পর্ব-২০৮: হুনায়েন যুদ্ধ-৭: পিছু ধাওয়া ও রক্তের হোলি-খেলা!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনার নিরপেক্ষ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো: হাওয়াজিনদের সহিষ্ণুতা ও মানবিকতার (পর্ব: ২০৬) বিপরীতে নবী মুহাম্মদের অমানুষিক নৃশংসতায় হলো হুনায়েন যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের প্রকৃত কারণ; যার আলোচনা গত দু’টি পর্বে করা হয়েছে। মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের অতর্কিত আক্রমণ ও নৃশংসতায় হাওয়াজিনরা তাঁদের জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে দিগ্বিদিকে পলায়ন শুরু করে। কিছু লোক পালিয়ে আশ্রয় নেয় ‘আল-তায়েফ’ অঞ্চলে। কিছু লোক পালিয়ে শিবির স্থাপন করে ‘আল আওতাস’ এলাকায়। আর, কিছু লোক যায় ‘নাখলা’ অঞ্চলে। মুহাম্মদের আদেশে তাঁর অনুসারীরা প্রাণ-ভয়ে ভীত এই লোকগুলোর পিছু ধাওয়া করে; তাঁদের বন্দী ও হত্যা করে পাশবিক নৃশংসতায়! মুহাম্মদের “কোন প্রলোভনে” তাঁর অনুসারীরা মানুষ হত্যার রক্তের এই হোলি-খেলায় মেতে উঠেছিল, তার আলোচনা গত পর্বে করা হয়েছে। যত বেশী মানুষ খুন, তত বেশী পার্থিব নগদ-গনিমত প্রাপ্তি! মানুষ খুনের বিনিময়ে ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্য প্রাপ্তির খোলা ঘোষণা!

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনার পুনরারম্ভ – কবিতা পঙক্তি পরিহার: [1]
(আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ) [2] [3]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২০৭) পর:

‘মুশরিকরা বিতাড়িত হওয়ার পর আল-তায়েফে গমন করে। তাদের সঙ্গে ছিল মালিক বিন আউফ। অন্যরা শিবির স্থাপন করে ‘আল আওতাসে’। তাদের কিছু লোক, শুধুমাত্র বানু থাকিফের অন্তর্ভুক্ত বানু ঘিয়ারা (আল-ওয়াকিদি: ‘বানু আনাযাহ’) গোত্রের লোকেরা, নাখলার উদ্দেশ্যে গমন করে। আল্লাহর নবীর অশ্বারোহী বাহিনী ধাওয়া করে নাখলার রাস্তায় গমনকারী লোকদের পিছনে, গিরিপথ-গামী লোকদের পিছনে নয়।’ [4] [5] [6]

‘রাবিয়া বিন রুফায়ে বিন উহবান বিন থালাবা বিন রাবিয়া বিন ইয়ারবু বিন সামমাল বিন আউফ বিন ইমরুল-কায়েস, যাকে তার মায়ের নাম অনুসারে ইবনে দুঘুননা (Ibn Dughunna) নামেই বেশী ডাকা হতো, দুরায়েদ বিন আল সিমমা-কে [পর্ব-২০২] ধরে ফেলে ও তার উটের গলার রশিটি চেপে ধরে এই চিন্তায় যে সে ছিল এক নারী; কারণ সে তার ডুলির (হাওদার [Howdah]) মধ্যে অবস্থান করছিল। অতঃপর সে বিস্মিত হয়ে দেখে যে লোকটি ছিল পুরুষ। সে উট-টি কে হাঁটু গেড়ে বসায় ও দেখে যে লোক-টি অতিবৃদ্ধ – দুরায়েদ বিন আল সিমমা। যুবক-টি তাকে চিনতো না। দুরায়েদ তাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় যে, তার নাম কী ও সে কী চায়। জবাবে সে তাকে জানায় যে, সে তাকে হত্যা করতে চায়।

