জন্মান্তর (উপন্যাস: পর্ব-নয়)

ব্যথা ভারাক্রান্ত মনে আমি উড়তে থাকি, অতিক্রম করি ব্র‏হ্মপুত্র, পদ্মা, ভাগীরথী, গঙ্গা, যমুনা আরও কতো শত নদ-নদী ও জনপদ; উড়তে থাকি আরো অতীতের দিকে, নিগূঢ় শিকড়ের সন্ধানে। পাহাড়, সমভূমি, মরুভূমির ওপর দিয়ে অনবরত-অবিশ্রান্ত উড়ি আমি এক মুক্ত হলদে পাখি, দু-ডানায় ক্লান্তি ভর করলে জিরিয়ে নিই কোনো পাহাড়ি ঝিরির পাশের তেঁতুল কী হরিতকী কিংবা নাম না জানা কোনো বৃক্ষশাখায় বসে, ঝিরির জল পান করে তৃষ্ণা মিটাই; কখনো বা বসি কোনো নদীর পারের বটবৃক্ষের ডালে, নিচে নেমে ঠোঁট ডুবিয়ে আকণ্ঠ পান করি নদীর জল; আবার উড়তে উড়তে ক্লান্ত হলে রাজস্থানের তপ্ত মরুভূমির কোনো পাথর চুইয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা জলে দূর করি বুকের খরা। তারপর আবার উড়ি কেবলই অতীতের দিকে। উড়তে উড়তে সিন্ধু নদী পেরিয়ে পৌঁছে যাই ৭১৩ খ্রিষ্টাব্দের বসন্তে সিন্ধুর দেবল বন্দরে। বন্দর সংলগ্ন এলাকায় এক পাক উড়ে এসে বসি বন্দরের কাছের এক পুরাতন উঁচু অশ্বত্থের মগডালে, কোথাও কোথাও রয়ে গেছে ধ্বংসের চি‎‎হ্ন; ৭১২ খ্রিষ্টাব্দের বছর জুন মাসে ব্রাহ্মণ রাজা দাহিরকে পরাজিত করে দেবল নগরী দখল করেছে মোহাম্মদ বিন কাশিম। আমি উড়াল দিই নগরীর ভেতরের দিকে; কোথাও ঘরবাড়ির পোড়া কাঠামো, কোথাও বড়ো বড়ো প্রসাদ কিংবা মন্দিরের ধ্বংসস্তুপ চোখে পড়ে, কোথাও পুরাতন প্রাসাদের জায়গায় তৈরি করা হচ্ছে নতুন নতুন ইমারত, মন্দিরের জায়গায় নির্মাণ করা হচ্ছে মসজিদ এবং উঁচু মিনার। আমি একটি পিপুলগাছে বসে দেখতে পাই ধ্বংস করা একটি মন্দিরের জায়গায় বিশাল মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে, মন্দিরের পাথর এবং অন্যান্য মাল-মসলা দিয়ে। ভারতীয় নব্য মুসলমান ক্রীতদাস কারিগররা ত্রস্ত হয়ে ব্যস্ত হাতে মসজিদ নির্মাণের কাজ করছে; নিকট অতীতে এদের কাউকে অজিত থেকে আজিজ, কাউকে নকুল থেকে কবিরুল করা হয়েছে। আজিজ-কবিরুলদের বিশ্রামের কোনো সুযোগ নেই, যেনবা নেই ক্ষুধা-তৃষ্ণাও! কেবল কাজ করার জন্যই তাদের জন্ম হয়েছে, এক মনে তারা মসজিদ নির্মাণের কাজ করছে। অপেক্ষাকৃত উচ্চ মর্যাদার আরব ক্রীতদাসরা চাবুক হাতে তাদের ওপর নজরদারি করছে। শারীরিক দূর্বলতার কারণে কাজে ধীরগতি বা সামান্য কোনো ভুল-ত্রুটি হলেই আরব ক্রীতদাসদের চাবুক আছড়ে পড়ছে তাদের পিঠে, তাদের মাথা ঠুকে দিচ্ছে দেয়ালে। মাটিতে ফেলে কাউকে কাউকে পা দিয়ে পিষছে তাদের কওমের ভাইয়েরা!

আমি হলদে পাখি থেকে মানুষ হয়ে নগরীর রাস্তায় নেমে নব্য মুসলমানের বেশে গায়ে আলখাল্লা-মাথায় পাগড়ি পরে হাঁটতে থাকি। কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমার সামনে পড়ে একটি ক্রীতদাসের বহর; আমি পথ ছেড়ে দাঁড়াই একটা গাছের আড়ালে। চামড়ার ফিতে দিয়ে ক্রীতদাসদের হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, কারো কারো হাতে-পায়ে লোহার বেঁড়ি পরানো। তাদের মধ্যে নারী এবং পুরুষ উভয়ই আছে, আছে অল্প বয়সী বালক-বালিকা ও শিশু। শরীরে জীর্ণ পোশাক, শরীরের অনাবৃত অংশে চাবুকের লালচে লম্বা দাগ। সকলেই ক্লান্ত, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর; অপেক্ষাকৃত দূর্বলরা খুব কষ্টে দলের অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটছে চাবুকের ঘা খেতে খেতে, অশ্রুশূন্য শুষ্ক তাদের চোখ, গালে ময়লা কাটা শুকনো অশ্রুরেখা। চাবুক হাতে তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে কয়েকজন অশ্বারোহী আরব মুসলমান; তাদের কথায় কান পেতে বুঝতে পারি যাত্রাপথে এই বহরটির সাথে আরো কয়েকটি বহর যোগ হবে। তারপর একত্রিত বিশাল বহরটিকে নিয়ে যাওয়া হবে প্রথমে বাগদাদে, কিছু বিক্রি করা হবে বাগদাদের দাসবাজারে; অবশিষ্ট দাসদের পাঠানো হবে দামেস্কে।

টানা দু-দিন আমি কখনো মুসলমানের বেশে কখনোবা হলদে পাখি হয়ে দেবল নগরীতে ঘুরে বেড়াই আর প্রত্যক্ষ করি মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট। সর্বত্রই প্রায় একই রকম দৃশ্য; কোথাও ক্রীতদাসরা কারখানায় অস্ত্র এবং বর্ম তৈরি করছে, কোথাও তৈরি করছে সোনা-রূপা-তামার অলঙ্কার, কোথাও মাঠ থেকে ফসল কেটে এনে প্রক্রিয়াজাত করছে, কোথাও বস্ত্র কিংবা নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদি তৈরি করছে, কোথাও খনন করছে কিংবা ভারী বস্তু বহন করছে; আর সবখানেই তাদেরকে নজরদারি ও নিপীড়ন করছে আরবরা। সর্বত্রই একই রকম নিপীড়ন ক্রীতদাসদের ওপর। কোথাও কোথাও নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে দূর্বল কোনো ক্রীতদাস আত্মহত্যাও করেছে। এই জনপদে মানুষের দুঃখগাঁথা ব্যতিত যেন কিছু নেই! ভারতীয় নব্য মুসলমানদের মুখে কোনো হাসি নেই, জীবনে কোনো সুখ-আনন্দ নেই; নিজের জীবনটাও তাদের নিজের নেই। সকলেই যেন অপরের জীবনের বোঝা বয়ে চলেছে, আপন দেহের ভেতরে আপনিই নেই!

উড়তে উড়তে আমি একজন পদাতিক যোদ্ধার অন্দরমহলের বারান্দার রেলিংয়ের ওপর গিয়ে বসি। যোদ্ধা বাড়িতে নেই; আছে দামী রত্ন ও স্বর্ণালঙ্কারে সজ্জিত তার চারজন পত্নী, সাধারণ বেশভূষায় ছয়জন ভারতীয় ধর্মান্তরিত যৌনদাসী, তিনজন সুদর্শন বালক ক্রীতদাস আর একজন বালকের মতো দেখতে কিন্তু তার সাজগোজ অনেকটা নারীদের মতোই। বাড়িতে বিপুল বিত্ত-বৈভব। বাড়ির বাইরের মহলে বল্লম হাতে পাহাড়ায় রয়েছে তিনজন ক্রীতদাস। একজন পদাতিক যোদ্ধার এতো দাস-দাসী, বিত্ত-বৈভব; তাহলে আরো বড় যোদ্ধাদের না জানি কী অবস্থা!

আমি একজন বড় মাপের ঘোড়সওয়ার যোদ্ধার বাড়ির আমগাছে গিয়ে বসি। বাড়ির আভিজাত্য দেখে আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়; দামী আসবাপত্র, বাসন-কোসন, পত্নী, দাস-দাসীর যেন অভাব নেই! এরপর আমি সেনাপতির বিশাল প্রাসাদের এদিক-সেদিক উঁকি দিই; অসংখ্য পত্নী, যৌনদাসী আর দাস-দাসীর বহর দেখে আমার বেঁহুশ অবস্থা! আমি এলোমেলোভাবে উড়তে থাকি যোদ্ধা আর পদস্থ আরবীয়দের বাড়ির ওপর দিয়ে। একটা ব্যাপার আমাকে বিস্মিত করে-ঋতুবতী নারী মাত্রই গর্ভবতী; তা সে বয়স তেরো হোক কিংবা তেতাল্লিশ, পত্নী কিংবা দাসী! একসঙ্গে এতো নারী গর্ভবতী হবার কী রহস্য! পত্নীরা অন্দরমহলে উঁচু পেট নিয়ে হাঁটছে, খাচ্ছে, দাস-দাসীদের সেবা গ্রহণ করছে; দাসীরা উঁচু পেট নিয়ে মালকিনের সেবা এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করছে!

