ভারত চীন সম্পর্ক ও বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব- দ্বিতীয় পর্ব

ভারত ও চীন পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম সভ্যতা। ঐতিহাসিক আঙ্গিকে দেখলে বলতে হয় পৃথিবীর সভ্যতার বিবর্তনে এই দুই দেশের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বসভ্যতায় কাগজের আবিষ্কার ও গান পাউডার যেমন চীনের দান তেমনই আধুনিক সংখ্যাপদ্ধতি ও শূন্যের আবিষ্কার ভারতের অবদান! তাই প্রকৃতপক্ষে বলা যায় প্রচীন চৈনিক সভ্যতা ও ভারতীয় সভ্যতা উভয়েই পৃথিবীতে বহু উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল। শুধু তাই নয় চৈনিক বৌদ্ধ পর্যটক ‘হিউয়েন সাং’ এর ভারত আগমন বা ভারত থেকে ‘অতিশ দীপঙ্কের’ তিব্বত হয়ে চীন গমন উভয় দেশের প্রাচীন সাংস্কৃতিক বন্ধন সুদৃঢ় করে। উভয় দেশের এই সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের ফলস্বরূপ ভারতে সৃষ্ট বৌদ্ধ মতবাদের ব্যাপক প্রসার চীনে দেখা যায়, এর ফলে উভয় দেশের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়। চীনের কনফুসিবাদ ও ভারতের বৌদ্ধ মতবাদের আদানপ্রদানের ফলে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়!

অন্যদিকে প্রাচীন সিল্ক রুটের দ্বারা চীনের সঙ্গে ভারতের ও বর্হিবিশ্বের বাণিজ্য চলত। এই রুটে উভয় দেশ ব্যবসার মাধ্যমে প্রচুর মুনাফা অর্জন করত, যাঁর ফলে উভয় দেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধশালী হয়! মধ্যযুগে পৃথিবীর মোট জিডিপির প্রায় অর্ধেক ভারত ও চীন উৎপাদন করত। এই কারণেই প্রাচীনকাল ও মধ্যযুগে ভারতকে ‘সোনেকি চিড়িয়া’ বলা হত! এই সম্পদের লোভেই যুগে যুগে ভারত ও চীন উভয় দেশে বহিঃ শত্রুর আক্রমণ ঘটেছে। এমনকি আধুনিক যুগে ও এই সম্পদের লোভেই পশ্চিমা শক্তিগুলি ভারত ও চীনে আসে এবং এখানকার শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে উভয় দেশকেই উপনিবেশে পরিণত করে।

বহু সংঘর্ষের পর 1947 সালের 15 ই আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে অন্যদিন চীন ও বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে 1949 সালের 1 লা অক্টোবর ‘Peoples Republic China’ নামে স্বাধীনতা লাভ করে। ভারত ও চীন এই উভয় দেশের স্বাধীনভাবে আত্মপ্রকাশ বিশ্বব্যাপী এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। ভারত প্রথম থেকেই বিশ্বের উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কন্ঠস্বরে পরিণত হয়, তাই চীনের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা থেকে স্বাধীনতা অর্জনকে ভারত সরকার সাগ্রহে গ্রহণ করেছিল। ভারত সরকার চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখার পক্ষপাতী ছিল। ভারত সরকার মনে করত নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ভারত ও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে সম্পূর্ণ বিষয়টি নির্ভর করছিল উভয় দেশের ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার উপর।

আধুনিক যুগে ভারত চীন সম্পর্ক বুঝতে গেলে সর্বপ্রথম উভয় দেশের দর্শন বুঝতে হবে। চীন রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ‘সাম্যবাদী চীনের’ সর্বাধিনায়ক ‘মাও সে তুং’ মনে করতেন- ‘বন্দুকের নলই সমস্ত ক্ষমতার উৎস’ অর্থাৎ চীন হিংসাশ্রয়ী আদর্শে বিশ্বাসী! অন্যদিকে, ভারতবর্ষ তৈরি হয়েছিল ‘গান্ধীজির অহিংসা নীতি ও নেহেরুর আদর্শবাদ’ দিয়ে। আসলে ভারতের সভ্যতা সম্রাট অশোক ও গৌতম বুদ্ধের অহিংসা ও শান্তিনীতি দ্বারা প্রভাবিত যা আধুনিক সময়ে গান্ধীবাদ ও নেহরুবাদ দ্বারা লালিত! এর ফল স্বরূপ ভারত স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকেই বেশ কিছু নীতি মেনে চলে যেগুলি আজও ভারতের বিদেশনীতির মূলভিত্তি, যেমন- ভারত অন্য দেশের সঙ্গে শান্তি ও সংহতি বজায় রাখবে, ভারত অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে মর্যাদা প্রদান করবে, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না, ভারত প্রথমে কোন দেশকে আক্রমণ করবে না। বলাইবাহুল্য এই ‘মধ্যমপন্থার কূটনীতি’ আজও ভারতের বিদেশনীতির মূল ভিত্তি হিসাবে রয়ে গেছে!

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন ‘পন্ডিত জওহরলাল নেহরু’। তিনি একজন আদর্শবাদী মানুষ ছিলেন, তিনি গোটা বিশ্বকে আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিচার করতেন। তিনি মনে করতেন পৃথিবীতে কোথাও কোন সমস্যা দেখা দিলে, আলোচনার মাধ্যমে সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি মনে করতেন গোটা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে, ঔপনিবেশিক দেশগুলি যেন দ্রুত স্বাধীনতা পায় সেদিকে তিনি লক্ষ্য রাখতেন। এইসময় ভারত জাতিসংঘে ঔপনিবেশিক দেশগুলির স্বতন্ত্রতা, মুক্তি ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে শক্তিশালী কন্ঠস্বরে পরিণত হয়। নতুন স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশগুলি যাতে পৃথিবীর দুই মহাশক্তি সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে বিভক্ত না হয়ে যায় এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব যাতে বিসর্জন না দেয় সেই উদ্দেশ্যে তিনি ‘জোট নিরপেক্ষ নীতি’ গ্রহণ করেন। নেহেরুর এই নীতির ফলে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশগুলি স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ পেয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে নেহেরু এইসময় এক বিশ্বনেতায় পরিণত হন!

তবে নেহেরু চীনের নীতি সম্পর্কে সঠিক বিশ্লেষণ করতে পারেন নি। তিনি আশা করতেন চীন ও ভারতের সঙ্গে ‘শান্তি পূর্ণ সহাবস্থান’ (Peaceful Coexistence) বজায় রাখবে। কিন্তু প্রশ্ন হল এগুলি সবই ছিল নেহরুর দৃষ্টিভঙ্গী যার সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল ছিল না। অন্যদিকে চীনের নীতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চীন আক্রমণত্মক বিদেশ নীতিতে বিশ্বাসী ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভুল হল পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা, যেমন- একজন সাধু ব্যাক্তি মনে করেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষই ভালো ভাবে থাকবে, কোথাও কোন সমস্যা দেখা যাবে না কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তাই দেখি? নেহরুর ক্ষেত্রে ঠিক একই ভুল হয়েছিল তিনি চীনকে ঠিক বুঝতে পারেন নি!

