জনগণের চাহিদা বনাম শিল্পীর স্বাধীনতা

দর্শকের রুচি অনুযায়ী সিনেমা বানানো কি নির্মাতার দায়? নাকি নির্মাতা যেটা বানাবে সেটা নিয়ে দর্শক নতুন রুচি তৈরী করবে?

এমন প্রশ্ন নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে মাথায় এলো, শাকিল প্রাইভেট কোম্পানি নতুন একটা প্রোডাক্ট বাজারে আনছে। যেটার মাধ্যমে আপনি যেখানে খুশি – বসে, হাঁটতে হাঁটতে, শুয়ে হিসুর কাজ সারতে পারবেন কোনো প্রকার পরিবেশ নোংরা করা ছাড়াই। এখন এই প্রোডাক্ট কি শাকিল প্রাইভেট কোম্পানি ক্রেতার চাহিদা বা রুচির উপর ভিত্তি করে বাজারে আনবে নাকি ক্রেতার নতুন একটা চাহিদা বা রুচি তৈরী করতে আনবে?
তেমনই আজ থেকে ১৫ বছর আগে আমরা কেউ ফেসবুকের সম্পর্কে জানতাম? জানতাম না। অথচ আজ এটি আমাদের জীবনের অপরিহার্য একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী সিনেমা বলুন, নাটক বলুন, গান বলুন কিছু করার দায় নেই। বরং শিল্পীর দায় নিজের কাছে। এটাকে অবশ্য দায় বলে ভারী করে ফেলারও কিছু নেই। শিল্প একেবারেই খামখেয়ালীর বিষয়। যেমন Van Gogh এর মনে হলো একজন মানুষের পশ্চাতে চার জোড়া স্তন বসিয়ে দিবে ; দিতেই পারে। এটা শিল্পীর স্বাধীনতা। এখন এটা আপনি বা আমি অশ্লীল বলে বাদ করে দিতেই পারি। কিন্তু সেটা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, Van Gogh এর নামে হুলিয়া জারি করে দিতে পারি না। আমার তার ওই ছবি দেখতে খারাপ লাগছে, আমি দেখবো না। এটা একজন ভদ্র সমাজের ভদ্র মানুষের আচরণ। এখন আপনারা যারা সিনেমা, ওয়েব সিরিজে অশ্লীলতা নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন তাদের অভদ্র বললাম কিনা ভাবছেন তাদের জন্য বলি, আপনারা অভদ্র বটেই! এরচেয়ে আরো নিকৃষ্ট কোনো শব্দ ব্যবহার করা গেলেও তা কম হবে।
এই যে আজকে কথায় কথায় বলা হচ্ছে, এগুলো বাঙালী সংস্কৃতি পরিপন্থী! এগুলো করা যাবে না বা সহনশীলভাবে করতে বলা হচ্ছে – তা এই দেশে কি বাতাসে প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যা হয়ে গেছে? কেউ কি ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে খাটের পায়ায় ঢিপি দিয়ে সেক্স করেন না? আপনি সাবালক হোন নি বলে দরজা-জানালা দিয়ে চুপিচুপি সেক্স করে ডজন খানেক বাচ্চা পয়দা করেছেন আর আমি সে বিষয়টাকে সিনেমায় ফুটিয়ে তুলেছি আমার মত করে, আমার স্বাধীনতায়। আপনি বাঁধা দেয়ার কে?
এখন আপনি বলতে পারেন এই দৃশ্যে এগুলো অপ্রাসঙ্গিক। এত চুমুর দৃশ্য, এতবার সেক্স – বড্ড বাড়াবাড়ি না? এখন একজন নির্মাতা তার সিনেমায় প্রাসঙ্গিক বিষয় রাখার সঙ্গে সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ও রাখার অধিকার রাখে। কই তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমায় যে হুটহাট আইটেম গান শুরু হয়ে যায়, সেটার পুরোটাই অপ্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে আপনাদের প্রশ্ন নেই কেনো? নাকি তারা করলে সবই প্রাসঙ্গিক।

সিনেমায় চুমু থাকবে, চুটিয়ে সেক্স করার দৃশ্য থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি থাকবেই। থাকতে পারবে না! সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না! এসব কথাবার্তা বলা কাকুদের বলতে চাই, আপনাদের এসব কথা শুনলে এতকালে শিল্পের নেংটিটা পর্যন্ত উধাও হয়ে যেতো৷ ফলে যারা বলছেন আমাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, নাটক, গান করতে হবে তাদের জন্য বলি, এখনকার সময়ে বটতলায় বসে লণ্ঠনের আলোতে পুঁথি পাঠের আসর জমানো পশ্চাৎপদতা বৈ আর কিছু নয়। আবার যাত্রাপালাকে ক্যামেরায় শুট করে ওয়েব প্ল্যাটফর্মে বেচে দেয়াটাও বড্ড জ্ঞানহীনতা।
সিনেমা, ওয়েব সিরিজে অশ্লীলতা আছে অভিযোগ না করে সিনেমা হল থেকে বের হয়ে চলে যেতে পারেন কিংবা ওয়েব প্ল্যাটফর্মে ওয়েব সিরিজ দেখে থাকলে সেটা পাল্টে মটুপাতলু কিংবা গোপাল ভাঁড় দেখতে পারেন৷ তবুও শিল্পে শিল্পীর স্বাধীনতায় নাক গলাবেন না। আপনাদের মন মত কাজ করার জন্য সইসাবুদ করি নাই যে যা বলবেন – কমাতে বলবেন কমাবো বাড়াতে বললেন বাড়াবো ; এমন কোন দায় শিল্পীর নাই৷ শিল্প সৃষ্টি করে নিজের জন্য, খামখেয়ালী থেকে৷ সুতরাং ওটাকে একেকটা থিউরী দিয়ে, ফতোয়া দিয়ে বেঁধে দিবেন, অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে আঁটকে দিবেন সে অধিকার শিল্পী ও শিল্প কোনা কাকা, দাদা মশাইদের দেয় নি।
এই যে আমাদের দেশে ভাঁড়ামোর নাটক, গৃহপালিত পরিবারের নাটক হয় তা নিয়ে কেউ কিছু বলে? নাট্যকার-নির্মাতাদের বেঁধে রাখা হয়, আইনী নোটিশ দেয়া হয়? হয় না তাহলে যৌনতার ক্ষেত্রেই কেনো এত এত কথা! এত এত অভিযোগ!! আপনারা কি মায়ের পেটে আপনা আপনি এসে গেছেন কিংবা আমাদের জন্ম এমনি এমনি হয়ে গেলো!(?)
সুতরাং বাঙলাদেশের সংস্কৃতিতে যেটা যায় না সেটা ভারতীয় সংস্কৃতিতে যায় আবার ভারতীয় সংস্কৃতিতে যেটা যায় না সেটা ইরোপীয় সংস্কৃতিতে যায়৷ আর যেহেতু সিনেমা, নাটক, গান, চিত্রশিল্প সর্বোপরি শিল্প ভৌগলীক সীমারেখা দ্বাটা নিয়ন্ত্রিত নয় এবং সময়, কাল, পাত্রভেদে মানুষের আচার-আচরণ পরিবর্তনশীল তাই আজ যে গল্পে, দৃশ্য ধারণ করে সিনেমা, ওয়েব সিরিজ নির্মাণ হচ্ছে কালকেও যে সেভাবেই, সে ধরণের গল্পে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ হবে এমন কোনো সীমারেখা এঁকে দেয়া যাবে না বা যেতে পারে না৷

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

61 − = 57