অতঃপর সে তাকে তার তরোয়াল দিয়ে আঘাত করে, কিন্তু তাতে কোন কাজ হয় না। দুরায়েদ বলে: “কী ভোঁতা অস্ত্রই না তোমার মা তোমাকে দিয়েছে! আমার উটের জিনের পিছনে ডুলির ভিতরে আমার যে তরোয়াল-টি আছে তা নিয়ে এসো ও আমাকে আঘাত করো (আল তাবারী: ‘মেরুদণ্ডের উপরে কিন্তু মস্তিষ্কের নীচে, কারণ আমি সেইভাবে মানুষদের হত্যা করতাম।’)।

অতঃপর যখন তুমি তোমার মায়ের সাথে মিলিত হবে, তখন তাকে বলো যে তুমি দুরায়েদ বিন আল সিমমা-কে হত্যা করেছো; কারণ-টি হলো এই যে আমি বহুকাল যাবত তোমাদের নারীদের সুরক্ষা দিয়েছি (আল তাবারী: ‘আল্লাহর কসম, আমি কতবার যে তোমাদের নারীদের রক্ষা করেছি’)।”

বানু সুলায়েম গোত্রের লোকেরা দাবী করে যে, রাবিয়া বলেছে: “আমি যখন তাকে আঘাত করি, সে পড়ে যায় ও উলঙ্গ হয়ে পড়ে। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখি যে তার ঊরুসন্ধি ও দুই উরুর অভ্যন্তরের অংশটি কাগজের মতো, ঘোড়ার পিঠের ওপর গদি (জিন) ছাড়া অশ্ব-চালনার কারণে।”

রাবিয়া যখন তার মায়ের কাছে প্রত্যাবর্তন করে ও তাকে বলে যে সে তাকে হত্যা করেছে; [আল তাবারী: ‘তার মা’] বলে, “আল্লাহর কসম, সে তোদের তিনজন মা ও ঠাকুরমা-কে মুক্ত করেছিল।

(আল-ওয়াকিদি: —‘তার মা বলে, “আল্লাহর কসম, সে এক সন্ধ্যায় তোদের তিনজন মা-কে মুক্ত করেছিল। আর সে ছেঁটে দিয়েছিল তোর পিতার কপালের উপরে থাকা মাথার চুলের গুচ্ছ।” যুবক-টি বলে, “আমি তা জানতাম না।” [পৃষ্ঠা ৪৪৮-৪৪৯])

আল্লাহর নবী আবু আমির আল-আশারি কে ‘আওতাসের’ পথে গমনকারী লোকদের পিছু ধাওয়ার জন্য প্রেরণ করেন। সে পলাতক কিছু লোকের নাগাল ধরে ফেলে। এই সংঘর্ষে এক তীরের আঘাতে আবু আমীর নিহত হয় ও তার চাচাত ভাই আবু মুসা আল-আশারী যুদ্ধের ঝাণ্ডা-টি গ্রহণ করে। সে যুদ্ধ চালিয়ে যায়; আল্লাহ তাকে বিজয়ী করে ও শত্রুদের তাড়িয়ে দেয়। কথিত আছে যে, সালমা বিন দুরায়েদ নামের এক ব্যক্তি আবু আমিরের হাঁটুতে তীর-বিদ্ধ করে, আর সেই ক্ষত-টি তার প্রাণনাশের কারণ হয়। —-

যুদ্ধের এই সময়টি-তে মালিক বিন আউফ তার কিছু অশ্বারোহী লোকদের নিয়ে এক গিরিপথের সম্মুখে এসে থেমে যায় ও তাদের বলে যে যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্বলরা এই পথটি অতিক্রম না করে ও পিছনে পড়া লোকজন তাদের নাগাল পায়, ততক্ষণ পর্যন্ত যেন তারা সেখানে অপেক্ষা করে। তারা তাই করে।’ —–

আল তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ সাল) অতিরিক্ত বর্ণনা: [2]

‘আবু জাফর [আল-তাবারী]: যে সমস্ত লোকেরা আওতাস (Awtas) নামক স্থানে পালিয়ে যায়, তাদের পিছু ধাওয়ার জন্য আল্লাহর নবী (তাঁর লোকদের) প্রেরণ করেন।

মুসা বিন আবদ আল-রহমান আল-কিনদি হইতে < আবু ওসামা হইতে < বুরায়েদ বিন আবদুল্লাহ [বিন আবু বারদা] হইতে <আবু বারদা বিন [আবু মুসা] হইতে < তার পিতা (আবু মুসা আল-আশারি) হইতে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক: [7]

‘আল্লাহর নবী হুনায়েন থেকে ফিরে আসার পর আবু আমির (আল-আশারি) কে এক সেনাবাহিনী সহ ‘আওতাসের’ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। সে দুরায়েদ বিন আল-সিমমার মুখোমুখি হয় ও তাকে হত্যা করে; অতঃপর, আল্লাহ দুরায়েদের সঙ্গীদের বিতাড়িত করে।’ [8] [9] [10]

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বিস্তারিত ও অতিরিক্ত বর্ণনা: [3]

(তিনি বলেছেন: আবদুল্লাহ বিন আমর বিন যুহায়ের আমাকে < উমর বিন আবদুল্লাহ আল-আবসি হইতে < রাবিয়া হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলেছে, সে বলেছে: ‘আমাদের সম্প্রদায়ের একদল লোক যারা সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিল, আমাকে যা বলেছে, তা হলো [পৃষ্ঠা ৪৪৫]):—

তারা বলেছে: যারা ‘আওতাসের’ পথে গমন করে, তাদের পিছু ধাওয়ার জন্যে আল্লাহর নবী আবু আমির আল-আশারি কে প্রেরণ করেন। তিনি তাকে একটি ঝাণ্ডা প্রদান করেন। তিনি যাদের-কে প্রেরণ করেন, তাদের মধ্যে ছিল সালামা বিন আল-আকওয়া, সে যা বলতো, তা হলো:

যখন হাওয়াজিনরা পরাজিত হয়, তারা ‘আওতাসে’ এক বিরাট শিবির স্থাপন করে। তাদের যারা পালিয়ে গিয়েছিল, তারা তো পালিয়েই গিয়েছিল; আর যারা নিহত হয়েছিল, তারা তো নিহতই হয়েছিল; আর যারা বন্দি হয়েছিল তারা তো বন্দীই হয়েছিল। আমরা তাদের শিবিরে পৌঁছায়। হঠাৎ তারা আমাদের বাধা প্রদান করে। এক লোক দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ জানায়, এই বলে, “কে আমার সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ করবে?” তাই আবু আমির তার সাথে লড়াই করে।

সে বলেছে: আল্লাহ সাক্ষী, আবু আমির তাকে হত্যা করে। একই ভাবে সে আরও নয় জন লোক-কে হত্যা করে। তার নবম দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের প্রাক্কালে এক চিহ্নিত ব্যক্তি দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের অনুরোধ জানায়, আবু আমির দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ করে ও তাকে হত্যা করে। তার দশম দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের সময়টিতে যে চিহ্নিত ব্যক্তি-টি ছিল, তার পরিধানে ছিল হলুদ পাগড়ি। তাই আবু আমির বলে, “আল্লাহই যেন হয় আমার সাক্ষী!”

সে বলেছে: কিন্তু লোকটি বলে, “আল্লাহ যেন সাক্ষী না হয়!” অতঃপর সে আবু আমির-কে আঘাত করে ও তাকে হত্যা করে। আমরা তাকে বহন করে নিয়ে আসি, যখন তার মধ্যে জীবনের স্ফুলিঙ্গ তখনো অবশিষ্ট ছিল। সে আবু মুসা আল-আশারি কে তার উত্তরসূরি নিযুক্ত করে। আবু আমির আবু মুসা-কে জানায় যে হলুদ পাগড়ির মালিক লোকটি তাকে হত্যা করেছে।

