স্বৈরাচারের ভাবমূর্তি

রাষ্ট্রের কাজ অনর্গল মিথ্যে বলা এবং সাধারণ মানুষের কাছে আষাঢ়ের গল্পের মাধ্যমে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা। আহাম্মকেরা সেই আষাঢ়ের গল্প সত্য ভেবে কখনও দেশপ্রেমের নামে, কখনও ধর্মপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদীদের কণ্ঠ রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে যায়। সরকার নিজেদের দুষ্কর্ম, অসৎ কার্যক্রম ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে কথিত ভাবমূর্তির নাটক সাজিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার মানুষদের কণ্ঠস্বরে বিষ মিশিয়ে স্বাধীনতার হত্যার পরিকল্পনা করে থাকে।
দেশের ভাবমূর্তি তখনই ক্ষুন্ন হয়, যখন সরকার মানুষের অধিকারকে সম্মান না জানিয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন করে থাকে। যখন সংবিধানের ধারা-কে তুচ্ছ করে নিজেদের শক্তিশালীরূপে ও স্বৈরাচারী মনোভাবে বশবর্তী হয়ে সাধারণের অধিকার ও চাহিদা এবং ন্যায্য পাওনাকে তোয়াক্কা করে। দেশের ভাবমূর্তি তখনই ধূলিসাৎ হয়, যখন সত্য প্রকাশে বাধা প্রদান করা হয়।
একটি স্বাধীন দেশে কখনোই মত প্রকাশের জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা কাম্য নয়। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরেও যদি মানুষ নিজের মত প্রকাশ করতে ভীতবোধ করে বা আতংকিত হয়ে থাকে, তাহলে বুঝে নিতে হবে সেই রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সেই রাষ্ট্র কখনোই মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকারে বিশ্বাসী নয়। সেই রাষ্ট্র শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতা ও দুর্নীতিতে বিশ্বাসী।
বাঙলাদেশে হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে গায়েব হয়ে গেলেও ভাবমূর্তি বজায় থাকে, মন্ত্রী কোটি কোটি টাকা ঋণখেলাপি করলেও ভাবমূর্তি বজায় থাকে, মন্ত্রীকে মানব পাচারের দায়ে বিদেশে গ্রেপ্তার করলেও ভাবমূর্তি বজায় থাকে, এমপি, কমিশনার, আমলা, পুলিশ, র্যাব- তাদের আত্মীয়স্বজনেরা দুর্নীতি ও হত্যা করলেও দেশের ভাবমূর্তি অটুট থাকে। কিন্তু কেউ যদি সেই দুর্নীতি, অসদাচরণ ও অন্যায়ের কথা লেখে- তখনই নাকি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়!
শেখ হাসিনার সমালোচনায় শেখ হাসিনার মানিজ্জত যায় না বরং শেখ হাসিনার মানিজ্জত তখনই যায়, যখন শেখ হাসিনা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, ২০১৮ স্বাক্ষর করেছিলেন। ১৫ বছরের একটা ছোট্ট বালকের সমালোচনায় শেখ হাসিনার হৃদয়ে জ্বালাও পোড়াও হওয়ার কথা নয়, বরং ১৫ বছরের বালকের গ্রেপ্তারে শেখ হাসিনা মানিজ্জত, সম্মান সব-ই বিলীন হয়ে যায়। শেখ হাসিনাকে ব্যঙ্গ করলে শেখ হাসিনার সম্মানহানি হয় না বরং সাংসদ শহীদ ইসলামের মানব পাচারে, কক্সবাজারের ইয়াবা সম্রাট আব্দুর রহমান বদি ও সন্ত্রাসের গডফাদার শামীম ওসমানকে সমর্থন দেওয়াতে শেখ হাসিনার সম্মানহানি হয়। শেখ হাসিনার সমালোচনায় বা সরকারের অসৎ কর্মের সমালোচনায় দেশ, জাতি, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে সম্মানহানির কোন সম্ভাবনা থাকে না বরং সম্মানহানি বা ভাবমূর্তিতে আঘাত তখনই লাগে যখন সরকারসমর্থিত হর্তাকর্তারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে।

দেশের ভাবমূর্তি তখনই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে- যখন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংক থেকে ৮৫০ কোটি টাকা পাওয়ার পরেও করোনা টেস্ট করতে সাধারণকে টাকা দিতে হয়। দেশের ভাবমূর্তি তখনই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে- যখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও করোনামুক্ত সার্টিফিকেট নিয়ে বাইরের দেশের এয়ারপোর্টে দেশী কোন মানুষকে চিহ্নিত/ গ্রেপ্তার করা হয়। দেশের ভাবমূর্তি তখনই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে- যখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ও চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে ভুল ও মিথ্যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। দেশের ভাবমূর্তি তখনই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে- যখন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংক থেকে আরও ৯০০০ কোটি টাকা পাওয়া সত্ত্বেও সঠিক কোন পরিকল্পনা, নির্দেশনা, জনস্বাস্থ্যে উপকারী কার্যক্রম, বিনামূল্যে চিকিৎসা, কর্মসংস্থানের কোন হিশাব উপস্থাপন করা হয় না। এবং এই সকল কারণেই জাপান, কোরিয়া ও ইউরোপ মহাদেশে বাঙলাদেশী পাসপোর্টধারীদের সাময়িক প্রবেশ নিষেধ করেছে।
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 − = 33