হাইয়া সোফিয়ার পরিণতি ও আমার ভাবনা

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের প্রসিদ্ধ হাইয়া সোফিয়া জাদুঘরকে মসজিদ বলে ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তুরস্কের একটি আদালত হাইয়া সোফিয়ার জাদুঘরের মর্যাদা রদ করে রায় দেওয়ার পর এরদোয়ান এটিকে মসজিদে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। তুরস্কের ইসলামপন্থীরা এই জাদুঘরকে মসজিদে রূপান্তরে অনেক দিন ধরে আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ধর্মনিরপেক্ষরা এর বিরোধিতা করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে এরদোয়ান বলেন, ২৪ জুলাই মসজিদের ভেতর মুসল্লিরা নামাজ আদায় করবেন [1]।

হাইয়া সোফিয়ার ইতিহাসটা সংক্ষেপে বলে নিই। বসপরাস প্রণালীর পশ্চিম পাড়ে ইস্তাম্বুলের ফাতিহ এলাকায় গম্বুজশোভিত এই বিশাল ঐতিহাসিক ভবনটি খুব সহজেই দর্শকদের নজর কাড়ে। সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের আদেশে এই হাইয়া সোফিয়া নির্মাণ শুরু হয়েছিল ৫৩২ খ্রীষ্টাব্দে। ইস্তাম্বুল শহরের নাম তখন ছিল কনস্টান্টিনোপল, যা ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী – যাকে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যও বলা হয়। এই সুবিশাল ক্যাথিড্রাল তৈরির সময় তখনকার প্রকৌশলীরা ভূমধ্যসাগরের ওপার থেকে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে এসেছিলেন। হাইয়া সোফিয়া নির্মাণ শেষ হয় ৫৩৭ সালে। এখানে ছিল অর্থডক্স চার্চের প্রধানের অবস্থান। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজকীয় অনুষ্ঠান, রাজার অভিষেক ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতো এখানেই। প্রায় ৯০০ বছর ধরে হাইয়া সোফিয়া ছিল পূর্বাঞ্চলীয় অর্থডক্স খ্রিষ্টান ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু। অবশ্য মাঝখানে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে একটি সংক্ষিপ্ত কালপর্ব ছাড়া, যখন চতুর্থ ক্রুসেডের সময় ইউরোপের ক্যাথলিকরা এক অভিযান চালিয়ে কনস্টান্টিনোপল দখল করে নেয়। তারা হাইয়া সোফিয়াকে একটি ক্যাথলিক ক্যাথিড্রালে পরিণত করেছিল। কিন্তু ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের অটোমান সাম্রাজ্যের দখলে চলে যায় কনস্টান্টিনোপল। এর নতুন নাম হয় ইস্তাম্বুল। চিরকালের মত অবসান হয় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের। হাইয়া সোফিয়ায় ঢুকে বিজয়ী সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ নির্দেশ দেন এটাকে সংস্কার করে একটি মসজিদে পরিণত করতে। তিনি এই ভবনে প্রথম শুক্রবারের নামাজ পড়েন। তার কয়েকদিন আগে অভিযানকারী বাহিনী এখানে ধ্বংসলীলা চালায়। অটোমান স্থপতিরা হাইয়া সোফিয়ার ভেতরের অর্থডক্স খ্রীষ্টান ধর্ম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতীক-চিহ্নগুলো সরিয়ে ফেলেন বা পলেস্তারা দিয়ে ঢেকে দেন। ভবনের বাইরের অংশে যোগ করা হয় উঁচু মিনার। ইস্তাম্বুলে ১৬১৬ সালে ব্লু মস্ক বা নীল মসজিদ নির্মাণ শেষ হওয়া পর্যন্ত হাইয়া সোফিয়াই ছিল শহরের প্রধান মসজিদ। নীল মসজিদ সহ এ শহরের এবং বিশ্বের অন্য বহু মসজিদের নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করে এর স্থাপত্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৮ সালে শেষ হলে অটোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হয়। বিজয়ী মিত্রশক্তিগুলো তাদের ভূখন্ডকে নানা ভাগে ভাগ করে ফেলে। তবে ওই সাম্রাজ্যের অবশেষ থেকেই জাতীয়তাবাদী তুর্কী শক্তির উত্থান হয়। তারা প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক তুরস্ক। তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক আদেশ দেন, হাইয়া সোফিয়াকে একটি জাদুঘরে পরিণত করতে। হাইয়া সোফিয়াকে ১৯৩৫ সালে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার পর এটি তুরস্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটনস্থলে পরিণত হয়েছে [2]।