তারা বলেছে: আবু আমির তার উত্তরসূরি নিযুক্ত করে আবু মুসা-কে। সে তাকে ঝাণ্ডা-টি দেয় ও বলে, “আমার ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র-গুলো তুমি নবী-কে প্রদান করো।” আবু মুসা তাদের সাথে লড়াই করে, যতক্ষণে না আল্লাহ তাকে বিজয়ী করে। সে আবু আমিরের হত্যাকারী-কে হত্যা করে; ও তার ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র-গুলো নবীর কাছে নিয়ে আসে। সে বলে, “নিশ্চয়ই আবু আমির আমাকে এ বিষয়ে যে আদেশ করেছে, তা হলো, ‘আল্লাহর নবী-কে বলো যে তিনি যেন আল্লাহর কাছে আমার ক্ষমার জন্য দোয়া-প্রার্থনা করেন।'” আল্লাহর নবী উঠে দাঁড়ান ও দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। অতঃপর তিনি বলেন, “হে আল্লাহ, আবু আমির-কে ক্ষমা করো। তাকে আমার সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় লোকদের সাথে জান্নাতে স্থান দিও!” তিনি আদেশ করেন যে, আবি আমিরের রেখে যাওয়া সম্পদ-গুলো যেন তার পুত্র-কে দেয়া হয়।

সে বলেছে: আবু মুসা বলেছিল, “হে আল্লাহর নবী, আমি জানি যে আল্লাহ আবু আমির-কে ক্ষমা করেছে, কারণ সে শহিদ হিসাবে মৃত্যুবরণ করেছে। বরঞ্চ আপনি আমার জন্য আল্লাহ-কে বলুন।” তাই নবী বলেন, “হে আল্লাহ, আবু মুসা-কে ক্ষমা করো ও তাকে আমার সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় লোকদের সাথে স্থান দাও!” যারা এই বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী ছিল, তারা এটিকে দুই রায়ের দিন হিসাবে আখ্যায়িত করেছিল।’ —-

‘মালিক বিন আউফ তার অনুসারীদের মধ্যে থেকে তার অশ্বারোহী লোকদের নিয়ে এক গিরিপথের নিকট এসে দাঁড়ায়। অতঃপর সে বলে, “তোমাদের মধ্যে যারা দুর্বল, তারা আগে অগ্রসর না হত্তয়া পর্যন্ত তোমরা অপেক্ষা করো; অতঃপর সবার শেষে তাদের অনুসরণ করো।”

সে বলে, “যা কিছু দেখছো, তা মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করো।” তারা বলে, “আমরা একটি সম্প্রদায়-কে তাদের ঘোড়াগুলোর ওপর দেখতে পাচ্ছি। তারা তাদের বর্শাগুলো ঘোড়াগুলির পশ্চাৎ-ভাগে রেখেছে।” সে বলে, “তারা তোমাদের ভাই, বানু সুলায়েম গোত্রের লোকেরা। তারা তোমাদের জন্য হুমকি নয়। যা কিছু দেখছো, তা মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করো।” তারা বলে, “আমরা লোকদের পৃষ্ঠদেশ দেখতে পাচ্ছি, যারা তাদের বর্শাগুলো ঘোড়াগুলির পশ্চাৎ-ভাগে রেখেছে।” সে বলে, “তারা খাযরাজ গোত্রের লোকেরা; তাদের কাছ থেকে তোমাদের কোন বিপদ নেই। তোমারা তোমাদের ভাইদের পথ অনুসরণ করো।” সে বলে, “যা কিছু দেখছো, তা মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করো।” তারা বলে, “আমরা একটি সম্প্রদায়-কে দেখছি, তাদের প্রতিমাগুলো ঘোড়াগুলোর ওপর।” সে বলে, “সেটি হলো কাব বিন লুয়েভি গোত্র। তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবে।”

যখন অশ্বারোহী বাহিনী তাকে (মালিক-কে) আড়াল করে, তখন সে তার ঘোড়া থেকে নেমে আসে, এই ভয়ে যে তাকে হয়তো বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হবে। অতঃপর তৎক্ষণাৎই সে গাছ-গছালির ভিতরে আশ্রয় নেয় ও নাখলার শীর্ষে অবস্থিত ইয়াসুম পাহাড়ের ভিতর দিয়ে যাত্রা করে। সে পালিয়ে যায়, তাই তারা তার কাছে পৌঁছতে পারে না।