উড়ে যাবার সময় একটা বাড়ির জানালায় চোখ পড়তেই আমি ফিরে এসে বসি জানালা থেকে সামান্য দূরত্বের একটা পেয়ারা গাছের ডালে, ঘরের ভেতর জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছেন খোলা চুলের বছর চল্লিশের এক নারী; গায়ে কারুকার্যময় সবুজ ব্লাউজ, পরনে সবুজ ঘাঘড়া। বুকে ওড়নার আগল থাকলেও অনাবৃত তার ফর্সা চিকন বাহু আর স্ফীত পেটের অংশবিশেষ, যথারীতি তিনিও গর্ভবতী! আমি তার চোখ চিনি, চিনি তার চোয়াল আর চুল; তিনি আমার মায়ের পূর্বসুরি! তার সঙ্গে কথা বলার উদগ্র বাসনায় আমি পেয়ারা গাছ থেকে ভূমিতে নামতে যাব এমন সময় আমাকে হতাশ করে এক যুবতী এসে তাকে ডেকে নিয়ে যায় অন্য কক্ষে। আমি এদিকে-ওদিকে উঁকি দিয়েও তাকে আর দেখতে পাই না। কিন্তু দেখা যে আমাকে করতেই হবে, আবার কখন তাকে একা পাব সেই অপেক্ষায় এগাছ-ওগাছ করছি এমন সময় চোখ পড়ে এই বাড়িরই পিছন দিকের বাগানে, একজন প্রৌঢ় শীতলপাটিতে বসে সামনের জলচৌকির ওপর ঝুঁকে কিছু লিখছেন আর বারবার কালির পাত্রে কলম চুবিয়ে নিচ্ছেন। পিছনে দাঁড়িয়ে তাকে পাখার বাতাস করছে এক সুদর্শন কিশোর, আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কিশোরটি প্রৌঢ়ের ক্রীতদাস। আমি উড়ে গিয়ে বসি তাদের মাথার ওপরের কাঁঠাল গাছের শাখায়। প্রৌঢ় একটু পরপর কালির পাত্রে কলম চুবিয়ে উটের চামড়ায় একমনে লিখছেন; এখন বসন্তকালের শুরু, এলোমেলো বাতাস বইছে, তেমন গরম লাগছে না তবু কিশোর অনবরত তার মনিবকে বাতাস করে চলেছে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি প্রৌঢ়কে; দুধে আলতা তার গায়ের রঙ, দাড়ি-গোঁফের আশি ভাগই সাদা, মাথায় সাদা পাগড়ি, গায়ে সাদা আলখাল্লা। কিছুক্ষণ পর বেশ তৃপ্তির সঙ্গে কলমটি রেখে আবৃত্তি করতে থাকেন লেখাগুলো। বুঝতে পারি যে তিনি একজন কবি। পর পর কিছু পংক্তি আবৃত্তি করার পর তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে, দারুণ উদ্যম আর উচ্ছ্বাসে তিনি পরবর্তী পংক্তিগুচ্ছ আবৃত্তি শুরু করেন-

কাফেরের অন্ধকার আসমানে ইসলামের পবিত্র সূর্য

উঠিয়েছেন মোহাম্মদ বিন কাশিমের শৌর্য।

কাফেরের নাপাক জমিনে ধ্বনিত হয়েছে পাক আল্লাহ’র নাম

মোহাম্মদ বিন কাশিমের তলোয়ারেই বেঁচে থাকবে ইসলাম।

কাফেরের রক্তে লিখে আল্লাহ’র নাম

মোহম্মদ বিন কাশিম রেখেছেন নবীজির সম্মান।

বসন্তের কোকিলের কণ্ঠেও আজ শুনি যার নাম

সেই মোহাম্মদ বিন কাশিমকে হাজার সালাম।

আবৃত্তি শেষ হলে কবি বিপুল উচ্ছ্বাসে নিজের মুষ্টিবদ্ধ ডানহাত ঊর্ধ্বে ছুড়তে ছুড়তে প্রায় চিৎকার করে ওঠেন, ‘মারহাবা! মারহাবা! পেরেছি! কেমন হয়েছে শাহাবউদ্দিন?’

‘মারহাবা, মারহাবা; খুব ভাল, খুব ভাল।’ শাহাবউদ্দিন নামক সুদর্শন কিশোর ক্রীতদাসের চোখ থেকে অশ্রু গড়ালেও কবি তা দেখতে পাচ্ছেন না!

‘জাঁহাপনার ছন্দ হবে বলছো?’

‘খুব হবে, শিরোপা দেবে আপনাকে।’

‘সোবহানাল্লাহ সোবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ; শাহাবউদ্দিন, তাহলে আমিও তোমাকে শিরোপা দেব; একরাতের জন্য দাসী সালমাকে তুমি পাবে, তোমার ইচ্ছে মতো সালমা তোমাকে সেবা করবে!’

শাহাবউদ্দিনকে চুপ থাকতে দেখে কবি বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আহ তোমাকে কতোবার বলেছি যে কোনো সুংসংবাদ শুনলে আলহামদুলিল্লাহ বলতে হয়!’

শাহাবউদ্দিন দ্রুত উচ্চারণ করে, ‘আলহামদুল্লাহ… আলহামদুল্লাহ…!’

‘আলহামদুল্লাহ্ নয়, নালায়েক; আলহামদুলিল্লাহ্! মালাউন ভারতীয়, আল্লাহ’র পবিত্র ভাষাও মুখে আনতে পারে না! তিনবার বলো, আলহামদুলিল্লাহ…!’

শাহাবউদ্দিন খুব সাবধানে উচ্চারণ করে, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।’

কবি কয়েক মুহূর্ত নীরবে নিজের লেখায় চোখ বুলান, দুটি সংশোধন করেন, তারপর পুনরায় কিছু পংক্তি আবৃত্তি করার পর ওপরে দু-হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘শুকরিয়া, শুকরিয়া, আপনার অশেষ মেহেরবানি; আমিন!’

কবির দেখাদেখি পাখা মাটিতে নামিয়ে রেখে শাহাবউদ্দিনও দু-হাত ওপরে তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘শুকরিয়া, শুকরিয়া, আপনার অশেষ মেহেরবানি; আমিন!’

শাহাবউদ্দিন পুনরায় পাখা হাতে নিয়ে কবিকে বাতাস করতে থাকে। মুখে হাসি ছড়িয়ে কবি শাহাবউদ্দিনের উদ্দেশে বলেন, ‘শিরোপা পাব বলছো, শাহাবউদ্দিন?’

‘আলবত পাবেন, আলবত পাবেন।’

‘কবি মোহাম্মদ আফাজউল্লাহ আর শামসুদ্দিন খাঁর চেয়ে আমি ঢের বড় কবি নই, শাহাবউদ্দিন?’

‘আলবত আপনি তাদের চেয়ে বড় কবি। গেল সপ্তাহের কবিতার আসরেও তো তারা আপনার কাছে হেরে গেছে!’

‘শাহাবউদ্দিন…’

‘জী।’

‘কাছে এসো।’

শাহাবউদ্দিন পাখা রেখে ব্যস্ত হাতে চোখের জল মুছে কবির বাম হাতের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, কবি তার বাম হাত ধরে কাছে বসিয়ে বাম হাতে তাকে নিজের শরীরের সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে ধরে কপালে চুম্বন করেন, এরপর চুম্বন করেন দুইগালে এবং ঠোঁটে। তার চুল আঘ্রাণ করে বলেন, ‘তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয় নোকর, ইহজগতের গেলমান; আমি যদি জাঁহাপনার কাছ থেকে শিরোপা পাই তাহলে একরাত নয়, তোমাকে তিনরাতের জন্য দাসী সালমাকে উপহার দেব; আর অতি উত্তম বাক্য বলার জন্য আজকের রাতটি কোনো বিবি কিংবা দাসী নয়, তোমাকে উপহার দেব প্রিয় গেলমান আমার!’

পুনরায় শাহাবউদ্দিনের কপালে ও মাথায় চুম্বন করে চিবুকে আঙুল ছুঁইয়ে বলেন, ‘যাও, খুশ দিলে আমাকে হাওয়া করো প্রিয় আমার।’

শাহাবউদ্দিন আবার পাখার বাতাস করতে থাকে আর কবি পুনরায় কবিতা রচনায় মনযোগ দেন। কবির কবিতাগুলো না মানবপ্রেমের, না ঈশ্বরপ্রেমের, না প্রকৃতিপ্রেমের; সকলই শাসকপ্রেমের কসিদা। গত বর্ষায় সিন্ধু জয় করা, সদ্য যৌবনে পা দেওয়া শাসক মোহাম্মদ বিন কাশিমের স্তুতিগাঁথা; অন্যান্য যোদ্ধাদের স্তুতিগাঁথা। কীভাবে তারা বীরত্ব দেখিয়ে কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, কীভাবে কাফেরদের ধড় থেকে মাথা আলাদা করে ফেলেছে, কীভাবে কাফেরদের মন্দির এবং মূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, কীভাবে কাফের রাজা দাহিরের মস্তক ছিন্ন করে মস্তকের সাথে লুণ্ঠিত মূল্যবান সামগ্রী এবং রূপবতী নারী ও ক্রীতদাস উপহারস্বরূপ দামেস্কে পাঠানো হয়েছে খলিফা আল-ওয়ালিদের নিকট ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখা কবিতা! দুয়েকটি কবিতা কাফের যুবতীদের আশ্চর্য সৌন্ধর্য, তাদের যৌনদাসীতে রূপান্তরিত হওয়া এবং তাদের সঙ্গে রতিসুখ বিষয়ক!

