অক্সফোর্ড এস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের এপিঠ ওপিঠ

বর্তমানে বিশ্বব্যাপ ১৬০টি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট রয়েছে। অর্থাৎ ১৬০টি ভ্যাকসিন কোন না কোন ট্রায়ালে চলছে আগামী পৃথিবীতে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য। তবে এর মাঝে তিনটি ক্যান্ডিডেটের প্রোগ্রেস এখন পর্যন্ত খুবই ভালো। এই তিনটি হল আমেরিকার মর্ডানা, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ও চীনের সাইনোভ্যাক।

করোনা ভাইরাস যখন পুরো জন-জীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে তখন মানুষের চাওয়া একটিই, যত দ্রুত সম্ভব ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে সময় যত দ্রুত যাবে তত ভালো। কেননা ভ্যাকসিন যদি বানানো হয়েও যায় তারপরও সেটা বাজারে আসতে যথেষ্ট সময় লাগবে। আশা করা যাচ্ছে যে লেট ২০২০ বা আর্লি ২০২১ অর্থাৎ ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারি নাগাদ করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন অফিশিয়াল হয়ে যাবে। সেটা ডিস্ট্রিবিউট, সরকারি রেগুলেশন সম্পন্ন করে আগামী বছরের এপ্রিল, মে অথবা জুন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে রাশিয়া, আমেরিকা, ইংল্যান্ড চীনের ভ্যাকসিনগুলো বেশ দ্রুত গতিতে ফেজগুলো সম্পন্ন করছে। যেহেতু সমগ্র পৃথিবী কোভিড-১৯ এর পেছনে কোটি কোটি ডলার খরচ করছে সেহেতু ভ্যাকসিন দ্রুত ডেভেলপ না করার কোন কারণ নেই।

মর্ডানা আমেরিকার কোম্পানি। এরাই প্রথম কোভিড-১৯ এর হিউম্যান ট্রায়াল শুরু করে। আমরা যখন লক ডাউনও দেইনি তখন এদের ফেজ ওয়ান ট্রায়াল শুরু হয়, মার্চের ১৬ তারিখ৷ মর্ডানার ভ্যাকসিনটির নাম রাখা হয়েছে mRNA-1273।

শরীরের যে ইমিউন সিস্টেম রয়েছে সেটাকে গঠন করে হোয়াইট ব্লাড সেল। হোয়াইট ব্লাড সেল বা শ্বেত রক্ত কণিকা যে মানুষের শুধু এন্টিবডিই সৃষ্টি করে তা নয়, এটির আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। আমাদের ইমিউন সিস্টেমের কথা বললে এন্টিবডিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোন ভাইরাস আক্রমণ করে তখন আমাদের শরীর ভাইরাস থেকে বাঁচতে এন্টিবডি সৃষ্টি করে, এই অন্টিবডিও এক ধরণের প্রোটিন দ্বারা গঠিত। mRNA-ও একই কাজ করে। যেকোনো ভাইরাসই কিন্তু জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালকে ট্রান্সফার ও রেপ্লিকেশন করে। তাই ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে ভাইরাসের এই জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল ট্রান্সফার ও রেপ্লিকেশনকে থামানোর প্রয়োজন। এটাকে থামানোর জন্যই এন্টিবডি বানানো প্রয়োজন। দুইটা পদ্ধতিতে আমাদের শরীর সুস্থ হতে পারে। এক, এন্টিবডি বানিয়ে; দুই, সেল ইমিডিয়েট রেসপন্সের মাধ্যমে। টি সেলের ভাইরাস ধ্বংস করাকে সেল ইমিডিয়েট রেসপন্স পদ্ধতি বলে। বি সেল ও টি সেল দুটোই কিন্তু এন্টিবডিই বানায়।