কিছু লোক বলে: সে বলেছিল, “তোমারা কী দেখতে পাচ্ছো?” তারা বলেছিল, “আমরা দুই লোকের মাঝখানে এক ব্যক্তি-কে দেখতে পাচ্ছি, যার কাছে আছে এক হলুদ ফিতা ও যে সজোরে জমিনে তার পা ঠোকাচ্ছে। সে তার বর্শা-টি তার কাঁধের ওপর রেখেছে।” সে বলেছিল, “সে হলো সাফিয়ার পুত্র আল-যুবায়ের। আল্লাহর কসম, নিশ্চিতই সে তোমাদের জায়গা থেকে তোমাদের উচ্ছেদ করবে!” যুবায়ের তাদের-কে দেখতে পায় ও আক্রমণ করে ও তাদের-কে গিরিপথ থেকে ধরে নিয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখে। মালিক বিন আউফ পালিয়ে যায় ও লিয়ার দুর্গের (Qasr bi Liyya) মধ্যে আশ্রয় নেয় ও নিজেকে সুরক্ষিত করে। কথিত আছে যে, সে থাকিফদের এক দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করেছিল।’ [পৃষ্ঠা: ৪৪৯-৪৫০]।

সহি মুসলিম: বই নম্বর ৩১, হাদিস নম্বর ৬০৯২: [9] [10] [2]

‘আবু বারদা তার পিতা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যা বর্ণনা করেছেন, তা হলো: হুনায়েন যুদ্ধ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পর, আল্লাহর নবী (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) আবু আমির-কে সেনাপ্রধান হিসাবে আওতাসের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তার সাথে সংঘর্ষ হয় দুরায়েদ বিন আল-সিমমার; দুরায়েদ-কে হত্যা করা হয় ও আল্লাহ তার সঙ্গীদের পরাস্ত করে।

আবু মুসা বলেছে: তিনি (নবী করীম সাঃ) আমাকে আবু আমিরের সঙ্গে প্রেরণ করেন। আবু আমির তার হাঁটুতে তীর-বিদ্ধ হয় আঘাত প্রাপ্ত হয়, তীর-টি (ছুঁড়েছিল) বানু জুশাম গোত্রের এক লোক। সেটি তার হাঁটুতে বিদ্ধ হয়। আমি তার কাছে যাই ও বলি: চাচা, কে তোমাকে তীর-টি ছুঁড়েছিল? আবু আমির আবু মুসার দিকে ইঙ্গিত করে ও বলে: বস্তুত: যে ব্যক্তি আমার উপর তীর-টি ছুঁড়েছে, সে আমাকে প্রকৃতপক্ষে হত্যাই করেছে।

আবু মুসা বলেছে: আমি তাকে হত্যার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে অনুসরণ করি ও তার নাগাল ধরে ফেলি। আর আমাকে দেখতে পেয়ে সে হঠাৎ চম্পট দেয়। আমি তাকে অনুসরণ করি ও তাকে বলি: তোমার কী লজ্জা বোধ হয়না (এ ভাবে পালাতে), তুমি কী আরব নও? কেন তুমি থামছো না? সে থেমে যায় ও তার সাথে আমার এক সংঘর্ষ হয়। আমরা একে অপর-কে (তরোয়ালের) আঘাত করি। আমি তাকে তরোয়াল দিয়ে আঘাত করি ও হত্যা করি। অতঃপর আমি আবু আমিরের কাছে ফিরে আসি ও বলি: বস্তুতই যে ব্যক্তি তোমাকে হত্যা করেছে, আল্লাহ তাকে হত্যা করেছে। আর সে বলে: এখন তীর-টি টেনে তুলে ফেলো। আমি যখন তীর-টি টেনে উঠাই, সেখান (জখম) থেকে পানি বের হয়ে আসে। আবু আমির বলে: হে আমার ভাতিজা, আল্লাহর নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হউক) কাছে যাও ও তাঁকে আমার শুভেচ্ছা জানাও ও তাঁকে বলো যে আবু আমির আপনাকে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার আর্জি জানিয়েছে। অতঃপর আবু আমির আমাকে তার লোকদের প্রধান নিযুক্ত করে ও তার অল্প সময় পরে সে মারা যায়।