প্রথম দিকে চীন ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বললে ও ভিতরে ভিতরে চীন সামরিক দিক থেকে প্রস্তুত হতে থাকে। অন্যদিকে ভারত চীনের এই দ্বিচারিতা ধরতে পারেনি। আসলে চীনের উদ্দেশ্য কি তা ‘মাও সে তুং’ এর নীতিতেই সুস্পষ্ট। মাও সে তুং প্রথম থেকেই তাঁর বিস্তারবাদী নীতি শুরু করেন একে মাও এর ‘Hand plam and Finger Technic’ বলা হয়। মাও এর মতে চীন তখনই সম্পূর্ণ হবে যখন এই ‘Hand plam and Finger Technic’ সম্পূর্ণ হবে। মাও এর মতে ‘চীন হল হাত, হাতের তালু তিব্বত এবং পাঁচটি আঙ্গুল হল লাদাখ, নেপাল, ভুটান, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ’। যতক্ষণ না এই অঞ্চলগুলি চীনের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ততক্ষণ চীনের হাত সম্পূর্ণ হচ্ছে না। তাই চীন আজও মাও সে তুং এর এই দর্শন মেনে চলে এবং এই সমস্ত অঞ্চল চীনের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে।

চীনের এই আক্রমণত্মক বিদেশনীতির বিপরীতে ভারত ‘Piece full co existence’ নীতি নিয়ে চলে, এর ফলে চীনের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়। সেই উদ্দেশ্যে চীন সিমলা চুক্তি রদ (1914) করে 1950 সালের 6 ই অক্টোবর ‘চামডো নদী’ অতিক্রম করে তিব্বত আক্রমণ করে। এটি ছিল এক বিরাট ঘটনা, কোন রকম আগাম সতর্কবার্তা না দিয়ে 40,000 সৈনিক নিয়ে নবগঠিত তথাকথিত ‘সাম্যবাদী চীন’, তিব্বত আক্রমণ করে। এথেকেই বোঝা যায় চীন প্রথম দিন থেকেই কতটা সাম্রাজ্যবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত! তিব্বতে এই আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে চীন বলে- “Units of the Chinese People’s Army have been ordered to cross over into Tibet in order to free three million Tibetans from Western Imperialist Oppression and to consolidate on Chinese western border”. অর্থাৎ চীন তিব্বত আক্রমণ করেছে তিব্বতের তিরিশ লক্ষ মানুষকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য! ভাবা যায় একটা পুরো দেশ দখল করে তাঁদের কিভাবে মুক্তি দেওয়া সম্ভব? চীন তিব্বতে পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে প্রবেশ করে পুরো দেশ দখল করে! তাই আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে চীনের ‘বেল্ট রোড ইনিশিয়েট’ (BRI) পরিকল্পনা নিয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন!

তিব্বত, ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র ছিল। তাই তিব্বত সম্পর্কে ভারত যাতে কোন ব্যবস্থা না নেই তাঁর জন্য চীন সরকার, ভারত সরকারের উদ্দেশ্যে 1950 সালের 30 শে অক্টোবর একটি চিঠি লেখে। এই চিঠিতে বলা হয়- ‘তিব্বত চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং তিব্বত বিষয়ে চীন কোনও বিদেশি শক্তিকে গ্রহণ করবে না’। বলাইবাহুল্য এটি ছিল ভারতের পক্ষে হুমকি স্বরূপ। তাহলে প্রশ্ন হল ভারত এর প্রত্যুত্তর কি দিয়েছিল? দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্য ভারত সরকার তখন তিব্বত বিষয়ে শক্ত কোন অবস্থান নিতে পারেনি। ভারত সরকার পার্লামেন্টে বলে ‘তিব্বত সম্পর্কে কিছু করতে গেলে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা রয়েছে’ তাই ভারত সরকার তিব্বত বিষয়ে চুপ থাকে। আসলে নেহেরু মনে করতেন ‘চীনের থেকে তিব্বতের মুক্তি শুধু ভারত কেন পৃথিবীর সমস্ত দেশের সৈন্য দ্বারা ও সম্ভব নয়, একমাত্র তখনই তা সম্ভব যখন চীন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে’।

বলাইবাহুল্য, চীনের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের এই তোষণ নীতি আগামীদিনে ভারতের জন্য বড় বিপদ ডেকে এনেছিল। এতদিন ভারতের সঙ্গে যে তিব্বতের সীমান্ত ছিল তা এখন ভারত ও চীনের সীমান্তে পরিণত হয়, যার ফলে ভারতের সমস্যা আরও বৃদ্ধি পায়। তবে নেহেরু এটাও মনে করত চীন ভারতকে কখনও আক্রমণ করবে না, কারণ চীন যদি ভারতকে আক্রমণ করে তাহলে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। তাই তিনি এই অঞ্চলের শান্তির জন্য চীনের বিস্তারবাদী নীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেন। তাঁর এই তোষণ নীতির ফলে চীন বুঝতে পারে ভারতীয় সেনাবাহিনী এখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়, চীন এটাকে ভারতের দুর্বলতা হিসাবে চিন্হিত করে!

তবে নেহেরুর চীনের প্রতি এমন নীতির কিছু যৌক্তিক কারণ ছিল। প্রথমত, সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশে সমস্যার কোন শেষ ছিল না একদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অন্যদিকে পিঁপড়ের মতো বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা খুবই কঠিন কাজ ছিল, সেইসঙ্গে শক্তিশালী কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকার ফলে কাজ করতে খুবই সমস্যা হচ্ছিল। একই সঙ্গে দায়িত্ব ছিল ভারতকে এক ‘উন্নত গণতন্ত্রে’ পরিণত করার, তাই নেহরুর দায়িত্ব ছিল প্রচুর কিন্তু সেই তুলনায় সম্পদ বিশেষ ছিল না। নতুন করে ‘আধুনিক ভারতবর্ষ’ গড়ে তোলার গুরু দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। আবার সেই সময়েই 1948 সালে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কাশ্মীরকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রথম ভারত পাক যুদ্ধ শুরু হয়। তাই প্রকৃতপক্ষে দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক অবস্থা ভালো ছিল না, এমতাবস্থায় নেহরু চাইছিলেন না তিব্বতকে কেন্দ্র করে 1950 সালে ভারত ও চীন আরও একটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। এই সমস্ত কথা বিবেচনা করে নেহরু চীনের সঙ্গে শান্তিনীতি বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন।

তবে সকলে নেহরুর এই নীতির পক্ষপাতী ছিলেন না বিশেষত ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ‘সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল’ চীন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। অসুস্থ থাকা অবস্থাতে ও তিনি জেনারেল ‘হিম্মত সিং জির’ নেতৃত্বে নেফাতে (অরুণাচল প্রদেশ) দ্রুত ‘আসাম রাইফেলের’ এক সেনাবাহিনী পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তিনি আশঙ্কা করেন তৎকালীন নেফা বা অরুণাচল প্রদেশে যদি সেনাবাহিনী না পাঠানো হয় তাহলে এটা দ্বিতীয় কাশ্মীরে পরিণত হবে। আসলে বন্ধুরাষ্ট্র তিব্বতের সঙ্গে ভারতের বর্ডার থাকায় এতদিন সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা ছিল না কিন্তু চীন তিব্বত দখলের পর এই সীমান্তে দ্রুত সেনাবাহিনী পাঠানোর প্রয়োজনতা দেখা যায়। বলাইবাহুল্য, ‘সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের’ এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপের ফলে আজও অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অংশ হিসাবে রয়ে গেছে।

