সমাজতন্ত্র!

জয়া আর রুবেলকে একসাথে পাট ক্ষেতের মধ্য দেখা গেছে। কারো বুঝতে আর বাকি রইল না মোদ্দা ঘটনা কি! প্রেমের টানে দু-একটা চুমা চামা খাইতে বর্ষাকালে গ্রাম গঞ্জে পাট ক্ষেতের মতো উত্তম যায়গা দ্বিতীয়টি নেই। এমন ঘটনা গ্রামে যে এই প্রথম তাও না। মাঝেসাঝে এমন ঘটনা দু একটা হয়। শহরে ধরুন চাইলে হাতে হাত রেখে রাস্তায় হাঁটা যায়! রমনা কিংবা কার্জনের চিপায় একটু বসা যায়। খুব দরকার হলে দু জন সময় কাটাতে বোটানিক্যাল ভাল যায়গা। পকেটে টাকা থাকলে দামী রেস্টুরেন্টে খাওয়ার ছলে কাছে অাসা যায়। আর কোন বন্ধুর যদি ফ্ল্যাট থাকে তবে তো নো চিন্তা, মাসে দু একবার লিটনের ফ্ল্যাটে রুমডেট করা যায়। লোকে পিছে বললেও সামনে তেমন কেও কিছু বলে না। কিন্তু ভরা যৌবনের প্রেমে গ্রামের ছেলে মেয়েরা কি করবে? একটু যে কাছে অাসবে সে উপায় তো নেই। বটতলা, আমতলা কিংবা রাস্তার বাকে একটু কথা বললেই মুরুব্বিরা টিপ্পনী কাটবে। মহিলারা বাড়িতে বাড়িতে পাচা করে বেড়াবে অমুক ছেলে মেয়ে ব্লা ব্লা। ছেলে ছোকরাও বলতে কম যায় না। অার কাছে অাসা, হাতে হাত রাখা, একটু আলতু চুমো, বুক আগলে জড়িয়ে ধরা ওসব তো অধরা!

রাতে শালিস বসবে রহিম মন্ডলের বাড়িতে। ছেলেমেয়েকে অাটকে রাখা হয়েছে। গ্রামের ময় মুরুব্বি আর ছেলে মেয়ের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে। গ্রামের মধ্য এইসব অশালীন কাজ কর্ম কখনোই বরদাস্ত করা যায় না। আসলেই অশালীন বটে! অবিবাহিত যুবক যুবতী পাট খেতের মধ্য জড়াজড়ি করবে এটা কখনোই ভালো কথা নয়। কি এক আজব দুনিয়া! তেইশ বছরের ভরা যৌবন যুবকের কিন্তু ছোঁয়া যাবে প্রেমিকার হাত। মেয়েটাও পনেরো বছরের তরুণী। এই বয়সে একটু ছুঁয়ে দেখতে কার না ইচ্ছে করে। বিশ বাইশ বছরের একটা ছেলে মেয়ের মধ্য যৌন চাহিদা টগবগ করবে না তা কি করে হয়! কিন্তু কখনো তাঁরা যৌন চাহিদা পূরণের সুযোগ পায় না। এখন তারা করবে টা কি? হয় ঘরে বসে হাত মারবে মানে ভাল বাংলায় যারে বলে মৈথুন। অন্যথা রাস্তাঘাটে জোর জবরদস্তি করবে। মোদ্দা কথা চাহিদা তো মেটানো লাগবে। যৌন চাহিদা ফেলনা কোন বিষয় নয়। তিনবেলা ভাতের মতো যৌন চাহিদা মানুষের প্রধান যা পূরণ করার দরকার পড়ে। কিন্তু এ বেচারা বেচারি তো শুধুমাত্র তাদের চাহিদা পূরণ করছিলো। তারা তো ভেবে পায় না কার পাকা ধানে মই দিলো যে তাদের নিয়ে গ্রামে সালিশ বসবে!

সন্ধে হতে না হতে পাড়ার মহিলারা জড়ো হতে থাকে! ঘটনা কি এই মহিলা সমাজকে তো বলা হয়নি তাহলে তারা এখানে কি করছে! তাড়িয়েও কাওকে সরানো যাচ্ছে না। অাস্তে অাস্তে ময় মুরুব্বিরা হাজির হল। ছেলে মেয়েকেও সামনে অানা হল। যে দুজন মাঠে কাজ করার সময় ছেলে মেয়েকে ধরেছিলে তারা ঘটনার বর্ণনা শুরু করলো। ঘটনা শুরু হতে না হতে কোথা থেকে পাড়ার ছেলে ছোকরার দলে উঠোন ভর্তি হয়ে গেল। একজন বলে যাচ্ছে, অামরা মাঠে কাজে যাচ্ছিলাম তো দূর থেকে দেখি পাট খেত নড়তেছে। তো অামরা মনে করলাম বাতাসে এমন হচ্ছে। তারপর একটু এগিয়ে যখন পাট খেতের পাশ দিয়ে যাচ্ছি তখন আঃউঃ শব্দ শুনতে পেলাম (মহিলারা সব শোরগোল শুরি করে দিয়েছে)। প্রথম তো মনে করলাম কেও কাতরাচ্ছে, মনে হয় কারো সাপে কাটছে না হয় কুদালের কোপ পায়ে মারছে। তো অামরা ঢুকতে যাচ্ছি তখন দেখি এই পোলা মাইয়া একসাথে জড়াজড়ি করতাছে। ছিঃছিঃ আর কইতে পারুম না ভাই। আপনারা ময় মুরুব্বি, বুইঝা লন কি হইছিলো।