আমি আল্লাহর নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) কাছে আগমন করি ও তাঁর সাথে সাক্ষাত করি। তিনি তখন দড়ি দিয়ে বোনা এক দোলনার উপর শুয়ে ছিলেন, যার ওপরে কোন বিছানা ছিল (না); যে কারণে আল্লাহর নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) পিঠ ও তার দুই পাশে ছিল দড়ি-গুলোর ছাপ। আমাদের ওপর যা ঘটেছিল তা আমি তাকে খুলে বলি ও আবু আমিরের ঘটনা-টি বর্ণনা করার পর তাঁকে জানাই যে, সে তাঁকে এই আর্জি জানিয়েছে যে তিনি যেন তার জন্য (আল্লাহর) ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যে কারণে আল্লাহর নবী (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) পানি আনতে বলেন ও তা দিয়ে তিনি অজু করেন। অতঃপর তিনি তাঁর দুই হাত উত্তোলন করেন ও বলেন: হে আল্লাহ, তুমি তোমার দাস আবু আমির-কে ক্ষমা করে দাও। (নবী করিম (সাঃ) তাঁর এই প্রার্থনা কালে হাতগুলো এত উপরে উঠিয়েছিলেন যে) আমি তাঁর বগলের সাদা দাগ-টি (শুভ্রতা) দেখতে পাই। তিনি আবারও বলেন: হে আল্লাহ, তুমি তাকে তোমার সৃষ্ট সত্তাদের মধ্যে বেশী প্রাধান্য কিংবা জনগণের মধ্যে বেশী সম্মান প্রদান করো। আমি বলি: হে আল্লাহর নবী, আপনি আমার জন্যেও ক্ষমা প্রার্থনা করুন। যে কারণে আল্লাহর নবী (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলেন: হে আল্লাহ, তুমি আবদুল্লাহ বিন কায়েসের (আবু মুসা আশারী) পাপ-গুলো মার্জনা করো ও কিয়ামতের দিন তুমি তাকে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করো। আবু বারদা যা বলেছে, তা হলো: একটি প্রার্থনা ছিল আবু আমিরের জন্য ও অপর-টি ছিল আবু মুসার জন্য।’

সহি মুসলিম: বই নম্বর ১৯, হাদিস নম্বর ৪৩৪৪: [11]

সালামা বিন আল-আকওয়া হইতে বর্ণিত:
আমরা আল্লাহর নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) সাথে হাওয়াজিন যুদ্ধ-টি করি। (একদিন) যখন আমরা আল্লাহর নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) সাথে সকালের নাস্তা করছিলাম, লাল রংয়ের উঠের পিঠের ওপর চড়ে সেখানে এক ব্যক্তির আগমন ঘটে। সে তাকে হাঁটু গেড়ে বসায়, তার জিনের পেটি থেকে এক টুকরা চামড়ার দড়ি বের করে ও তা দিয়ে উট-টি কে বেঁধে রাখে। অতঃপর সে লোকদের সাথে খাবার খাওয়া শুরু করে ও (কৌতূহলী দৃষ্টি-তে চারপাশে) দেখতে থাকে। আমাদের অবস্থা ছিল দরিদ্র ও তাই আমাদের কিছু লোক এসেছিল পদব্রজে (সওয়ারী পশু না থাকার কারণে)। হঠাৎ করেই সে তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যায়, তার উটের কাছে আসে, উট-টি কে সে হাঁটু গেড়ে বসায়, তার ওপর উঠে বসে ও জন্তু-টি কে চালনা করে; অতঃপর সেটি তাকে নিয়ে দৌড়ে চলে যায়। (তাকে গুপ্তচর মনে করে) বাদামী রংয়ের উষ্ট্রীর ওপর বসা এক লোক তাকে তাড়া করে।