একটু পর এক বালিকা দাসী দু-পাত্র মদ নিয়ে আসে, নত হয়ে কবির লেখার জলচৌকির পাশের আরেকটি জলচৌকির ওপর নামিয়ে রাখতেই কবি দুই হাতে তার মুখমণ্ডল ধরে কপালে ও ঠোঁটে চুম্বন করে গাল টিপে দেন, তারপর তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেন, কিন্তু এই আদরে দাসীটির মুখশ্রীতে কোনো পরিবর্তন ঘটে না, বরং মুখশ্রীতে ভেসে ওঠে গোপন ব্যথার সুক্ষ্ণ আস্তরণ। কবির বুকে মাথা রেখেও সে নির্লিপ্ত। কবি তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন, ‘নার্গিস, প্রিয় বাঁদী আমার, তোমাকে কখনও হাসতে দেখি না কেন, তুমি কি এখনো তোমার কাফের আব্বা-আম্মার কথা মনে করে কষ্ট পাও? তাদেরকে ভুলে যাও নার্গিস, তারা অবিশ্বাসী কাফের ছিলো, তারা মূর্তি পূজারি ছিল, তাই তোমার আব্বাকে হত্যা করা হয়েছে আর তোমার আম্মাকে উম্মতের সেবার জন্য কোথাও পাঠানো হয়েছে। তোমার আব্বা নিশ্চয় এখন দোজখের আগুনে জ্বলছে। তুমি এখন মুসলমান, ন্যায় ও সত্য ধর্মের পথে এসেছো; পুরনো দিনের কথা ভুলে যাও আর নতুন করে বাঁচো। কাফের আব্বা-আম্মার কথা ভেবে কখনোই মন খারাপ করবে না, চোখের জলও ফেলবে না; তাহলে আল্লাহ তোমার ওপর নাখোশ হবেন। খুশ দিলে থাকো আর আমার সেবা করো প্রিয় বাঁদী।’

নার্গিসের দু-চোখের পাতায় চুম্বন করে বলেন, ‘যাও।’

চলে যায় নার্গিস। কবি পানপাত্রে চুমুক দিয়ে বলেন, ‘শাহাবউদ্দিন…।’

‘জী।’

‘নার্গিস এখনো গোলাপের কুড়ি। দু-তিন বছর পর ও বসরাই গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে রোশনাই ছড়াবে! আল্লাহ যেন ততোদিন আমাকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করেন, আমি ওর গর্ভে আমার শ্রেষ্ঠ পুত্র উৎপাদন করতে চাই, যে পুত্র একদিন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা রচনা করবে, ইনশাল্লাহ। ’

শাহাবউদ্দিনও কবিকে অনুসরণ করে, ‘ইনশাল্লাহ।’

কবি লেখার ফাঁকে ফাঁকে পানপাত্রে চুমুক দিতে থাকেন, লিখতে লিখতে কখনো বিড়বিড় করেন, আবার কখনো নিচুস্বরে কখনো গলা ছেড়ে আবৃত্তি করেন। থেকে থেকে নিজেই প্রশংসা করেন নিজের কবিতার আবার কখনো শাহাবউদ্দিনের কাছ থেকে প্রশংসা আদায় করে নেন। দীর্ঘক্ষণ লেখার পর অন্য একজন দাসী এসে কুর্নিশ করে জানায়, ‘গোসলের পানি প্রস্তুত।’

দাসীর বয়স চৌদ্দ-পনের, গায়ের রঙ প্রায় ফর্সা এবং সুন্দরী। পরনে শাড়ি, তার স্ফীত পেটে দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায় যে সে চার-পাঁচ মাসের পোয়াতি। সদ্য স্নান করায় তাকে যেমনি স্নিগ্ধ লাগছে, তেমনি গা থেকে একটা স্নিগ্ধ গন্ধও ছড়াচ্ছে বাতাসে। তাকে দেখেই বোঝা যায় যে সে কোনো সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে ছিল। কবি প্রথমে তার মুখের দিকে তাকান, তারপর মাথা থেকে পা অবধি দৃষ্টি বুলিয়ে মৃদু হেসে বলেন, ‘জোহরা, আমার একবার কঠিন পীড়া হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তখন আমাকে বেহেশতে তুলে নেননি কেন জানো? হিন্দু্স্তানের মেয়েদের সেবা গ্রহণ করার জন্য, তাদের গর্ভে সন্তান উৎপাদন করার জন্য। তোমরা হিন্দু্স্তানের মেয়েরা অপার সৌন্ধর্যের অধিকারী, তোমাদের শরীর আমার কাছে এক মহাবিস্ময়; তোমাদের স্পর্শে দেহাভ্যন্তরে বয়ে যায় সাইমুম! স্নানের পরে তোমাকে অপূর্ব লাগছে জোহরা!’

জোহরা হাত কপালে ছুঁইয়ে বলে, ‘শুকরিয়া, শুকরিয়া!’

কবি কলম রেখে হাত বাড়ান জোহরার দিকে। জোহরার সাহায্য নিয়ে উঠে দাঁড়ান, জোহরার কপালে চুমু খেয়ে তার চুলে নাক গুঁজে গন্ধ শুঁকে বলেন, ‘আশ্চর্য তোমার শরীরের ঘ্রাণ! চলো, প্রিয় বাঁদী আমার।’

কবি জোহরাকে ডানপাশে রেখে তার পিঠের ওপর দিয়ে হাত নিয়ে পেটের ডানপাশে বীনার তারের মতো আঙুলের স্পন্দন করতে করতে হাঁটতে শুরু করেন; তারপর হঠাৎ মাথাটা পিছনে ঘুরিয়ে শাহাবউদ্দিনের মুখে দৃষ্টি রেখে বলেন, ‘শিরোপা পেলে আমি আমার কথা রাখবো শাহাবউদ্দিন!’

ঘাড় ফিরিয়ে পুনরায় একইভাবে হাঁটতে শুরু করেন বাসগৃহের দিকে। শাহাবউদ্দিন পাখা নামিয়ে রেখে কবির লেখার উটের চামড়া এবং কালি-কলম গোছাতে থাকে। আমি কাঁঠালগাছের শাখা থেকে ভূমিস্পর্শ করা মাত্র মানুষ হয়ে যাই, আমাকে দেখে শাহাবউদ্দিনের হাত থেমে যায়, হয়তো কিছুটা চমকায়ও।

বলি, ‘তোমার নাম শাহাবউদ্দিন?’

ও নীরবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, বুঝিবা ভয়ে। আমি ওকে আশ্বস্ত করি, ‘আমাকে ভয় পেয়ো না। আমি জানি তুমি শাহাবউদ্দিন।’

হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নেড়ে ও।

‘তোমার বাবার নাম?’

ও একইভাবে চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি আবার জিজ্ঞাসা করি, ‘বলো, তোমার বাবার নাম কী?’

শাহাবউদ্দিনের চোখে জলের জোয়ার, হয়তো এখনই ঝরে পড়বে। মাটির দিকে মাথা নামিয়ে বলে, ‘চন্দ্রদেব।’

‘আর তোমার আগের নাম?’

‘অর্জুন।’

সত্যিই ও এখন শাহাবউদ্দিন নয়, অর্জুন। হয়তো সকলের সামনে ওকে শাহাবউদ্দিন হয়ে থাকতে হয়, কিন্তু একা হলেই ওর ভেতরের অর্জুন সত্তা চাগাড় দিয়ে ওঠে। অর্জুনের চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল ঝুপ করে ঝরে পড়ে মাটিতে। বলি, ‘কবিতা শুনে কষ্ট পেয়েছো?’

ঘাড় নেড়ে জানায়, ‘হ্যাঁ।’

‘কবিকে খুশি করতে ভাল বলেছ?’

‘হ্যাঁ, নইলে মারতো।’

‘এখানে তোমার আপনজন কেউ নেই?’

‘না, আমার বাবাকে সৈন্যরা মেরে ফেলেছে; আমার মামার মাথা কেটে খলিফার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। আর বুড়ো কবিটা সেইসব কথাই লিখেছে ওর কবিতায়।’

‘মহারাজ দাহির তোমার মামা?’

‘হ্যাঁ, আমার মায়ের মামাতো ভাই। আমাদের পরিবারের সব পুরুষদেরকে মেরে ফেলেছে, মেয়েদের আর ছোটদেরকে দাস-দাসী বানিয়েছে। আমার মা কোথায় আছে আমি জানি না, মনে হয় আর কোনোদিন আমি আমার মাকে দেখতে পাব না।’

কেঁদে ফেলে অর্জুন। আমি ওর পিঠে সান্ত্বনার হাত রাখি, মুখে বলার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাই না। চৌদ্দ-পনের বছরের কিশোর, যার এখন দুষ্টুমি আর খেলাধুলা করার বয়স, পাঠশালায় লেখাপড়া করার বয়স, অথচ সে এখন বাবা-মাকে হারিয়ে এক কবির সেবাদাস-যৌনদাস হয়ে জীবন কাটাচ্ছে; একে সান্ত্বনা দেবার মতো শব্দ বা ভাষার কী জন্ম হয়েছে পৃথিবীতে!

বেশ কিছুক্ষণ পর বলি, ‘এই বাড়িতে একজন নারী আছেন, বয়স চল্লিশের মতো, মাথায় লম্বা চুল, গায়ের রঙ ফর্সা; ঐ পূর্বদিকের জানালার কাছে আমি তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, তুমি চেন তাকে?’

‘চিনিতো, সত্যবতী মাসি।’

‘তিনি এখানে কী করছেন?’

‘তিনিও একজন দাসী।’

‘আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তুমি এই সংবাদটি তাকে দিতে পারবে?’

‘হ্যাঁ, পারবো।’

‘আমি রাতে তার জন্য এখানে অপেক্ষা করবো, তিনি যেন এখানে আমার সঙ্গে দেখা করেন।’

‘আপনি তার কী হন?’