রহিম মন্ডল নড়ে চড়ে খুকখুক করে গলা সানিয়ে পোলারে জিগাইলো ঘটনা সত্যি নাকি? পোলা তো অপকটে হ্যা বলে দিলো। চারিদিকে হায় হায় পড়ে গেল। মাইয়ারে জিগাইলে সেও কইলো হ্যা। একি অলক্ষুনে কান্ড কারখানা। কারো মুখে লাগাম নেই। আলাপ আলোচনা পরে পোলা মাইয়ার বাড়ির লোকরে জিগাইলো এখন কি করা যায় তোমরা কও? তারা কইলো অাপনে গ্রামের মাথা যা কন! সলা পরামর্শ চলতে চলতে সিন্ধান্ত হইলো এমন ঘটনার একমাত্র শাস্তি হল বিয়া। এইডারে শাস্তি না কয়ে পুরষ্কার কওন যায়। কিন্তু এরা দুজন হল দুই ধর্মের। এদের মধ্য তো বিয়া হইবার পারে না। সবাই হায় হায় করে উঠল। কেও কেও কয়ে উঠল পোলাডা মাইয়ার ধর্ম নষ্ট করতে চাইছিলো। কিন্তু পোলা মাইয়া দুজনি চিৎকার করে উঠল তারা রাজি।

ঘটনা কি! খাইছে মজিবর! এ দেহি অন্য কেচ। পোলা পাইয়া ভাবছিলো পাট খেতে পাওয়া গেলে সবাই মিলে সহজ শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দিবে। কিন্তু সালিশ তো উল্টো দিক যাচ্ছে। বাচ্চা পোলাপান, সহজ সরল চিন্তা। কিন্তু এখানে তো কেও রাজি না। হাজার বলে কয়েও কিছু করোন গেল না। না কার মানে, না কার। পোলা মাইয়া বিয়া করতে রাজি কিন্তু সালিশ মেনে নেবে না। পোলা মাইয়ার অাকুতি মিনতি শুরু হয়ে গেল। কিন্তু কিছুতে কিছু হইল না। গ্রামের ধর্ম নষ্ট করতে চায় না কেও।

পোলা তো পড়াশোনা করে, ছুটি কাটাইতে গ্রামে অাসছে দু দিন পর চইলা যাইবো। কিন্তু মাইয়ার হইবো টা কি! এদিকে পয়তাল্লিশ বছর বয়সি এক সুদখোর নাম আনন্দ, বলে উঠল মাইয়ারে তো কেও বিয়া করবো না, এমন করে ছেড়ে রাখলে নষ্টামি করবো। অামার বউডাও মারা গেছে, মাইয়ারে অামার লগে বিয়া দেন। দেখেন কেমন জব্দ করি। সালিশ এখন তুমুল পর্যায়ে চলছে। কেও কেও কয় পোলাডা যেন অার কোনদিন গ্রামে না আসে। মাইয়াডারে ঘরের বন্ধ করে রাখতে হইবো। নানা মুনি নানা মত দিতে লাগলো, শেষমেশ কিছুই হইলো না। সালিসে সিন্ধান্ত হইলো পোলা যেন গ্রামে কখনো না অাসে। অার মাইয়ার সাথে কেও মিশতে পারবো না। পোলার বাড়ির লোক কান্না কাটা করতেছে, তাদের বাড়ির ছেলে থেকেও থাকবে না। মাইয়াডারে তো কথা শোনাচ্ছে চারদিক থেকে। অবশ্য এমন সহজ সালিস অাগে কখনো গ্রামে হয়নি। কারণ পোলা মেয়ে দুজনি শিক্ষিত অার তাদের বাপরা গৃহস্থ। তাদের কথা বিবেচনা করে সালিস সহজ ভাবে শেষ হলো। গ্রামের মানুষ জন কইতে লাগলো শিক্ষিত পোলাপান কামডা করলো কি!

বছর চারেক পরের ঘটনা,

জয়া অার রুবেলের বিয়ে ঠিক হয়েছে। গ্রামে ধুমধাম করে বিয়ে হচ্ছে। এমন ধুমধামের বিয়ে গ্রামে অাগে কখনো হয়নি। পোলা গতবছর বিসিএস ক্যাডার হইছে। বড় অফিসার, হাতে অনেক ক্ষমতা। মাইয়াও এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। রহিম মন্ডল বিয়ের সব দেখাশোনা করছে। গ্রাম সুদ্ধ লোকের দাওয়াত। বিশাল অায়োজন! সবাই দলে দলে বিয়া খাইতে অাসছে। সবাই পোলা মাইয়ার ধন্য ধন্য করতে লাগলো। চারিদিকে শুধু জয়জয়কার!

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 − = 61