ভারত চীন সম্পর্ক ও বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব- প্রথম পর্ব

আমাদের পরিচিত পৃথিবী প্রতি মুহূর্তেই পরিবর্তনশীল এখানে প্রতিদিনই এমন কিছু কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় যা গোটা দেশ তথা সারা বিশ্বে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং নতুন নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করে। তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল গালওয়ান উপত্যকায় ভারত চীন সংঘর্ষ! করোনা আক্রান্ত বিশ্বে যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ব্যস্ত কিভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, সেখানে চীন ব্যস্ত এই সুযোগে কিভাবে তাঁর বিস্তারবাদী নীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্য বিস্তার করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে গোটা বিশ্বে করোনা ভাইরাস প্রসারের ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা খুবই সন্দেহজনক, চীনের অভ্যন্তরে করোনাতে কত মানুষ মারা গেছে তাঁর সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না, এক বেসরকারি টেলিকম কোম্পানি এক তথ্যে জানিয়েছে চীনে করোনার পরবর্তী সময়ে প্রায় 2 কোটি মোবাইল সংযোগ কমে গেছে তাই প্রকৃতপক্ষে চীনে কতজন মারা গেছে তাঁর সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না! আজও চীনে করোনায় কতজন আক্রান্ত তাঁর সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না।

এমতাবস্থায় গোটা বিশ্বব্যাপী চীনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে জার্মানি, ফ্রান্স সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীনের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের দাবি আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার কথা ভাবছে। জাপান, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন, ব্রিটেন, কানাডা, হংকং, তাইওয়ান, ম্যাকাও, ভিয়েতনাম সহ আশিয়ান দেশসমূহ, ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করার দিকে এগোচ্ছে, তাই চীন তীব্র চাপে পড়ে গেছে। অন্যদিকে করোনা পরবর্তী সময়ে চীনে তীব্র বেকারত্ব দেখা যাচ্ছে তাই চীনের সর্বেসর্বা শি জিন পিং এর গদি আজ টলমল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে ও শি জিন পিং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের স্বর দেখা যাচ্ছে এবং চীনে যেকোন সময় বিদ্রোহ দেখা যেতে পারে। তাই চীনের জনগণকে শান্ত রাখতে ও বিশ্বের নজর ঘোরাতে চীন আক্রমণাত্মক বিদেশনীতি শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন চীন বর্তমান বিশ্বের ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে’ পরিণত হয়েছে। চীন মনে করে করোনা পরবর্তী বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব দ্রুত হ্রাস পাবে তাই আমেরিকার জায়গা দখল করতে গিয়ে এই আক্রমণাত্মক সাম্রাজ্যবাদী বিস্তারবাদী নীতির প্রয়োগ।

তেমনি এক নীতির ফল হল গত 15-16 ই জুন 2020 রাত্রিবেলা, দীর্ঘ 45 বছর পর চীন নিরস্ত্র ভারতীয় সৈনিকদের আক্রমণ করে, সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায় 100 জন ভারতীয় সৈনিকদের উপর প্রায় 350 জন চীনা সৈনিক রড, লঠি, বেয়োনেট, ধারালো অস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে আক্রমণ করে। এলএসি (LAC) তে চুক্তি অনুযায়ী ভারত ও চীন উভয় পক্ষের সেনা বন্দুক ব্যাবহার করতে পারে না, তাই ভারতীয় সৈনিকরা চুক্তি অনুযায়ী নিরস্ত্র ভাবেই দেখতে গিয়েছিল চীনা সৈনিকরা নিয়ন্ত্রণ রেখা থেকে পিছিয়েছে কি না। একদিকে যখন উভয় পক্ষের সেনা প্রধানদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আলোচনা চলছিল তখন এই আক্রমণ চুক্তি লঙ্ঘন ও বিশ্বাসঘাতকতার শামিল!