সালামা (বর্ণনাকারী) বলেছে: আমি পায়ে হেঁটে তার পশ্চাদনুসরণ করি। আমি দৌড়াতে থাকি যতক্ষণে না আমি উট-টির ঊরু-দেশের কাছে এসে পৌঁছোই। আমি আরও অগ্রসর হয়ে উট-টির পাছার কাছে যাই। আমি আরও বেশী অগ্রসর হয়ে উট-টির নাকে লাগানো দড়ি-টি ধরে ফেলি। আমি তাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করি। যখনই সেটি তার হাঁটু মাটি-তে স্থাপন করে, আমি তরোয়াল উন্মুক্ত করি ও সওয়ারি লোকটির মাথায় আঘাত করি; সে নিচে পড়ে যায়। আমি লোকটির মালামাল ও অস্ত্রশস্ত্র সহ উট-টি তাড়িয়ে নিয়ে আসি। আল্লাহর নবী (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য সামনে এগিয়ে আসেন, তাঁর সাথে ছিল লোকজন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন: কে এই লোক-টি কে হত্যা করেছে? লোকেরা বলে: ইবনে আকওয়া। তিনি বলেন: এই লোকটির সমস্ত কিছুই তার (ইবনে আকওয়া)।’

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

ইসলামের ইতিহাসের আদি উৎসের প্রায় সকল মুসলিম ঐতিহাসিকদের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমারা জানতে পারি: স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী-কে প্রেরণ করেন নাখলার রাস্তায় পলায়নকারী লোকদের পিছনে। অতি-বৃদ্ধ দুরায়েদ বিন আল-সিমমা কে হত্যা করা হয় অমানুষিক নৃশংসতায়! মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনা মতে তাঁর হত্যাকারী ছিল রাবিয়া বিন রুফায়ে বিন উহবান; আর আল-তাবারী, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের বর্ণনা মতে, তাঁর হত্যাকারী ছিল আবু আমির আল-আশারি। তাঁদের বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো:

“এই অতিবৃদ্ধ লোকটি তাঁর হত্যাকারীর পরিবারের তিনজন মহিলা-কে রক্ষা করেছিলেন। শুধু তাইই নয়, আল-ওয়াকিদির বর্ণনা মতে এই অতিবৃদ্ধ লোকটি ছিলেন হত্যাকারীর পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক-যুক্ত।”

আবু আমির আল-আশারি কে একদল অনুসারী সহ মুহাম্মদ প্রেরণ করেন ‘আওতাসে’ গমনকারী লোকদের বিরুদ্ধে। আবু আমির কম-পক্ষে দশজন লোক-কে হত্যা করে ও নিজেও নিহত হয়, সালমা বিন দুরায়েদ নামের এক অবিশ্বাসীর তীরের আঘাতে। এই যুদ্ধে অবিশ্বাসীদের পক্ষের সংগঠক ও সাধারণ দিকনির্দেশনার দায়িত্ব পালনকারী যুবক, ৩০ বছর বয়সী নেতা মালিক বিন আউফ আল নাসরি (পর্ব: ২০২) ছিল ‘আল-তায়েফের’ উদ্দেশ্যে পলায়নকারী লোকদের সঙ্গে। সে পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে আল-তায়েফের এক দুর্গের ভিতরে।

আমারা ইতিমধ্যেই জেনেছি, ‘হুনায়েন যুদ্ধে’ আক্রমণকারী দল-টি ছিল মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা; আর হাওয়াজিনরা সমবেত হয়েছিলেন মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের আগ্রাসনের কবল থেকে নিজেদের আত্মরক্ষার প্রচেষ্টায়। সে কারণেই মুহাম্মদের প্রায় সকল অনুসারী যখন মুহাম্মদ-কে প্রায় একা ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা মুহাম্মদ-কে আক্রমণ করেন নাই। মুহাম্মদে প্রাণ রক্ষা পেয়েছিলেন তাঁদের এই সহিষ্ণুতার কারণে। অন্যদিকে, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা পলায়নরত হাওয়াজিনদের পিছু ধাওয়া করে হত্যা করেছিলেন নির্বিচারে। পার্থক্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট!