এবার মূল কথায় আসি। মুসলমানরা তুরস্ক সরকারের এই সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্তকে জাস্টিফাই করার জন্য ইতিহাস নিয়ে নানা রকম মিথ্যাচার করছে। মিথ্যা ছাড়া ইসলামের কোন অস্তিত্ব নেই। ইসলাম টিকে আছে মিথ্যার উপর। মুসলিমদের মধ্যে নিজস্ব একটা ইতিহাস মুখে মুখে প্রচলিত হয় যার কোন ভিত্তি থাকে না। সেই ইতিহাসে ইহুদী খ্রিস্টানদের নৃশংস আর প্রতারক দেখানো (ইহুদী বুড়ি আর নবী মুহাম্মদের গল্পটা স্মরণ করুন) আর মুসলমানদের উদার মহান সাজানোই উদ্দেশ্য থাকে। অথচ এমন একটাও মুসলিম শাসনের কথা জানা যায় না যেখানে মুসলিমরা হানাদার হয়ে অনুপ্রবেশ করে স্থানীয় মন্দির গির্জা প্যাগোডাকে মসজিদে রূপান্তরিত করেনি। ভারত থেকে ইউরোপ সর্বত্র একই কাজের সাক্ষ্য পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়নি। হাইয়া সোফিয়া তারই একটা জ্যান্ত প্রমাণ। এরদোয়ান তো কোন লুকোছাপার আশ্রয়ই নেয়নি। সরাসরি মসজিদ বানিয়ে ফেলেছে। মুসলিমদের অস্বীকার করার উপায় নেই ওটা আগে গির্জা ছিলো। এ জন্য নতুন গল্পের আমদানি হয়েছে। কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর ওসমানিয়া সুলতান নাকি এটি খ্রিস্টানদের কাছ থেকে কিনে নেন! যে সুলতান তিনদিন পর্যন্ত কনস্টান্টিনোপল লুটপাট করতে নির্দেশ দেন, পুরো নগরির নিরীহ সাধারণ জনগণের উপর হত্যার তান্ডব চালান, হাইয়া সোফিয়া গির্জাতে আশ্রয় নেয়া নারী শিশু ও সন্ন্যাসীদের হত্যা করেন তিনি কিনে নিবেন গির্জাটি? কার কাছ থেকে? যে যুগে দখলকৃত দেশ সুলতানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে যায় সে যুগে তিনি খ্রিস্টানদের কাছে গির্জা কিনে নিবেন! এ ধরণের হাস্যকর গল্প শুধু মুসলিমদের মধ্যেই প্রচলিত। তারাই অবচেতনে এগুলো বিশ্বাস করে, প্রচার করে। এমনকি মিথ্যা জেনেও এগুলো তারা প্রচার করে। ইসলামের বদনাম হচ্ছে জেনে এরকম মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ইসলামকে দোষমুক্ত করা ইসলামের হুকুমতের মধ্যেই আছে। তাই প্রতিটি বিশ্বাসী মুসলিম তার ধর্মের নামে মিথ্যা বলতে দুবার ভাবে না। বিকৃত অর্ধসত্য কিংবা পুরো অসত্য ইতিহাস রটিয়ে মুসলিম শাসনকে মহান করার চেষ্টা, জিজিয়া, গণিমতের মাল, যৌনদাসী, দাস বা মুশরিক হত্যাকে নানা রকম গল্প তৈরি করে মহান করে তোলার চেষ্টা করে। যেন ইসলামের এই বিধানগুলো আসলে অমুসলিমদের জন্য খুবই উপকারী! যুদ্ধে স্বামী মারা যাওয়া কাফের নারীদের যৌন চাহিদা মেটানোর জন্যই মুসলিম যোদ্ধারা তাদের ভাগে পায়- এরকম পার্ভাট ইতিহাস মানুষকে গেলাতে যারা চায় তাদের মানবিকতার ধারনায় বড় রকমের গলদ রয়ে গেছে। জিজিয়া করের মতো অপমানজনক একটি বিধানকে যাকাত দানের সমতুল্য হিসেবে দেখানোটা বড় ধরণের চাতুরিতার আশ্রয়!… হাইয়া সোফিয়ার উপর ঘটা ধর্মীয় উপনিবেশনের গ্লাণিকে ঢাকতে সেই একই রকম মিথ্যাচার চলছে। বাংলায় লেখা ইউকিতে এই রকম মিথ্যাচার লিখে রাখা হয়েছে [3]। নানা রকম ইসলামিক ও জাতীয়তাবাদী সাইটে (যেগুলোর অনেকগুলো বামপন্থিরা চালায়) সবখানে মুসলিমদের কিনে নেয়া গির্জার কথা বলা আছে। উদ্দেশ্য কি সেটা তো বলাই বাহুল্য…।