নেহেরু ও প্যাটেলের বহু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তাঁরা ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। নেহেরু ও প্যাটেল পরস্পরকে শ্রদ্ধা করতেন এবং যৌক্তিক পরামর্শ দিতেন। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ গঠনে এই দুই নেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাদের বহু বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল ঠিকই তবে তাঁর মানে এই নয় তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ ছিল। আসলে নেহেরু ছিলেন শান্তিবাদে বিশ্বাসী অন্যদিকে প্যাটেল সমস্ত কিছু দৃঢ় ভাবে করার পক্ষপাতী ছিলেন, তাই তাঁকে ‘ভারতের লৌহপুরুষ বা ভারতের বিসমার্ক’ বলা হত! বহু বিষয়ে উভয় নেতার মধ্যে আদর্শগত দন্দ দেখা যেত ঠিকই কিন্তু বিপদে সর্বদা তাঁরা একে অপরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করতেন। আজকের দিনে এমন রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের মধ্যে এমন মধুর সম্পর্ক আর কোথায় দেখতে পাওয়া যায়? 1950 সালের 15 ই ডিসেম্বর প্যাটেলের হঠাৎ প্রয়াণের পর নেহেরু কার্যত অনেক একা হয়ে গিয়েছিলেন যা পরবর্তীতে তাঁর কর্মপদ্ধতিতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে প্যাটেলের মতো একজন মানুষকে যখন তাঁর সত্যিই প্রয়োজন ছিল তিনি তা পাননি, ভারত চীন সম্পর্কে এই বিষয়টি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চীন বিষয়ে শুধু প্যাটেলই নয় কংগ্রেসের মধ্যে দক্ষিণপন্থী অনেক নেতাই শান্তিনীতির পরিবর্তে কঠোর নীতির পক্ষপাতী ছিলেন। উল্লেখ্য চীনের তিব্বত দখলের পর বিপদ ভারত সীমান্তে ও এসে পৌঁছায়। তবে এসময় বিশ্বের সুপার পাওয়ার আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলির ভূমিকা ছিল খুবই নেতিবাচক, কারণ তাঁরা চীনের এই অবৈধভাবে তিব্বত দখলের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি, তাঁরা যদি ব্যবস্থা নিত তাহলে হয়তো তিব্বতের সমস্যা এত বৃদ্ধি পেত না। তিব্বত বিষয়ে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ ভারতের চেয়ে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলি অনেক কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারত কিন্তু তাঁরা তা না করায় চীন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই চীনের এই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের বৃদ্ধিতে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের দায় কম নয়! তবে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন যেহেতু সাম্যবাদী চীনের উত্থানে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত ছিল তাই আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব চীনের তিব্বত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন ভূমিকা রাখেনি। প্রকারান্তরে তাদের তোষণনীতি গ্রহণ করার ফলে চীনের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা আরও বৃদ্ধি পায়।

চীন তিব্বত দখলের পর খুব দ্রুতই নিজের আসল রূপ দেখাতে শুরু করে। চীনের দমন পীড়নের বিরুদ্ধে তিব্বতের মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠলে চীন তিব্বতের সঙ্গে ’17 th point agreement’ সাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুসারে চীন, তিব্বতের মানুষকে আশ্বস্ত করে তাঁরা তাঁদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের লালন পালন করতে পারবে। দালাই লামাকে আশ্বস্ত করা হয় তিনি স্বাধীনভাবে তাঁরা কার্য পরিচালনা করতে পারবেন। তিব্বতের মানুষরা চীনের কথায় বিশ্বাস করে এই চুক্তি সম্পাদন করে কিন্তু খুব দ্রুতই তাঁরা বুঝতে পারে চীনকে বিশ্বাস করে তাঁরা কতটা ভুল করেছে! তিব্বতিরা খুব শীঘ্রই উপলব্ধি করতে পারে চীন মুখে এই চুক্তির কথা বললে ও বাস্তবে তা মানতে রাজি নয়। তাই তিব্বতের মানুষ ধীরে ধীরে চীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য তৈরী হতে থাকে! বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু দালাই লামা তিব্বতের এই সমস্যা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সচেতন করতে থাকেন!

এদিকে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ ভারত, চীনের সঙ্গে কি রকম সম্পর্ক রাখবে এ নিয়ে চিন্তিত ছিল। ভারত চীনের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে বিশ্বাসী ছিল এবং এশিয়া থেকে ভারত ও চীন উভয় দেশ বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করুক এটাই চাইছিল। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সীমান্ত সমস্যার কি হবে? ভারত পশ্চিমি সীমান্তে ‘জনসন লাইনকে’ ও পূর্ব সীমান্তে ‘ম্যাকমোহন লাইনকে’ নিজের সীমান্ত বলে মনে করে। চীন সীমান্ত হিসাবে কি মানে তা পরিষ্কার নয়। যদিও পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি চীন পশ্চিম সেক্টরে ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইনকে’ মানে, তবে চীন কোথায় কোন লাইনকে মানে তা আজও পরিস্কার নয়। চীনের এই ‘মানচিত্র আগ্রাসন বা Cartographic aggression’ তাঁদের সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এদিকে ভারত ম্যাকমোহন লাইন অনুসারে প্রথমবার তাঁর প্রশাসন 1951 সালের 12 ই ফেব্রুয়ারি ‘তাবাং’ অঞ্চলে প্রেরণ করে এখানকার অধিবাসীরা ভারতীয় প্রশাসনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। এই অঞ্চলকে চীন দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে মনে করত। ভারত ম্যাকমোহন লাইন অনুসারে নেফাতে (অরুণাচল প্রদেশ) প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও চীন এবিষয়ে কোন মন্তব্য করেনি এটি বেশ সন্দেহজনক বিষয় ছিল। তাই চীন সীমান্ত বিষয়ে কি ভাবে এবং ম্যাকমোহন লাইনকে স্বীকার করে কিনা তা জানার জন্য নেহেরু তৎকালীন চীনে অবস্থিত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ‘কে এম পানিক্কর’ কে একটি রিপোর্ট তৈরী করতে বলেন। কে এম পানিক্কর চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাই এর সঙ্গে দেখা করেন এবং সাংস্কৃতিক তথা বহু বিষয়ে আলোচনা হলেও চীনা প্রধানমন্ত্রী সীমান্ত বিষয়ে একটি ও কথা বলেন নি। তাই পানিক্কর মনে করেন চীন ভারতের সীমান্ত মেনে নিয়েছে। পানিক্করের পাঠানো রিপোর্টের ভিত্তিতে নেহরু ও মনে করেন তাহলে চীন ভারতের সীমান্তকে মেনে নিয়েছে এবং চীনের সঙ্গে ভারতের কোন সীমান্ত সমস্যা নেই। নেহেরুর বিদেশ মন্ত্রকের বহু আধিকারিক মনে করতেন চীনের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত এবং চীন আমাদের সীমান্ত না মেনে নিলে চীনের সঙ্গে কোন চুক্তি করা উচিত নয়।

