাইয়া যা। তুই ছাড়া আমার বাপের বাড়িতে আপন বলতে আর ক্যাডা আছে যারে এট্টু ভাল-মন্দ রাইন্ধে খাওয়ামু, যার লগে মন খুইলা দুইডা কথা কমু, আমি তো সবার শত্তুর! চল।’

‘তাইলে তুমি যাও, আমি বাসায় গিয়ে গোসল করে আসি।’

‘আইবি তো?’

‘হ আসবো।’

বড়োফুফুকে গেটে ঢুকিয়ে দিয়ে আমি ফিরি, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দেখি দোতলায় চাচার বাসার সামনে চাচী আর মেজোফুফু আলাপ করছেন; যথারীতি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এরশাদুল। আমার উপস্থিতিতে তাদের গতিময় আলাপ কিছুটা ছন্দ হারায়, আমি চুপচাপ ওপরে উঠে আসি। স্নানে যাবার আগে মাকে বলি, ‘আমি রাতে খাব না।’

‘খাবি না ক্যান?’

‘বড়োফুফুর বাসায় খাব।’

আমি মাকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে গামছাখানা নিয়ে বাথরুমে ঢুকি। অস্বস্তিকর গরম থেকে এসে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াতেই প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে দেহ-মনে। চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকতে ভাল লাগে। বেশ সময় নিয়ে গোসল করে বের হই। থ্রি কোয়ার্টার আর গেঞ্জির ভেতরে শরীর গলাতেই ফোন বেজে ওঠে। বিছানায় রাখা মোবাইলের স্ক্রীনে তাকাতেই দেখি-শাশ্বতীদি। গামছাখানা বারান্দার তারে মেলে দিয়ে এসে ফোন রিসিভ করি-‘হ্যালো…দিদি, কেমন আছো?’

‘ভালো। তুই ঢাকায় আছিস?’

‘হ্যাঁ।’

‘আগামী সোমবার সন্ধ্যায় বাসায় আসিস।’

‘কেন?’

‘আসিস তো, এলেই দেখতে পাবি।’

‘ও বুঝতে পেরেছি, তোমাদের অ্যানিভার্সারি। পরাগদা কোথায়?’

‘ও এখনো ফেরেনি, রাস্তায়। শোন, গল্পটার দ্বিতীয় পর্বিআজ ব্লগে দিয়েছি, ফেসবুকেও শেয়ার দিয়েছি, পড়ে দেখিস।’

‘হ্যাঁ পড়বো, আজ রাতেই পড়বো। প্রথম পর্ব পড়ার পর আমি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছি। এই সময়ে তোমার এই লেখাটা ভীষণ প্রয়োজনীয়, এই কথাগুলো মানুষকে জানানো দরকার। শিক্ষিত মানুষও না জেনে এই বিষয়ে অসভ্যের মতো মন্তব্য করে। এইসব তথাকথিত শিক্ষিতগুলোকে সভ্য করতে হলে এ ধরনের লেখার কোনো বিকল্প নেই।’

‘দেখিসনি কি রকম গালাগালির বন্যা বইয়ে দিয়েছে!’

‘তোমার বেশিরভাগ পোস্টেই তো মুমিনরা কোরান তেলাওয়াত আর গোঁড়া হিন্দুরা গীতাপাঠ করে! লেখাপড়া করে কী আর সবাই সভ্য হয়? এরাও হবে না। তবে হাজার জনের মধ্যে দু-জনও যদি তোমার লেখা পড়ে বিষয়টা সম্পর্কে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারে, সেখানেই সার্থকতা।’

‘আমিও তাই মনে করি রে। মানসিকতার পরিবর্তনটা আসতে সময় লাগবে। তবে সংখ্যায় খুব কম হলেও নতুন প্রজন্মের কিছু ছেলেমেয়ের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি। এটা আমাকে আশা জাগাচ্ছে।’

‘পরিবর্তনের ব্যাপারে আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি। দেশে যেভাবে মাদ্রাসা বেড়েই চলেছে, দেশটা যে কোনদিকে যাচ্ছে! তবে ইন্টারনেটের কল্যাণে মুক্তচিন্তার মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে এটা সত্য। হয়তো সমাজ কখনো বদলাবে কিন্তু আমরা তা দেখে যেতে পারবো না।’