হাইয়া সোফিয়া কিনে নেয়নি মুসলমানরা। এটি ইসলামের অন্যসব মিথ্যাচারের মতই একটি মিথ্যাচার। স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান নিয়েও মুসলমানদের কুৎসিত একটি মিথ্যাচার আছে। ১৪৯২ সালে স্পেনের মুসলিম খিলাফতের শেষ খলিফা দ্বাদশ মোহাম্মদের হাত থেকে শান্তিপূর্ণভাবে রানী ইসাবেলা ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ইচ্ছা করলে ইসাবেলা দ্বাদশ মোহাম্মদকে বন্দি করতে পারতেন বা শহর জুড়ে লুটপাট চালাতে পারতেন। কিছুই হয়নি। অথচ ইউরোপীয়ানদের এই উদারতার মুখে মুসলিমরা কালিমা লেপন করে দিলো। বহু বছর ধরে মুসলিম সমাজে প্রচলিত আছে, স্পেনে মুসলিমদের মসজিদে ডেকে নিয়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিলো! দিনটি ছিলো পহেলা এপ্রিল। সেই থেকে খ্রিস্টানরা এপ্রিলের ১ তারিখ ‘এপ্রিল ফুল’ পালন করে মজা করে। কারণ সরল নাদান মুসলমানদের নাকি সেইদিন বোকা বানিয়ে খ্রিস্টানরা পুড়িয়ে হত্যা করেছিলো! [4]

আসলে অমুসলিমদের দেশ দখল করে অমুসলিমদের উপাসনালয়কে মসজিদে রূপান্তরিত করে ফেলা মুসলমানদের ইসলামী ঐতিহ্যের অংশ। কাবাঘর ছিলো আরবের পৌত্তলিকদের প্রধান মন্দির। গোটা আরব অঞ্চলে ছোট ছোট আরো অনেক কাবাঘরের কথা ঐতিহাসিকরা সন্ধান পেয়েছেন। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কালি মন্দির কিংবা বিষ্ণু মন্দির ভারতবর্ষ জুড়েই দেখতে পাওয়া যায়। তেমনই হুবাল দেবতার প্রধান মন্দির হিসেবে কাবাঘর পৌত্তলিকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলো এবং মক্কার কাবাটি ছিলো প্রধান কারণ এখানেই হজ অনুষ্ঠিত হত। এবার প্রশ্ন আসতে পারে এটি যে মন্দির তার কি কোন প্রমাণ আছে?

