দামোদর তীরের শুভ্রজিতা

দামোদর তীরের শুভ্রজিতা
:
আকস্মিক ফেসবুকে শুভ্রজিতা নামটা দেখে মনটা কেমন করে উঠলো আমার। কোন কিছু না ভেবেই কেবল নামের কারণে ‘ফ্রেন্ডরিকোয়েস্ট’ পাঠালাম অচেনা শুভ্রজিতাকে। দুদিন পর অপরিচিত শুভ্রজিতা গ্রহণ করলো আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপ। আমার কটা গল্পের লিংক দিলাম শুভ্রজিতাকে। ও জানালো – গল্প পড়তে সে ভালবাসে খুব। এক সময়ে জানলাম – বর্ধমানের দামোদর তীরের অজপাড়াগাঁ পারবেলিয়া মায়ের সাথে থাকে শুভ্রজিতা। বাবা নেই ওর! বাংলা সাহিত্যে অনার্স পড়ে নিকটবর্তী একটা কলেজে। বিদ্যাসাগর যে দামোদর সাঁতরে পার হয়েছিল এক ঝড়বৃষ্টির রাতে, তা দেখার সাধ ছিল আমার। সুতরাং প্লান করলাম একবার শুভ্রজিতাদের বাড়ি যাবো দামোদর পার হয়ে। দেখে আসবো দামোদর নদী আর শুভ্রজিতার পারবেলিয়া গ্রাম।
:
ঢাকা থেকে কলকাতা যাই আমি বছরে তিন-চার বার। বর্ধমানেও গিয়েছি অন্তত দুবার। সেখানে পরিচিত এক বন্ধু আছে আমার। শুভ্রজিতাকে ম্যাসেঞ্জারে জানালাম – তার বাড়ি পারবেরিয়া আমি আসবো একদিন। শুভ্রজিতা হয়তো মনে করেছিল এটি ‘জাস্ট কথার কথা’! বাংলাদেশের ঢাকার মানুষ আমি! কখনো বর্ধমান রাধানগর চিনাকুড়ি বাজার হয়ে সত্যি পৌঁছবো ঐ অঁজপাড়াগাঁয়ে। এমন কথা কষ্মিনকালেও মনে হয়নি গ্রামীণ মেয়ে শুভ্রজিতার। তাই কোন কিছু না ভেবেই তাৎক্ষণিক জবাব দিয়েছিল – “নিশ্চয়ই আসবেন দাদা! আমাদের বাড়িতে আপনাকে স্বাগতম। খুব খুশি হবো আপনার মতো একজন লেখক এলে”! কিন্তু এক গ্রীস্মের দিনে যখন কলকাতা থেকে ভারতীয় সিমে ফোন দিলাম শুভ্রজিতাকে, তখন যারপরনাই বিস্মিত হলো সে। আমার তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা শুনে আরো আশ্চর্য হলো সে। শেষে বললো – “দাদা, আমাদের বাড়ি তথা ঘরদরজাতো খুব সুন্দর নয়। তাই আমার কলেজে দেখা করি আমি আপনার সাথে”? কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। শুভ্রজিতাকে বললাম – ‘না তোমাদের ঐ ঘর দেখতেই আসতে চাই আমি। এবং দুপুরে তোমার কিংবা তোমার মায়ের হাতের রান্না খেতে চাই তোমাদের ঘরে’! আমার এ প্রস্তাব শুনে এবার মনে হলো সত্যি লজ্জায় পড়েছে শুভ্রজিতা। সে বললো – “দাদা আমরা খুব দরিদ্র। বাবা নেই আমার। মা মুড়ি ভেজে সংসার চালায়। সেখানে আপনি আসবেন ভাবতে খুব খারাপ লাগছে আমার”! আমি বললাম – “আমি নিজেও গ্রামের মানুষ ছিলাম একদিন। তুমি যতই দরিদ্র হও। আমার কোনই আপত্তি নেই তোমার বাড়ি যেতে। যদি না তোমার বা তোমার মায়ের কোন সমস্যা হয়”।
:
শনিবার দুপুরের ট্রেনে বর্ধমান গেলাম। পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল আমার। রাতে শহরে কাটালাম পুরনো বন্ধুর বাড়িতে। পরদিন রোববার খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি নিলাম শুভ্রজিতার বাড়ি যেতে। প্রথমে রাধানগর টোটোতে। তারপর চিনাকুড়ি বাজার পার হয়ে খেয়া নৌকোয় পার হলাম গ্রীস্ম-বর্ষার ভরা দামোদর নদী। দামোদর পার হতে মনে হলো আমিই বিদ্যাসাগর। মায়ের জন্য একাকি পার হচ্ছি ভরা দামোদর! খেয়াঘাট থেকে প্রায় আধাঘন্টা হেঁটে পৌঁছলাম পারবেলিয়া গ্রামে। পারবেলিয়া জুনিয়র স্কুল বায়ে রেখে আরো হাঁটলাম প্রায় কুড়ি মিনিট। এরপর কাছাকাছি পৌঁছলাম শুভ্রজিতাদের বাড়ির। শুভ্রজিতা কাঁচা রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে এলো সামনে। যাতে সহজে চিনে যেতে পারি আমি ওদের বাড়ি! আমাকে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে আসতে দেখে বললো – “দাদা এতোদূর সত্যি আসবেন আপনি! কখনো বিশ্বাস হয়নি আমার! মানুষ কি এতো কষ্ট করে এই গ্রামে আসে”! শুভ্রজিতাকে বললাম – “কেন আসবে না! মানবিক মানুষ হলে নিশ্চয়ই আসবে শুভ্রজিতা”! ও আমার কাঁধের ব্যাগ নিজে বহন করতে চাইলো। কিন্তু আমি বর্ধমান থেকে কেনা মিষ্টির প্যাকেট ওর হাতে দিয়ে বললাম – “এটা ধরলেই হবে”!