অতর্কিত আক্রমণে প্রথমদিকে ভারতীয় সৈনিকরা আক্রান্ত হলে ও দ্রুত তাঁরা প্রত্যাঘাত করে। অনেক উচুতে এই লড়াই হওয়ার ফলে বেশ কিছু জাওয়ান নীচে নদীতে পড়ে যায় হিমাঙ্কের অনেক নীচে তাপমাত্রা থাকার ফলে, দীর্ঘসময় এই আহত জাওয়ানরা পড়ে থাকার কারণে অতিরিক্ত ঠান্ডায় এরা মারা যায়। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী এই অতর্কিত আক্রমণে 20 জন ভারতীয় সৈনিকের মৃত্যু হয় ও বহু ভারতীয় সৈনিক আহত হয়, অন্যদিকে চীনের প্রায় 43 জন সৈনিক মারা যায় ও শতাধিক আহত হয়। আসলে চীনা সৈনিকরা আশা করেনি, যে ভারতীয় সৈনিকরা প্রত্যাঘাত করতে পারে! তাই ভারতীয় সৈনিকদের এই আক্রমণে চীন অবাক হয়ে যায়। তবে বরাবরের মতো চীন তাদের সেনার হতাহতের বিষয়টি চেপে যায়। তাই বর্তমানে গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের মধ্যে এক অনমনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে! তাই আগামী দিনে কি হবে তা বলা খুবই মুসকিল!

এছাড়া ও চীন প্যাঙ্গোন লেকের 8 থেকে 5 নম্বর ফিঙ্গার পর্যন্ত জায়গা দখল করেছে। এই লেকে ভারতের সরাসরি 1-4 ফিঙ্গার পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং ফিঙ্গার 8 পর্যন্ত তাঁরা পেট্রোলিং করতে পারত অথচ এখন চীনা সৈনিকরা এই অঞ্চল দখল করার ফলে এখানে ভারত ও চীনা সৈনিকরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটা ভারত ও চীনের সীমান্তে একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়েছে। চীনের এই নীতিকে বলে ‘Salami Slicing’ অর্থাৎ চীন একেবারে কোন অঞ্চল দাবি করবে না, ধীরে ধীরে প্রথমে একটি নদী দাবি করবে তারপর একটা গ্রাম তারপর পুরো অঞ্চল এভাবে ধীরে ধীরে পুরো এলাকা চীন দখল করে নেবে। চীনের এই ‘Salami slicing’ নীতি নিয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন এবং কোন ভাবেই চীনকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়া উচিত নয়, একটু ছাড় দিলে ধীরে ধীরে চীন পুরো এলাকা দখল করে নেবে। ভারতীয় সেনা সচেতন রয়েছে তাই সমস্যা হবে বলে মনে হয় না!

□ এবার প্রশ্ন হল গালওয়ানের এই সমস্যার সূত্রপাত হল কিভাবে?

ঐতিহাসিক ভাবে দেখতে গেলে বলতে হয় গালওয়ান উপত্যকা ভারতীয় সীমান্তের অভ্যন্তরে অবস্থিত। 1962 সালে চীন অতর্কিতে ভারত আক্রমণ করে এবং ভারত চীন যুদ্ধের সুত্রপাত হয়। ‘পঞ্চশীল নীতিতে’ আস্থাশীল নেহেরু সরকার ‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’ আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কোন রকম যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়নি, তাই অতর্কিত আক্রমণে এই যুদ্ধে ভারতের পরাজয় হয়। পরে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। তবে এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে, এই যুদ্ধের পর 1967 সালে চীন আবার একই কৌশলে সিকিমের কাছে নাথুলায় আক্রমণ করে এই যুদ্ধে আগে থেকে সচেতন থাকার কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনা সৈন্যবাহিনীকে রুখতে সক্ষম হয়। নথুলার যুদ্ধে 80 জন ভারতীয় সৈনিক মারা গেলেও 400 জনের অধিক চীনা সৈনিকের মৃত্যু হয় তাই এত অধিক চীনা সৈনিকের মৃত্যুর কারণে চীন শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে চীন অতর্কিতে এই আক্রমণ করেছিল সিকিম দখল করার জন্য এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী সচেতন থাকার কারণে সেবার চীনা বাহিনী পরাজিত হয়।

আসলে চীনের এই বিস্তারবাদী নীতির কারণেই সিকিমের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে এছাড়া আরও নানা অভ্যন্তরীণ কারণে সিকিম গণভোটের মাধ্যমে 1975 সালের 16 ই মে ভারতের 22 তম অঙ্গরাজ্য হিসাবে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর অরুণাচল প্রদেশের তুলুং লেতে 1975 সালের 20 ই অক্টোবর শেষ ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয় যখন অসম রাইফেলের চার সৈনিককে চীনারা গুলি করে মারে। এরপর থেকে উভয় দেশের সৈনিকরা চুক্তিতে আবদ্ধ হয় সীমান্তে অযথা গোলাগুলি চলানো যাবে না এবং কোন সমস্যা হলে বন্দুক ছাড়া উভয় সেনা শান্তিপূর্ণ ভাবে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের সমস্যার সমাধান করবে, বলাইবাহুল্য এই চুক্তি এতদিন পর্যন্ত মেনে চলা হচ্ছিল এবং সাম্প্রতিক গালওয়ান উপত্যকায় চীনা আক্রমণে এই চুক্তি লঙ্ঘিত হয়।