ইসলামিক ইতিহাস বলছে কাবাঘর ভাঙ্গতে এসেছিলেন রাজা আবরাহার। এই কাবাঘর রক্ষা করেন আল্লাহ ছোট ছোট পাখির আক্রমন দিয়ে। কে সেই আল্লাহ এটা এখন আমাদের জানা দরকার। কারণ তখন কাবাঘরে ৩৬০টি মূর্তি রেখে তাদের পুজা করা হত। আবরাহার যখন মক্কাতে আসছেন তখন আবদুল মোতালিব ছুটে গেছেন তার কাছে। তার দুশো উট রাজার লোকজন ধরে নিয়ে গেছে সেটা জানাতেই রাজা উত্তরে বলছেন, ‘তোমার বাপ-দাদার ধর্মের কেন্দ্র যে কাবাঘর আমি সেটাকে ভাঙ্গতে এসেছি আর তুমি বলছ দুশো উটের কথা বলছ!… আবদুল মোতালিব বললেন, ‘আমি শুধু দুশো উটের মালিক, কাবাঘরের যে মালিক তিনিই তার ঘর রক্ষা করবেন [5]।

এই যে “কাবাঘরের যিনি মালিক তিনিই কাবা রক্ষা করবেন” বলে আবদুল মোতালিব এতখানি নির্ভার ছিলেন তার পরিচয় জানা দরকার। একই সঙ্গে আবদুল মোতালিবের সঙ্গে তার সম্পর্কও জানা দরকার। ইসলামপন্থিরা দাবী করেন আবদুল মোতালিবের ধর্ম ছিলো ইব্রাহিমের একেশ্বরবাদ। এটা বলে তারা কাবাঘরের সঙ্গে ইহুদী নবী আব্রাহামের সঙ্গে কাবার সম্পর্ক তৈরি করতে চান এবং কাবা যে পৌত্তলিক মন্দির ছিলো না তা প্রমাণ করতে চান। কিন্তু ইসলামিক সোর্সগুলোই বলছেন আবদুল মোতালিব ছিলো ঘোর পৌত্তলিক!

আবদুল মোতালিব তৎকালিন পৌত্তলিক ধর্মীয় বিশ্বাস মতে যে কোন সিদ্ধান্ত জানার জন্য কাবায় হুবাল দেবতার কাছে রক্ষিত সাতটি তীর ছুড়ে জেনে নিতেন। নিজ পুত্র আবদুল্লাহকে তিনি কাবার পাশে কোরবানী দিতে চাইলে প্রতিবেশীরা বাধা দেন। আবদুল মোতালিবের যমযম কূপ খননের সময় আল্লাহ’র কাছে শপথ করেছিলেন যে তার যদি দশটি ছেলে জন্ম নেয় তাহলে একটিকে তিনি আল্লাহ’র নামে জবাই করে উৎসর্গ করবেন। তার দশম সন্তান জন্মালে তিনি তার শপথ রক্ষা করতে তীর ছুড়ে সন্তান নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। আবদুল্লাহ নাম লেখা তীর উঠে আসলে আবদুল্লাকেই বলি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু প্রতিবেশীদের বাধার মুখে এর বিকল্প কি হতে পারে জানতে হুবাল দেবতার কাছে রক্ষিত তীর ছুড়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা হয় [6]। আবদুল মোতালিবের ধর্ম কি ছিল এই ঘটনাটাও তার একটা প্রমাণ।

মূর্তির সামনে রক্ষিত তীর ছুড়ে পুত্র আবদুল্লাহর (প্রফেট মুহাম্মদের পিতা) প্রাণ বাঁচানো আবদুল মোতালিব তাহলে এই মূর্তিগুলোকে বিশ্বাস করতেন। সে সময় কাবাঘরের প্রধান ছিলেন তিনি। তার হাতেই কাবাঘরের চাবি থাকত। কাবাঘরে আল্লার কন্যা লাত, উজ্জা, মানাত তখন প্রতিষ্ঠিত। আবদুল মোতালিব এই নারী মূর্তিগুলোসহ ৩৬০টি মূর্তি কাবার ভিতরে রেখে কোমরে চাবি নিয়ে ঘুরতেন অথচ তিনি নাকি ইব্রাহিমের অনুসারী ছিলেন! রাজা আবরাহার মক্কায় প্রবেশের সময় আবদুল মোতালেব কাবার চৌকাঠ আকড়ে ধরে বললেন, হে আল্লাহ! একজন দাসও তার দলবলকে রক্ষা করে। অতএব তুমি তোমার ঘর ও লোকজনকে রক্ষা করো [7]।