:
ইটের গাঁথুনি আর টালির চালের লাউয়ের লতানো ডগার বাড়িতে পৌঁছতে আরো পাঁচ মিনিট লাগলো আমাদের। পোড়া চেহারার মাঝ বয়েসি নারী সামনে এলো। ইনি শুভ্রজিতার মা। চেহারা দেখেই বোঝা যায় – খাটতে খাটতে পুড়িয়ে ফেলেছেন মুখের লাবণ্য। আমাকে দুহাত উপরে তুলে নমস্কার করে বললেন – “শুভর কাছে শুনেছি আপনার কথা। ঢাকাতে নাকি কত বড় সরকারি চাকুরি করেন আপনি! আপনি এলেন এ গরিবের বাড়িতে। কোথায় বসতে দেই আপনাকে এ গরিবের বাড়িতে”! আমি বিনয়ের সাথে বললাম – “আপনার জীবন সংগ্রামের কথা শুনেছি শুভ্রজিতার কাছে। তাইতো দেখতে এলাম আপনাকে”! ঠান্ডা জল খেয়ে বললাম – “সকালে নাস্তা করিনি। আপনার হাতের ভাজা মুড়ি খাবো বলে”! শুভ্রজিতার মা হেসে বড় বস্তা থেকে মুড়ি বের করতে থাকলো আমার জন্যে। কথা প্রসঙ্গে বললো – এ বস্তায় ত্রিশ কেজির মত মুড়ি আছে। যা কাছের বাজারে বিক্রি করেন তিনি। সেখান থেকে পাইকাররা তা নিয়ে যান বর্ধমানে। তারপর প্যাকেটজাত হয়ে তা চলে যায় কলকাতার মত বড় শহরে!
:
গ্রামীণ এ দরিদ্র ঘরেও রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুকুমার সেনের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বই দেখলাম। পাঠ্য বই হিসেবে শুভ্রজিতা হয়তো সংগ্রহ করেছে। খুব ভ্যাপসা গরম লাগছে। ঘরে একটা ফ্যান লাগানো দেখে বললাম – “ফ্যানটা চলেনা”? শুভ্রজিতা বললো – “বিদ্যুৎ নেই”! বাংলাদেশের মত এখানেও লোডশেডিং? শুভ্রজিতার মা বললো – “না তা নয়। ৭-মাস বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে বলে, লাইনটা কেটে দিয়েছে লোকাল বিদ্যুৎ অফিস”। আমার চাপাচাপিতে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল বের করলো কলেজ পড়ুয়া লাজুক তরুণী শুভ্রজিতা। হিসেব করে দেখলাম মাত্র ১১৫০ টাকা বকেয়া। জরিমানাসহ যা ১২৫০ টাকার মত। এ টাকা জমা দিলেই নাকি পুন: সংযোগ হবে ওদের ঘরের লাইন। দুপুরে আমাকে কি খাওয়াবে তার জন্য ভীষণ ব্যস্ত হলো শুভ্রজিতা আর তার মা। এ দরিদ্র পরিবারের কোন টাকা পয়সা খরচ হোক, তা একদম চাইলাম না আমি। শুভ্রজিতাকে বললাম – “তুমি কি একটু কাছের বাজারে যাবে আমার সাথে! দেখবো তোমাদের গ্রামীণ বাজারটা”। স্থানীয় পারবেলিয়া বাজারে তখনো দুচারটে মাছের দোকান ছিল। যারা অপেক্ষা করছিল শেষ কাস্টমারের! লোকাল বিদ্যুৎ অফিসও সেখানে।
:
প্রথমে বিদ্যুৎ অফিসে ঢুকলাম আমরা দুজনে। কিন্তু শুভ্রজিতার প্রবল আপত্তি। কিছুতেই বিলের টাকা পরিশোধ করতে দেবেনা আমাকে। বললাম – “ধরো, এ টাকাটা তুমি এখন ধার নিলে। কলকাতা থেকে আমার প্রকাশিত ১০-টা বই পাঠাবো তোমাকে। তা বিক্রি করতে পারলে ১৫০০ টাকার মতো লাভ হবে তোমার। কলেজে বই বিক্রি করে দিও আমার। বিল পরিশোধের পর অফিস বললো – “এখনই লাইন কানেক্ট করে দেবে তারা”! বাজার থেকে তাজা রুই মাছ কিনলাম আস্ত একটা। বাংলাদেশের তুলনায় বেশ কমদাম মনে হলো এ গ্রামে! শুভ্রজিতা বললো – “এতো মাছে কি হবে? আমরাতো মা-মেয়ে মাত্র কাটা দুপিছ করে কিনি”! আমি হেসে বললাম – “আমরা বাংলাদেশীরা আস্ত একটা কিনি। তারপর ৩/৪ দিন ধরে খাই”। বাজার করে শুভ্রজিতা আর আমি ঘন্টাখানেকের মধ্যে ফিরলাম ওদের বাড়িতে আবার। এতো বেশী মাছ দেখে শুভ্রজিতার মাও একই কথা বললো শুভ্রজিতার মতো।
:
মাছ ছাড়াও আমার আব্দারে শাকপাতার নানাবিধ ব্যঞ্জন তৈরী করলো শুভ্রজিতা আর তার মা। আমরা ৩-জনে খেলাম মাটির বিছানায়। বেলা গড়ালে আমি উঠবো বলে জানালাম শুভ্রজিতাকে। তার আগে রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম মুড়ি ভাজার টেকনিক, তা বস্তাবন্দীকরণ, বাজারে নেয়া, চালকেনার হিসেব আর দৈনিক লাভ-লোকশান। শুভ্রজিতার মা বললো – “এ মুড়ি ভেজেই এ ঘর তুলেছি আমি গতবছর। এখনো প্লাস্টার করা হয়নি, নিচে পাকা করা হয়নি। একদিন করবো সব”! আমি বললাম – “একদিন পড়ালেখা করে আপনার মেয়ে ভাল জব করবে, তারপর অবস্থার পরিবর্তন হবে আপনার”! বিকেল না গড়াতেই বিদেয় নিতে চাইলাম শুভ্রজেতা আর তার মা থেকে। এ গরমের দিনেও চা বানালো শুভ্রজেতা। চা খেলে ব্যাগ কাঁধে নিলাম আমি বের হতে। বিদায়ক্ষণে শুভ্রজিতাদের বাড়ির প্রাণের মৃণালে ভেঙে পড়া দরিদ্র দুখগুলো যেন আঁকড়ে ধরতে চাইলো আমাকে! মা মেয়ের দিকে চেয়ে মানবিক মানুষের মৃত্যুর মৃদঙ্গ বাজলো হৃদয়ে যেন! ঘরের চারদিকে চেয়ে ভালবাসাময় হৃত্পিণ্ড কষ্টকথার ডম্বরু বাজিয়ে গেল আমার!
:
তারপরো ওদের জীবনবোধের ছন্দের সুন্দর নীড় ফেলে ফিরে তাকাই আমি অদূরের দামোদর বাতাসে! মনে হয় আসলে জীবনটা যেন বৃহদরণ্যের মতো রক্তহৃদয়ের! মানুষের এসব কষ্টবোধের ক্ষণিক সময়ের অম্লান বোধের আকাশে যেন ভেসে বেড়াই কিছুক্ষণ! বিদায় নিয়ে পথে নামি আমি। শুভ্রজিতা এগিয়ে আসে আমার সাথে সাথে। খেয়াঘাট পর্যন্ত যাবে সে দামোদর তীরে! এ অঁজপাড়াগাঁয়ের এসব কষ্টবেদনাময় অদৃষ্টের ক্রূর বাঁকে-বাঁকে হেঁটে যাই গ্রামীণ পথে। আমাদের সাথে যেন জীবনের এসব জ্বলন্ত জাগ্রত স্বপ্নেরা হাঁটে হাত ধরাধরি করে! এক সময় খেয়াঘাটে পৌঁছে যাই আমরা। নৌকোয় পা রেখে শুভ্রজিতাকে বলি – “এবার চলে যাও তুমি, বৃষ্টি আসতে পারে”! কিন্তু অচেনা গাঁয়ের অজানা তরুণী শুভ্রজিতা তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে আমার দিকে! দামোদরের ঘোলা জলের দিকে তাকিয়ে এসব জীবনের জটীল গ্রন্থিল বৃক্ষতলের ছায়ায় বসে থাকি অনেকক্ষণ। নৌকো ছেড়ে দেয় ওপারে যেতে। জীবনের এসব বিকল্পকুটিল কষ্টপাথর ভেঙে এগুতে থাকি সামনে আমি। বর্ধমান পৌঁছতে হবে আমাকে বৃষ্টির আগেই। তারপর কলকাতা!
:
ছবি : দামোদর তীরের শুভজিতাদের ইট টালির ঘর!
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1