‘আমি তার আত্মীয়। তুমি খবরটা সাবধানে দিও, কেউ যেন বুঝতে না পারে।’

‘কেউ বুঝতে পারবে না। আমি গোপনে মাসিকে বলবো। আমি এখন যাই, নইলে বুড়ো কবিটা আবার বকবে।’

‘আচ্ছা, যাও।’

‘আপনার বসার জন্য একখানা জলচৌকি রেখে যাচ্ছি।’

‘জলচৌকি রেখে গেলে কেউ কিছু বলবে না?’

‘বললে বলবো ভুলে ফেলে এসেছি, মাসি আপনার কাছে এলেও বসতে পারবে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাসির কষ্ট হয়, আবার মাটিতে বসতেও কষ্ট হয়।’

জলচৌকিখানা রেখে অন্য সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে চলে যায় অর্জুন। রাজার ভাগ্নে, সকলের আদরের দুলাল; বাবা-মা হয়তো মহাভারতের অর্জুনের নামে ওর নাম রেখেছিল অর্জুন, তারা হয়তো ভেবেছিল ছেলে বড় হলে অর্জুনের মতোই বীর হবে; অথচ সেই ছেলে আজ একজন কবির ক্রীতদাস-যৌনদাস; যে কবি কিনা তারই পিতা আর আত্মীয়-স্বজনের হত্যাকারী শাসককে খুশি করতে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে লিখছে স্তুতিগাঁথা, প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে জিহাদীদেরকে! হায়, কবি এতোটাই বিবেকহীন নির্লজ্জ আর শাসকের পদলেহনকারী জ্ঞানদাস যে ভুলে গেছে মানবতা; মানবতার পক্ষে না লিখে লিখছে হত্যাকারী, লুণ্ঠনকারী, ধর্ষকের প্রশস্তিগাঁথা! যে জাতির কবি শাসকের গোলাম; সে জাতি তো উন্মত্ত, উদ্ভ্রান্ত, হিংস্র, লোভী, ধর্ষক, রক্তপিপাসু, পথভ্রষ্ট হবেই!

অনেক রাত, ঝিঁঝির খেয়াল ব্যতিত চতুর্দিক সুনসান, আমি বাগানে কাঁঠালগাছের নিচে ঘন অন্ধকারে জলচৌকির ওপর বসে আছি সত্যবতীদেবীর অপেক্ষায়, যিনি আমার মায়ের বহু প্রজন্ম আগের পূর্বসূরি; যার সঙ্গে কথা বলার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছি। কিন্তু তিনি দেরি করছেন কেন বুঝতে পারছি না। অর্জুন সংবাদটা ঠিক মতো দিতে পেরেছে তো, নাকি তিনি সংবাদ পেয়েও আসার সুযোগ পাচ্ছেন না? অন্ধকারে বসে বারবার পথের দিকে তাকাই, আমার ভাবনা জুড়ে কেবলই তিনি, দৃষ্টিজুড়ে জানালায় দণ্ডায়মাণ তার মুখচ্ছবি। একসময় গাছের অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসেন সত্যবতীদেবী, আমি কাঁঠালগাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে অনুজ্জ্বল চাঁদের কৃপণ আলোয় গিয়ে দাঁড়াই। তিনি আমার ছোঁয়ার দূরত্বে এসে দাঁড়ান। তিনি কেমন আছেন, এই প্রশ্ন করা উপহাসের নামান্তর। তাই একবারেই বলি, ‘আমি আপনার উত্তরসূরির পুত্র।’

তিনি কথা বলেন না, অনুজ্জ্বল চাঁদের আলোয় আমরা একে-অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি; মনে হয় চাঁদের আলো যদি আরেকটু বৃদ্ধি পেতো, যদি আরেকটু স্পষ্ট দেখতে পেতাম তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি। তিনি আমার মাথায় হাত রাখেন, অল্প আলোতেও আমি দেখতে পাই তিনি চোখ বুজে আছেন। আমি তার স্পর্শের আনন্দে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকি। মনে হয় তাকে আমি বহুকাল আগে থেকেই চিনি, তার এই স্পর্শ নতুন নয়; আমার মা যখন ছেলেবেলায় আমাকে খাইয়ে-পরিয়ে যত্ন করতেন, আদর করতেন, তখন সেই যত্নে-আদরে এই হাত দুটিরও অদৃশ্য উপস্থিতি থাকতো; তার গায়ের গন্ধ ঠিক আমার মায়ের গায়ের গন্ধের মতোই! বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি আমার মাথা থেকে হাত নামিয়ে নিলে আমি জলচৌকিখানা নিয়ে তাকে বসতে দিই কাঁঠালগাছের ঘন অন্ধকারের বাইরে; তিনি বসেন, আমি বসি তার পায়ের কাছে মাটিতে। জলচৌকির একদিকে সরে তিনি আমাকেও বসতে বললে বলি, ‘আপনি বসুন, মাটিতে আমার অসুবিধে হচ্ছে না।’

আমার ডান হাতখানা দু-হাতে ধরে কোলের কাছে নিয়ে তিনি তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে; যেন দেখছেন আর আমার অন্তরাত্মা পাঠ করছেন! নিজের অদম্য কৌতুহল নিবারণে আমি তার পাঠে বিঘ্ন ঘটিয়ে বলি, ‘আপনি এখানে কতোদিন আছেন?’

তিনি উদাসীনভাবে উত্তর দেন, ‘গত বর্ষায় যখন মোহাম্মদ বিন কাশিম দেবল দখল করলো, তখন থেকেই।’

‘এখানে আপনার আপনজন কেউ আছেন?’

মুখ থেকে শব্দ নয়, যেন বুকের দীর্ঘশ্বাস বেরোয়, ‘না।’

‘পরিবারের আর সবাই কোথায়?’

‘কেন জানতে চাও এসব কথা?’

‘শিকড়ের কথা জানা আমার দায়িত্ব। শিকড়ের প্রতি যার আগ্রহ-শ্রদ্ধা নেই সে তো এক উন্মুল চেতনার মানুষ; সহজেই পতিত কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়; নিজেকে হারিয়ে ফেলে পতিত-পঙ্কিল স্র্রোতে।’

বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে যায় নীরবে, তার বাম হাত আমার কাঁধে, ডান হাত মাথায়; দৃষ্টি শূন্যে। তারপর ঝিঁঝির আবহসংগীত ছাপিয়ে ধ্বনিত হয় তার কণ্ঠস্বর, ‘আমার স্বামী দেবল বন্দরে কাজ করতেন। বন্দরের কাছেই আমার বাবার দোকান ছিল; সেই সূত্রেই বাবার সঙ্গে তার পরিচয় এবং আমাদের বিয়ে। আমাদের সংসার সুখের হয়েছিল, একসময় কোল আলো করে এলো আমার মেয়ে, তারপর ছেলে। সন্তানেরা বড়ো হলো, পাঠশালায় লেখাপড়া শিখতে লাগলো। ততোদিনে শ্বশুর গত হয়েছেন। সংসারে অভাব ছিল না; স্বামী, শাশুড়ি, ভাসুর, বড়ো জা, তাদের দুই মেয়ে আর আমাদের এক মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে যৌথ সংসারে তখন উপচে পড়া সুখ! ভাসুরের বড়ো মেয়ের তখন সবে বিয়ে হয়েছে, আমার মেয়ে অমলার বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক, ভেবেছিলাম দু-তিন বছরের মধ্যে ছেলেটাকেও বিয়ে দিয়ে টুকটুকে একটা বউ আনবো ঘরে; তার আগেই আমাদের সব শেষ গেল!’

আমার হাতটা নিজের গালে চেপে ধরে তিনি নিঃশব্দে কাঁদেন, তার চোখের জলে আমার হাত ভিজে যায়। আমি জানি এইসব কথা তুললে তার ব্যথা চাগাড় দিয়ে উঠবে, কিন্তু আমাকেও যে জানতে হবে আমার শিকড়ের কথা। আমি তার হাঁটুতে কপাল ঠেকাই, কিছুক্ষণ পর তিনি আমার মাথায় হাত বুলান, আমি মাথা তুলি।