যাইহোক 1962 সালে ভারত চীন যুদ্ধের পরে চীন ‘আকসাই চীন’ অঞ্চল দখল করে তখন থেকেই এই আকসাই চীন অঞ্চল চীনের দখলে রয়েছে এবং ভারত চীন সীমান্তকে বলে এলএসি (LAC)। এই এলএসি সীমানা নির্দিষ্ট নয় 1962 সালের যুদ্ধে চীনা সেনা যতটা পিছিয়ে গেছে সেটাই এলএসি সীমান্তে পরিণত হয়েছে। তাই চীন মাঝে মধ্যেই এই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতীয় এলাকার উপর দাবি জানাই। চীন বরাবরই এই সীমান্ত নিয়ে আগ্রাসী মনোভাব দেখায় তাঁরা নিজেদের সীমান্তে বৃহৎ সড়ক নির্মাণ করেছে এর ফলে সীমান্তে চীনা সৈনিকরা বাড়তি সুবিধা পাবে। এখন ভারত তাঁর নিজের অধিকার ভুক্ত অঞ্চলে লাদাখের দারবুক থেকে দৌলতবেগ ওল্ডি (ডিবিও) পর্যন্ত 255 কিমি দীর্ঘ পাকা ‘অল ওয়েদার রোড’ তৈরী করলে চীন গভীর চিন্তায় পড়ে যায়। কারণ এই ‘দওলাত বেগ ওল্ডি’ সামরিক এয়ারস্ট্রিপ প্রায় তেরো থেকে ষোলো হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এত উচ্চতায় অবস্থানের কারণে এটি সামরিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এখান থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনী একদিকে চীনের দিকে নজর রাখতে পারবে, অন্যদিকে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের দিকে ও নজর রাখতে পারবে।

এখান থেকে POK এর মাত্র 20 কিমি দূর দিয়ে গেছে কারাকোরাম পাস ও চীন পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর, চীনের ভয় এই রোডটি সম্পূর্ণ হওয়ার ফলে লেহ থেকে দৌলতবেগ ওল্ডি পর্যন্ত অঞ্চলে ভারতীয় সেনারা খুব দ্রুত পৌঁছাতে পারবে এবং সাপ্লাই লাইন মজবুত হওয়ার ফলে আকসাই চীন ও পিওকের (Pok) নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। এই সড়কটি তৈরী হওয়ার ফলে দুর্গম অঞ্চলে আগে যেখানে সেনার পৌঁছাতে 28 ঘন্টা সময় লাগত সেখানে এখন ভারতীয় সৈনিকরা মাত্র 3 ঘন্টাতে পৌঁছাতে পারবে। অন্যদিকে সিওক নদীর উপর সেতু নির্মাণ ও আরও বেশ কিছু সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার ফলে চীন এই নির্মাণ প্রক্রিয়া যেততেন প্রকারণে রুখতে চাই এবং এই অঞ্চলকে নিজেদের অঞ্চল বলে দাবি করতে থাকে। চীনের বিস্তারবাদী নীতির অংশ হিসাবেই গালওয়ান উপত্যকায় চীনের এই আক্রমণ।

□ এবার প্রশ্ন হল চীনের সঙ্গে ভারতের কি কোন প্রকৃত সীমান্ত সমস্যা রয়েছে?

ভারত চীন সীমান্ত সমস্যা বুঝতে গেলে ইতিহাসের পাতায় নজর রাখতে হবে। পৃথিবীর আদি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে লড়াই চলছে। ধনতান্ত্রিক দেশগুলি সর্বদা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিকে হারাতে চাই অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিকে ধ্বংস করতে চাই।উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পৃথিবীতে বৃহৎ দুই শক্তির উত্থান ঘটতে থাকে একদিকে রাশিয়ান সাম্রাজ্য অন্যদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। এরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা শঙ্কিত থাকত ব্রিটেন ভাবত রাশিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ আবার অন্যদিকে রাশিয়া ভাবত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আমাদের ধ্বংস করতে পারে তাই শতাব্দী প্রাচীন ধনতান্ত্রিক দেশগুলির সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির এই স্নায়ুযুদ্ধকে বলা হয় ‘The Great Game’ অনেকে আবার একে রাশিয়া ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে সংঘর্ষ বলে ও উল্লেখ করেন।