আমেরিকার মডার্নার ভ্যাকসিনটি mRNA টেকনোলজি নির্ভর। RNA বেশ কয়েক ধরণের হয়। যেমন tRNA, mRNA। mRNA হল মেসেঞ্জার আরএনএ। তাদের ফেজ ওয়ানের রেজাল্ট কিছুদিন আগে প্রকাশ করা হয়েছে। অপরদিকে ২৭ শে জুলাই থেকে মর্ডানার ফাইনাল ফেজের ট্রায়াল শুরু হবে। শুভ সংবাদ হল আগের দুটো ফেজের রেজাল্ট খুবই কার্যকরী এসেছে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত সবচাইতে আলোচিত ভ্যাকসিন হল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন। গ্লোবাল বায়োফার্মাসিটিক্যাল ফার্ম এস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে কাজ করে তারা এই ভ্যাকসিন বানিয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ChAdOx1 nCoV-19। এটি AZD1222 নামেও বেশ পরিচিত। এর ডিজাইন করেছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং ডেভেলপ করেছে অ্যাংলো সুইডিশ ফার্মা। একারণেই নিউজপেপারে এর নাম অক্সফোর্ড এস্ট্রাজেনেকার নাম দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

চিত্র ২: করোনা ভাইরাস

প্রথমেই আমরা দেখবো ভ্যাকসিন কাজ করে কিভাবে ও এর মূল কাজটা কি? করোনা ভাইরাসের স্ট্রাকচারের সাথে অনেকেই সুপরিচিত (চিত্র ২)। ভাইরাসটির শরীরে বেশ কিছু প্রোটিন দেখতে পাওয়া যায়। ভাইরাসের গায়ে লেগে থাকা ছোট-বড় স্পাইকগুলোই মূলত প্রোটিন। বিশেষ করে বড়গুলোকে স্পাইক প্রোটিন বলা হয়। করোনা ভাইরাস একবার মানব শরীরে প্রবেশ করার পর কোষে প্রবেশ করে। বেসিক্যালি, স্পাইকের সাহায্যেই এটা মানব শরীরে প্রবেশ করে। শরীরে প্রবেশের পর ভাইরাসের মাল্টিপ্লাই ঘটে। যত বেশি মাল্টিপ্লাই হবে ইমিউনিটি সিস্টেম তত বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। অক্সফোর্ড এস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের মূল কাজটা হল যখনই করোনা ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে তখনই শরীরের অভ্যন্তরে থাকা এন্টিবডি যা আগেই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয়েছে সেটা ভাইরাসের লাল রঙের স্পাইক প্রোটিন ধ্বংস করে ফেলবে। স্পাইক প্রোটিন ধ্বংস হওয়ার অর্থ হচ্ছে তা মানব কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। আর প্রবেশ করতে না পারলে মাল্টিপ্লাইও করতে পারবে না। ফলে মানব শরীর হয়ে উঠবে ইমিউন। এটা হল অক্সফোর্ড ভাইরাসের সাধারণ কার্যপ্রণালী। নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

শুধু এটিই না, যত ভ্যাকসিন তৈরি করা হয় তাদের মূল কাজই তাই। এই পদ্ধতির ভ্যাকসিনকে বলা কোভ্যাক্সিন (Covaxin)। ভ্যাকসিনের মাঝে স্পেশাল কিছুই থাকে না। মূলত ভাইরাসকেই দুর্বল আকারে প্রবেশ করানো হয়। তবে এর ফলে মানুষের শরীরকে এক প্রকার দ্রুত রেসপন্স করতে সাহায্য করে।

কাজ করে কিভাবে? ভ্যাকসিনটা কাজ করে কিভাবে জানতে হলে ভ্যাকসিন বানানো হয় কিভাবে এটা জানাও জরুরী। তাহলে ভ্যাকসিন ও কোভ্যাক্সিন (Covaxin) জিনিসটা কি? মনে রাখতে হবে সাধারণভাবে ভ্যাকসিনের কাজ হল, যখনই শরীরে কোনো ভাইরাস প্রবেশ করে তখন শরীরের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে ক্ষমতা থাকে নির্দিষ্ট ভাইরাসটির সাথে লড়াই করার জন্য। কিন্তু কোভিড-১৯ জাতীয় ভাইরাসটির নাম হল CoV SARS-2; এটি সম্পূর্ণ নতুন ধরণের ভাইরাস যাকে মানব শরীর চিনতে পারে না বা চেনার কথাও না। ফলে এর সঙ্গে লড়াই করতে শরীরের অনেক সময় লেগে যায়, অনেক ক্ষেত্রে এন্টিবডিও বহু দেরীতে তৈরি হয়। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে ভাইরাসটি মানব শরীরের যতটুকু ক্ষতি করার করে ফেলে। কিছু মানুষের ইমিউনিটি সিস্টেম আগে থেকেই দুর্বল হলে তারা কোন প্রকার লড়াই করতে পারে না।