ইসলামের আল্লাহ তাহলে ৩৬০ মূর্তি রক্ষা করলেন আবাবিল পাখি পাঠিয়ে? এটা কি ইসলামের সঙ্গে একদমই যায়? হযরত মুহাম্মদের চাচা আবু তালিব মুশরিক ছিলেন বলে তিনি জাহান্নানের আগুনে পুড়বেন। হযরত মুহাম্মদ তার মৃত্যু শয্যায় গিয়ে বার বার বলছিলেন কলেমা পাঠ করতে তাহলে তিনি বেহেস্তে যেতে পারবেন নতুবা নবীর প্রিয় চাচা হবার পরও তাকে অনন্তকাল দোযগের আগুনে পুড়তে হবে …[8]। আবদুল মোতালিবের পুত্রকে আগুনে পুড়তে হবে অথচ আবদুল মোতালিব আল্লার কাছে সাহায্য চান কাবা রক্ষা করতে। সেই আল্লাহ কে? আবু তালিব তার বাপ দাদার ধর্ম ত্যাগ করতে রাজি হন নাই একথা হাদিসেই রয়েছে। তাই তিনি জাহান্নামী। আবু তালিবের পিতা তো আবদুল মোতালিব! অর্থ্যাৎ আবদুল মোতালিবও জাহান্নামের যাবে মুশরিক হওয়ার কারণে! এর সপক্ষে আরো প্রমাণ রয়েছে। নবী তার মা ও বাবার কবর জিয়ারত করে তাদের জন্য দোয়া করেননি! কারণ কাফেরদের জন্য মুসলমানদের দোয়া করা নিষেধ। আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, আমি নবীকে বলতে শুনেছি, আমি আমার মায়ের জন্য ক্ষমা ভিক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম কিন্তু তিনি তা মঞ্জুর করেন নি। আমি তার কবর জিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছিলাম এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন [9]।

নবীর পিতা আব্দুল্লাহ, তার চাচা আবু তালিব মুশরিক হলে তার বাপ আবদুল মোতালিব মুমিন বান্দা হন কিভাবে? যে আল্লাহর ঘরের চৌকাঠ ধরে আবদুল মোতালিব সাহায্য চেয়েছিলেন সেই আল্লাহকে তো আবু তালিব মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন। এতটাই করেন যে স্নেহের ভাতিজা মুহাম্মদের নতুন ধর্মকে তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। আবু তালিব মুশরিক ছিলেন। তিনি তাই দোযগে যাবেন। একই ভাবে নবীর বাবা মা হওয়ার পরও আমিনা আর আবদুল্লাহও দোযগের আগুনে পুড়বেন! মুশরিক হওয়ার কারণে মুহাম্মদ তার পিতা-মাতার কবর জিয়ারত করে দোয়া করতে পারতেন না! কারণ তিনিই ঘোষণা করেছিলেন মুশরিকদের জন্য দোয়া করা যাবে না। আবদুল মোতালিবও তাই অনন্ত আগুনে পুড়তে থাকবে দোযগে।…