‘নিশ্চয় বদলাবে, এখন আমরা হয়তো একটা অন্ধকার সময় পার করছি। কিন্তু মহাকালের হিসাবে একশো-দুশো বছর সামান্য সময়। আমি আশাবাদী যে একদিন সমাজ বদলাবেই। শোন, তুই কিন্তু সন্ধ্যার মধ্যেই চলে আসিস।’

‘সোমবার তোমরা অফিসে যাবে না?’

‘অফিস থেকে দুপুরের পরপরই চলে আসবো। বাসায় বলে আসিস যে রাতে থাকবি, জমিয়ে আড্ডা দেব।’

‘ঠিক আছে, আমি সন্ধ্যার মধ্যেই এসে পড়বো।….ওকে বাই।’

ফোন রাখতেই দেখি আমার দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে দাদি, তাকিয়ে আছে আমার দিকে, চোখে-মুখে অপ্রসন্নতা। বলি, ‘কি গো কমলাসুন্দরী, চোখে-মুখে তো প্রেম একেবারে উছলাইয়া পড়তাছে। অমন প্রেমময় দৃষ্টিতে কী দ্যাখতাছো? আসো ভেতরে আসো।’ বেশিরভাগ সময়ই আমি দাদীর সঙ্গে ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলি।

দাদী দেয়ালের মুখোশগুলোর দিকে তাকান, তারপর পুনরায় আমার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলেন, ‘তর ঘরে ঢুকুম না, তর ঘরে ঢোকনও গুণাহ। আল্লারে আল্লাহ, পেত্নি-পুত্নি ঝুলাইয়া ঘরডারে করছে কী! এই বাড়িতে নি ফেরেশতা আইবো কুনোদিন! যে জইন্যে হিন্দুগো বাড়িভাড়া দেই না, সেই বেশরিয়তী কাম অহন আমার বাড়ির মইদ্যে। আল্লাহ আমারে তুইলা নেয় না ক্যান!’

এক বাড়িতে থাকলেও দাদি আমার ঘরে প্রবেশ করেন না অনেকদিন। বলি, ‘এই যে রোজার দিনে এতোক্ষণ বইসা ইন্ডিয়ান বেপর্দা মালাউন মাইয়াগো নাটক দ্যাখতাছিলে, তাতে তোমার গুণাহ অয় নাই? আমার ঘরের ছবি আর ভাস্কর্য দেখলেই তোমার যতো গুণাহ অয়! টিভিতে নাটক-সিনেমা দ্যাখন তো হারাম। এই হারাম জিনিস দেইখা একটু পর আবার তারাবি নামাজ পড়বা!’

‘তর কাছ থেইকা আমার ধর্মের জ্ঞান নিতে অইবো না। তরে আমি যা কই তাই হুন।’

‘কও কী কইবা।’

‘তুই শামীমারে যা তা কইছস ক্যান?’

‘যা তা তো কই নাই। মেজোফুফু বড়োফুফুকে এই বাসায় আসতে নিষেধ করছে, তাই আমি তারে কইছি বাপের বাড়িতে বড়োফুফু যহন খুশি আইবো, তুমি নিষেধ করবার পারো না।’

‘মাইয়া আমার, তর লগে এতো খাতির কিয়ের?’

‘সত্যিই তোমার মাইয়া! নাকি দাদার লগে কারো গোপন সম্পর্ক আছিল, তার মাইয়া।’

‘তর দাদা তোগো মতো গুণাহগার আছিল না।’

‘তোমার মাইয়াই যদি অইবো তাইলে তুমি মাইয়াডারে এতো শাস্তি দিতাছো ক্যান?’