ব্রিটিশরা রাশিয়ার প্রতি ভয় থেকে ‘বাফার স্টেটের’ পরিকল্পনা করে। অর্থাৎ ব্রিটিশদের মতে রাশিয়ার হাত থেকে বাঁচতে গেলে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত, দেশের নিরাপত্তার জন্য ঠিক নয়। তাই রাশিয়ার হাত থেকে বাঁচতে ব্রিটিশরা আফগানিস্তানকে ‘বাফার স্টেট’ হিসাবে ব্যাবহার করে। অন্যদিকে ব্রিটিশরা চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে তিব্বতকে ‘বাফার স্টেট’ হিসাবে ব্যাবহার করে। মনে করা হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও রাশিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্যে ‘The Great game’ চলেছিল 12 জানুয়ারি 1830 থেকে 10 ই সেপ্টেম্বর 1895 সাল পর্যন্ত। তবে বহু বিশেষজ্ঞরা মনে করে আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে অঘোষিত ভাবে নতুন নতুন সাম্রাজ্য বিস্তারের খেলা চলছে অনেকেই একে ‘The New Great game’ বলে অভিহিত করেন।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রচেষ্টাহেতু ভারত ও তিব্বতের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি সংগঠিত হয়। তাই ভারত ও চীনের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোন নিয়ন্ত্রণরেখা নেই, আসলে ভারতের সীমান্ত তিব্বতের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং তিব্বতের সঙ্গে ভারতের বরাবরই সুমধুর সম্পর্ক ছিল! তাই ঐতিহাসিক ভাবে ভারত এবং তিব্বতের মধ্যে কোন দিন সীমান্ত সংঘর্ষ হয়নি। ভারত ও তিব্বত পরস্পর বন্ধু রাষ্ট্র হিসাবে বহু বছর পরস্পর সহাবস্থান করেছিল। তবে পরবর্তীকালে চীন তিব্বত দখল করে।

চীন তিব্বত দখল করার পর থেকেই ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত সমস্যার সূত্রপাত হয়। ভারত তিব্বত সীমান্ত যা চীনের তিব্বত অধিগ্রহণের পর ভারত চীন সীমান্তে পরিণত হয়। এই সীমান্তের সমস্যা বুঝতে গেলে আগে বুঝতে হবে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত কয়টি অংশে বিভক্ত। ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত 3915 কিমি দীর্ঘ। এই সীমান্তকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়- Western sector, Middle sector এবং Eastern sector. এই Western sector এর সীমান্ত জম্মু কাশ্মীরের লে ও লাদাখ অঞ্চল দিয়ে গেছে এই সীমান্তের দৈর্ঘ্য হল 2150 কিমি। এই অঞ্চলকে ভারত আকসাই চীনের অংশ বলে এবং চীন দাবি করে এটা তাঁদের জিন জিয়াং প্রদেশের অংশ। তাই আকসাই চীন ও জিন জিয়াং প্রদেশ বলতে একই অঞ্চলকে বোঝায়। ভারত চীন সীমান্তে সবচেয়ে বেশি সমস্যা এই Western sector এ দেখা যায়।

Middle sector এই সীমান্তটি ভারতের হিমাচল প্রদেশ ও উওরাখন্ড অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে গেছে। এই সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় 625 কিমি। মনে করা হয় এই অঞ্চলে চীনের সঙ্গে ভারতের কোন সীমান্ত সমস্যা নেই। তবে এটাও যথার্থ বিশ্লেষণ নয় আসল কথা হল এই অঞ্চলের সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী উঁচু অঞ্চলে অবস্থিত তাই কৌশলগত দিক থেকে ভারত বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তাই এই অঞ্চলে চীন খুব একটা সমস্যা সৃষ্টি করে না, কারণ এই অঞ্চলে সমস্যা তৈরী করতে আসলে চীনের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, তাই চীন এই অঞ্চলে চুপ থাকে।