তিনি বলেন, ‘মুসলমানরা যেদিন হামলা চালালো সেদিনও আমার স্বামী কাজে গিয়েছিলেন দেবল বন্দরে, তারপর আর আমাদের দেখা হয়নি কোনোদিন। রাজার সৈন্যরা প্রতিরোধ করেছিল মুসলমানদের, কিন্তু মোহাম্মদ বিন কাশিমের হাজার হাজার দুর্ধর্ষ সৈন্যের অতর্কিত হামলা সামলাতে পারেনি তারা। প্রথম তিনদিন ওরা মহাতাণ্ডব চালালো দেবলের বুকে! সামনে যাকেই পেলো তাকেই হত্যা করলো, ধড় থেকে মাথা নামিয়ে শরীর ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেললো। ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে বাড়ি-ঘরে আগুন দিলো, মন্দির-বিগ্রহ ধ্বংস করলো, অধিকাংশ পুরোহিতদের শিরোচ্ছেদ করলো আর কাউকে কাউকে সুন্নত করিয়ে বানালো মুসলমান, সতেরো বছরের বেশি বয়সের অধিকাংশ পুরুষদের ধরে ধরে কচুকাটা করলো, সতেরো বছর পর্যন্ত ছেলেদের বানালো ক্রীতদাস; সকল মেয়েদেরকে বানালো যৌনদাসী। এমন সর্বভুক যুদ্ধ দেবলের মানুষ তো বটেই সারা ভারতের মানুষও কোনোদিন দেখেছে কি-না সন্দেহ। ভারতেও তো কখনো কখনো যুদ্ধ হতো রাজ্যে রাজ্যে; কিন্তু সে যুদ্ধ করতো রাজার সৈন্যরা, মেয়েদের সর্বনাশ করা তো দূরের কথা ইচ্ছাকৃত সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষয়ক্ষতিও তারা করতো না। যুদ্ধে যে রাজা জিততো সে-ই লালন-পালন করতো প্রজাদের। রাজা বদলালেও নতুন রাজা বিদ্বেষবশত প্রজা উচ্ছেদ বা দমন-পীড়ন করতো না, রাজ্য শাসনেও বিরাট কোনো পার্থক্য চোখে পড়তো না। তবে এমন সর্বভুক যুদ্ধের কথা আমরা শুনতাম বটে। আমার স্বামী তো বন্দরে চাকরি করতেন, তাই দেশ-বিদেশের খবরা-খবর তিনি জানতে পারতেন। নানান দেশ থেকে বাণিজ্য জাহাজ আসতো দেবল বন্দরে, আবার দেবলের জাহাজও বিভিন্ন দেশে যেতো বাণিজ্য করতে, কতো রকমের মানুষ আসতো-যেতো, সে-সব মানুষের সাথে আমার স্বামীর পরিচয় ছিল, তাদের মুখেই তিনি দেশ-বিদেশের নানান গল্প শুনতেন। তার মুখেই শুনতাম সেইসব সর্বভুক যুদ্ধের কথা। আরবে মুহাম্মদ নামে এক ডাকাত নাকি ইসলাম নামে এক ধর্ম চালু করেছিল, তার শিষ্যরা মুসলমান নামে পরিচিত; তারা সব মূর্তি পূজাবিরোধী। মুহাম্মদ নাকি প্রথমদিকে ডাকাতি করতো, তারপর আস্তে আস্তে যখন তার ধন-সম্পদ আর শিষ্য বেড়ে গেল, তখন সে বিভিন্ন জাতির ওপর হামলা চালাতো। সে এমনই পাষণ্ড ছিল যে নিজের জাতির ওপরও আক্রমণ চালিয়েছিল, মক্কার কাবা মন্দিরের বিগ্রহ ভেঙেচুরে নিজের আত্মীয়-স্বজনদেরকে মেরে-ধরে ধর্মান্তরিত করে তাদেরকে মুসলমান বানিয়েছিল। বেঁচে থাকতে সে বহু যুদ্ধ করে বহু জনপদ দখল করেছিল, যুদ্ধে জিতলেই নাকি তারা পরাজিত জনপদের সম্পদ লুণ্ঠন করতো, তরবারির মুখে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে ক্রীতদাস বানাতো, মেয়েদের ভোগ করতো আর বাজারে বেচে দিতো। সে মরার পর তার শিষ্যরাও নানা দেশের সাথে একইরকম ভাবে যুদ্ধ করে চলেছে। আমরা এসব কথা শুনতাম আর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতাম, এমন অমানবিক পাষণ্ড মুসলমান শরীর স্পর্শ করার আগে যেন আমাদের মরণ হয়! ভগবান আমাদের প্রার্থনা শোনেননি, তাই পেটে মুসলমানের জারজ সন্তান…!’

অল্পক্ষণের জন্য থামেন সত্যবতীদেবী, যেন আচমকা একঝাঁক স্মৃতির শর তার হৃদয় ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়! শর-যন্ত্রণা গোপন রেখে তিনি আবার বলতে শুরু করেন, ‘বছর পাঁচেক আগে সিংহল থেকে ইরাকগামী একটি জাহাজ দেবল বন্দরের কাছে জলদস্যুরা লুণ্ঠন করেছিল; ইরাকের শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর দায় চাপিয়েছিল মহারাজ দাহিরের ওপর, ক্ষতিপূরণ চেয়েছিল; রাজা দাহির জলদস্যুদের এই হামলার দায় নিতে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। সত্যিই এতে রাজার কোনো হাত ছিল না, এটা নিছকই একটি দূর্ঘটনা, জলদস্যুদের কাজ; জলদস্যুরা তো সুযোগ পেলে দেবলের বণিকদের জাহাজও লুণ্ঠন করতো। জলদস্যু কর্তৃক জাহাজ লুণ্ঠনের দায় চাপানো হাজ্জাজের একটা অজুহাত, কেননা অনেক আগে থেকেই ভারতভূমির ওপর তাদের লোভ। ভারতবর্ষের মশলা-রেশম, সোনাদানার প্রতি যেমনি লোভ; তেমনি লোভ ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তারের। আরবভূমির পূর্ব ও পশ্চিমে তাদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। ডাকাত মোহাম্মদ নাকি মদিনা দখলের মধ্য দিয়ে শুরু করেছিল ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তার, তারপর তার মৃত্যুর পর তার শিষ্যরা সমগ্র আরব দখল করেছে, উত্তর আফ্রিকা দখল করে পশ্চিমের স্পেন দখল করেছে। এদিকে পারস্য দখল করলেও ভারতবর্ষে সুবিধা করতে পারছিল না, অতীতে বারবার হামলা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। আমার জন্মেরও বহু আগে, ডাকাত মোহাম্মদ মরার বছর চারেক পরই আরবের খলিফা ওমরের শাসনামলে মুসলমানরা নাকি প্রথম ভারতে হামলা চালিয়েছিল থানা অঞ্চলে, কিন্তু তখন ওরা বেশিদূর এগোতে পারেনি। এর কিছুকাল পর রাজা দাহিরের বাবা চাচের শাসনামলে নাকি সিন্ধুতে নৌ-অভিযান চালিয়েছিল, কিন্তু সেবারও তারা সুবিধা করতে পারেনি, পরাজিত হয়েছিল, নিহত হয়েছিল তাদের নেতা। এরপর আরবের খলিফা ওসমান, আলি আর মুয়াবিয়ার আমলে আরো আটবার হামলা চালিয়েছিল; কিন্তু আটবারই তারা ব্যর্থ হয়। খলিফা আলির সৈন্যরা নাকি উত্তরের বোলান গিরিপথ দিয়ে কিকান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু কিকানের অধিবাসীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয় কিছু মানুষকে হত্যা, কিছু সম্পদ লুণ্ঠন আর কিছু মানুষকে ক্রীতদাস হিসেবে বন্দী করে। বার বার ব্যর্থ আরবরা এরপর থেকে হাজ্জাজের হামলার আগ পর্যন্ত অনেকদিন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ছোটো-খাটো দস্যুবৃত্তি ব্যতিত বড় কোনো হামলা করেনি।

মোহাম্মদ বিন কাশিমের আক্রমণের আগে হাজ্জাজের নির্দেশে দু-জন সেনাপতির নেতৃত্বে মুসলমানবাহিনী আরো দু-বার আক্রমণ করলে দু-বারই আমাদের সৈন্যরা তাদের আক্রমণ প্রতিহত করে, হাজ্জাজের সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ আর বুদাইল নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত খলিফা আল ওয়ালিদের সহযোগিতায় তার দেওয়া ছয় হাজার শক্তিশালী সিরীয় সৈন্যসহ হাজ্জাজ নিজের জামাতা সতেরো বছরের মোহাম্মদ বিন কাশিমকে সিন্ধু আক্রমণ করতে পাঠায়। এবার আর তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেনি আমাদের সৈন্যরা। পার্শ্ববর্তী কোনো রাজ্যও সাহায্য করেনি, রাজা দাহিরের ওপর প্রতিবেশি রাজাদের ক্ষোভ ছিল। দাহিরের বাবা চাচ ছিলেন গরিব ব্রা‏হ্মণ, কিন্তু ক্রমান্বয়ে তিনি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। রাজা দ্বিতীয় সাহসি রাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি সিন্ধুর ক্ষমতা দখল করেন। ব্রা‏হ্মণ রাজার ক্ষমতা দখল রাজ্যের বাইরের এবং ভেতরের অনেকেরই ভাল লাগেনি; তাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। চাচের মৃত্যুর পর রাজা হন তার কনিষ্ঠপুত্র দাহির। এ কথা সত্য যে ব্রা‏হ্মণ রাজারা সুশাসক ছিলেন না, নিন্মবর্ণের মানুষ আর বৌদ্ধদেরকে নানাভাবে নিপীড়ন করতেন। রাজ্যের গণ্যমান্য মানুষও রাজার বিরোধিতা করতেন। তাই মুসলমান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের সময় রাজা দাহির রাজ্যের ভেতর-বাহির থেকে তেমন সহযোগিতা পাননি। ফলে খুব সহজেই তিনি পরাজিত হন। সর্বকালেই রাজারা ক্ষ্যাপা ষাঁড়; তাদের একটু-আধটু ঢুঁসঢাস খেয়ে চলাই যেন সাধারণ প্রজার নিয়তি! কিন্তু ষাঁড়ের মুখ থেকে হঠাৎ যেন আমরা দৈত্যের মুখে পড়লাম, এর ঢুঁস দেবার বালাই নেই, খেয়ে সাবার করে দেয়!