‘ওরে শাস্তি দিতাছি কই! তুই দুইদিনের পোলা, তুই কী জানোস? ওরে কম দেই নাই! বহুত দিছি ওরে। দুই-দুইবার বিয়া দিতে খরচ অইচে। আগের জামাইডা বালা আছিল না, মারধর করতো; ছাড়াইয়া নিয়া আইলাম। বহুত খরচা-পাতি কইরা আবার বিয়া দিলাম। এই জামাইডা এমনিতে বালা আছিল, মারধর করতো না; ব্যভারও বালা আছিল। তয় বেহিসেবী আছিল, কী ফুডানি তার, খাওন-পরনের কী বাহার! জামায় এট্টা ভাঁজ পরছে নি কুনোদিন? মনে অইতো জমিদারের ব্যাডা! ট্যাহা-পয়সা গুছাইতে পারে নাই, হ্যার দায় কী আমার? ডি ব্লকে ওগো তো প্লটও আছে, মামলা চলতাছে। মামলায় অরাই জিতবো।’

‘কবে মামলা জিতবো সেই আশায় বাতাস খাইয়া থাকবো ওরা! ওই জমির পার্টি তিনটা; জিতলেও তিনভাগ অইবো, ফুফারাও তিন ভাই।’

‘কয়দিন পর ওর মাইয়া পাস দিয়া বাইর অইবো, বাইর অইলেই তো চাকরি পাইবো। তহন ওগো ভাত খাইবো পরে।’

উহ্! এই বুড়ির সাথে কথা বলা মানে বাজে সময় নষ্ট করা। মেজাজও ঠিক থাকে না। বলি, ‘তাই বলে বাপের সম্পত্তি থেইকা তুমি তারে বঞ্চিত করবা?’

দাদী এবার উত্তেজিত, ‘বুঞ্চিত করলাম কই, কইলাম না ওরে বহুত দিছি। হুন, তরে এইসব নিয়া মাতা ঘামাইতে অইবো না। এ নিয়া মাতা ঘামানোর লাইগা আমি আছি, তর বাপ-চাচা আছে।’

‘আমি তো মাথা ঘামাই না। কিন্তু কইয়া দিও কেউ যেন বড়োফুফুরে এই বাড়িতে আসতে নিষেধ না করে। তাইলে কিন্তু আমি তারে ছাইড়া কথা কমু না।’

‘ই…মার পোড়ে না পোড়ে মাসির!’

দাদীর মুখে প্রবাদবাক্য শুনে আমার হাসি পায়! যতো রকমের বাঙালিয়ানা আছে তাকে হিন্দুয়ানী আখ্যা দিয়ে উঠতে-বসতে এরা ফোঁড়ন কাটে; অথচ চাল-চলন, কথাবার্তায় নিজেরাই সেই বাঙালিয়ানা থেকে বের হতে পারে না।

‘বড়োফুফু তোমারে ভালবাসে, তাই সে বারবার আইসা তোমারে তোষামোদ করতাছে, কিন্তু তুমি কোনো কথা কানেই নিতাছো না। যহন মামলা দিবো, বুড়াকালে কাঠগড়ায় যাইয়া দাঁড়াইবা, তহন কিন্তু আদালতের কথা ঠিকই কানে নিতে অইবো।’

দাদীর চোখ-মুখের তেজ হঠাৎ কমে যায়, আমার ঘরের ভেতরে কয়েক পা এগিয়ে আসেন, ‘অয় কি মামলা দিবো নাকি, তরে কইচে কিছু?’

‘তোমরা তারে বাপের সম্পত্তি থেইকা বঞ্চিত করবা, আর সে চুপ কইরা বইসা থাকবো!’

‘হ, অতো সোজা না, মামলা দিলেই অইলো, আমি বাইচ্চা আছি না!’

‘এইটা ব্রিটিশ আমল না আর তুমিও রানি ভিক্টোরিয়া না, মামলা দিলে কিন্তু ঠিক-ই তারে সম্পত্তি দিতে অইবো। মাঝখান থেইকা মান-ইজ্জত হারাইবা।’

‘মামলার ব্যাপারে অয় তরে কী কইছে?’