তবে ইদানিং চীন তাঁর অনুগামী ‘নেপালি কমিউনিস্ট পার্টির’ প্রধান নেপালি প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে দিয়ে এই অঞ্চলে নতুন সমস্যা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। 1816 খৃষ্টাব্দে ইঙ্গ-নেপাল যুদ্ধের পর ‘সগৌলির চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয় এই চুক্তি অনুসারে মহাকালি বা কালি নদীকে উভয় দেশের সীমান্ত হিসাবে গ্রহণ করা হয় তাই লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিধুরা ভারতের উত্তখন্ড রাজ্যের অংশ কিন্তু এতদিন পর চীনের কৌশলে নেপাল দাবি করে এই লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিধুরা নেপালের অন্তর্গত। নেপালি পার্লামেন্ট এ বিষয়ে একটি বিল পাশ করে এবং নতুন মানচিত্রকে বৈধ্যতা প্রদান করেছে। এখন নেপাল আবার এক উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে যাদের কাজ হল লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিধুরার উপর নেপালের দাবির বৈধতা কতটা তা খতিয়ে দেখা। অর্থাৎ নেপাল সরকার নিজেই সঠিক জানে না আসলেই এ অঞ্চলের উপর তাঁদের দাবির বৈধতা কতটা? এথেকেই বোঝা যায় নেপাল আসলে চীনের কথা অনুযায়ী চলছে। নেপালের এরূপ কর্মসূচির ফলে ভারত ও নেপালের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নয় বরং এটা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একে ‘রোটি বেটি’ সম্পর্ক বলে। নেপালের 2 কোটি 80 লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রায় 80 লক্ষ মানুষ ভারতে থাকে ও কাজ করে। নেপালি নাগরিকরা ভারতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে, সরকারি চাকরি করতে পারে এবং নেপালিদের দ্বারা গঠিত ‘গোর্খা রেজিমেন্ট’ ভারতের সেনাবাহিনীর এক শক্তিশালী অংশ।

ভারতের সঙ্গে নেপালের সম্বন্ধ এতই মধুর যে উভয় দেশের মধ্যে কোন সীমান্ত নেই এবং উভয় দেশের মানুষের পরস্পর যাতায়াত করতে পাসপোর্টের দরকার হয় না। যেহেতু এই Middle sector এ ভারত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে তাই চীন, নেপালি কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতায় ভারতকে এই অঞ্চলে রুখতে চাই। আসলে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে প্রচুর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাই ওলি যে কোন সময় ক্ষমতাচ্যুত হতে পারেন। তাই তিনি ভারত বিরোধী মনোভাব জাগিয়ে তুলে নেপালে ক্ষমতায় ফিরতে চান। তবে ওলির এরূপ কর্মসূচির ফলে নেপালের জনগণের কষ্ট অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে সীমান্তে উত্তেজনার কারণে নেপাল সীমান্তে পণ্যবাহি ট্রাকের আদান প্রদান কম হচ্ছে এরফলে নেপালে জিনিসপত্রের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ওলি সরকার নতুন ‘নাগরিকত্ব আইন’ আনার ফলে ভারত ও নেপালের নাগরিকদের সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরফলে ওলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চরমে উঠেছে। ভারত সরকার নেপালের এরূপ কর্মকান্ডকে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি ও প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির ব্যাক্তিগত কার্যকলাপ বলে মনে করে। ভারত সরকার মনে করে নেপাল ও ভারতের জনগণের সুপ্রাচীন সম্পর্ক যাতে না আক্রান্ত হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তাই নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ভারত বিরোধীতায় অন্ধ হয়ে নেপাল চীনের সমস্যাকে লঘু করে দেখছেন। সাম্প্রতিক নেপালি ভূদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায় নেপালের বেশ কিছু অংশ চীন দখল করেছে। আসলে চীনের বহু দিনের স্বপ্ন নেপাল দখল করার। ওলি তাঁর ব্যক্তিগত লাভের জন্য নেপালের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে চীনের কাছে বিসর্জন দিতে চলেছে, এর চরম মূল্য নেপালের জনগণকে দিতে হবে।

এবার আসা যাক Eastern sector নিয়ে, এই সীমান্তটি 1140 কিমি লম্বা। এই সেক্টরে ভারতের সিকিম সীমান্ত ও অরুণাচল প্রদেশ অবস্থিত। চীন সিকিমকে ভারতের অঙ্গ বলে স্বীকার করতে চাই না এবং অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে মনে করে। তাই ভারত ও চীনের সীমান্ত সমস্যা খুবই জটিল। এবার দেখা যাক ভারত ও চীনের সীমান্ত সমস্যার মূল সূত্রপাত কিভাবে?