স্বামী বাড়িতে না ফেরায় রাতে তাকে খুঁজতে বের হলেন আমার ভাসুর, তিনিও আর ফিরে এলেন না। আমরা ভয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতাম। মাঝে মাঝে জানালা একটুখানি খুলে রাস্তায় তাকালেই টুকরো টুকরো লাশ চোখে পড়তো, রক্ত-মাংসের পচা গন্ধ এসে লাগতো নাকে! মুসলমানদের নারী লোলুপতার কথা জানা থাকায় আমরা মেয়েদেরকে নিয়ে ঘরের মধ্যে ভয়ে মরছি তখন, আমার মেয়ে আর ভাসুরের ছোট মেয়ে; ভাসুরের বড় মেয়ে তখন শ্বশুরবাড়িতে। ঘরে চাল ব্যতিত আর কোনো খাবার ছিল না, ভাত ফুটিয়ে লবণ দিয়ে খেতাম; তখন প্রতিটা মুহূর্ত যেন সহস্র বছর! একদিন দুপুরে দরজায় দরাম দরাম শব্দ হলো; মেয়েদেরকে আর আমার চৌদ্দ বছরের ছেলে যাদবকে নিয়ে আমি পালঙ্কের নিচে লুকোলাম। দরজা প্রায় ভেঙে ফেলে দেখে আমার জা দরজা খুলে দিলো, আমি পালঙ্কের নিচ থেকে একটুখানি উঁকি দিয়ে দেখি যে একজন মুসলমান সৈন্য জা’র চুলের মুঠি ধরে তাকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। অন্য সৈন্যরা তখন ঘরে অনুসন্ধান চালালো, আমার বৃদ্ধ শাশুড়ি তাদেরকে বাধা দিতে গেলে সৈনারা তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। তারপর একে একে তারা পালঙ্কের নিচ থেকে বের করে আমাদের চুলের মুঠি ধরে নিয়ে গেল আঙিনায়। পিছমোড়া করে সবার হাত বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল রাজবাড়ীতে, সেখানে তখন পশুবলির মতো নরবলি চলছিল! মুসলমানরা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে চিৎকার করছিল আর সঙ্গে সঙ্গে কোনো পুরুষ বন্দীর মাথা ধড় থেকে ছিন্ন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছিল রক্তের মধ্যে, আছাড়ি-পিছাড়ি করতে করতে একটু পরই নিথর হয়ে যাচ্ছিল ধড়টা! তাজা রক্তের গন্ধে পেট গুলিয়ে উঠছিল আমাদের, কেউ কেউ বমি করে ভাসাচ্ছিল। কী মর্মান্তিক সেই দৃশ্য!

রাজবাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার পর আমার বুকের ধন যাদবকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলো ওরা, “মা মা” বলে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আমার দিকে ছুটে আসতে চাইলে এক সৈন্য ওকে চাপড়ে-চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গেল আমার চোখের সামনে থেকে।’

কান্নায় গলা ধরে আসে সত্যবতীদেবীর, নিঃশব্দে কাঁদেন তিনি; বুকভরা তার শূন্যতা আর হাহাকার পুত্র যাদবের জন্য। সত্যবতীদেবী আবার শুরু করেন, ‘হাতের বাঁধন খুলে আমাদের রাখা হলো রাজপ্রাসাদের বিশাল একটি কক্ষে যেখানে আগে থেকেই আরো অনেক মহিলা, যুবতী ও বালিকাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। তার মধ্যে রাজবাড়ীর দু-একজন মহিলাও ছিল, ছিল রাজা দাহিরের কয়েকজন ভাগ্নি, সেনাধ্যক্ষদের কন্যা। তখন কে রাজরানি, কে রাজকন্যা আর কে মেথরানি এই হিসেব ছিল না; সকলেই বন্দী দাসী। কয়েক দিন যাবৎ দেবল নগরীর নানা প্রান্ত থেকে আরো অনেক নারীকে তুলে আনলো ওরা। আমাদের যা হবার হবে, দুচিন্তা তখন মেয়েদের নিয়ে; তখন মনে হচ্ছিল যদি হাতের কাছে বিষ পেতাম তাহলে আগে মেয়েদের খাইয়ে তারপর নিজেরা খেতাম। আমরা তখন কক্ষে বন্দী হয়ে আছি আর থেকে থেকে কেঁপে উঠছি বাইরে থেকে ভেসে আসা ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি শুনে!

আমাদের দিন কাটতে লাগলো শুধু রুটি আর জল খেয়ে; স্নান নেই, ঘুম নেই, চোখের জলও যেন তখন আর অবশিষ্ট নেই! আমাদের নিয়তি আমরা বুঝে ফেলেছিলাম, তাই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে ঠায় বসে থাকতাম। এরই মধ্যে নতুন নতুন মহিলা, যুবতী ও নাবালিকাকে আনা হলে তারা এসেই খুব কান্নাকাটি করতো, কার স্বজনকে কেমন করে খুন করা হয়েছে সে-সব বলতো আর বিলাপ করতো; তারপর একসময় ক্লান্তিতে তাদের মুখে নেমে আসতো শ্মশানের নীরবতা। নতুন আসা কয়েকজনের মুখেই শুনেছিলাম যে আমাদের রাজ্যের সেনাধ্যক্ষদের পর রাজা দাহিরেরও শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে।

কয়েকদিন পর আমাদেরকে বাইরে আনা হলো; আমাদেরই মতো আরো কিছু কক্ষে বন্দী থাকা মহিলা, যুবতী ও নাবালিকাদেরকে এনে সারিসারি দাঁড় করানো হলো। বাজারের পশুর মতো আমাদেরকে গুণলো ওরা, তারপর মোট সংখ্যার পাঁচভাগের একভাগ হিসেবে আমাদের ভেতর থেকে বেছে বেছে কুমারীদের আলাদা করলো। আমার বুকের ধন অমলা আর ভাসুরের মেয়ে ইন্দুমতীকেও ফেললো ওই এক ভাগে। আমরা মেয়েদেরকে জোর করে ধরে রাখতে চাইলে আমাদেরকে মেরে মেয়েদেরকে ছিনিয়ে নিলো। ওই একভাগকে আমাদের সামনে থেকে নিয়ে গেল সৈন্যরা। তারপর অবশিষ্ট চারভাগের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক কম বয়সী মেয়েকে রাখা হলো রাজপ্রাসাদে আর বাকিদের বণ্টন করে দেওয়া হলো বিভিন্ন পর্যায়ের যোদ্ধা, কবি এবং অন্যসব আরবীয়দের মধ্যে। আমি পড়লাম একজন কবির ভাগে। আরব মুসলমানরা যুদ্ধে জিতলে নারীভোগ করে তা আগেই শুনেছিলাম কিন্তু তার ব্যাপকতা এতোটা তা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। জানতে পারলাম যে আমরা যুদ্ধে বিজয়ী মুসলমানদের কাছে গণিমতের মাল, দেবল নগরীর সম্পদের মতো আমাদেরও ভোগ কারার অধিকার তাদের ধর্মসম্মত। পরে শুনেছিলাম, যে একভাগ কুমারীকে প্রথমে আলাদা করেছিল, খলিফা আল ওয়ালিদের হিস্যা হিসেবে লুণ্ঠিত মালামাল এবং ক্রীতদাসদের সঙ্গে তাদেরকেও পাঠানো হয়েছে দামেস্কে; সঙ্গে রাজা দাহিরের কাটা মস্তকটিও পাঠানো হয়েছে। এটাই নাকি ইসলামের নিয়ম; লুণ্ঠিত মালামাল, পুরুষ ক্রীতদাস আর নারীদের পাঁচভাগের একভাগ পায় খলিফা, বাকি চারভাগ পায় যোদ্ধা এবং অন্যান্যরা। ডাকাত মোহাম্মদও নাকি তাই-ই করতো, আল্লাহ নাকি তাকে তেমন নির্দেশই দিয়েছিলেন।’

বলতে বলতে যেন পাথর হয়ে যান সত্যবতীদেবী! এখন আর কোনো কান্না নেই, কোনো শোক নেই; যেন একটি নিশ্চল পাথরের মূর্তির মুখ থেকে কালের কথন শুনছি! তিনি বলেন, ‘নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায়-ই বুঝতে পারি যে মেয়ে দুটো সেই দূর দেশে কী নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে! ওদের একটা মরার খবরও যদি পেতাম তাহলে আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হতো না! জা আর তার ছোট মেয়ের কোনো খবর জানি না, আছে হয়তো এই নগরে আমারই মতো।’

‘আর যাদব, তার কোনো খবর পেয়েছেন?’

‘ওর জন্যই তো বেঁচে আছি, নইলে কবে গলায় দড়ি দিয়ে মরতাম; ভ্রষ্ট কবির পাপ পেটে নিয়ে বেঁচে থাকতাম না। সেই যে আমার বুকের ধন যাদবকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলো ওরা, তারপর রাজবাড়ীতে ওর সাথে আর দেখা হয়নি। আমি দাসী হয়ে কবির বাড়িতে এলাম। প্রতিদিনই ভাবতাম আত্মহত্যা করবো, কিন্তু যাদবের কথা মনে হলেই আত্মহত্যার ইচ্ছেটা দমন করতাম। মনে হতো আরো কিছুদিন দেখি, যদি যাদবের কোনো খবর পাই। বয়স চৌদ্দ হওয়ায় ওকে নিশ্চয় হত্যা করা হয়নি, ও হয় এই নগরীতেই আছে নয়তো ক্রীতদাস হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে দামেস্কে। সুযোগ পেলেই আমি রাস্তায় তাকিয়ে থাকতাম। এই বাড়ির দু-জন ক্রীতদাস দারোয়ানের মধ্যে একজন আমার পূর্ব পরিচিত। গোপনে ওর সাথে দেখা করে বলে রেখেছিলাম যাদবকে কোথাও দেখলে আমাকে যেন জানায়। ও একদিন রাজবাড়ীর সামনের রাস্তায় দেখেছিল যাদবকে, বলেছিল আমার কথা। তারপর কবির অনুমতি নিয়ে কয়েকদিন পরই যাদব আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, ছেলে আমার আর ছেলে নেই! আরো অনেক ছেলের মতো যাদবকেও খোঁজা করে দিয়েছে পাষণ্ডরা!’