দাদীর নরম সুর দেখে হাত ধরে তাকে বিছানায় বসাই কোনোরকম জোরাজুরি ছাড়াই। অর্থাৎ মামলা বিষয়ে বড়োফুফু আমাকে কিছু বলেছে কিনা সেই ব্যাপারে তার এখন প্রবল কৌতুহল। কিন্তু আমি মামলার প্রসঙ্গ এড়িয়ে তুলি মুহাম্মদীয় তরিকা, ‘আচ্ছা, সারাক্ষণ তো আল্লাহ-বিল্লাহ আর ফেরেশতা ফেরেশতা কইরা মুখে ফ্যানা তুইলা ফ্যালো। আমারে তো উঠতে বসতে গুণাহগার কও, দোজখের আগুনে পোড়ার ভয় দ্যাহাও, গরম তেলে ভাজার-গরম জলে সিদ্ধ হবার ভয় দ্যাহাও। কিন্তু তুমিও তো ধরাডা খাইবা, তোমার দুই কাঁধে দুই ফেরেশতা কেরামান আর কাতেবীন বইয়া বইয়া সব লেইখা রাখতাছে, এই যে মাইয়ারে ফাঁকি দিতাছো, সেইটাও লেখতাছে। মাইয়া ফাঁকি দেওনের অপরাধে তোমার আল্লায় যে তোমারেও আগুনে পোড়াইবো, গরম তেলে ভাঁজবো তা কী তুমি জানো?’

‘হ, তরে কইছে!’

‘আমারে কইবো ক্যা, তোমার আল্লাহ’র সাহস আছে নি আমার সামনে আসার? কইছে নাকি তোমাগো পিয়ারের নবী মুহাম্মদরে, বসো দ্যাহাইতাছি।’

আমার কথা শেষ হওয়ামাত্র দাদী উঠে যেতে চাইলে আমি তাকে জোর করে পুনরায় বসিয়ে দিই। দ্রুততার সঙ্গে বইয়ের তাক থেকে কোরান নিয়ে সুরা নিসার সম্পত্তি বণ্টন সংক্রান্ত এগারো নম্বর আয়াত দাদীকে পড়ে শুনিয়ে বলি, ‘বুঝলে কিছু? এক ছেলের সমান সম্পত্তি পাইবো দুই মাইয়া; সেই হিসাবে বড়োফুফু কিন্তু একটা ফ্ল্যাট পায়।’

শুনে দাদী গম্ভীর, মুখে কোনো কথা নেই। এরপর শোনালাম তেরো এবং চৌদ্দ নম্বর আয়াত- ‘এসব আল্লাহ’র নির্ধারিত সীমা। আর যে আল্লাহ্ ও রসুলের অনুগত হয়ে চলবে, আল্লাহ তাকে স্থান দেবেন জান্নাতে, যার নিচে বইবে নদী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, আর এ মহাসাফল্য।’ সুরা নিসা (৪:১৩)

‘অপরদিকে যে আল্লাহ্ ও তার রসুলের অবাধ্য হবে ও তার নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে তিনি তাকে আগুনে ছুড়ে ফেলে দেবেন, সেখানে সে থাকবে চিরকাল; আর তার জন্য রয়েছে অপমানকর শাস্তি।’ সুরা নিসা (৪:১৪)

দাদীর মুখ আরো গম্ভীর, তিনি যে ভেতরে ভেতরে বিচলিত তা বেশ বুঝতে পারি আমি। তাকে আরো বিচলিত করতে বলি, ‘কী বুঝলে? মুখে মুখে সারাক্ষণ যতোই আল্লাহ-বিল্লারে ডাকো, আগুনের হাত থেইকা কিন্তু তোমারও রেহাই নাই। সময় থাকতে মাইয়ার সম্পত্তি বুঝাইয়া দাও।’