মক্কার পতনের পর কুরাইশরা আত্মসমর্পনে বাধ্য হয়েছিলো। সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পান আবু সুফিয়ান। শর্ত ছিলো তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে এবং নবীকে বিশ্বাস করতে হবে। কুরাইশ পৌত্তলিকরা মুহাম্মদের বাহিনীর কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে কাবার রক্ষাবেক্ষণার জন্য ঐতিহ্য মেনে তা যেন শুধু কুরাইশদের হাতে দেয়া হয় সেই আর্জি জানানো হয়। সেই থেকে কুরাইশরাই বংশ পরম্পরায় কাবাঘরের চাবি বহন করে আসছে। তারাই হজ পরিচালনা করে থাকে। আরবের বুক জুড়ে পৌত্তলিকদের শত শত মন্দির মুসলিম বাহিনী ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলে। শুধু মক্কার কাবাটি মুসলমানদের প্রধান মসজিদ হিসেবে রয়ে যায়। এটিই সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম কোন ধর্মালয় যেটিকে দখল নিয়ে রূপান্তরিত করে ফেলা হয়। ৩৬০ মূর্তিকে ভেঙ্গে ফেলা হয়। এই ঘটনাকে জাস্টিফাই করার জন্য হযরত মুহম্মদ দাবি করেন এটি নাকি নবী ইব্রাহিম বানিয়েছিলেন এবং এখানে নামাজ পড়েছিলেন!

আরও ঘটনা আছে। ইসলামী খিলাফতের আওতায় জেরুজালেমের পতন হলে হযরত ওমর এখানে সফর করেন। তারপর কথিত নবী মুহাম্মদের নামাজ পড়ার স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন যার নাম মসজিদুল আকসা বা দূরের মসজিদ [10]। ওমরকে নামাজের সময় হলে গির্জাতে গিয়ে নামাজের কথা বলা হলে ওমর রাজি হননি। তিনি বলেন, আজ তিনি গির্জার ভেতরে নামাজ পড়লে মুসলমানরা পরবর্তীতে এই গির্জা ভেঙ্গে মসজিদ বানাবে। তিনি বাইরে নামাজ পড়েন। পরবর্তীতে ওমর যেখানে নামাজ পড়েছিলেন সেখানে আরেকটি মসজিদ বানানো হয় যার নাম মসজিদুল উমার [11]। ফাতিমীয় খলিফা আল হাকিম, ওমর যে গির্জাতে নামাজ পড়েননি সেটি ধ্বংস করে দেন ১০০৯ সালে। মানে অন্যের ধর্মালয় ভাঙ্গাভাঙ্গি ইসলামের মধ্যে ছিলোই। তা না হলে ওমর কেন বলে মুসলমানরা গির্জা ভেঙ্গে ফেলবে! যদি এগুলো ভাঙ্গা ইসলামে অন্যায় বলে বিবেচিত হত তাহলে ওমর কেন মুসলমানদের উপর অহেতুক কলংক দিতে যাবেন?

বাইতুল মোকাদ্দেসে অবস্থিত আল আকসা মসজিদের খতিব শায়খ ইকরামা সাবরি তুরস্কে হাইয়া সোফিয়া গির্জাকে মসজিদ বানানোয় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন! [12] এই আল আকসা মসজিদটি অবস্থিত ইহুদীদের অতি পবিত্রতম বলে বিশ্বাস করা বাইতুল মোকাদ্দেসের ভেতরে। আল আকসা আর বাইতুল মোকাদ্দেসকে সহজ করে বুঝাতে বললে যদি বলি বিশাল এক মন্দির এলাকার মধ্যেই একটা মসজিদ! মনে করুন পোপ মক্কার কাবা শরীফ সফর করে গেলেন, তারপর তার ভক্তরা কাবার সামনেই পোপ যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেই স্মৃতিচিহ্নে একটা গির্জা বানালো- বিষয়টি কেমন হবে? মুসলমানরা মেনে নিবে? ইহুদীরা কিন্তু মেনে নিয়েছে। এবার আসল কথায় ফিরে আসি। ইহুদীরা তাদের পবিত্রতম স্থানে কেন মুসলমানদের মসজিদকে সহ্য করবে? মুসলমানরা বিশ্বাস করে মক্কা থেকে মুহাম্মদ এখানে আকাশ পথে উড়ে এসে নামাজ পড়েছিলেন। সেই বিশ্বাসকে কেন ইহুদীরা মানতে যাবে? যদি আল আকসার বর্তমান খতিব একটি গির্জাকে ফের মসজিদে ফিরিয়ে আনায় অভিনন্দন জানায় তখন এই প্রশ্নগুলো চলে আসবেই। এখানে ইহুদীদের Holy of Holies, আর্ক অফ দ্য কোভেন্যান্ট অবস্থিত। ইহুদীরা বিশ্বাস করে এখানেই হযরত মুসা (আ) এর উপর নাজিল করা তাওরাতের দশ আদেশের ফলকগুলো ডোম অফ দ্য রকের ঠিক নিচেই ঘটেছিলো। এই টেম্পল মাউন্টে তাই বেশির ভাগ ইহুদী ভয়ে সফর করতে চান না যদি তাওরাতের সেই দশ আদেশের স্থান পা মাড়িয়ে চলে যান! সেরকম গভীর বিশ্বাসের পবিত্র স্থানে কেন মুসলমানদের মসজিদ তারা রাখতে দিবে? যেখানে কাবা শরীফে মুসলমানরা অমুসলিম প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে!