1953 সালের 5 ই মার্চ প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর বিদেশসচিবকে বলেন চীনের সঙ্গে আপাতত সীমান্ত নিয়ে কিছু বলার দরকার নেই, ব্রিটিশ আমল থেকে তিব্বত ও ভারতের মধ্যে যে সীমান্ত বজায় ছিল সেটিই ভারত ও চীনের সীমান্ত হিসাবে বিবেচিত হবে। চীন যদি কিছু বলে তাহলে ভারত সরকার তাঁর উত্তর দেবে। ভারত চীনের সম্পর্ক যাতে সুন্দর হয় সেজন্য ভারত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের মাধ্যমেই তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। লর্ড কার্জনের আমলে তিব্বত ভারতের প্রভাবাধীন ছিল আদর্শবাদী নেহেরু তিব্বতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন না, তিনি মনে করতেন সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা থেকে ভারতের মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে ভারতের সুস্থ সম্পর্কের জন্য 1954 সালে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ভারত ভ্রমণে এলে দুদেশের মধ্যে উন্নত সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে কথা হয়। উভয় দেশের সম্পর্কের উন্নতির জন্য ‘পঞ্চশীল নীতির’ উপর কথা হয়। 1954 সালের 29 শে এপ্রিল The “Agreement on Trade and Intercourse between the Tibet region of China and India” এই চুক্তিটি বেজিং এ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ‘এন রাগভন’ ও চীনের ডেপুটি ফরেন মিনিস্টার ‘হান-ফু’, এটিকে ‘পঞ্চশীল নীতি’ হিসাবে গণ্য করা হয়। পঞ্চশীল নীতির মূল পাঁচটি নীতি হল- 1) পরস্পরের রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, 2) অনাক্রমণ, 3) পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, 4) সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সাহায্য প্রদান এবং 5) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। শান্তিবাদী নেহেরু মনে করতেন এই পাঁচটি নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠলে পৃথিবীতে আর কোন সমস্যা থাকবে না, বিশ্বব্যাপী শান্তি বজায় রাখা সম্ভব। তবে এটি উল্লেখ্য ভারত এই নীতিতে বিশ্বাসী হলেও চীন এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিল না!

ভারতের এই peaceful co-existence এর নীতি অর্থাৎ শান্তি নীতির চীন অন্য মানে করে, চীন এটি ভারতের দুর্বলতা মনে করে। চীন দাবি করে চীন এই পঞ্চশীল চুক্তি মানবে যদি ভারত স্বীকার করে, তিব্বত চীনের অংশ। প্রধানমন্ত্রী নেহেরু চীনের এই দাবিটি মেনে নেন। তবে এখানে একটা কূটনৈতিক বিষয় আছে ভারত দাবি করে 1914 সালের সিমলা চুক্তি অনুসারে অন্তঃ তিব্বত চীনের অংশ হিসাবে মনে করে, বহিঃ তিব্বত নয়। উল্লেখ্য এই বিষয়ে ভারত কি মনে করে এবং চীন কি মনে করে তা আজও পরিস্কার নয়। তবে এই চুক্তিতে চীন, ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, আকসাই চীন সহ সীমান্তকে মানে এটা পরিষ্কার করে বলেনি।

অন্যদিকে ভারত তিব্বতকে চীনের অংশ মনে করে তিব্বতের অধিকার চীনের কাছে ছেড়ে দেয় এর জন্য অনেকে নেহরুকে সমালোচনা করেন। তবে বিরুদ্ধ মত ও ছিল অনেকের মতে ভারত তখন চীনকে তিব্বত থেকে দখল মুক্ত করার মতো অবস্থায় ছিল না, তাই নেহেরু উভয় দেশের সুস্থ সম্পর্কের জন্য তিব্বতের উপর চীনের দাবি মেনে নেন। আসলে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু মনে করতেন চীনের সঙ্গে ভারতের একটিই সমস্যা তাহল তিব্বত, তাই তিব্বতের সমস্যা মিটলে চীনের সঙ্গে ভারতের আর কোন সীমান্ত সমস্যা থাকবে না। কিন্তু নেহেরু চীনকে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলেন নেহেরু তিব্বতকে চীনের অংশ মেনে নেওয়ার পর চীন বলে তিব্বতের সমস্যা মিটেছে এবার বহু সমস্যা বসে মেটাতে হবে। অর্থাৎ আবার নতুন করে সীমান্ত সমস্যা! আসলে নেহেরু বুঝতে পারেন নি যে চীনের কথা ও কার্যের মধ্যে কোন মিল নেই।

এদিকে ঠিক এমন সময় 1954 সালের 19 শে অক্টোবর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু প্রথমবার পিকিং অর্থাৎ বর্তমানের বেজিং এ পৌঁছালে ‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’ শ্লোগানে তাঁকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়! চীনের এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং ‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’ এর শ্লোগানে মুগ্ধ হয়ে শান্তিবাদী নেহেরু মনে করেন ভারত এবং চীন স্বাভাবিক বন্ধু, তাই আগামীদিনে এই দুই দেশ বিশ্ব শাসন করবে এবং আমাদের মধ্যে যে সমস্যা রয়েছে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। প্রাচীন ভারতীয় ও চৈনিক সভ্যতা নতুন আঙ্গিকে বিশ্বকে পথ দেখাবে!

ভারত একদিকে যখন চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে চাইছিল, অন্যদিকে চীন রোজ নতুন নতুন সমস্যা হাজির করছিল এবং এনিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও চলছিল। চীন মুখে পঞ্চশীল নীতি মেনে চলার কথা বললে ও ভিতরে ভিতরে ব্যাপক পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করছিল। অন্যদিকে, ভারত চীনের কথায় বিশ্বাস করে কিছুই করেনি। 1956 সালের 26 শে নভেম্বর চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ভারতে আসেন সেইসময় দালাই লামা ও ভারতে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে অনুরোধ করেন ‘তিনি ভারতেই থাকতে চান এবং চীনে ফিরে যেতে চান না, তিনি তিব্বতে চীনা আগ্রাসন নিয়ে চিন্তিত ছিলেন’। নেহেরু এইসময় ভারত চীনের শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করতে চাইনি, তাই তিনি দালাই লামাকে বুঝিয়ে তিব্বতে পাঠিয়ে দেন। নেহেরু, দালাই লামাকে বলেন ’17 th point agreement’ অনুযায়ী তিনি যেন দেশে গিয়ে কাজ করেন। তিনি চাইছিলেন না এমন কিছু ঘটুক যাতে ভারত ও চীনের সম্পর্কের অবনতি হোক।

এদিকে সেটাই হল যেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন। 1957 সালের সেপ্টেম্বর মাসে চীনের সরকারি সংবাদপত্র ‘Peoples Daily’ তে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়। যেখানে বলা হয় ‘সিনকিয়াং থেকে তিব্বত’ পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। এটি এক বিরাট ঘটনা কারণ এই রোড আকসাই চীন অঞ্চলের উপর দিয়ে গেছে অর্থাৎ এটি সরাসরি ভারতের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত। ভারত এই আকসাই চীনকে চিরকাল নিজের অংশ বলে মনে করে এখন চীনের এই দাবির ফলে উভয় দেশের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে।

