জল ভালুকের রহস্য

হিমাঙ্কের নিচে রাখুন অথবা ফুটন্ত পানিতে, ছেড়ে দিন মাত্রাতিরিক্ত রেডিয়েশনের ভেতরে ওয়াটার বিয়ার কিছুতেই মরবে না। এমনকি যেখানে প্রাণ ধারণের উপযুক্ত কোনো পরিবেশ নেই সেখানেও ওয়াটার বিয়ার আনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে দশকের পর দশক। কৈ মাছের প্রাণ বলতে যা বোঝায় ওয়াটার বিয়ার যেন তার চাইতেও বেশি। পৃথিবীতে অমর বহু অর্গানিজম রয়েছে কিন্তু ওয়াটার বিয়ারকে ঠিক পুরোপুরি অমর বলা যায় না। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে বলা হয় টার্ডিগ্রেড। একটি আণুবীক্ষণিক আটপেয়ে জীব। কিন্তু ছোট যতই হোক না কেন একে সামান্য ভাবার কোনো অবসর নেই। আনুমানিক ৫০০ মিলিয়ন বছর ধরে এটি পৃথিবীতে বাস করছে। অর্থাৎ খালি চোখে দেখা যায় অথবা যায় না এমন প্রাণীদের মাঝে সবচেয়ে প্রাচীন একটি জীব।

টার্ডিগ্রেড পৃথিবীর সর্বত্র বাস করতে পারে। সবচাইতে উঁচু পাহাড়, সবচেয়ে গভীর সমুদ্র বা ফুটন্ত লাভায়। এটা এতটাই কঠিন জীব যে মহাকাশের বায়ুশূন্য পরিবেশেও জীবিত থাকতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে পাঁচটি মহা বিলুপ্তির দুর্ঘটনাতেও টার্ডিগ্রেড টিকে ছিলো। প্রত্যক্ষ করে গেছে সবগুলো প্রাণীর বিলুপ্তি। সর্বশেষ মহা বিলুপ্তি ঘটে আনুমানিক ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে, এর পরপরই আদিমানবের উদ্ভব হয়। ইতিহাসে এই বিলুপ্তিকে বলা হয় ক্রেটাসিয়াস- টেরটিয়ারি এক্সটিঙ্কশন (Cretaceous Tertiary K-T Extinction)।

তবুও টার্ডিগ্রেড, রাসপুটিন এর মত মাইক্রোস্কোপিক প্রাণীগুলো কেন ফ্রোজেন, বয়েলড অথবা মাত্রাতিরিক্ত রেডিয়েশনে বা স্পেসের ভ্যাকুয়াম পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এটা বিজ্ঞানের কাছে এতদিন রহস্য ছিলো। বিজ্ঞান এখন সেই রহস্যের পর্দা উন্মোচন করেছে।

একটি জলজ প্রাণী হয়েও বিজ্ঞানীরা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখেছেন এটি কিভাবে সম্পূর্ণ শুষ্ক পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে, ড্রাই পিরিয়ডের সময়ে জীবটির মাথা ও পাগুলো বহিঃকঙ্কালের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেকে একটা ছোট বলে পরিণত করে ফেলে। থেকে বের হয়ে আসে। ওটা ওভাবেই অনড় অবস্থায় পড়ে থাকে যতক্ষণ না আবার পানির সংস্পর্শ পাচ্ছে।

টার্ডিগ্রেডের এই অভূতপূর্ব সক্ষমতা ড. থমাস বুথবির আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। তিনি চ্যাপেল হিলের নর্থ ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটির একজন গবেষক। বুথবি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, “বল আকৃতির অবস্থায় টার্ডিগ্রেড বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতে পারে, এমনকি কয়েক দশক, যখনই ওদের পানিতে ছেড়ে দেবেন কয়েক ঘণ্টার ভেতরে ওরা পানির মাঝে খেলে বেড়াতে শুরু করবে, খাবে, বংশ বিস্তার করতে থাকবে যেন এতদিন কিছুই হয়নি।”

অদ্যবদি গবেষকদের ধারণা ছিলো, টার্ডিগ্রেডের থ্রেহালোস (সার) নামের এক ধরণের সুগার রয়েছে যা ড্রাই সিজনে তাদের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। ব্রাইন শ্রিম্প বা সি মাঙ্কি এবং নেমাটোড কৃমি একই ভাবে ড্রাই সিজনে তাদের শরীরের সুগারকে কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকে। এই প্রসেসটিকে বলা হয় এনহাইড্রোবায়োসিস (anhydrobiosis)। জন্তুগুলো তাদের শরীরের ২০% সুগার উৎপাদন ও ধারণ করতে পারে।

