ধ্বংসপ্রাপ্ত পালমিরা

সমাজবিজ্ঞানের একটি অংশ হলো ‘ইতিহাস’। ‘ইতিহাস’ বলতে সহজ ভাষায় আমরা বুঝি মানুষের বর্তমান যখন অতীতে রূপ নেয়, সেই অতীতটা ভবিষ্যত প্রজন্মকে জানানোর জন্য অতীতের ঘটনাবলীর একটি লিখিত রূপ। ইতিহাস লিখিত হওয়ার পূর্বের সময়টাকে আমরা প্রাগৈতিহাসিক বলেই জানি। প্রাগৈতিহাসিক শব্দটিকে ভাঙলে পাওয়া যায়, প্রাক+ইতিহাস । অর্থাৎ, ইতিহাসের পূর্বে। ইতিহাসের সীমানা রয়েছে। ইতিহাসের সময়কালকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু, প্রাগৈতিহাসিক সময়কালটাকে মহাবিশ্বের জন্ম পর্যন্ত বিচরণযোগ্য বলা যায়। সে যাই হোক। মানুষ এবং তার তৈরী সমাজের বিবর্তনের ক্রমধারায় যেই পর্যায়ে মানুষের ব্যবহার্য সকল হাতিয়ার এবং অস্ত্রের মূল উপকরণ ছিলো পাথর সেটাকেই আমরা প্রস্তর যুগ বলে জানি। প্যালিওলিথিক এবং মেসোলিথিক সময়কাল পাড়ি দিয়ে আসে প্রস্তর যুগের শেষ অধ্যায় নিওলিথিক। নিওথিলিক মানে নব্য প্রস্তর যুগ। আজ আলোচনাটা নব্য প্রস্তর যুগ নিয়ে নয়। তবে, আজকে আলোচ্য বিষয়ের বিবরণের শুরুতেই এই যুগের ছোঁয়া রয়েছে বলেই ভূমিকায় কিছুটা উল্লেখ করলাম।

কথা বলতে চাই, ‘পালমিরা’ নিয়ে। ঘটনা এবং লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় সম্পর্কে আমরা সকলেই কম বেশি জানি। সিরিয়ার হমস প্রদেশে অবস্থিত প্রাচীন সেমেটিক শহর হচ্ছে পালমিরা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে আজ থেকে চার হাজার বছর আগেও এখানে ছিলো মানুষের বসবাস। এটির সমৃদ্ধির ইতিহাস টা বিস্তৃত। আরব অঞ্চলে গড়ে ওঠা সভ্যতার উৎপত্তি হয়েছিলো এখানেই। ২০০০ বছর আগে রোমান সাম্রাজ্যের অধিনস্তে আসার পর থেকে পালমিরার সমৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকে। তখনকার সময়েই এখানে নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও স্থাপত্য গড়ে ওঠে। ইউনেস্কো এগুলোকে “World Heritage Site” বলে ঘোষণা দেয়।
খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক হতে শাম অঞ্চলের বানিজ্য কেন্দ্র হয়ে উঠে এই পালমিরা। বিভিন্ন অঞ্চল হতে এখানে ব্যবসার কাজে পাড়ি জমাতেন ব্যবসায়ীরা। খ্রীষ্টাব্দ প্রথম শতকে রোম সম্রাজ্যের আওতায় আসে রাজ্যটি। রোমানদের অধিনস্ত রাজ্যগুলোর মধ্যে পালমিরার মর্যাদা ছিলো কিছুটা ভিন্ন। ২৬৭ সালে পালমিরা রাজ্যটি যখন রোম দ্বারা শাসিত ছিলো তখন হঠাত এক সম্রাজ্ঞীর উত্থান ঘটে। তার নাম ছিলো জেনোবিয়া। জেনোবিয়া ছিলেন অল্পবয়স্কা এক প্রতাপশালী সম্রাজ্ঞী। তার সম্রাজ্যের সময়কাল ছিলো ক্ষণস্থায়ী তবুও তার সম্রাজ্য ছিলো বিশাল। তার সময়কালে এই পালমিরার নিদর্শনগুলোর উপর একবার হামলা চলে। সে যাই হোক। প্রাচীন ইতিহাস আর ঘাটাবো না। ধীরে ধীরে বর্তমানে ফিরে আসা যাক। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে পালমিরার আলোকিত অতীতকে মাটি খুঁড়ে বাইরে নিয়ে আসেন। তারা এই স্থান হতে বিভিন্ন নিদর্শন নতুন করে আবিষ্কার করেন। হেরিটেজ বলতে আমরা মূলত যেই বিষয়টি বুঝে থাকি সেটা হলো উত্তরাধিকারসূত্রে অতীত প্রজন্মের কাছ থেকে আমাদের প্রাপ্ত ঐতিহ্যগুলোকে। পালমিরা তেমনই এক ঐতিহ্য।

