প্রসঙ্গ: রাষ্ট্রে চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া কি অধিকার!

প্রারম্ভিকঃ অধিকার বলতে আসলে কি বোঝায়? খুব সহজভাবে বললে- মানুষে মানুষে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাই হচ্ছে অধিকার। যেমন- নৈতিক অধিকার, আইনগত অধিকার এবং অন্যান্য অধিকার।

(১) একটি দেশের সংবিধান, সে দেশের আয়নার স্বরূপ। যে আয়নায় তাকালে পুরো দেশের চিত্রস্বরূপ আনায়াসে ফুটে উঠে। অথচ বাংলাদেশ সংবিধানে এখনো অনেক বিষয় অস্পষ্ট পরিলক্ষিত রয়েছে। যেমনটি স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ইত্যাদি সেবা বিষয়গুলো রাখা হয়েছে; সেগুলো নাগরিকের জন্য মৌলিক চাহিদা বা মৌলিক উপকরণ হিসেবে পরিগণিত। কিন্তু চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য সেবা বিষয়টি মৌলিক চাহিদা হিসেবে থাকার কারনে চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত বা অবহেলার শিকার মানুষ আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে তেমন কোন প্রতিকার দাবি করতে পারে না। আজ যদি এই স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া বিষয়টি সংবিধানের তৃতীয়ভাগে অর্থাৎ “মৌলিক অধিকার” হিসেবে স্বীকৃতি থাকতো তবে ধনী-গরীব প্রত্যেকের জন্য রাষ্ট্রের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের দায় বা গ্যারান্টি দিতে হতো। মানুষও চিকিৎসা সেবা পাওয়া বিষয়টির চিন্তা থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতো। এক কথায় মৌলিক সংবিধানে চিকিৎসা এখনো মানুষের অধিকার হিসেবে রূপ লাভ করেনি।

(২) এই করোনা ক্রান্তিতে জানা হয়ে গেলো রাষ্ট্র বা সরকার কতটা চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিনিয়ত জনগণের মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা দিতে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়েছে আকাশচুম্বী। সাধারন জনগণ কেউ রাস্তায় রাস্তায় দৌঁড় দিতে দিতে সন্তানকে তার কোলেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পরিস্থিতির শিকারে বাধ্য হয়েছে বা হচ্ছে। আবার কাউকে স্পেশাল বিমান, হেলিকপ্টারে করে দুর্গম থেকেও উন্নত চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য আনা হয়েছে রাজধানী বা অন্যান্য জায়গাতে। এমনকি দেখা গেছে স্বয়ং চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ডাক্টার এবং মহান মুক্তিযোদ্ধারা পর্যন্ত ন্যায্য স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। মনে রাখা শ্রেয় একটা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের এমন ব্যবহার কোনমতেই কাম্য নয়। তাই রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত প্রদান করা।

(৩) ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ সাধারন পরিষদ কর্তৃক সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ-২৫ এ বলা আছে, “মানুষ হিসেবে চিকিৎসা এবং নিজ পরিবারের স্বাস্থ্য এবং কল্যাণের জন্য পর্যাপ্ত জীবনমানের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে।”
অতএব এখন একটি বিষয় পরিস্কার এবং যথাযথ সময়ের দাবি চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য সেবা অচিরেই মৌলিক উপকরণ বা মৌলিক চাহিদা হতে সংবিধানে নাগরিকের “মৌলিক অধিকার” হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। আর তখনি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সাধারণ জনগণের নিকট অধিকার হিসেবে পরিগণিত হবে এবং সর্বোপরি সকল নাগরিকের নিকট সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ সংবিধান একটা মহান বিধান হিসেবে কাঙ্খিত হবে।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

26 + = 29