সেক্ষেত্রে মানুষের শরীর যেন সম্পূর্ণ নতুন ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে সেজন্য ভ্যাকসিনকে বায়োলজিক্যালি প্রস্তুত করা হয়। বানানো হয় ভাইরাসেরই একটি নির্দিষ্ট অংশকে নিয়ে। ভ্যাকসিন এমন কিছু না যে মানব শরীরে স্পেশাল সুপার-পাওয়ার প্রবেশ করানো হয়, এবং সেটা অতিরিক্তি ক্ষমতাশালী হয়ে নির্দিষ্ট ভাইরাসটির সাথে লড়াই করতে পারবে। এটি ভুল ধারণা। কিন্তু ভাইরাসটির যে দুর্বল ফর্ম শরীরে প্রবেশ করানো হয় সেটিই কোভ্যাক্সিন।

ভাইরাসের স্ট্রেইন নিয়ে সেটা মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো হয়। স্ট্রেইন দুই ধরণের হতে পারে। একটি সক্রিয় ও অপরটি নিষ্ক্রিয় হতে পারে। একটিভ ফর্মের ক্ষেত্রে ধরা যাক সার্স কোভ টু জীবন্ত কিন্তু বেশ দুর্বল ভাইরাসকে ভ্যাকসিন আকারে শরীরে প্রবেশ করানো হল। তখন করোনা ভাইরাসের যে সিম্পটমগুলো আছে তা সেভাবে দেখা যাবে না কিন্তু ভাইরাস শরীরে বাস করতে থাকবে। ইনএকটিভ ফর্ম বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় যদি এই ভ্যাকসিন প্রবেশ করানো হত তাহলে ধরে নিতে হত ভাইরাসটিকে মেরে ফেলা হয়েছে, শরীরের ভেতরে সেটি মাল্টিপ্লাই হতে পারব না। সামান্য যদি শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো যায় তবে ধীরে ধীরে শরীরে ইমিউন চলে আসে বা সক্ষমতা চলে আসে ঐ ভাইরাসটিকে মোকাবিলা করার জন্য। ভ্যাকসিনের কাজই এটা। ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করা হয় আর ধীরে ধীরে সেই ভাইরাসটির বিরুদ্ধে শরীরে ইমিউনিটি বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে যখনই সেই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে তখন দেখা যায় শরীর আগে থেকেই লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছে।

চিত্র ৩: ভ্যাকসিনের কার্যপ্রণালী

বর্তমান পৃথিবীতে বেশিরভাগ কোম্পানি এই কোভ্যাক্সিনই তৈরি করছে। তবে অক্সফোর্ড এস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল সেটায় করোনা ভাইরাসের স্ট্রেইন ব্যবহার করা হয়নি। এটায় কমন কোল্ড ভাইরাসের স্ট্রেইন ব্যবহার করা হয়েছে। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এডেনোভাইরাস (Adenovirus) (চিত্র: ৪)। এটি মূলত শিম্পাঞ্জিকে আক্রান্ত করে। সেটাকে জেনেটিক্যালি এমনভাবে মোডিফায়েড করা হয়েছে যেন সেটি মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর রেপ্লিকেট তৈরি করতে না পারে। তবে মানব শরীর ধীরে ধীরে রেসপন্ড করা শুরু করবে। মানব শরীরে প্রবেশ করে এটি কোড রিলিজ করবে যার ফলে এক ধরণের স্পাইক প্রোটিন তৈরি করে। এক সময়ে এটাই হয়ে উঠবে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে এন্টিবডি। এরপর যখন ফিল্ড থেকে কোনো ভ্যাকসিন প্রদান করা মানুষ করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবে তখন দেখা যাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য এন্টিবডি আগে থেকেই শরীরের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ঠিক ট্রোজান হর্সের মত। এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস মোকাবিলার জন্য এটি অন্যতম কার্যকরী একটি ভ্যাকসিন।