ভারত চীন সীমান্ত সমস্যা বুঝতে হলে সেক্টর ধরে ধরে আলোচনা করতে হবে। Western sector বা পশ্চিম সীমান্তে ভারত ও তিব্বতের মধ্যে নির্দিষ্ট কোন সীমান্ত ছিল না। তাই ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বত নিজেদের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে প্রথম 1865 সালে আলোচনায় বসে। এই বছর ব্রিটিশ অফিসার ‘উইলিয়াম জনসনকে’ দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারত ও তিব্বতের মধ্যে সীমান্ত চিন্হিত করার। জনসনকে এই কাজে সাহায্য করেন ‘জন আরডক’। ভারত ও তিব্বত বহু দিন আলোচনা করে যে সীমান্ত তৈরী করে তাঁর নাম হল ‘জনসন আরডক লাইন’। জনসন লাইন অনুসারে আকসাই চীন ভারতের অংশ বলে স্বীকার করা হয়। ভারত সরকারি ভাবে আজও এই নীতি মানে এবং পশ্চিম সেক্টরে জনসন লাইনকে ভারতের সীমান্ত হিসাবে চিন্হিত করা হয়।

‘জনসন আরডক লাইন’ সীমান্ত হিসাবে ভারত ও তিব্বত উভয় দেশ মেনে নেয় কিন্তু তিব্বতের প্রতিবেশি দেশ চীন এই সীমান্ত মানতে চাইনি। চীনের যুক্তি হল যখন ‘জনসন লাইন’ তৈরী হয় চীনকে তা জানানো হয়নি তাই চীন এই লাইন মানবে না। অন্যদিকে ব্রিটিশদের যুক্তি ছিল সেইসময় চীনে মুসলিম সংখ্যালঘুদের এক বিদ্রোহ হচ্ছিল একে ‘ডানগিয়ান বিদ্রোহ’ বলা হয়। তাই ব্রিটিশরা এই ‘জনসন লাইনের’ কথা চীনকে জানাতে পারেনি তবে কাশ্মীরের রাজা ও তিব্বতকে জানিয়েছিল। তাছাড়া জনসন লাইন ভারত ও তিব্বতের মধ্যে দিয়ে গেছে তাই ব্রিটিশ সরকার এই লাইনের কথা চীনকে জানানোর বিশেষ প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি।

কাশ্মীরের রাজা এই ‘জনসন লাইনের’ শেষ সীমান্তে একটি দূর্গ নির্মাণ করেন এই দূর্গটির নাম হল ‘Ford of Sahidulla’ এটিকেই ভারত ও তিব্বতের সীমান্ত হিসাবে চিন্হিত করেন। তবে দুর্গম পরিবেশ হওয়ার কারণে তিনি এই দূর্গটি বিশেষ ব্যাবহার করেনি তাই চীন দাবি করে তাঁরা এই বিষয়ে জানে না এবং এই লাইন মানবে না। ভারত ও তিব্বতের সীমান্তের পাশেই চীন ও তিব্বতের সীমান্ত ছিল এই সীমান্ত নির্দিষ্ট ছিল না। 1878 সালে অতর্কিতে চীন তিব্বতের আকসাই চীন অঞ্চলে আক্রমণ করে এই অঞ্চল দখল করে এবং এটিকে চীনের জিনজিং প্রদেশের অংশ বলে দাবি করে। আসলে চীন তিব্বতের স্বাধীন অস্তিত্ব কোন দিন স্বীকার করেনি, চীন সব সময় মনে করত তিব্বত চীনের অধীন একটি রাষ্ট্র। তাই এতদিন যেটা ভারত ও তিব্বতের মধ্যে সীমান্ত ছিল এবার চীন সেখানে দাবী জানাতে থাকে।

চীন এই উদ্দেশ্যে 1892 সালে নিজে থেকেই এক ম্যাপ তৈরী করে এই ম্যাপে কারাকোরাম পাস পর্যন্ত অঞ্চল চীনের অধীনে দেখানো হয়। চীন ভারত সীমান্ত সমস্যা মেটাতে 1893 খৃষ্টাব্দে চীন ও ব্রিটিশ কাউন্সিল জেনারেল ‘জর্জ ম্যাককারটি’ বসে। 1899 সালে চীন ও ব্রিটিশ কাউন্সিলার একসঙ্গে বসে তবে এবার ‘ম্যাকডোনাল্ড’ নামে এক ব্রিটিশ অফিসার এই লাইন গঠন করতে সহযোগিতা করে। তাই ভারত চীনের মধ্যে গঠিত নতুন লাইনের নাম হয় ‘ম্যাককার্টি ম্যাকডোনাল্ড’ লাইন। যা সাধারণত আমরা ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইন’ নামেই চিনি। এই লাইন অনুসারে আকসাই চীনকে, চীনের জিনজিং প্রদেশের অংশ হিসাবে দেখানো হয়। আসলে চীন সর্বদা নতুন নতুন মানচিত্র দেখিয়ে নিজের এলাকা বিস্তারের চেষ্টা করে চীনের এই নীতিকে ‘Cartographic Aggression’ বলা হয়।