ক্রোধে-কান্নায় নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরেন সত্যবতীদেবী। আমি আঁৎকে উঠি, ‘খোঁজা করে দিয়েছে!’

‘রাজ্যের কম বয়সী দাড়ি-গোঁফবিহীন কিছু ছেলেকে পাষণ্ডরা খোঁজা করে দিয়েছে ওদের সঙ্গে ফুর্তি আর রাজপ্রাসাদের হেরেমের মহিলাদের ওপর নজরদারি করার জন্য। ওকে পেয়েই আর মরতে পারিনি, পেটের পাপ নিয়েও বেঁচে আছি এজন্য যে আমি বেঁচে থাকলে ও তো তবু মা বলে ডাকতে পারবে, মরে গেলে তো তাও পারবে না। কবির কাছ থেকে অনুমতি আদায় করে নিয়েছি যাতে মাসে অন্তত চার-পাঁচদিন ও আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারে। ও তো আমায় কিছুই বলে না লজ্জায়, শুনেছি ও মোহাম্মদ বিন কাশিমের খুব কাছের, তাই রাজপ্রসাদের বাইরে বেরোতে ওকে কেউ বাধা দেয় না।’

রাত বয়ে যায়, আমি ব্যথায়-বিস্ময়ে সত্যবতীদেবীর কথা শুনতে থাকি। শুনতে শুনতে শুকতারা ডুবে যায়, সত্যবতীদেবী অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় নিয়ে চলে যান, আমিও অশ্রুসিক্ত চোখে দাঁড়িয়ে থাকি কাঁঠালতলায়। আবার যেদিন যাদব আসবে সত্যবতীদেবীর সঙ্গে দেখা করতে সেদিন আমি যাদবের সঙ্গে রাজপ্রাসাদে যাব।

আমি হলদে পাখি হয়ে এদিকে-ওদিকে ঘুরি, শস্যদানা খুঁটে খাই, আর রাতেরবেলা সত্যবতীদেবীর সঙ্গে দেখা করি। দু-দিন পরই যাদব আসে মায়ের সাথে দেখা করতে, চৌদ্দ বছরের কিশোর কিন্তু মুখ দেখে মনে হয় এখনো বাল্যের ঘুম ভাঙেনি। মিষ্টি চেহারা, একমাথা কালো রেশমি চুল। গায়ে মেয়েদের পোশাক, বুকে উত্তরীয়, ঠোঁটে রঙ। আরব মুসলমানরা ওকে শারীরিকভাবে হত্যা না করলেও প্রস্ফুটিত হবার আগেই হত্যা করেছে ওর ভেতরের পৌরুষ! ওর ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন সব হত্যা করেছে নিজেদের প্রয়োজনে। ও রাজবাড়ীতে ফেরার পথে আমি ওর সঙ্গ নিলাম খোঁজার বেশে! রাজপ্রাসাদের রক্ষীরা আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে ও জানায় যে আমি ওর বন্ধু। বিনা বাধায় প্রবেশ করি অন্তঃপুরের হেরেমে; যেখানে রয়েছে আঠারো বছরের যুবক মোহাম্মদ বিন কাশিমের অসংখ্য যৌনদাসী; তাদের প্রহরায় রয়েছে আরো কিছু খোঁজা। অন্তঃপুরে পুরুষ প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ, কিন্তু খোঁজার বেশ ধারণ করায় কেউ আমাকে সন্দেহ করে না, যাদবের সঙ্গে যৌনদাসীদের কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখি আর বিস্ময় বনে যাই, সাত-আট বছরের বালিকা থেকে চল্লিশ বছর বয়সী অসংখ্য নারী; এদের মধ্যে বেশিরভাগই গর্ভবতী, একজন পুরুষের জন্য এতো যৌনদাসী, একজন পুরুষ এতোটা কামলিপ্সু! ছোট্ট মেয়েদের কেউ হয়তো পাঠশালায় পড়তো, কিশোরী-যুবতীদের কারো কারো হয়তো বিয়ের সম্বন্ধ পাকাপাকি হয়েছিল, আরেকটু বেশি বয়সের নারীদের হয়তো স্বামী-সন্তান-সংসার ছিল; সে-সব ভেসে গেছে এই একজন পুরুষের কামলিপ্সায়! এরা আর কোনোদিন স্বামী পাবে না, সংসার পাবে না, প্রিয়তম’র আদর-সোহাগ পাবে না, হয়তো আর কাউকে ভালবাসতেও পারবে না।

সন্ধ্যা নামলে সাধারণ দাসী আর খোঁজারা প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয় যৌনদাসীদের ঘরে ঘরে। আমি এক ফাঁকে যাদবের সহায়তায় পারভীন নামের একজন সন্তানসম্ভবা যুবতী যৌনদাসীর কক্ষে প্রবেশ করি, পূর্বে যার নাম ছিল রেণুকা। গল্পে গল্পে অনেক কথার পর বলি, ‘মোহাম্মদ বিন কাশিম আপনাকে ভালবাসে?’

কটাক্ষের হাসি হেসে পারভীন বলে, ‘ভালবাসার সময় কোথায় তার! দু-তিন মাস পর পর একেকজনের পালা আসে তার সঙ্গে থাকার, রাতের এক প্রহর অথবা একরাতের জন্য; তিনমাস আগে আমার পালা গেছে, এখন তো পেটে সন্তান, পেট খালি হলে হয়তোবা আবার ডাক পড়বে পেট ভরানোর জন্য; তখন হয়তো চিনতেই পারবে না আমাকে!’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলে, ‘ডাক না পরলে আরো ভাল, অমন একটা নরপশু শরীর ছুঁলে ঘেন্না লাগে!’

‘আমি একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, আরব মুসলমানদের অন্দরমহলের অধিকাংশ নারী-ই গর্ভবতী!’

পুনরায় তার শ্লেষোক্তি, ‘উম্মত! ভারতভূমিতে দ্রুত উম্মতের সম্প্রসারণের জন্য ওরা বেছে নিয়েছে আমাদের মতো ভারতীয় মেয়েদেরকেই, ধর্মান্তরিত করে আমাদের গর্ভে ঢেলেছে বিষাক্ত আরব ঔরস! আমাদের গর্ভে বেড়ে উঠছে আমাদেরই পিতা, স্বামী-স্বজন হন্তারকের সন্তান। আমাদের সন্তানেরাই নাকি একদিন ভারতভূমিতে উম্মত রক্ষা করবে, সারা ভারতভূমি শাসন করবে!’

পারভীনের এই কথায় আমার চৈতন্যে বিদ্যুৎচমক হয়, পুনপুন ঝলকায়! সেই ঝলকানিতে অতীতে বসে বর্তমানের চিত্রটা প্রচ্ছন্ন হয়ে ওঠে, একাকার হয়ে যায় অতীত-বর্তমান। প্রচ্ছন্ন হয়ে ওঠে আমাদের গলিতে ডিশ লাইনের কাজ করা ইমরানের মুখটি। ইমরানকে বেশ কয়েক বছর যাবৎ দেখার পর হঠাৎ একদিন আমার মনে হয়, আচ্ছা এই লোকটি ডিশ লাইনের কাজ করে কেন? ইমরানের বয়স তেতাল্লিশ-চুয়াল্লিশ কিন্তু বয়স আরো কম মনে হয় চিকন শারীরিক গড়ন ও সুন্দর মুখাবয়বের কারণে, ছয় ফুটের মতো লম্বা, গায়ের রঙ টকটকে লালচে ফর্সা, মাথাভরা চুল। ডিশ লাইনে কাজ করলেও বেশিরভাগ সময়ই খুব পরিপাটী থাকার চেষ্টা করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে, শার্ট আর জিন্স পরে অধিকাংশ সময়, বিকেল কিংবা সন্ধ্যার দিকে মাঝে মাঝে পাঞ্জাবি পরতেও দেখা যায়। নিজে সবসময় পরিপাটী থাকলেও ওর বউটা কালো বোরকায় মোড়া থাকে, শুধু চোখ দুটো দেখা যায়, হাত এবং পায়ে মোজা পরে। মাঝে মাঝে বউকে নিয়ে যখন গলি দিয়ে হেঁটে যায় তখন ওর বউটাকে মনে হয়ে একটা চলমান তাবলীগী ব্যাগ!

ফরমাল পোশাকে ইমরানকে কোনো বহুজাতিক কোম্পানীর প্রধান নির্বাহীর চেয়ারে বসালে অনায়াসে মানিয়ে যাবে কিংবা সিনেমার পর্দায় কোনো নায়িকার সাথে রোমান্স করতে দেখলেও মোটেই খাপছাড়া লাগবে না; অথচ ও ডিশের লাইন মেরামত করে! গলিতে রোজই ওকে দেখতে পাই; কখনো একগাদা কালো তার হাতে নিয়ে হেঁটে যায় কখনো খালি হাতে, কখনো খুঁটিতে লাগানো মইয়ের মাথায় চড়ে কাজ করে, কখনো-বা গলির মাথার সেলুনের খালি চেয়ারটিতে বসে রাজকীয় ভঙ্গিতে সিগারেট টানতে টানতে তামিল ছবির হিন্দি ভার্সন কিংবা ক্রিকেট খেলা দ্যাখে। বাংলাদেশ-ভারত কিংবা ভারত-পাকিস্থানের খেলার সময় ওর হাতের জলন্ত সিগারেটটি যেন মশাল হয়ে যায়, পারলে টিভির পর্দায় ভেসে ওঠা ভারতীয় খেলোয়াড়দেরকে ও পুড়িয়ে মারে; অকথ্য ভাষায় গালাগলি করে খেলোয়াড়দের মা-বোন-স্ত্রীকে নিয়ে! এমন কী বাংলাদেশ দলে যখন কোনো হিন্দু খেলোয়াড় থাকে তখন তাকেও একইরকম ভাষায় গালাগালি করে এবং সে যাতে তাড়াতাড়ি আউট হয় সেজন্য আল্লাহ’র স্মরণাপন্ন হয়। অথচ পাকিস্থানী খেলোয়াড়দেরকে নিয়ে ওর কী উচ্ছ্বাস, কী বিপুল আনন্দ! আমি আগে ওই সেলুনটাতে চুল কাটাতাম, নিজের কানকে নিস্তার দিতে কয়েক বছর হলো অন্য সেলুনে যাই। প্রথমদিকে ওকে দেখলেই আমার মনে হতো ডিশের লাইনম্যান নয়, ও এর চেয়ে ভাল কোনো কাজের যোগ্য। এখন ওকে দেখলেই গু’র পোকা দেখার মতো ঘৃণার উদ্রেক হয় আমার, কানে বাজে ওরই মুখে শোনা অশালীন বাক্য, ‘মালাউনের মায়রে বাপ, আউট অয় না ক্যা পুঙ্গির পুত, খানকির পোলার মায়রে চুদি!’