চিত্র ৪: এডেনোভাইরাস

একবার যখন ভ্যাকসিন প্রস্তুত হয়ে যায় তখন সেটাকে প্রথমে প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পাঠানো হয়। প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ক্ষুদ্র প্রাণীর উপরে এটা প্রয়োগ করা হয়। যেমন ইঁদুর, খরগোশ, গিনিপিগ ইত্যাদি। ফলাফল ইতিবাচক হলে ভ্যাকসিন পাঠানো হয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে থাকে তিনটি মূল স্টেজ। ফেজ ওয়ান, ফেজ টু ও ফেজ থ্রি। বর্তমানে বেশিরভাগ ভ্যাকসিনগুলো এই তিনটি স্টেজের কোন না কোনটাতে রয়েছে। প্রথমে ফেজ ওয়ান। খুবই ছোট গ্রুপের উপরে এটা প্রয়োগ করা হয়। যাদের উপরে প্রয়োগ করা হয় তাদের সাইড ইফেক্ট কী কী দেখা যাচ্ছে, কতটুকু ডোজ দিতে হবে এসব পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফেজ টু এবং ফেজ থ্রি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপেক্ষাকৃত বড় গ্রুপের শরীরে ফেজ টু প্রয়োগের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। ফেজ থ্রি আরও বৃহৎ গ্রুপে দেওয়া হয়। রেগুলেটরি অথোরিটির এপ্রুভাল এই পর্যায়েই দেওয়া হয়। সরকারি বিধিনিষেধ আইনকানুন সম্পন্ন করে ভ্যাকসিনের ম্যানুফ্যাকচারিং শুরু হয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রসেস। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অনেক সময়ে মাস তো মাস, বছরও লেগে যায়। তখন পর্যবেক্ষণ করা হয় কিভাবে ভ্যাকসিন মানুষের উপরে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। সামান্য ভুলেও বিরাট সমস্যা এক্ষেত্রে সৃষ্টি হতে পারে। অনেক সময় পাঁচ, দশ কিংবা পনেরো বছর লেগে যায় সকল ধাপ সম্পন্ন করতে। কিন্তু এখন কোভিড-১৯ এর কারণে বিভিন্ন দেশের সরকার ভ্যাকসিনের ডেভেলপিং ফার্স্ট ট্রাকে নিয়ে এসেছে।

চিত্র ৫: একটি ভ্যাকসিন তৈরির ট্রেডিশনাল টাইমলাইন

অক্সফোর্ড এস্ট্রোজেনেকা ভ্যাকসিনের ফেজ ওয়ানের ট্রায়াল শুরু হয়েছিলো ১ এপ্রিল। ইংল্যান্ডে মাল্টিপল সাইটে ফেজ ওয়ানে ১১০২ জন মানুষের উপরে এটা প্রয়োগ করা হয়। কাউকে এক ডোজ, কাউকেবা দুই ডোজ। ফেজ ওয়ানে যাদের শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছিলো তাদের মাঝে অনেক শিশুও ছিলো। লক্ষ্যনীয় সেই ট্রায়ালের ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। তদুপরি এটি ফেজ থ্রির ট্রায়ালে চলে গেছে ফেজ টুয়ের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগেই। ২২ শে মে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ফেজ টুয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২৭শে জুন ব্রাজিলে ৫০০০ সুস্থ ভয়ান্টিয়ারের শরীরে এর ফেজ থ্রি প্রয়োগ করা হয়। আফ্রিকায় খুব শিঘ্রই এর ট্রায়াল শুরু হবে। মনে রাখতে হবে, ফেজ থ্রি ট্রায়াল শুধু মাত্র সেখানেই হয় যেখানে ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। কিছুদিনের মধ্যে চীনের সাইনোভ্যাকের ফেজ থ্রির ট্রায়াল শুরু হবে বাংলাদশে, এটা বাংলাদেশের প্রতি চীনের বন্ধুত্বের কোনো নিদর্শন না, সরকারী সফলতা অথবা কোন মানবিক দৃষ্টিকোণের কারণে হচ্ছে না। বরং চীনের কাছে করোনা ভাইরাসের উর্বর ক্ষেত্র বলে বাংলাদেশ পরিচিত, সেকারণেই হচ্ছে।