‘সর, তারাবি পড়মু।’ উঠে পড়েন দাদী।

বুঝিয়ে-সুজিয়ে কোনো কাজ হবে না, বড়োফুফুকে ফ্ল্যাট না দেবার সিদ্ধান্তে সবাই অনড়। তাই বিষে বিষক্ষয় করার পথ বাতলেছি। অবশ্য এতে কাজ হবে কিনা আমি জানি না, চেষ্টা তো করে দেখি। কোনোভাবে দাদীকে একবার রাজি করাতে পারলেই কাজ হবে; কারণ, দাদী যদি একবার বলে যে বড়োফুফুকে ফ্ল্যাট দেওয়া হবে, তাহলে বাবা-চাচার সাধ্য নেই দাদীর মুখের ওপর কথা বলার। দাদী ভয়ানক কড়া, চেঁচামেচি করে মহল্লার লোক জড়ো করবে; বছর চারেক আগেও চাচাকে চড় মেরেছিলেন। আর ধমক তো তিনি সবাইকেই দেন, কেবল আমার সঙ্গেই সুবিধামতো খবরদারি করতে পারেন না আজকাল।

আমার বড়োফুফু একদম সরল মনের মানুষ। আমি তাকে আমার মায়ের মতোই ভালবাসি, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মায়ের চেয়েও তাকে বেশি শ্রদ্ধা করি। দাদার মধ্যে যে সারল্য ছিল, সেটাই পেয়েছেন বড়োফুফু; ছোটফুফুও অনেকটা তেমনই। বাবা, চাচা আর মেজোফুফু পেয়েছে দাদীর স্বভাব; তবে মেজোফুফু দাদীকেও ছাড়িয়ে গেছেন। তুখোর কূটনৈতিক জ্ঞান তার, আমার ধারণা তিনি গোয়েন্দা, ক্রাইম রিপোর্টার কিংবা রাষ্ট্রদূত হলে একেবারে মাত করে দিতেন! কিন্তু বিএ পাস করেও তিনি পারিবারিক কূটনীতিতেই জীবনের অপচয় করছেন।

ছোটবেলা থেকেই নাকি মেজোফুফু আত্মসচেতন; ঈদে ভাল জামাটা তার চাই, বাসার ভাল খাবারটা তার চাই। আর বড়োফুফু ঠিক এর উল্টো, নিজের চেয়ে বোনের জামাটা ভাল হলেই তিনি খুশি হতেন, নিজের খাবারটা ভাই-বোনের মুখে তুলে দিতে পারলেই তিনি তৃপ্তি পেতেন। অথচ তার সেই ভাই-বোনদের কাছেই আজ তিনি ব্রাত্য। বড়োফুফুর প্রথম বিয়েটা টিকেছিল বছর খানেক। তার বর এবং বরের পরিবার তাকে নির্যাতন করতো, দাদার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার জন্য তাকে চাপ দিতো। ফলে দাদা বড়োফুফুকে ডিভোর্স করিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর বড়োফুফু আর বিয়ে করতে চাননি, বাবা-মা, ভাইদের সঙ্গেই বাকি জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। পরে দাদা তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে এগারো বছর পর আবার বিয়ে দিয়েছেন।

আমার এই ফুফা খুব ভাল মানুষ ছিলেন। সৌখিন ছিলেন খুব, পরিপাটী থাকতে পছন্দ করতেন। বছরে অন্তত দু-বার পরিবার নিয়ে ঘুরতে যেতেন। নিজে খেতে এবং মানুষকে খাওয়াতে ভীষণ পছন্দ করতেন। কাছাকাছি শ্বশুরবাড়ি, কিন্তু খালিহাতে কখনোই আসতেন না, ছোটদের জন্য আইসক্রিম হলেও নিয়ে আসতেন। তার এই স্বভাবই আমার দাদী পছন্দ করতেন না। বলতেন, ‘জমিদারের ব্যাডা, খালি ফুডানি!’