আমার সিএনএন ফুফুর মুখে যে-দিন শুনেছি যে ইমরান একাত্তরের যুদ্ধশিশু, সেদিন থেকে ওর জন্য আমার ভীষণ করুণা হয়; পৃথিবীর আর কোনো দেশে ওর মতো দূর্ভাগা সন্তান আছে যে নিজের মায়ের ধর্ষকের জাতিকে পাগলের মতো ভালবাসে? একাত্তরে পাকিস্থানীরা বাঙালি হিন্দু-মুসলমান নিধনে নেমেছিল, কাফের হিন্দু আর কাফেরদের দালাল মুসলমান পুরুষদের মেরে নারীদেরকে গর্ভবতী করে আধা পশ্চিম পাকিস্থানী-আধা বাঙালী এক শংকর জাতি উৎপন্ন করতে চেয়েছিল, যারা ওদের অপশাসনের বিরোধিতা করবে না, ওরা যা বলবে মাথা নত করে তা-ই মেনে নেবে। ইমরানকে দেখে মনে হয় পাকিস্থানীদের সেই কৌশল একেবারে বৃথা যায়নি! উম্মতের সম্প্রসারণে পাকিস্থানীদের এই দর্শনের বীজ ইসলামের একেবারে শিকড়ে প্রোথিত; মদিনার বানু কোরাইজা গোত্রের নারীদের ওপর মুহাম্মদ তার এই দর্শন প্রয়োগ করেছিলেন। এরপর মুহাম্মদ এবং তার শিষ্যরা আরো অনেক জাতি-গোত্রের ওপর এই দর্শন প্রয়োগ করেছে। ভারতে সিন্ধু দখলের পর মোহাম্মদ বিন কাশিম এবং তার যোদ্ধারাও মুহাম্মদের এই দর্শন প্রয়োগ করে দ্রুত মুসলমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে। সময়-কালের স্রোতে অনেক কিছুর উত্থান-পতন হলেও মুহাম্মদের সেই দর্শন এখনো ভেসে চলেছে উম্মতের জনস্রোতে!

পারভীনের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসি। এখন অনেক রাত, হেরেমের সদর দরজা বন্ধ, একজন খোঁজা প্রহরী সদর দরজার কাছে দেয়ালে মাথা এলিয়ে ঘুমোচ্ছে। আমি মৃদু পায়ে হেরেমের ভেতরের গলি দিয়ে হাঁটতে থাকি, যৌনদাসীদের কক্ষের দরজা বন্ধ। চলতে চলতে পিছনের বারান্দার দিকের একটা কক্ষের জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেতরে দৃষ্টি পড়তেই আচমকা আমার পা থমকে যায়, প্রদীপের অল্প আলোয় বিছানায় দুটো নগ্ন শরীর; শায়িত শরীরটির ওপর ঝুঁকে অপর শরীরটি তাকে চুম্বন করছে আর ডান হাতে মন্থন করছে স্তন। শায়িতের হাতদুটো আদর করছে তাকে চুম্বন ও মন্থনরত শরীরটির পিঠে ও চুলে। দু-জনেরই মাথায় দীর্ঘ চুল, দু-জনের বুকেই স্ফীত স্তন, দু-জনকেই নিবিড়ভাবে অবলোকন করে আমি নিশ্চিত হই যে দু-জনেই নারী!

জানালা থেকে সরে আসি আমি, কিন্তু মাথার মধ্যে ভাবনার ঘুর্ণিপাক। দু-তিন মাস পর পর এরা পুরুষ সঙ্গ পায় কিছু সময়ের জন্য, বাকি সময় পুরুষসঙ্গ বঞ্চিত হয়ে হেরেমে বন্দী থাকে, বন্দী জীবন থেকে মুক্তির কোনো আশা নেই, পছন্দের পুরুষের সঙ্গ পাওয়া এবং মনো-দৈহিক চাহিদা মিটানোর কোনো উপায় নেই। হতে পারে ওরা দু-জন সহজাত সমকামী, আবার এমনও হতে পারে অতীতে ওদের দু-জনেরই স্বামী-সংসার ছিল; হয়তো দিনের পর দিন পুরুষ শূন্যতায় জৈবিক প্রয়োজনে একে অন্যকে কাছে টেনেছে, হয়তো ভালও বেসেছে। এই বন্দী জীবনে সীমাহীন দঃখ-যন্ত্রণার মাঝেও সমপ্রেমে-সমকামে ডুবে ওরা হয়তো খুঁজে পেয়েছে কিছুটা মুক্তির স্বাদ আর হৃদয়ে জেগেছে বেঁচে থাকার নতুন আশা।

যাদবকে কোথাও না দেখে আমি হলদে পাখি হয়ে গরাদের ফাঁক গলে উড়ে বাইরে এসে বসি একটা গাছের ডালে। তারপর সিন্ধুর বিয়োগান্তক অধ্যায় অতিক্রম করে আমি আবার উড়াল দিই অতীতের দিকে। আমার অসংখ্য পূর্বপুরুষের দেখা পাই; কোথাও আমার পূর্বপুরুষ খেয়াঘাটের মাঝি, কোথাও চাষী, কোথাও রাজকর্মচারী, কোথাও নট, কোথাও চার্বাক দার্শনিক, কোথাও ঋষি, কোথাওবা যাযাবর। তাদেরকে অতিক্রম করে আমি উড়ে যাই আরো অতীতের দিকে। আমার উড়ানযাত্রা আর থামে না; মনের আনন্দে আমি উড়ে বেড়াই এশিরিয়া, ব্যাবিলন, সুমেরীয়, মিশরীয়, হিব্রু, গ্রীক, রোমান সভ্যতার ওপর দিয়ে! উড়তে উড়তে একসময় পৌঁছে যাই প্রাচীন আফ্রিকায়; ক্লান্ত-তৃষ্ণার্ত আমি। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য গহীন অরণ্যের মাঝখানের এক পাহাড়ী ছড়ার পাশের পাথরে বসতেই মানুষ হয়ে যাই; ছড়াটা বেশ গভীর, শীতল-স্বচ্ছ জল। আমি হাঁটুজল অব্দি নেমে জলের আয়নায় নিজেকে দেখি, হাত-মুখ ধুয়ে আঁজলা ভরে পান করি শীতল জল! হঠাৎ-ই আমার কানে ভেসে আসে কাশির শব্দ। আমি মাথা তুলে চারিদিকে দৃষ্টি ঘুরাই। আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় অদূরে পাথরের ওপর উপবিষ্ট একজন নগ্ন মানুষের পিঠে। আমি তার মুখ দেখতে না পেলেও এটুকু বুঝতে পারি যে তিনি কিছু খাচ্ছেন। আমি ছড়া থেকে উঠে কিছুটা বামদিকে সরে ধীর পায়ে তার পিছনদিকের একটা বড়ো পাথরের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি মিষ্টি আলু খাচ্ছেন, পাথরের ওপর রাখা আরো একটি মিষ্টি আলু এবং একটি পাকা পেঁপে। আমি নীরবে দাঁড়িয়েই থাকি। মানুষ নাকি মানুষের মতো দেখতে অন্য কোনো প্রাণি! রোমশ শরীর দীর্ঘ, সুঠাম আর কালো। হাতে-পায়ে বড় বড় নখ, মাথার কাঁচা-পাকা দীর্ঘ কোঁকড়া চুল পিঠে ছড়ানো। মিষ্টি আলু খাওয়া হলে ঘাড় কাত করে পাথর থেকে পেঁপে হাতে তুলে নেবার সময় তার মুখের ডানদিকের কিছু অংশ দেখতে পাই, মুখে কিঞ্চিত বানরের আদল; মুখের দাড়ি-গোঁফও কাঁচা-পাকা। পেঁপে খাওয়ার পর তিনি ছড়ার দিকে এগিয়ে যান, আমি তার মুখের ডান পাশটি আরো ভালভাবে দেখতে পাই, দাড়ি-গোঁফে লেগে আছে পাকা পেঁপে। তিনি ছড়ার কোমরজলে নেমে হাত-মুখ ধুয়ে পর পর কয়েকটি ডুব দেন। হাত দিয়ে চুল, দাড়ি-গোঁফ এবং শরীর মার্জন করেন; তারপর আরো দুটি ডুব দেন। এরপর আঁজলা ভরে জলপান করার পর ঘাড় উঁচিয়ে আকাশ অথবা গাছের দিকে তাকিয়ে নিজে নিজেই এমনভাবে নিঃশব্দে হাসতে থাকেন যেন তিনি অমৃত পান করেছেন এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ তিনি!

 

(চলবে…..)

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1