চলার পথের গল্পমালা : সুকাইক

আমি তখন জেদ্দা শহরে থাকতাম। চীন, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরের সাথে ভাল ব্যবসা ছিল আমার! আমার ভগ্নিপতি থাকতেন সুকাইক নামে একটা গ্রামে। যে এলাকায় কোন বিদ্যুৎ বা পানির ব্যবস্থা ছিলনা। গ্রাম্য ঐ জনপদে ৮০/৯০টা বেদুইনদের সেকেলে ঘর ছিল। তারা সবাই ওয়াদি রিমের প্রাকৃতিক পানি দ্বারা কৃষিকাজ করতো। আর তাদের জনপদ ছিল “আল সুকাইক” নামক এই গ্রাম্য জনপদ। নিকটবর্তী বড় শহর ছিল জিজান, যার দূরত্ব ছিল অন্তত ২০০ কিমি। সুকাইক গ্রামে জেনারেটর চালিত একটা পেট্রোল পাম্প ছিল, যা এলাকার সকল গাড়ির তেল সরবরাহ করতো। এই পাম্প সংলগ্ন ছিল একটা বড় স্টেশনারী কাম মুদি দোকান। মানে দোকানে নিত্য ব্যবহার্য প্রায় সকল জিনিসই পাওয়া যেতো। আমার ভগ্নিপতি ছিলেন ঐ দোকান কাম পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার। দূরবর্তী বুদাইয়া, আল হানফা, হাজানবাহ, আল কাতিয়া প্রভৃতি জনপদ থেকে লোকজন আসতো তাদের গাড়িতে তেল আর নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র কিনতে। তাই ৫/৭টা জনপদের একমাত্র পাম্প কাম দোকানটির ব্যবসা ছিল বেশ রমরমা।
:
থাকা খাওয়া ফ্রি ছাড়াও বিচ্ছিন্ন জনপদ হিসেবে খুব ভাল বেতন ছিল আমার ভগ্নিপতির। কিন্তু একটা অসুবিধা ছিল তার। তা হচ্ছে ২০০- কিমি এর মাঝে কোন পোস্ট অফিস না থাকাতে চিঠিপত্র পাঠাতে না পারা এবং ব্যাংক না থাকাতে টাকা পাঠানোর প্রবলেম। তার চিঠিগুলো মূলত পাঠানো হতো জেদ্দা আমাদের ঠিকানায়। ওখানে পরিচিত কোন লোক গেলে তার হাতে দিয়ে দিতাম চিঠি কিংবা দুমাস পর পর আমি যেতাম তার সাথে দেখা করতে। তখন সাথে থাকতো তার পুরনো চিঠির বান্ডেল। আমি মূলত যেতাম তার খবরাখবর এনে দেশে বোনকে জানাতে ও তার বেতনের টাকা আনতে। যা এনে জেদ্দা থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠাতাম বোনের কাছে। জেদ্দা থেকে স্যাপ্টকোর জিজান লাইনের এসি বাসে যেতে হতো সুকাইক। বিকেলে বাস রওয়ানা করলেও, সুকাইক চেকপোস্টে বাস থামতো রাত দুটোর দিকে। চেকপোস্টকে ওরা বলে তাফতিস। তাফতিসে নেমে ধূ-ধূ মরুভূমির মাঝ দিয়ে হাঁটতে হতো অন্তত এক/দেড় ঘন্টা। তারপর দেখা মিলতো সুকাইক জনপদের।
:
এক শুক্রবারে জিজানের বাসে উঠে বসেছি সুকাইক যেতে। রাত পৌনে দুটোর দিকে চেকপোস্টে নামলাম আমি একাকি। কাধে একটা ছোট ব্যাগ। মরুভূমির কাঁচা রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছি সুকাইকের দিকে। পথের পাশে নিচে একটু যায়গা নজরে এলো। ঢালু জলাধার অনেকটা পুকুরের মত। তার জলে সাদা পোশাক পরা চারজন মানুষ হাঁটাহাটি করতে। এতো গভীর রাতে সুনসান এলাকায় ৪ মানুষের হাঁটাহাটি দেখে কিছুটা বিস্মিত হয়ে গা ছমছম করে উঠলো। কি কারণে যেন সোজা পথে না হেঁটে ওদের দিকে হাঁটতে থাকলাম। ধবধবে সাদা আরবি পোশাক পরা মানুষগুলো এবার অনেক লম্বা হলো। লম্বা হতে হতে তারা আকাশে মিলিয়ে গেল। ভয়ে কেঁপে উঠলাম আমি। এবার হারিয়ে ফেললাম পথ। কোনদিকে যাবো বুঝতে পারলাম না। মরুভূমির মাঝে তালগাছের মত কাটাগাছগুলো দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। পেছনে তাকিয়ে দূরে দেখলাম চেকপোস্টের বাতি জ্বলছে। এবার তা ঠিক ধরে পুনরায় হাঁটতে শুরু করলাম সুকাইক গাঁয়ের দিকে। কিন্তু দুঘন্টা হাঁটলাম এখনো পথ শেষ হচ্ছেনা কেন? একটা লোকালয়ে পৌঁছেছি কিন্তু এটাতো দেখতে সুকাইকের মত নয়। পেট্রোল পাম্পটা নজরে আসছে না কেন?