ফুফা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন বছর দেড়েক হলো। ফুফা যেহেতু কৃপণ স্বভাবের ছিলেন না, আবার পেশাগত জীবনেও সৎ ছিলেন, ফলে তিনি খুব বেশি সঞ্চয় করতে পারেননি। আকস্মিক ফুফা মারা যাবার পর দুই সন্তান নিয়ে ফুফু খুব সমস্যায় পড়েছেন। তার বাবার বাড়ির পাওনা ফ্ল্যাটে উঠতে চাইলেও দাদী এবং আমার বাবা-চাচা তাকে উঠতে দেননি। তিন বেড, ড্রয়িং-ডাইনিংয়ের বড়ো বাসা ছেড়ে ফুফু এখন দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে দুই বেড আর ডাইনিংয়ের ছোট্ট একটা বাসায় ভাড়া থাকেন। স্থান সংকুলানের অভাবে বেশিরভাগ ফার্নিচার বিক্রি করে দিয়েছেন। বড়োফুফুর মেয়ে নাদিয়া আপু ইডেন কলেজে পড়ছে, অনার্স ফোর্থ ইয়ার; ছেলে আবিদ একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ফুফা মারা যাবার পর খরচ টানতে পারবে না বলে এক বছর লস দিয়ে কমার্স কলেজে ভর্তি হয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি ইসলামী রাষ্ট্র, দেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান; সম্পত্তির বণ্টন সম্পর্কে কোরানে স্পষ্ট লেখা আছে, দেশের প্রচলিত আইনেও তা আছে; যদিও তা নারীর সঙ্গে স্পষ্টত প্রতারণা। মুসলমানরা মুখে মুখে নারী অধিকারের কথা বললেও আদতে ইসলামই প্রায় সর্বক্ষেত্রে নারীকে সবচেয়ে বেশি অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং পদে পদে নারীর সঙ্গে করেছে প্রতারণা; সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও তাই করেছে এক পুরুষের সমান সম্পত্তি দুই নারীকে দিতে বলে। তারপরও আমার বড়োফুফুর মতো লাখ লাখ নারী পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। যে বাড়িতে তারা জন্মে, বেড়ে উঠে, বিয়ের পর সেই বাড়িতে বাস করার অধিকার তারা হারায় স্বয়ং মা-বাবা এবং ভাইদের চক্রান্তে। দেশে এখন আশংকাজনক হারে বাড়ছে সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা। কেবল ভাইয়ের বিরুদ্ধে বোন নয়; ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই, মায়ের বিরুদ্ধে মেয়ে, বোনের বিরুদ্ধে বোন, চাচার বিরুদ্ধে ভাতিজা, মামার বিরুদ্ধে ভাগ্নে-ভাগ্নি ইত্যাদি ধরনের মামলা দিনকে দিন বাড়ছে। অথচ এরা নিজেদের মুসলমান দাবি করে, নামাজ পড়তে পড়তে কপালে সহিদাগ পড়ে যায়, বছর বছর লক্ষাধিক মানুষ হজে যায়, মসজিদের মাইক দিনে পাঁচবার হাঁক দেয়, মহল্লায় মহল্লায় ওয়াজের শব্দে কানের বারোটা বাজে। যে ধর্মগ্রন্থের জন্য এদেরই কেউ কেউ জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে, নিজের স্বার্থের জন্য সেই ধর্মগ্রন্থকেই আবার অমান্য করে এরা।

বড়োফুফুর বাসা থেকে খেয়ে নাদিয়া আপু আর আবিদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে এগারোটা বেজে যায়। ওদের সঙ্গে আড্ডা দিতে আমার ভাল লাগে, আমি উপভোগ করি। বাড়াবাড়ি রকমের ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়নি বলে ওরা ধার্মিক হলেও বেশ উদার। নাদিয়া আপু সবগুলো রোজা রাখলেও আবিদের টেনেটুনে পাঁচ-সাতটা হয়। আমি যে নাস্তিক এই ব্যাপারে ওদের কোনো অ্যালার্জি নেই আমাদের বাসার মতো। আমি তো আমার ছোট আপু আর চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে টানা দশ মিনিটও আলাপ করতে পারি না। ওরা আমার সঙ্গে আড্ডা চালিয়ে যাওয়ার মতো কথা খুঁজে পায় না, আমিও ওদের সঙ্গে আলাপের সময় বিষয়বৈচিত্রে ভুগি। ফলে প্রয়োজনের বাইরে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ওদের সঙ্গে আমার কথা হয় না। পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে একটু মন খুলে কথা বলতে পারি শুধু নাদিয়া আপু আর আবিদের সঙ্গেই।

 

(চলবে…..)

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 + = 60