জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-2

এক জলথৈ-থৈ জলমগ্ন বিকেলে রাস্তায় কাপড় উঠিয়ে যখন হাঁটছিলাম আমরা, তখন আমাদের বাড়ির খালের ঘাটে লাগলো এক মালবাহি নৌকো। নৌকোতে মোট পাঁচজন মানুষ। মাঝবয়সি পোড়া চেহারার একজন পুরুষ মানুষ। তার স্ত্রী এবং তিন সন্তান। অনেক ঔৎসুক মানুষ দাঁড়িয়ে রইলো তাদের নৌকো ঘেষে ঘটনা। খবর পেয়ে আমার বাবা আর বড়ভাইও এলেন ঘাটে। কথা বলে জানলো, দূরবর্তী মেঘনার এক গাঁ থেকে এসেছে তারা। নদীতে গ্রাস করেছে তাদের বাড়িঘর গতকাল। তাই এ ভাড়া নৌকোতে আশ্রয়ের সন্ধানে সকালে রওয়ানা করে এখানে পৌঁছতে বিকেল হয়েছে তাদের। তারা জানেনা এ গাঁয়ের নাম কিংবা চেনেনা কিছু। আশ্রয় চাইলো তারা আমার বাবা আর ভাইর কাছে।

:

তিনটে বড় ঘর ছিল আমাদের বাড়িতে। যার একটা ছিল প্রায় পরিত্যক্ত। আমার বড়বোন বিধবা হওয়ার পর স্বামীর ইন্সুরেন্সের টাকাতে তুলেছিল ঐ ঘরটি নিজ আর সন্তানদের জন্য। কিন্তু ঘটনাক্রমে স্কুল দূরবর্তী হওয়াতে স্কুলের কাছে দুটো সন্তানসহ আমার বোন চলে যান আমাদের এক স্বজনের বাড়িতে। ঘাটে নৌকো বেঁধে বহিরাগত পাঁচ আশ্রয়প্রার্থীকে ঐ রাতের মত আশ্রয় দেয়া হয় আমাদের ঘরেই। মাঝিদের সাথে সারাদিন নৌকো বেয়েছে পুরুষ আর তার ১০/১২ বছরের কিশোর পুত্রটি। বড় আর ছোট সন্তানটি মেয়ে। তারাও পুরোদিন নৌকোতে ঘরের চালে বসে থেকে থেকে ক্লান্ত হয়েছে অভুক্ত থাকার কারণে। রাতে আমার মা ভাবী পেটভরে নানাবিধ খাবার খাওয়ালো তাদের। আমাদের ঘরের সবার জন্য রান্না করা সব ভাত খেয়ে ফেললো এ পাঁচজনে। সুতরাং আবার রান্না করতে হলো ২য় দফা আমাদের জন্য।

:

খবর পেয়ে পরদিন বড়বোন এলো নিজ ঘরে। তাদের অসহায় অবস্থা দেখে তার খালি ঘরে আপাতত থাকতে দিলো তাদের। পুরুষটির নাম কাসেম। সে এখানে ওখানে কাজ করবে। তার ভাঙা ঘর আপাতত আমাদের মিল ঘরের সামনে খোলা যায়গায় জড়ো করে রাখা হলো। কাসেমের কিশোর ছেলে হাসানকে নিয়ে গেল বোন তার ঘরের কাজকর্ম করার জন্য। কাসেমের স্ত্রী, বড়মেয়ে পারুল আর ছোট মেয়েটি আয়েশা রইলো মা বাবার সাথে। প্রথমে কদিন আমাদের রাইস মিলে দৈনিক শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করলো কাসেম। শেষে একটা জালের নৌকোতে কাজ জুটে গেল তার মাসিক বেতনে। কাসেমের বউ পাশের বাড়িতে আর তার দুই মেয়ে আমাদের ঘরে মা আর ভাবীর সাথে নানাবিধ কাজ করতো। বিনিময়ে খেতে পেতো তারা দুবোন আমাদের ঘরে।

:

সন্ধ্যার পর আমি সাধারণত পড়তে বসতাম। ঘর থেকে বেড় হতাম না। পারুল আর আয়েশা বসে থাকতো আমার পড়ার টেবিলের কাছে। বই পুস্তক খুলে দেখতো মাঝে মাঝে। কথা বলার চেষ্টা করতো। কিন্তু মা পড়া শেষ না করা পর্যন্ত কথা বলতে নিষেধ করতো ওদের কিংবা আমাদের। পারুল আমার বয়সে বড় ছিল। আর ছোট মেয়ে আয়েশা ছিল মাত্র ৬/৭ বছরের। ওদের পড়তে বললেও ওরা কখনো পড়তে চাইতো না। ভয় পেতো পড়াকে। কারণ ওরা যেখানে থাকতো সেখানে নাকি কোন স্কুল ছিলনা। তাই ওরা কখনো স্কুলে যায়নি বা বইপুস্তক ছুঁয়ে দেখেনি। একসন্ধ্যায় কি কারণে পারুলকে যেন মারলো ওর মা। সে কান্নাকাটি করে চলে এলো আমাদের ঘরে এবং শুয়ে রইলো আমাদের খাটে। যেখানে আমি আর মা ঘুমাতাম। রাতে বেশ কবার তার মা ডাকতে এলো তাকে কিন্তু সে ফিরে গেলনা তার মায়ের সাথে। শেষে আমার মা তাকে অনেক চেষ্টা করে ভাত খাওয়ালো কিন্তু রাতে আর সে তার মায়ের কাছে ফিরে গেলনা। রাতে ঘুমের মাঝে আমি অনুভব করলাম, সে তার বুকের মধ্যে আমাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। সারারাত বুক টিপটিপ করতে থাকলো আমার! ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলো।