মানচিত্র নিয়ে চীনের এই আগ্রাসী মনোভাবের জন্য সীমান্তে আবার সমস্যা দেখা দেয়। চীন কিন্তু কোনও দিন ব্রিটিশ সরকারের কাছে ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইনের’ কথা স্বীকার করেনি। ব্রিটিশ সরকার ভারত, তিব্বত ও চীনের সীমান্তকে সরকারি ভাবে ‘জনসন লাইন’ দ্বারা চিন্হিত করত। অন্যদিকে চীন দাবি করে তাঁরা ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইন’ মানে। পূর্ব থেকে স্বীকৃত ‘জনসন লাইন’ অনুসারে আকসাই চীন ভারতের অংশ আবার নতুন ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইন’ অনুসারে আকসাই চীন চীনের জিনজিং প্রদেশের অংশ। তাই উভয় দেশের মধ্যে আবার সীমান্তে বিবাদ দেখা যায়। তাই ‘জনসন লাইন’ ও ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইনের’ এই সমস্যা সমাধান আজও সম্ভব হয়নি। আসলে চীন ম্যাকডোনাল্ড লাইন অনুসারে আকসাই চীনের কতটা অংশ নিজেদের মনে করে তারও কোন সঠিক ব্যাখ্যা নেই।

চীন কোন দিনই কোন দেশের সঙ্গে সঠিকভাবে মানচিত্র আদানপ্রদান করেনি তাই ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। চীনের এই নীতিকে বলে ‘মানচিত্র আগ্রাসন’। ভারত চীন পশ্চিম সেক্টরের সমস্যা হল দুই লাইনের সমস্যা। ভারত মনে করে ‘জনসন লাইন’ ভারত ও চীনের সীমান্ত অন্যদিকে চীন মনে করে ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইন’ ভারত ও চীনের সীমান্ত। জনসন লাইন অনুসারে আকসাই চীন ভারতের অংশ এবং ম্যাকডোনাল্ড লাইন অনুসারে ‘আকসাই চীন’ চীনের জিন জিয়াং প্রদেশের অংশ। বলাইবাহুল্য ভারত চীনের এই সীমান্ত সমস্যার সমাধান আজও সম্ভব হয়নি আসলে ম্যাকডোনাল্ড লাইন অনুসারে কতটা অংশ চীন নিজেদের দাবি করে তা আজও পরিস্কার নয়। বলাইবাহুল্য এই সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে 1962 সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ ও সংগঠিত হয় তবুও আজও এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি।

এবার আসা যাক ভারত ও চীনের মধ্যে Eastern sector বা পূর্ব সীমান্ত সমস্যা নিয়ে। পূর্ব প্রান্তের সীমান্ত সমস্যা মেটাতে 1914 সালে সিমলায় তিব্বত, চীন ও ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা মিলিত হন। এই অধিবেশনে চীনের প্রতিনিধি ছিল ইয়ান চেং, সিকিমের রাজা, তিব্বতের প্রতিনিধি ও ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি স্যার ‘হেনরি ম্যাকমোহন’। কয়েক মাস আলোচনার পর ম্যাকমোহন এক সীমান্ত তৈরী করেন এখানে উল্লেখিত হয় ‘Outer Tibet’ তিব্বত শাসন করবে ও ‘Iner Tibet’ চীনের অধীনে থাকবে। এই চুক্তি অনুসারে ‘চামডো নদীকে’ তিব্বত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত হিসাবে গ্রহণ করা হয়। এই চুক্তির ফলে একই সঙ্গে তিব্বত চীন ও ভারত তিব্বতের সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা হয়। যেহেতু বহিঃতিব্বতের সীমান্ত ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সঙ্গে মিলিত হত তাই এখানের সমস্যা মিটে যায়। অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অংশ এটা তিব্বত মেনে নেয়। চীনা প্রতিনিধি এই চুক্তি মৌখিক ভাবে মেনে নেয় কিন্তু ভারত, তিব্বত ও চীনের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় চীন বেঁকে বসে এবং এই চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। তাই শেষ পর্যন্ত ভারত ও তিব্বত এই ‘সিমলা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এই সিমলা চুক্তির সাহায্যে ভারত ও তিব্বতের মধ্যে ‘ম্যাকমোহন লাইন’ সীমান্ত হিসাবে নির্ধারিত হয়।