কিন্তু টার্ডিগ্রেড তা করে না। নির্জীব অবস্থায় তার সমগ্র শরীরে থ্রেহালোস থাকে মাত্র ২%। তাই মাত্র ২% সুগার দ্বারা দশকের পর দশক বেঁচে থাকা প্রাণীর জন্য একটু বেশিই অসম্ভব হয়ে যায়। সাম্প্রতিক যে আবিষ্কার ঘটেছে সেটা বিশ্বাস করা আরও বেশি অসম্ভব। টার্ডিগ্রেড নিজেকে ঘুমন্ত সময়টায় কাঁচে পরিণত করে রাখে।

এই গবেষণায় টার্ডিগ্রেডকে একটি শুষ্ক পরিবেশে রাখা হয়। প্রথমে টার্ডিগ্রেডগুলোকে পুকুরের মত কন্ডিশনে রাখা হয় যা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। ওয়াটার বিয়ার যখন এনহাইড্রোবায়োসিস প্রক্রিয়া শুরু করে, গবেষকরা লক্ষ্য করেন, এই অবস্থায় কোন জিনটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঐ জিন একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন উৎপাদন করে, যার নাম টার্ডিগ্রেড-স্পেসিফিক ইনট্রিনসিক্যালি ডিজঅর্ডার প্রোটিন্স (TDPs)।

যখন TDPs উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় ওয়াটার বিয়ারও মারা যায়। এই বিষয়ে বুথবি বলেন, “যদি ঐ জিনগুলো নিয়ে জীবগুলোর শরীরে ব্যাকটেরিয়া ও ইস্টের মত প্রবেশ করানো যায়, যাদের শরীরে স্বাভাবিক ভাবে ঐ প্রোটিন নেই তারা আসলে আরও বেশি শুষ্ক পরিবেশ সহিষ্ণু হয়ে ওঠে।”

শুষ্ক মৌসুম যখন শুরু হয় তখন ঐ জিনও সক্রিয় হয়ে ওঠে, টার্ডিগ্রেডের সমগ্র বডি সিস্টেমে এই জিন উৎপাদিত হয়। বুথবি জানান, সি মাঙ্কিরা শরীরে যে পদ্ধতিতে থ্রেহালোস সংরক্ষণ করে রাখে সেই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে টার্ডিগ্রেডও। এটি কনভার্জেন্ট এভুল্যুশনের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, অর্থাৎ এতে সম্পূর্ণ বিপরীত দুইটি প্রজাতি একই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করে।

সাধারণভাবে প্রোটিন গঠিত হয় সুশৃঙ্খল ভাবে, এমাইনো এসিডের ত্রিমাত্রিক চেইন দ্বারা। কিন্তু TDPs কাজ করে ভিন্নভাবে, অনেকটা বিশৃঙ্খল ও এলোমেলো ভাবে। ড. বুথবি বলেন, “এটা আসলেই আশ্চর্যজনক যে সুশৃঙ্খল ত্রিমাত্রিক কাঠামো ছাড়াই কোষ ঠিক মত কাজ করতে পারে।” এখানে আরেকটি প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায়, ঐ প্রোটিন কি অন্য কোন অর্গানিজম দ্বারা ব্যবহৃত হয়?

যখন বিশুষ্কীকরণ শুরু হয় তখন TDP সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন ভার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়। বুথবি বলেন, “টার্ডিগ্রেডের ভেতরের কোষগুলোর ভেতরের মলিকিউলে কাঁচের আবরণ পড়ে যায়, এবং সেগুলো ইনটেক অবস্থায় থেকে যায়।” ফলে টার্ডিগ্রেড পানির সংস্পর্শে না আসা পর্যন্ত নির্জীব অবস্থায় থাকে। পানির সংস্পর্শে এলে কাঁচের মত প্রোটিন গলে যায় এবং টার্ডিগ্রেড জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এই আবিষ্কারের কিছু ব্যবহারিক প্রয়োগ করা সম্ভব। যেমন বহু মেডিসিন ও ভ্যাকসিনকে রেফ্রিজেরাশনের দরকার পড়ে। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে সেটা সব সময় সহজলভ্য না। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ভ্যাকসিন ডেলিভারি বেশ চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

ড. বুথবির বিশ্বাস TDP জাতীয় শুষ্ক ফ্রিজিং আমরা ভ্যাকসিন ও মেডিকেশনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে সহজেই পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে পারি। স্পেস ট্রাভেলের সময়ে অ্যাস্ট্রোনটদের নির্জীব করার প্রয়োজন পড়বে, কিংবা টার্মিনাল ডিজিজে যখন কিউরের জন্য অপেক্ষা করবে তখন TDP কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে কি? এর কোন জবাব এখনই দেয়া সম্ভব না, সেগুলোর উত্তর হয়তো একদিন বিজ্ঞানীরা দিতে পারবেন কিন্তু আপাতত TDP এর অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী বোঝাটাই বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “জল ভালুকের রহস্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 29 = 34