নেহেরু চীনের এই পদক্ষেপের বিরোধীতা করে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইকে এবিষয়ে এক পত্র লেখেন তিনি বলেন “1956 সাল থেকে এবং আরও বহু বার আমরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি ভারত ম্যাকমোহন লাইন ও অন্যান্য বিষয়ে সীমান্ত নিয়ে যা ভাবে তা আপনি মেনে নিয়েছেন এমন সংকেত দিয়েছিলেন, আমি মনে করতাম ভারত ও চীনের মধ্যে কোন সীমান্ত সমস্যা নেই”। কিন্তু চৌ এন লাই সঙ্গে সঙ্গে এই পত্রের উত্তর না দিয়ে প্রায় এক মাস পর উত্তর দেন। চৌ এন লাই বলেন “আমরা অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম তাই এই বিষয়ে এতদিন আলোচনা করিনি এবং পত্রের উত্তর দিতে পারিনি, এখন কাজ শেষ তাই উত্তর দিচ্ছি। চীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নির্মিত বর্ডার মানে না, তাই ভারত ও চীনের মধ্যে নতুন করে সীমান্ত চুক্তি হওয়া প্রয়োজন।” অর্থাৎ প্রকারান্তরে চীন নতুন করে এলাকা দখল করতে চাই। নেহেরু মনে করতেন ভারত ও চীনের মধ্যে কোন সীমান্ত সমস্যা নেই কিন্তু চীনের, আকসাই চীনের উপর দাবি নতুন করে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং সীমান্ত সমস্যা দেখা যায়।

এদিকে 1959 সালে চীন তিব্বতের সঙ্গে একতরফা ভাবে ’17 th point agreement’ ভেঙ্গে ফেলে এবং ব্যাপক নরসংহার শুরু করে। এর প্রতিবাদে চীনের বিরুদ্ধে তিব্বতে এক বিদ্রোহ সংগঠিত হয়, দালাই লামা মনে করেন চীন তাঁকে গ্রেফতার করতে পারে তাই তিনি তাঁর হাজার হাজার অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে ভারতে চলে আসেন। নেহেরু, দালাই লামার সঙ্গে দেখা করতে যান চীন একে ভালো চোখে দেখেনি এবং চীন বলে নেহেরু দালাই লামার মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে আশ্রয় দিয়ে পঞ্চশীল নীতির চুক্তি ভঙ্গ করছে। তাই চীন পঞ্চশীল নীতি মেনে চলায় বাধ্য নয়।

প্রধানমন্ত্রী নেহেরু 1959 সালের 24 শে এপ্রিল মুসৌরিতে দালাই লামার সঙ্গে দেখা করতে যান। দালাই লামা নেহেরুকে বলেন ‘তিনি মনে করেন ভারতের সহযোগিতায় চীন থেকে তিনি তিব্বতকে মুক্ত করতে পারবেন’। অন্যদিকে নেহরু মনে করতেন ‘ভারত এখন তিব্বতের স্বাধীনতার জন্য চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে পারবে না, তিনি এটাও মনে করেন গোটা বিশ্বের সৈন্য মিলেও চীনের কাছ থেকে তিব্বতকে মুক্ত করতে পারবে না, যদি না চীন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়’। তাই তিনি দালাই লামাকে শক্ত কোন প্রতিশ্রুতি দেননি তবে দালাই লামা ও তাঁর সঙ্গীদের ভারতে থাকার ব্যবস্থা করেন। চীন একে তাঁর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত করে এবং উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত হতে থাকে।

চীনের সঙ্গে এরূপ মনোমালিন্য চলতেই থাকে। একদিকে আলোচনা চলতে থাকে অন্যদিকে চীন ভিতরে ভিতরে তৈরী হতে থাকে। 1960 সালে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ভারতে আসেন তাঁর মূল বক্তব্য ছিল ‘চীনের অধিকারে আকসাই চীন থাকবে, তেমনি অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অংশ হিসাবে থাকবে’ স্বভাবতই চীনের এই প্রস্তাব নেহেরু খারিজ করে দেন। এনিয়ে বিরোধীদের প্রবল চাপ ছিল যাতে ভারতের এক ইঞ্চি জমিও চীনের দখলে না যায়। তাই এই বৈঠক ব্যার্থ হয়। চীনের সঙ্গে এমন প্রবল তিক্ততার মাঝে ও 1960 সালের 6 ই ডিসেম্বর নেহেরু জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী সদস্য পদের পক্ষে কথা বলেন, তাই ভারতের সমর্থনে চীন জাতিসংঘে স্থায়ী সদস্যপদ পায়। নেহেরুর এই নীতির জন্য তিনি আজও সমালোচিত।অন্যদিকে নেহরুর যুক্তি ছিল এশিয়া থেকে চীন প্রতিনিধিত্ব করলে উন্নয়নশীল দেশের অবস্থান ও জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন শক্তিশালী হবে। তিনি মনে করতেন চীনের সঙ্গে সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব।

তবে নেহেরুর পরামর্শদাতা বি এম মালিক
মনে করেন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে তাই নেফার সুরক্ষা অসম রাইফেল এবং লাদাখের সুরক্ষা সিআরপিএফ এর হাতে থাকা আর উচিত নয় এটি সেনাকে দেওয়া উচিত। তাই নেহেরু তাঁর কথা মেনে 1959 সালের 23 শে অক্টোবর সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব ভারতীয় সেনাবাহিনী হাতে তুলে দেন। একে নেহেরুর ‘Forwar policy’ বলে, চীন দাবি করে নেহেরুর এই forward policy এর জন্য উভয় দেশের সমস্যা আরও বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে নেহেরু ফরওয়ার্ড পলিসি শুরু করলেও সীমান্তে হাতিয়ার, রেশন ব্যবস্থা, পরিকাঠামো কিছুই তৈরী করেনি। মহাবীর চক্র প্রাপ্ত মেজর ‘শ্রীকান্ত’ বলেন ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু দিন আগে নির্দেশ আসে এখন ভারত ও চীনের হিন্দি চিনি ভাই ভাই সম্পর্ক তাই যুদ্ধ প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই।’ আসলে ভারত হিন্দি চিনি ভাই ভাই করতে গিয়েই যুদ্ধের প্রস্তুতি না নেওয়ার ফলে 1962 সালে পরাজিত হয়।

চীনের সঙ্গে যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের আরও বেশ কিছু কারন ছিল ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ‘বিকে কৃষ্ণ মেনন’ মনে করতেন ভারতের আসল শত্রু পাকিস্তান তাই সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানের সীমান্তে থাকা প্রয়োজন, অন্যদিকে তৎকালীন সেনাপ্রধান ‘কে এস থিমাইয়া’ মনে করতেন চীন ভারতের আসল শত্রু তাই চীন সীমান্তে সমস্ত সৈনিক মোতায়েন করা উচিত। তাই সীমান্ত বিষয়ে সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা যায়। এই মতবিরোধ আরও বাড়ে যখন বারো জন উচ্চপদস্থ আধিকারিকে সরিয়ে ‘বি এম কল’ কে লেফটেন্যান্ট জেনারেল বানানো হয়। থিমাইয়া, কল কে লেফটেন্যান্ট জেনারেল বানানোর পক্ষপাতী ছিলেন না কারণ তিনি মনে করতেন কলের যুদ্ধের বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই। এদিকে সকলে মনে করেন কলের এই পদোন্নতি হয়েছিল কারণ তিনি নেহেরুর কাছের লোক ছিলেন।

বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ থাকায় সেনাপ্রধান কে এস থিমাইয়া 1959 সালের 31 শে আগস্ট নেহেরুকে পদত্যাগ পত্র পেশ করেন, নেহেরু এই পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করেন নি, তিনি থিমাইয়াকে ফিরে আসার অনুরোধ করেন থিমাইয়া নেহেরুর কথায় রাজি হন। একদিকে চীনের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে অন্যদিকে সীমান্তে ছোটখাটো সংঘর্ষ দেখা যায়। এরূপ ছোটখাটো সংঘর্ষ হতে হতে 1962 সালের 19 শে অক্টোবর রাত থেকে 20 অক্টোবর মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে চীন যুদ্ধ শুরু করে। চীন বহু দিন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তাই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর লাদাখ থেকে নেফা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চীন আক্রমণ করে। চীনের হঠাৎ আক্রমণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরাট ক্ষতি হয়। কোন রকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া, কোন রকম আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও পরিকাঠামো ছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনী শুধু সাহসের ভিত্তিতে এই যুদ্ধ লড়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর দুই দিন পর 22 শে অক্টোবর নেহেরু জাতির উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ দেন এবং যুদ্ধের কথা স্বীকার করেন।

নেফা সেক্টরে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিক্রম কলের হার্ট এট্যাক হয় তাই তাকে চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়। তাঁর বদলে হরবক্স সিংকে পাঠানো হয় কিন্তু সে কিছু করে ওঠার আগেই নেহেরু দ্বিতীয় বার কলকে নেফার দায়িত্বে পাঠান, এই পদক্ষেপ গুলিকে অনেকে নেফাতে হারের কারণ মনে করেন। কোন প্রস্তুতি ছাড়াই এই যুদ্ধে ভারত নেমেছিল তাই অনেকেই মনে করেন যুদ্ধের পরিণতি কি হবে তা কয়েক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। 1962 সালের 20 ই অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর একমাস পর নেহেরু বলেন “অসম সমস্যায় রয়েছে, উত্তর পূর্ব ও চীনের দখলে চলে যেতে পারে, দেশবাসীকে লম্বা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে, শেষ পর্যন্ত আমরাই যুদ্ধে জয়ী হব”। কিন্তু অবাক বিষয় হল ওই দিনই চীন একতরফা ভাবে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে যার ফলে চীন নেহেরুকে আর লড়াই করার সুযোগ দেয়নি। প্রশ্ন হল চীন একতরফা ভাবে এই যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করল কেন?

এর উওরে বলতে হয় সালটি ছিল 1962, এই সালটি পৃথিবীর ইতিহাসে আরও একটি কারণে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়টি অনেকে ভুলে যায়, তবে ভারত চীন যুদ্ধে এই বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 1962 সালের অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাপী এক মহাসংকট দেখা যায় যা ‘কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকট’ নামে পরিচিত। ঘটনাটি হল 1959 সালের 1 লা জানুয়ারি কিউবায় এক অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের মাধ্যমে ‘ফিদেল কাস্ত্রো’ ক্ষমতায় আসেন।  কাস্ত্রো মার্কিন অনুগামী ‘ফ্যালজেনিকো বাতিস্তা’ সরকারকে হাটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। কিউবায় ‘ফিদেল কাস্ত্রোর’ সাম্যবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা হলে এটি সোভিয়েত রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে। দেশের সমস্ত সম্পত্তি জাতীয়করণ করা হয় এর ফলে কিউবায় অবস্থিত মার্কিন পুঁজিপতিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আমেরিকা মনে করত তাঁর এত কাছে এক সমাজতান্ত্রিক দেশের অবস্থান আমেরিকার সুরক্ষার জন্য ক্ষতিকর। কাস্ত্রো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির কাছ থেকে প্রচুর আর্থিক সাহায্য ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাইতি, নিকুরাগুয়া, ভেনেজুয়েলা প্রভৃতি দেশের মার্কিন বিরোধী বিপ্লবীদের উৎসাহিত করতে থাকেন।

কাস্ত্রোর এরূপ কর্মকান্ড আমেরিকার জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমেরিকা যে কোন মূল্যে কাস্ত্রোর সরকারকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তৎকালীন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি বলেন- “We do not intend to abandon Cuba to the Communist অর্থাৎ আমরা কিউবাকে কমিউনিস্টদের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না।” আমেরিকা কাস্ত্রো সরকারের উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে কিউবার কিছু কমিউনিস্ট বিরোধী দেশত্যাগীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে 1961 সালের এপ্রিল মাসে 1400 কাস্ত্রো বিরোধী কিউবানকে নিকুরাগুয়া থেকে Bay of Pigs এ অবতরণ করে। বিদ্রোহীদের সাহায্যের জন্য মার্কিন B-26 বোমারু বিমান প্রস্তুত ছিল। মাত্র দুদিনের মধ্যে এই বিদ্রোহ দমিত হয়। এই ঘটনায় বিশ্বব্যাপী আমেরিকার নিন্দা হয়।আমেরিকা যেকোনো মূল্যে কাস্ত্রো সরকারের পতন চাইছিল, তাই কাস্ত্রো সোভিয়েত রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আমেরিকার পতনের উদ্দেশ্যে সোভিয়েত রাশিয়া গোপনে কিউবায় এক মিসাইল ঘাঁটি গড়ে তোলে। এই মিসাইল কেন্দ্র থেকে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে পারমাণবিক আক্রমণ সম্ভব ছিল। CIA তাঁর গোয়েন্দা বিমানের দ্বারা ছবি তুলে কিউবার মিসাইল ঘাঁটি বিষয়ে নিশ্চিত হয়। এই বিষয়টি আমেরিকা তাঁর নিরাপত্তার জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখে!

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘জন এফ কেনেডি’ 1962 সালের 22 শে অক্টোবর ঘোষণা করেন “কিউবার চতুর্দিকে নৌ অবরোধ করা হবে এবং সমস্ত দেশের জাহাজ, এমনি সোভিয়েত রাশিয়ার জাহাজকে ও অনুসন্ধানের পরই কিউবাতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া দেওয়া হবে। তিনি এ ও বলেন কিউবা থেকে কোন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর জন্য সোভিয়েত রাশিয়াকে দায়ী করবে এবং সোভিয়েত রাশিয়ার উপর আক্রমণ করতে এক মুহূর্ত ও ভাববে না, তাই তিনি রুশ প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভের কাছে এই অস্ত্র অপসারণের দাবি জানান এবং পৃথিবীকে আসন্ন পারমাণবিক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষার অনুরোধ জানান”। কেনেডির এই কথায় রাশিয়ায় ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সমস্ত সেনাবাহিনীর ছুটি বাতিল করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলা হয়েছিল এবং সোভিয়েত রাশিয়া স্পষ্ট জানায় কিউবাগামী কোন জাহাজ বাধা পেলে যেন সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালানো হয়। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব এক পারমাণবিক যুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এবং যে কোন মূহুর্তে পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধ হতে পারত!

শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে এবং সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পৃথিবী বিশ্বযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়। 1962 সালের 27 শে অক্টোবর ক্রুশ্চেভ কেনেডিকে বলে তাঁরা কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি সরিয়ে নেবে তবে আমেরিকাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, তাঁরা কিউবা আক্রমণ করবে না এবং তুরস্ক থেকে মার্কিন ঘাঁটি অপসারণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়া কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি সরিয়ে নেয় এবং আমেরিকা ও 1962 সালের 20 ই নভেম্বর কিউবা থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেয় এবং আমেরিকা ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয় এবং পৃথিবী আসন্ন এক বিশ্বযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়।

নিকিতা ক্রুশ্চেভের ভূমিকার বিশ্বব্যাপী প্রশংসা হলেও মাও সে তুং বলেন আমেরিকার ভয়ে অযথা ভীত হয়ে সোভিয়েত রাশিয়া এই চুক্তি সম্পাদন করেছে, তিনি আমেরিকাকে ‘কাগুজে বাঘ বা Paper Tiger’ বলে অভিহিত করেন। এর উত্তরে ক্রুশ্চেভ বলেন কাগুজে বাঘের ‘আণবিক দন্ত’ (Atomic teeth) রয়েছে। এই বাদানুবাদ সত্ত্বেও বলা যায় ক্রুশ্চেভের গঠনমূলক ভূমিকার জন্য বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়। মাও সে তুং সম্ভবত চাইছিলেন এই বিবাদ আরও বৃদ্ধি পাক তাহলে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত যুদ্ধে তাঁর সুবিধা হত। অবাক বিষয় হল 1962 সালের 20 ই নভেম্বর যেদিন কেনেডি কিউবা থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেয়, কাকতালীয়ভাবে 1962 সালের 20 ই নভেম্বর ঠিক একই দিনে চীন একতরফা ভাবে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করল কেন?

আসল কথা হল ভারত চীন যুদ্ধের সময় ভারত তাঁর বিমানবাহিনী ব্যবহার করেনি কারণ আমেরিকা বা সোভিয়েত রাশিয়া কোন এক তরফে বলা হয়েছিল ভারত যদি বিমান আক্রমণ করে তাহলে চীন কলকাতা ও ব্যাঙ্গালোরে ও বিমান আক্রমণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই তথ্যটি সঠিক ছিল না, আর ভারত বিমান আক্রমণ না করায় যুদ্ধে পিছিয়ে পড়েছিল। নেহেরু মনে করতেন চীন ভারত আক্রমণ করলে বিশ্বযুদ্ধ হতে পারে তার ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক ছিল না কিন্তু কিউবা মিসাইল সংকটের কারণে আমেরিকা বা রাশিয়া কেউই ভারতের সাহায্য করতে পারেনি।

তাই যুদ্ধে প্রথম দিকে ভারত হেরে গেলও ভারতীয় বিমান বাহিনী ও সেনাবাহিনী প্রত্যুত্তর দেওয়ার জন্য তীব্র ভাবে তৈরি হচ্ছিল। একদিকে চীনের কাছে সুবর্ণ সুযোগ ছিল অসম সহ উত্তরপূর্ব দখল করার কিন্তু চীনের সামনে এটাও বিপদ ছিল কিউবা সংকটের সমাধানের পর আমেরিকা, রাশিয়া প্রভৃতি বিশ্বশক্তি ভারতের পক্ষে নামতে পারে। বাস্তবিক ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল আমেরিকা ভারতের সাহায্যের জন্য তাঁর রণতরী বঙ্গোপসাগরে প্রেরণ করে ও আধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহ করে, ইজরায়েল যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে ভারতকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে। অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বড় যুদ্ধের জন্য তৈরী হচ্ছিল, তাই চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং এত বড় ঝুঁকি নিতে চাননি এবং একতরফা ভাবে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করেন এরফলে নেহেরু ও আমেরিকা কেউই চীনকে প্রত্যাঘাতের সুযোগ পায়নি!

বিশ্বের ইতিহাসে দেখা যায় বহু যুদ্ধে প্রথম দিকে যে পক্ষটি চরমভাবে আক্রান্ত শেষ পর্যন্ত তাদের জয় হয়েছে। যেমন- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির আক্রমণে প্রথম দিকে রাশিয়া সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলেও পরবর্তীতে রাশিয়ার প্রত্যাঘাতে জার্মানি ধ্বংস হয়ে যায় এবং বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় হয়! সম্ভবত চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাই ও চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন তাই যুদ্ধ না চালিয়ে একতরফা ভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। যেখান পর্যন্ত চীনা সৈনিক এগিয়ে এসেছিল সেটাই LAC নামে পরিচিত। চীন ঘোষণা করে উভয় দেশের সৈনিকরা এলএসি (LAC) থেকে 20 কিমি দুরত্বে চলে যাবে।

প্রকৃতপক্ষে ভারত চীন যুদ্ধে ভারত অনেক কিছু হারায় এই যুদ্ধে ভারতের প্রায় 42,735 বর্গ কিমি এলাকা চীনের দখলে চলে যায়। চীন অরুণাচল প্রদেশের কিছু অংশ ফেরত দিলেও লাদাখ অংশ ফিরিয়ে দেয়নি। এই যুদ্ধে চীনের 80,000 সৈন্যের বিরুদ্ধে 10-12 হাজার ভারতীয় সৈনিক যুদ্ধ করে। সরকারি তথ্য মতে এই যুদ্ধে 1383 জন সৈনিক শহীদ হয়, 1047 জন গুরুতর ভাবে আহত হন, 3968 জন সৈনিক চীনের বন্দি হন এবং 1696 জন সৈনিকের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। বলাইবাহুল্য বাস্তবে আরও অনেক বেশি ভারতীয় সৈনিক মারা গিয়েছিল। ভারতীয় সৈনিকরা কি অবস্থায় যুদ্ধ করেছিল তাঁর নিদর্শন পায় ব্রিগেডিয়ার ‘জে পি দালভির’ লেখা ‘Himalayan Blunder’ বইটিতে। এই বইটিতে উল্লেখ করা হয় হিমালয়ের উচ্চতায় কোন রকম গরম পোশাক ছাড়া শুধুমাত্র সাধারণ পোষাক, সাধারণ মোজা ও সাধারণ জুতোতে কোন রকম প্রস্তুতি ছাড়া, কোন রকম আধুনিক অস্ত্র ছাড়া, কোন রকম সাপ্লাই লাইন ছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনী শুধু সাহসের ভিত্তিতে এই যুদ্ধটি লড়েছিল! ভারতের বীর সৈনিকেরা দেশমাতৃকা রক্ষার্থে হাসতে হাসতে দেশের জন্য প্রাণ দেন। তাই 1962 সালের ভারত চীন যুদ্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে লতা মঙ্গেশকরের বিখ্যাত গান “এ মেরে বাতন কে লোগো, জারা আখ মে ভারলো পানি” যা আজও ভারতবাসীকে তীব্রভাবে আলোড়িত করে এবং এই গান ছাড়া যেন স্বাধীনতা দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিন অপূর্ণ থেকে যায়! লাতাজির এই গান শুনে শুনে নেহেরু বলেছিলেন “রুলা দিয়া বেটি”!