:
গরমের রাত ছিল। তাই এ জনপদের অনেক লোকজন খালি গায়ে ঘরের বাইরে শুয়েছে মাদুর বা প্লাস্টিক পেতে। একজনের নড়াচড়া দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম সুকাইক গ্রামের কথা। সে বললো সুকাইক ফেলে অন্তত এক ঘন্টার পথ চলে এসেছি অন্যদিকে। সুতরাং আবার একঘন্টা যেতে হবে পেছনে। ওর দেখানো পথ ধরে আবার পেছনে হাঁটতে থাকলাম। সেই পথ, সেই জলাধার, সেই চারটে সাদা পোশাকধারী লম্বা মানুষ। এবার চারজন আগলে ধরলো আমার পথ। আরবিতে বললো – কে তুমি? বার বার এ পথে যাচ্ছো কেন? আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম – তোমরা কারা। এতো রাতে কি করো এখানে? ওরা বললো – আমরা জীন। মরুভূমির জলাশয়ে থাকি আমরা। এখন আমাদের জলাশয়ে হাঁটাচলার সময়। আমি ভীত হয়ে বললাম – ‘সুকাইক যাবো আমি। পথ ভুলে গেছি’। জীনদের মাঝের একজন হাত প্রসারিত করে অনেকদূর ঠেলে দিলো আমায়! এবার দূরে ধূ-ধূ চোখে পড়লো সুকাইক গ্রাম। আমি যখন সেখানে পৌঁছলাম – তখন ফজরের আযান শুরু হয়েছে। লোকেরা তাদের বিছানা ছেড়ে উঠছে নামাজের জন্য।
:
গরম সিজনের কারণে ভগ্নিপতি বাইরে ঘুমাচ্ছিলেন। আমার এক ডাকেই ঘুম ভাঙলো তার। বিশ্রামের পর দুপুরে দিনের বেলাতে এলাম সেই জলাধারের কাছে। যেখানে রাতে অদ্ভুৎ সব দৃশ্য দেখেছিলাম। জলের কিনারে বড় বড় পায়ের ছাপ দেখলাম এ দিনের বেলায়ও। বিকেলে ঘুরতে এলাম আল হারিদা সাগর পারে। জলে মাছ সাঁতার কাটছে অগণিত। যেন জলের চেয়ে মাছ বেশি। হাঁটুজলে নেমে কটা মাছ ধরলাম অপার আনন্দে। ১০/১২-টা মাছ নিয়ে ফিরতে সন্ধ্যা হলো এবার। ভগ্নিপতি আর আমি তাজা মাছ ভেজে খেলাম পরম তৃপ্তিতে। সারাদিন বসে বসে সব চিঠিগুলো পড়লো ভগ্নিপতি। জরুরীগুলোর জবাবও লিখলো। শেষে ৩ মাসের বেতন আর চিঠিপত্র নিয়ে আবার প্রস্তুতি নিলাম রাতের বাসে জেদ্দা ফিরতে। ফিরতি বাসে চেকপোস্ট বা তাফতিস থেকে উঠতে হবে রাত ১-টার দিকে। আবার যেতে হবে সে পথ দিয়ে। ভগ্নিপতিকে জীনের কথা বলাতে হেসে উড়িয়ে দিলো সে। তারপরো বললাম – আমাকে এগিয়ে দিতে হবে ‘তাফতিস’ পর্যন্ত।
:
এবার ভগ্নিপতি এলো আমার সাথে চেকপোস্ট পর্যন্ত। আজ আর দেখা পেলাম না চার জীনের। রাত ১-টার দিকে উঠে বসলাম জেদ্দার বাসে। লোহিত সাগরের তীর ধরে এগোচ্ছে বাস। আল কামা, আল বির্ক হয়ে বাস চলে এসেছে আল কুয়াইজকে। আকস্মিক রাতের অন্ধকারে একঝাঁক মালিকানাহীন বুনো উট চলে এলো মহাসড়কে। প্রচন্ড গতির গাড়ি উটের বাথানে পড়ে হতাহত করলো ৫/৭টা উট। বাসটি প্রায় উল্টে যাচ্ছিল কিন্তু কিভাবে যেনে বেচে গেলো সেটা। জনমানবজীবন মরু সড়কে উটের সাথে এক্সিডেন্ট করে বাস অপেক্ষা করতে থাকলো পুলিশের জন্য। ইচ্ছে করলে পালিয়ে যেতে পারতো বাসটি, কিন্তু তা করলো না! জানিনা কখন আসবে পুলিশ আর আমরা কখন পৌঁছবো জেদ্দা!

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 21 = 22