চিন্তা করুন, তুরস্কে যা ঘটে গেছে তাকে সমর্থন ও অভিনন্দন জানাচ্ছে জেরুজালেমের আল আকসার খতিব। এটা তো পরিস্কার উশকানি! এরা যদি জেরুজালেমকে পুরো দখল করে নেয় তারা কি ইহুদীদের ডোম অফ দ্য রক আস্ত রাখবে? কোনও ইহুদীকে বাইতুল মোকাদ্দেসে প্রার্থন করতে দিবে? কিন্তু ইহুদীরা মুসলমানদের মসজিদে প্রবেশ করতে দেয়। ১১টি গেইট আছে এই বাইতুল মোক্কাদেসে প্রবেশ করার। এর মধ্যে ১০টি গেইট মুসলমানদের জন্য মাত্র একটি ইহুদীদের ব্যবহারের জন্য। মাঝে মাঝে ইজরাইয়েল সরকার মুসলমানদের জিহাদের কার্যক্রমে নিরাপত্তা বিঘ্ন হওয়ার আশংকায় গেইটগুলো বন্ধ করে দেয়। তাতেই সারা পৃথিবীর মানবতাবাদীদের চিৎকারে কান ঝালাপালা হয়ে যাবার যোগার। এখন কিন্তু হাইয়া সোফিয়াকে মসজিদ বানানোতে সেরকম কিছু ঘটছে না! এমনকি অবলীলায় নির্লজ্জ্বভাবে আল আকসার খতিব অভিনন্দন জানাচ্ছে একটি সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসকে!

রেফারেন্সঃ
[1] https://www.prothomalo.com/international/article/1668331
[2] https://www.bbc.com/bengali/news-53267334
[3] https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE_%E0%A6%B8%E0%A7%8B%E0%A6%AB%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE
[4] https://roar.media/bangla/main/history/april-fools-day-origin
[5] ইবনে হিশাম, কা’বা ধ্বংস করতে আবরাহার অভিযান, পৃষ্ঠা- ৭৫
[6] ইবনে হিশাম, আবদুল মোত্তালিব কর্তৃক নিজ সন্তানকে কুরবানী করার মানতের বিবরণ, পৃষ্ঠা- ১৪৯
[7] ইবনে হিশাম, কা’বা ধ্বংস করতে আবরাহার অভিযান, পৃষ্ঠা- ৭৫
[8] সহি বুখারী, বই – ২৩, হাদিস নং-৪৪২
[9] সহি মুসলিম, বই-৪, হাদিস-২১২৯
[10] https://en.wikipedia.org/wiki/Al-Aqsa_Mosque#Construction_by_the_Umayyads
[11] https://en.wikipedia.org/wiki/Mosque_of_Omar_(Jerusalem)#The_first_(eastern)_Mosque_of_Omar
[12] https://www.kalerkantho.com/online/muslim-world/2020/07/14/934750

পার্থ দাশ
১৮/০৭/২০
ঢাকা, বাংলাদেশ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 48 = 53