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৫৭৪- ৫৭৫
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা-আল-তাবারী, ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ১৬-১৮
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] আল-ওয়াকিদি: ভলুম ৩, পৃষ্ঠা (৯০৬ ও) ৯১৪-৯১৮; ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা (৪৪৫) ও) ৪৪৮-৪৫০:
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[4] ‘আওতাস’: হাওয়াজিন অঞ্চলের এক উপত্যকা, যেখানে হুনাইনের যুদ্ধ-টি সংঘটিত হয়েছিল।
[5] ‘আল-তায়েফ’: মক্কার ৭৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট উঁচুতে ‘সারাত (Sarat)’ পর্বতমালার উপরে অবস্থিত একটি শহর।
[6] ‘নাখলা’: মক্কা থেকে প্রায় দুই রাত্রির যাত্রা-পথে অবস্থিত একটি উপত্যকা।
[7] Ibid: আল-তাবারী নোট নম্বর: ১২১-১২৬

“মুসা বিন আবদ আল-রহমান বিন সাইদ বিন মাসরুক আল-কিনদি আল কুফি ৮৭১-৮৭২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। আবু ওসামা: হামমাদ বিন ওসামা বিন যায়েদ আল-কুরায়েশি আল কুফি মৃত্যুবরণ করেন ৮১৬-৮১৭ খ্রিস্টাব্দে। আবু বারদা আমির বিন আবু মুসা আল-আশারি ছিলেন কুফায় সর্বপ্রথম নিযুক্ত কাজীদের একজন; তিনি ৭২১-৭২২ সাল কিংবা ৭২২-৭২৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আবু মুসা আল-আশারি ছিলেন ইয়েমেন থেকে আগত এক ব্যক্তি; ইসলাম গ্রহণের পর তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন ও খায়বার যুদ্ধের প্রাক্কালে [পর্ব: ১৩০-১৫২] তিনি মদিনায় আগমন করেন; তিনি আলীর সমর্থক হিসাবে খ্যাত ছিলেন ও সিফফিনের যুদ্ধের পর আলী তাঁকে মধ্যস্থতাকারী (arbiter) হিসাবে নিযুক্ত করেন, কিন্তু তিনি আমর বিন আল-আসের প্রতারণার শিকার হোন; তিনি ৬৬২-৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। আবু আমির আল-আশারি মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।”

[8] Ibid: আল-তাবারী নোট নম্বর -১২৭:
“এই রিপোর্ট-টি রাবিয়া বিন রুফায়ের কর্তৃক দুরায়েদের হত্যার পূর্বোক্ত রিপোর্ট-টির সাথে সাংঘর্ষিক। ইবনে হিশাম তার সিরাত গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন: যে ব্যক্তি দুরায়েদ-কে হত্যা করেছে, তার নাম হলো আবদুল্লাহ বিন কুনায়ে বিন উহবান বিন থালাবা বিন রাবিয়া। বালাধুরি তাঁর ‘আনসাব’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন: আবু আমির-কে হত্যা করে ইবনে দুরায়েদ বিন আল-সিমমা, আর সে কারণে আল-দাহহাক বিন আবদ আল-রহমান আল-আশারি তাকে হত্যা করে।”

[9] সহি মুসলিম: বই নম্বর ৩১, হাদিস নম্বর ৬০৯২:
https://quranx.com/hadith/Muslim/USC-MSA/Book-31/Hadith-6092/

[10] অনুরূপ বর্ণনা – সহি বুখারি: ভলুম ৫, বই নম্বর ৫৯, হাদিস নম্বর ৬১২:
https://quranx.com/hadith/Bukhari/USC-MSA/Volume-5/Book-59/Hadith-612/

[11] সহি মুসলিম: বই নম্বর ১৯, হাদিস নম্বর ৪৩৪৪:
https://quranx.com/hadith/Muslim/USC-MSA/Book-19/Hadith-4344/

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 34 = 41