ভারত চীন যুদ্ধ চলাকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ‘বিকে কৃষ্ণ মেনন’ পদত্যাগ করেন, সেনাপ্রধান থাপার ছুটিতে চলে যান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল বি এম কল ইস্তফা দেন। পদত্যাগ করলেও এই যুদ্ধ ভারতবাসীর মনে যে আঘাত দিয়েছিল তা আজও ভারতবাসী মনে রাখে এবং নেহেরু মার খেয়ে বুঝতে পারেন চীনের বিরুদ্ধে ভারতের শান্তিনীতি চলবে না বরং চীনের বিরুদ্ধে সর্বদা সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রকৃতপক্ষে ভারত চীনের এই যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর উপর। যে নেহেরু বিশ্বনেতা হিসাবে পরিচিত ছিলেন, যে নেহেরু ভারতকে এক উন্নত গণতন্ত্রে পরিণত করেছিলেন সেই নেহরু চীনের বিরুদ্ধে এরূপ পরাজয় মন থেকে কখনো মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি আত্মসমালোচনায় দগ্ধ হতেন এবং নেহেরুর মতো এক বিরাট ব্যাক্তিত্ব ভিতর থেকে ভেঙে পড়েছিলেন। এই ঘটনার মাত্র দেড় বছরের মাথায় 1964 সালের 27 শে মে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু 74 বছর বয়সে পরলোক গমন করেন।

ভারত চীন যুদ্ধ আমাদের বহু শিক্ষা দিয়ে যায় প্রথমত সব সময় যে কোন পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকবে হবে, চীনকে বিশ্বাস করা যাবে না, চীনের কথা ও কর্মের মধ্যে কোন মিল নেই, চীনের বিস্তারবাদী নীতি রুখতে গেলে সর্বদা শক্তিশালী অবস্থানে থাকা প্রয়োজন। ভারত সরকার ও 62 এর যুদ্ধের পর সতর্ক হয়ে ওঠে 1965 সালে নাথুলার যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনা বাহিনীকে সঠিক জবাব দেয়। এই যুদ্ধে ভারতের প্রায় 80 জন সৈনিকের মৃত্যু হয় এবং চীনের 400 জন সৈনিকের মৃত্যু হয়। এরপর 1975 সালের 20 ই অক্টোবর ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয় যখন অসম রাইফেলের চার সৈনিককে চীনারা গুলি করে মারে। এরপর এতদিন চীনের সঙ্গে সীমান্তে আর কোনও বড় যুদ্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে 45 বছর পর 15-16 ই জুন রাত্রিবেলা, 2020 গালওয়ান উপত্যকায় হঠাৎ করে চীনা সৈনিক ভারতীয় সৈনিকদের উপর আক্রমণ করায় 20 জন ভারতীয় সৈনিক মারা যায় ও 43 জন চীনা সৈনিক মারা যায়, বেসরকারি সূত্র মতে উভয় দেশের আরও বহু সেনা আহত হয় এই সীমান্ত সংঘর্ষের ফলে উভয় দেশের মধ্যে নতুন করে সীমান্তে বিবাদের সূচনা হয়!

যাইহোক, অনেকেই ভারত চীন যুদ্ধে হারের জন্য প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে সমালোচনা করেন। গান্ধীবাদী নেহেরুর চীন নীতি সমালোচনার যোগ্য তবে এটা মনে রাখতে হবে তিনি আদর্শবাদী মানুষ ছিলেন এবং চীনের কথায় বিশ্বাস করেছিলেন, হিন্দি চিনি ভাই ভাই এর শ্লোগানে আস্থা রেখে নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন। আসলে নেহেরু পরাজিত হয়েছিলেন মিথ্যা ও ছলনার কাছে, বিশেষজ্ঞদের মতে 1962 সালে ভারত চীন যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে কোন যুদ্ধই ছিল না! একদিকে সুসজ্জিত চীনা বাহিনীর বিরুদ্ধে অপ্রস্তুত ভারতীয় সেনাবাহিনী পরাজিত হয়। দুঃখের বিষয় হল যে নেহেরু জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনকে মজবুত করার কথা ভেবে চীনকে বহুক্ষেত্রে সমর্থন করছিলেন সেই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের কোন নেতা ভারতের বিপদের দিনে ভারতের পাশে দাড়ায়নি, ভারতের পাশে দাড়িয়েছিল আমেরিকা ও ইসরায়েলের মতো রাষ্ট্র!

চীন শুধু ভারতের সঙ্গেই নয় সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, মিথ্যা ও ছলনার মাধ্যমে আকসাই চীন, তিব্বত, পূর্ব তুর্কিস্থান, মাঞ্চুরিয়া, দক্ষিণ মোঙ্গোলিয়া, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, ম্যাকাও, হংকং, তাইওয়ান প্রভৃতি দেশের বহু অংশ দখল করেছে ও বহু দেশ দখলের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে চীন, দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চল দখল করতে চাই। তাই বর্তমানে চীন বিশ্ব শান্তির পক্ষে এক হুমকি স্বরূপ। প্রকৃতপক্ষে চীন স্বাধীনতার সময় এত বড় দেশ ছিল না কিন্তু বিভিন্ন দেশ দখল করার পর চীন আজ এত বড় দেশে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সময়ে চীনের বিস্তারবাদী নীতির অন্যতম মূল উপাদান হল চীনের ‘Belt and Road project’. তাই বিশ্বকে চীনের এই বিস্তারবাদী নীতি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন এবং ভারত চীনের এই সমস্যা গুলিকে কিভাবে সামাল দিচ্ছে সেটাই দেখার!

চলবে…

তথ্যসূত্র-

1. উইকিপিডিয়া।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/History_of_China

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sino-Indian_War

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Cuban_Missile_Crisis

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Silk_Road

2. The Taiwan Times.
https://thetaiwantimes.com/chinese-land-grab-hunger-knows-no-limits-pt1/3369

3. The Hindu.
https://www.thehindu.com/opinion/lead/history-the-stand-off-and-policy-worth-rereading/article31854822.ece

https://www.thehindu.com/opinion/op-ed/comment-piece-on-the-maonehru-conversation/article7202352.ece

4. Indian Express.
https://indianexpress.com/article/opinion/columns/narendra-modi-jawaharlal-nehru-china-meghnad-desai-6501300/

5. Dawn.
https://www.google.co.in/amp/s/www.dawn.com/news/amp/1563923?espv=1

6. Silk road.
http://www.silk-road.com/artl/hsuantsang.shtml

7. The print.

2 persistent myths about 1962 China war are intelligence failure & Nehru’s meddling

8. Indian defence view.

The Panchsheel Agreement

9. ABP News.

10. India Today.

11. BBC Hindi.

12. Unacademy.
Indo-China relations- Dr. Sidharth Arora.

13. আধুনিক ভারত ও বিশ্ব- জীবন মুখোপাধ্যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 1