মর্মস্পর্শী কথন

গতকাল রাত সাড়ে তিনটায় বাসায় ফেরার সময় প্রায় এক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে চলতে হয়েছিল। বাস থেকে নামার পর রাস্তায় কোন মানুষের দেখা মেলে নি তবে লক্ষ কোটি নিঃসঙ্গ তারার সাথে পথ হেঁটে চলছিল আমার একাকীত্বের মনস্তত্ত্ব।
আমি যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, সে রাস্তা আমার মতই নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী বানিয়ে শত বছর ধরে স্থবির হয়ে অগণিত ঘটনাবলীর সাক্ষী হয়ে চেয়েছিল। আমি রাস্তা পেরিয়ে যতো গভীরে প্রবেশ করছিলাম, ততো অন্ধকার আমাকে হাঁহাঁ করে বরণ করে নিচ্ছিল। আমি দু’ বিল্ডিঙের মধ্যখান দিয়ে একটি সরু মেঠোপথ দিয়ে অন্ধকারে পার্কে প্রবেশ করা মাত্র-ই সিগারেটের মধুর গন্ধ আমার ঘ্রাণশক্তিতে প্রবেশ করে। আমি থেমে যাই।
আমি নিজেকে প্রশ্ন করি- এই গভীর অরণ্যে ও মধ্যরাত্রিতে- কে ধূমপান করতে পারে? পরক্ষণে-ই দেখতে পারি- একজন নারী একটি বেঞ্চে বসে ধূমপান করছে। আমি এক-কদম চলতেই অস্পষ্টভাবে মনে হয় যে, নারীটি আমার দিকে তাকিয়েছে। আমি খানিকক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি যে- আমি কি সরাসরি হেঁটে চলে যাবো নাকি নারীটির সামনে গিয়ে দাঁড়াবো?
আমার ভাবনা শেষ হতে না হতেই নারীটি জিজ্ঞেস করে- সব ঠিক ঠাক তো? আমার মনে হতে থাকে- এই নশ্বর পৃথিবীতে, তাৎপর্যহীন ও নিরর্থক জীবনে আমি একা নই।
আমি নারীটির কাছে একটি সিগারেট চাই এবং নারীটি আমাকে জিজ্ঞেস করে তুমি কি আশেপাশেই থাকো?
আমি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলি, হম।
নারীটি বলে, গতকালও তুমি এই সময়ে এইদিক দিয়ে যাচ্ছিলে।
আমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করি- তুমি এখানে কেনো?
নারীটি বলে, আমি স্বাধীনতা খুঁজতে এখানে আসি।
আমার খুব ইচ্ছে করে নারীটিকে জিজ্ঞেস করতে কীসের স্বাধীনতা সে চায়? কিন্তু আমি তাকে প্রশ্ন না করে – আবারও একদিন এখানে দেখা হবে- বলে স্থান ত্যাগ করি।
একেক অঞ্চলে স্বাধীনতা একেক রকম। আমাদের দেশের কোন মেয়ে কি রাত সাড়ে তিনটায় রমনা পার্কে একা বসে থাকতে পারবে? কিংবা কোন মেয়ে কি রাত বারো’টায় একা একা রাস্তায় হেঁটে বাড়ি ফেরার কথা কল্পনাও করতে পারবে? কিংবা অপরিচিত মানুষজনের সাথে কথা বলা শুরু করতে পারবে? আমাদের দেশের মেয়েরা কি ছেলেদের মত রাস্তায় বসে একাএকা প্রকাশ্যে ধূমপান করতে পারবে? কিংবা কোন অপরিচিত পুরুষের কাছ থেকে কি সিগারেট চাইতে পারবে?
আমাদের দেশের যে সংখ্যক মেয়েরা ডিপ্রেশনে ভুগে থাকে- তারা কি কখনও তাদের পরিবারের সাথে মন খুলে কথা বলতে পেরেছে? আমরা পরিবার নিয়ে জয়গান গাইতে থাকি অথচ আমাদের পরিবারই আমাদের স্বপ্নের প্রথম প্রতিবন্ধকতা সে বিষয় গোপন করে রেখে মহৎ প্রমাণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে অভিনয় করতে থাকি। আমাদের দেশের মেয়েদের যেখানে চিন্তার ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নেই, সেখানে আবেগ ও মর্মস্পর্শী কথন বাধা প্রদানে ভূমিকা পালন করে।
আমাদের দেশের কথিত শিক্ষিত নারীদের ধারণা- একদিন পুরুষেরা তাদের পৈশাচিকতা থেকে মুক্ত হয়ে তাদের স্বাধীনতা দিয়ে বরণ করে নেবেন। এই মর্মস্পর্শী ভাবনা থেকে দূর হতে না পারলে নারীর অগ্রগতি ব্যাহত হতেই থাকবে। নিজের অধিকার, নিজের প্রাপ্য, নিজের চাহিদা পূরণের জন্য নিজের কণ্ঠ শক্তিশালী না করলে অন্য কেউ এসে উপহার পৌঁছে দেবে না।
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

28 + = 32