আমরা সকলেই আইসিস এর ব্যাপারে জানি। পাঠকবৃন্দ, এই আইসিস বলতে কিন্তু প্রাচীন মিশরীয় দেবী সেমিরামিস কে বোঝানো হয় নি। এই আইসিস হলো, ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড সিরিয়া। এই সংগঠনটি ২০১৪ সালে সারা দুনিয়ায় খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। ২০১৫ সালের মে মাসের দিকে এই সংগঠনটি পালমিরা দখল করে। এই সন্ত্রাসের দল হাজার বছর পুরনো নিদর্শনগুলোকে ধ্বংস করে। সেই ধ্বংসযোগ্যের ভিডিও তারা সারা দুনিয়ার কাছে প্রকাশ করেছিলো। আব্রাহামিক ধর্মমতের সর্বশেষ প্রচারিত ধর্মমত তথা ইসলাম ধর্মে এক ও অদ্বিতীয় উপাসক হলেন আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর প্রশংসা বা স্তুতি করা রীতিমতো পাপ। সেই খাতিরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর অস্তিত্ব এবং সেগুলোর সংরক্ষণ করাও পাপ। তাই আইসিস পালমিরার নিদর্শনগুলো কে ধ্বংস করে। তারা বোমা দিয়ে পুরো এলাকায় ধ্বংসযোগ্য চালায়। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে তারা পালমিরার স্থাপত্যগুলো ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। পালমিরার জাদুঘরটিকে তারা তাদের আদালত এবং কারাগার হিসেবে ব্যবহার করেছে। জনসম্মুখে হত্যা করার জন্য প্রাচীন রোমান এম্ফিথিয়েটারটিকে তারা ব্যবহার করে। এসব অপকর্মকান্ড চালানোর প্রায় একবছর পর সিরিয়ার সেনাবাহিনী, প্রতিরক্ষাবাহিনী আইএসকে প্রতিরোধ করে। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হবার তা হয়ে গিয়েছে।

ধর্ম! ধৃ-ধাতুর সাথে মন-প্রত্যয় যোগ করে ধর্ম শব্দটির উৎপত্তি হয়। ধর্ম শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ধারণ করা। আক্ষরিক অর্থে সংজ্ঞায়িত করলে যা ধারণ করে তাই ধর্ম। আসলে বিষয়টি এমন নয়। বিষয়টি আরো জটিল এবং গোজামিল সম্পন্ন। সভ্য সমাজ মানুষের সৃষ্টি। অর্থাৎ, মানুষ তার সভ্য সমাজকে সৃষ্টি করেছে। কোনো ঈশ্বরের দ্বারা সভ্য সমাজ সৃষ্টি হয় নি। বরং, সভ্য সমাজে বসবাসকারী মানুষ মোরালাইজিং গডের জন্ম দিয়েছে। সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া মানুষের অন্যতম স্বভাব। সমাজের বাকি মানুষগুলোর ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যকে অনেকাংশেই সফল করেছে মোরালাইজিং গডের ধ্যান-ধারণা। প্রাচীনকালে মনে করা হতো, রাষ্ট্র কোনো আধ্যাত্মিক ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান। আর এই ঈশ্বর ধারণার স্রষ্টারা ছিলেন সার্বিক নিয়ন্ত্রক। নারীকে বন্দী করার জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কর্তৃক সৃষ্ট একটি শৃঙ্খল হচ্ছে তথাকথিত মোরালাইজিং গড প্রদত্ত নিয়মকানুন। এখন কথা হচ্ছে, যেই ঈশ্বর ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে বলে সে কেমন ঈশ্বর? যেই ঈশ্বর প্রাচীন নিদর্শনকে বিলীন করতে বলে সে কেমন ঈশ্বর?

যা কিছু পরিবর্তনযোগ্য, তা মৃত নয়। হাজার বছর পুরাতন অপরিবর্তনযোগ্য আইন আজকের জামানায় সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ানোর জন্য যারা বিদ্রোহ করে তাদের আইডিওলজি কতটা যৌক্তিক? যুগ যত উন্নত হচ্ছে, এইসব মতাদর্শের লোকেরা ততটাই পিছিয়ে পড়ছে।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

24 − 14 =