:

কদিন পর গ্রামের এক জেলের সাথে বিয়ে ঠিক হলো পারুলের। বিয়ের কথা পাকা হওয়ার পর থেকে সারাক্ষণ হাসতো পারুল আমাকে দেখলেই। তার বিয়ের কথা বলে প্রায়ই তাকে খ্যাপাতাম আমি। লজ্জা পেয়ে সে মুখ লুকাতো। একদিন সত্যি সে একটা টিস্যু শাড়ি পরে ছোট এক ছইহীন খোলা নৌকাতে হোগলা পাতার চাটাই মাথায় দিয়ে বসে থাকলো। তার বর নিজে নৌকো বেয়ে তাকি নিয়ে গেল নিজ বাড়ি। কদিন পর আবার তার বাবার সাথে সে বেড়াতেও এলো আমাদের বাড়ি। স্বামীর ভালবাসার অনেক গল্প শোনালো সে আমাকে দুদিনে। তারপর আবার এক সন্ধ্যায় ছাতা মাথায় দিয়ে হেঁটে চলে গেল স্বামীর বাড়ি তার সাথেই। কিন্তু একদিন খবর এলো তার স্বামী কেবলালকে কি এক সাঁপে জেনে কামড় দিয়েছে জলমগ্ন বাগানে। খবর শুনে পারুলের বাবা কাসেম আর কেবলালের স্বজনরা ওঝা ডেকে আনলো দূর থেকে। আমরাও গেলাম সবাই। মাথার চুলে জটপাকানো আলকাতরার মত কোলো ওঝা পান চিবুতে দিলো কেবলালকে। পান মিষ্টি লাগছে তার এমন কথা বললো কেবলাল। শেষে পাকা বোম্বাই মরিচ চিবুতে দিলে কেবলাল তাও খেয়ে ফেললো পান পাতার মত। এসব দেখে চিন্তিত হলেন ওঝা। বললেন – “ডোর দিতে হবে”!

:

বাজার থেকে ব্লেড এনে তা দিয়ে পায়ের সাত আট স্থান চিড়ে কালো রক্ত বের করে রশি লাগিয়ে ডোর দিতে থাকলো সাপের ওঝা। কিন্তু ঘন্টা খানেকের মধ্যে মুখে মরিচ রেখেই ঢেলে পড়লো কেবলাল। ওর মুখের সাদা ফেনার সাথে বেড়িয়ে এলো পাকা বোম্বাই মরিচের টুকরো। ওঝা মুখ প্যাঁচার মত করে নাকের কাছে হাত নিয়ে বললো “নাই”! নাই শব্দটি শুনে ভেতর থেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো পারুল। কিন্তু এ কান্নার আর শেষ হলোনা। বিয়ের মাত্র দুমাসের মাথায় ছেলেকে সাঁপে কামড়ে হত্যা করেছে, তাই পারুলকে অপয়া হিসেবে ফিরে আসতে হলো অভাবী বাবার ঘরে। আবার পারুল কাজ শুরু করলো আমার মা আার ভাবীর সাথে। ধান সেদ্ধ করা, বিল থেকে মরিচের বস্তা আনা, উঠোন লেপা, তাতে ডাল মরিচ শুকোতে দেয়া, শুকনো খেসারি, মুশরি ডাল পিটিয়ে দানা বের করা, ঢেকিতে পার দেয়া এমন নানাবিধ কাজ করতো পারুল। সকাল ছটা থেকে শুরু করে রাত দশ এগারোটা পর্যন্ত নানাবিধ কাজ করতো সে। সম্ভবত নানাবিধ কাজে পারদর্শীতার কারণে মা আর ভাবী খুব ভালবাসতো পারুলকে। নানাবিধ কাপড়চোপড় কিনে দিতো তাকে। এমনকি তাকে আবার ভাল ছেলে দেখে বিয়ে দেবে এমন কথাও বলতো!

:

একবার নিজের পুরনো গ্রামে গেল পারুলের বাবা কাসেম। প্রায় পনের দিন পর ফিরলো সে। কারণ তাদের নদীতে ভেঙে যাওয়া জমি জাগছে। তাতে কে বা কারা নাকি বোরো ধানের চাষ করেছে। তাই লাঠিয়ালদের দখল থেকে নিজেদের জমিতে রক্ষার জন্য চরে চরে এ কদিন ঘুরে জলের মধ্যেই সীমানা ঠিক করতে এ সময়টা কাটিয়ে এসেছে কাসেম। দুমাস পর ধান পাকবে। তখন আবার ধান কাটতে যেতে চায় পারুলের বাবা ভাটার সময় জেগে ওঠা সেই চরে।

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : ২]

 

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

43 − = 39