চীন এই চুক্তি মানতে অস্বীকার করে। চীনের দাবি হল তিব্বত আসলে চীনের অধীন একটি রাষ্ট্র তাই চীনের অনুমতি ছাড়া তিব্বত সিমলা চুক্তিতে সাক্ষর করে কিভাবে? অন্যদিকে ব্রিটিশদের যুক্তি ছিল যেহেতু ভারত ও তিব্বতের মধ্যে সীমান্ত থাকায় এই দুই দেশ রাজি হওয়ায় সীমান্ত নিয়ে আর কোন সমস্যা থাকার কথা নেই। তবে এটা ঠিক ইংল্যান্ড ও মনে করত তিব্বত পুরোপুরি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। তাহলে প্রশ্ন হল ইংরেজরা এমন চুক্তি সম্পন্ন করল কেন এবং চীনকে আপত্তি করেনি কেন? তাঁর উত্তর হল সালটি ছিল 1914 অর্থাৎ শীঘ্রই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তাই ব্রিটেনের এই বিশ্বযুদ্ধে চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল তাই বিশ্বযুদ্ধের কারণ হেতু ব্রিটেন দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করে এবং চীনের দাবির বিশেষ বিরোধীতা করেনি।

তাই ভারত চীনের সীমান্ত সমস্যা একই রকম রয়ে যায়। ভারত ম্যাকমোহন লাইনকে ভারত, তিব্বত ও চীনের সীমান্ত বলে মনে করে অন্যদিকে চীন ম্যাকমোহন লাইনকে মানতে অস্বীকার করে। চীনের দাবি হল অরুণাচল প্রদেশ দক্ষিণ তিব্বতের অংশ এবং বিশেষত অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং মঠ অঞ্চলটি বৌদ্ধ ধর্মের জন্য খুবই পবিত্র স্থান তাই তাওয়াং অঞ্চল ও অরুণাচল প্রদেশ চীনের অংশ। স্বভাবতই ভারত চীনের দাবিকে স্বীকার করে না এবং পূর্ব সেক্টরে ‘ম্যাকমোহন লাইনকেই’ ভারত ও চীনের সীমান্ত হিসাবে মনে করে। তাই ভারত ও চীনের সীমান্ত সমস্যা আজও মেটেনি। পশ্চিম সেক্টরে জনসন লাইন ও ম্যাকডোনাল্ড লাইনের সমস্যা এবং পূর্ব সেক্টরে ম্যাকমোহন লাইনের সমস্যা আজও বর্তমান।

পরবর্তী কালে বহু সংঘর্ষের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর 1947 সালের 15 ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। অন্যদিকে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে 1 লা অক্টোবর, 1949 সালে ‘Peoples Republic China’ এর উত্থান ঘটলেও ভারত ও চীনের সীমান্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি। যা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্বেসর্বা মাও সে তুং এর মধ্যেও এই সীমান্ত নিয়ে নতুন সমস্যা দেখা যায়। আসলে নেহেরুর মত ছিল ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার প্রাপ্ত এক দেশ তাই ব্রিটিশদের সঙ্গে যা আন্তর্জাতিক চুক্তি ছিল তা ভালো ও মন্দ যাই হোক না কেন তা সবই ভারত মেনে চলবে। অন্যদিকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কিন্তু সেরকম কোন চুক্তির প্রতি দায়বদ্ধ ছিল না। তাই সমস্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

চলবে…

তথ্যসূত্র:-

1. উইকিপিডিয়া।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sino-Indian_border_dispute

https://en.m.wikipedia.org/wiki/The_Great_Game

2. The Hindu.
https://www.thehindu.com/news/national/the-hindu-explains-who-does-galwan-valley-belong-to/article31879418.ece

https://www.thehindu.com/opinion/lead/for-a-reset-in-india-nepal-relations/article31697691.ece

3. BBC news.
https://www.bbc.com/news/world-asia-53174887

4. আনন্দবাজার পত্রিকা।
https://www.anandabazar.com/national/india-china-clash-what-happened-in-galwan-valley-clash-for-about-3-hours-say-sources-dgtl-1.1165676

5. Nepali times.

Nepal also has boundary issues with China

6. Dawn.
https://www.google.co.in/amp/s/www.dawn.com/news/amp/1563923?espv=1

7. The Eur asian times.

16th May 1975: The Kingdom of Sikkim and its Annexation with India

8. Al arabiya.

https://english.alarabiya.net/en/features/2020/03/31/21-million-drop-in-China-s-mobile-users-suggests-higher-COVID-19-death-toll-Report

9. Unacademy.
Indo-China relations- Dr. Sidharth Arora.

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 4 =