অক্সফোর্ড এস্ট্রোকেনেকা ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার পর শরীরে দুটো অতিরিক্ত জিনিস লক্ষ্য করা গেছে। প্রথমত এন্টিবডি তো গঠিত হয়ই যা করোনা ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনকে ধ্বংস করে উপরন্তু এটি শরীরে টি-সেলও গঠন করছে। টি-সেল নামের শ্বেত রক্ত কণিকা বা হোয়াইট ব্লাড সেল দীর্ঘমেয়াদে এটি শরীরে অবস্থান করে। অপরদিকে টি-সেল ক্যান্সার সেল ধ্বংস করতেও সাহায্য করে। অতএব অক্সফোর্ড এস্ট্রোজেনেকা ভ্যাকসিন ডুয়েল ইমিউন ডেভেলপ করে মানব শরীরকে করোনাভাইরাস ও ক্যান্সার মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

ভ্যাকসিনের আরও কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে যেমন, কতদিনের মধ্যে ভ্যাকসিনটি সাধারণ মানুষের হাতে আসবে? এন্টিবডি মানব শরীরে কতদিন সক্রিয় থাকবে বা কতটা সময়ের জন্য ভ্যাকসিন মানব শরীরে ইমিউনিটি প্রোভাইড করে? কত সময় পর্যন্ত কোভিড-১৯ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব? এক বছর, দুই বছর নাকি আজীবন? যদি এন্টিবডি ৬০ দিন স্থায়ী হয় তাহলে কি ৬০ দিন পর আবার ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হবে? তাহলে লাভটা কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে ট্রায়ালের ফলাফলগুলো আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে৷ সময়ের সাথে সাথে সেসব জানা যাবে৷ তবে এই ব্যাপারে কিছু আর্টিকেল ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে, “Oxford vaccine shows early promise but market is unconvinced” এই অবস্থায় তবে পরবর্তী স্টেপ কোনটা হবে?

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের সাইড ইফেক্ট খুবই কম। বডি ফ্যাটিগ, মাথা ব্যথা, চিল, ইঞ্জেকশন সাইটে ব্যথা হতে পারে। মানব ইতিহাসে ভ্যাকসিনের প্রয়োগে সিরিয়াস টক্সিক ও মারাত্মক এলার্জির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। হিউম্যান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তিনটি এসপেক্ট থাকে। প্রথমে থাকে রিয়েক্টোজেনেসিটি। অর্থাৎ যখন ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয় তখন মানব শরীরে এডভান্স রিয়েকশন হচ্ছে কিনা এটা গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এক কথায় সাইড ইফেক্ট পর্যবেক্ষণই রিয়েক্টোজেনেসিটি। দ্বিতীয় এসপেক্ট হল ইমিউনোজেনেসিটি। যদি কোন ভ্যাকসিন অথবা মেডিকেশনের গুরুতর রিয়েক্টোজেনেসিটি না হয় তবে শরীরের ইমিউন সিস্টেম কি অবস্থায় আছে এটা পর্যবেক্ষণ করা হয়। তৃতীয়টি ফেজ থ্রিতে দেখা হয়, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেফটি- ভ্যাকসিনটি কি এতটা নিরাপদ যাতে করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মাঝে এর প্রয়োগ সম্ভব? এমন যদি হয় ভ্যাকসিন মানব শরীরে প্রয়োগ করা হল কিন্তু সেটা নিরাপদ না৷ তখন লাভের থেকে ক্ষতিই বরং বেশি হবে৷

অক্সফোর্ড এস্ট্রোজেনেকার ভ্যাকসিন সবগুলো ট্রায়ালে ইতিবাচক ফলাফল দেখিয়েছে। আনঅফিশিয়ালি এটি একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন। ফ্রেজ থ্রির ট্রায়াল শেষ করে খুব সম্ভবত ভ্যাকসিন ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে যাবে সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। তাদের সাথে অক্সফোর্ড এস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের ডোজ ম্যানুফ্যাকচারের আলাপ চলছে। যদি তা সম্পন্ন হয় তবে ভ্যাকসিন শুধু ভারতেই না ডেভলপিং দেশসমূহে রপ্তানিও করা হবে। কিন্তু এর আগে সেখানে ফেজ থ্রির ট্রায়াল করা বাধ্যতামূলক।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 − 46 =