দু-মুখো কে, তসলিমা না জনগণ ?

এই এলেন আরেক পন্ডিতের দল!

গত দু-একদিন ধরে এই একটি পোস্টের বেশ রমরমা দেখছি। এই পোস্টটি মূলত ২০১৯-এর তসলিমা নাসরিনের দুটো পোস্টের কোলাজ করে বানানো। প্রথম ছবিতে তিনি কোন এক রেস্টুরেন্টে ডাক রোস্টের সাথে কিছু খাচ্ছেন (non-veg) এবং দ্বিতীয় ছবিতে তিনি কুরবানীর বিষয় একটি ছোট্ট satire জাতীয় লেখা পোস্ট করেছেন।
এবং এই নিয়েই চলছে সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড়!
এক শ্রেণীর মানুষ তুমূলভাবে উঠে পড়েছেন এটা প্রমাণ করার জন্য যে তসলিমা নাসরিন একজন কত বড় hypocrite (অবশ্য গত পঁচিশ বছর ধরে এটা একটা বড্ড সাধারণ ব্যাপারই হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে), এবং সাথে bonus হিসেবে কদর্য ভাষায় গালিগালাজ তো আছেই!

এবার আসি আমার কথায়, আমার এতে কেন সমস্যা হচ্ছে? সমস্যা হচ্ছে, কারণ মানুষ আজকাল যেকোন মুক্তমনা ব্যক্তির বলা মূল কথায় কান না দিয়ে তাকে অকারণে oppose ও নীচু প্রমান করতে প্রচন্ড ব্যস্ত।

● আমি একজন vegan নই, এবং আমি কুরবানীর/পশুবলির (যেকোন ধর্মের অন্তর্গতই হোক না কেন) ভীষণ বিপক্ষে।

● প্রকৃতির নিয়মেই হোক বা যেকোন কারণেই হোক, আমরা নিজেদের স্বাভাবিক অস্তিত্ব বজায় রাখতে animal protein গ্রহণ করতে এক পর্যায়ে বাধ্য, এবং বিত্তশালীদের পক্ষে alternate Plant protein পেরমানেন্টলি গ্রহণ করা সম্ভব হলেও তারা অভ্যাস/ভালোলাগার কারণে সেটা করেন না। এই পরিস্থিতি আমরা চাইলেও ১০০% বদলাতে পারবো না কখনো। কিন্তু তাই বলে যদি আমরা এটা ভুলে যাই যে আমরা নিজেদের প্রানের জন্য আরো বহু প্রাণ ধ্বংস করছি, এবং তা নিয়ে যদি আমাদের মনে কোনরকম সমব্যথা, সমবেদনার উদ্রেক না হয় ; তা আসলেই লজ্জার, সমগ্র মনুষ্যত্বের কাছে।

● বহু ধর্ম-অন্ত প্রাণ মানুষের দাবি “কুরবানীর আসল লক্ষ্য গরীবদের মধ্যে সুখাদ্য বিতরণ / পরিবারের মঙ্গল ইত্যাদি”। যাক, সব ভালো কাজের লিস্টি মেনে নিলাম! যদি তাহলে এই সমাজ সচেতনমূলক কাজগুলোই আসল হয়, তবে মৃত্যু নিয়ে এই মোচ্ছবের অংশ বাদ পড়ছে না কেন?

● “মৃত্য নিয়ে মোচ্ছব” বাক্যটি শুনে আবার অনেকে রে রে করে আসতে পারে, তাই আরেকটু খুলে বলি। কুরবানীর দিনের বেশ কিছুদিন আগেই হাট থেকে গরু/মোষ বাড়িতে কিনে নিয়ে আসা হয় এবং তাকে যেকোন বাড়ির পোষ্যের মতো আদর যত্নে রাখা হয়। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের ছোট থেকে বড় অনেকের সাথেই এই প্রাণীটির একটি ভীষণ সুন্দর ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়ে ওঠে (বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আরো বেশি!)। এরপর যখন কুরবানীর দিন দিনের আলোয় মানুষ ভরা প্রাঙ্গনে তাকে নিয়ে আসা হয় হত্যা করার জন্য, সেই সময় সেই প্রাণীটির এবং তাকে নিজের জীবনে জড়িয়ে ফেলা ওই মানুষগুলির মানসিক অবস্থা কেমন হয় ভাবতে পারেন?
তারপর তো শুরু হবে আসল ধার্মিক কর্মকান্ড! প্রাণীটিকে হাজার চোখের মাঝে মারা হবে অনেক কান্ড করে, এবং কাজ পরিপূর্ণ হলেই শুনতে পাবেন চারিদিকে আনন্দের সে কি হুল্লোড়! কোন কাজ? – প্রাণীটির মৃত্যু। আর এখন তো digital এর যুগ, সেদিন খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন আরো এক বিকৃত শ্রেণীর মানুষের update, “celebrating কুরবানী with অমুক and 49 others” আর সাথে একটা সেলফি, যার ব্যাকগ্রাউন্ডে হয়তো মৃত্যুশয্যায় কাতর এক প্রাণী এবং চারপাশে রক্তের তান্ডব। এবং আস্তে আস্তে এটাই হয়ে উঠছে আমাদের

#New_Normal

● আমার বাড়ির দেখাশোনার জন্য নিযুক্ত এক দিদির (যিনি ধর্ম অনুযায়ী একজন মুসলিম) মুখ থেকে শুনেছিলাম এই দিনের নিয়ম অনুযায়ী নাকি কুরবানীর চত্বরে মেয়েদের থাকতে দেওয়া হয়না, তবে বাড়ির কোন পুরুষকে ঠিকই একদম সামনে থেকে এইসবের পরিচালনা করতে হয়।
কেন? পুরুষ বলে কি সে মানুষ না? প্রত্যেক বছর এই এক দৃশ্য দেখতে দেখতে তার মস্তিষ্কে কি প্রভাব পড়বে? ভেবে দেখেছেন? আর এই কাজ করতে করতে কি তার মনে হত্যা সম্বন্ধে এক অস্বাভাবিক মানসিকতা তৈরি হতে থাকবে না আস্তে আস্তে? এই পরিস্থিতিই কি একরকমভাবে Toxic Masculinity-কে প্রশ্রয় দিচ্ছে না?

● আমি তো না হয় নাস্তিক, এসব ধর্ম কর্ম কিছু বুঝিনা! কিন্তু যেই পরম ঈশ্বর/আল্লাহ/God কে নিয়ে এত কিছু, তিনি যদি থেকেও থাকেন, তিনি কখনো এই মৃত্যুর শোভাযাত্রা চাইবেন কি?!

● আমি নিরামিষাশী বলেই কুরবানীর বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে পারবো, আর যদি তা না হই তাহলেই আমাকে এই আড়ম্বরের সাথে চলতে থাকা মৃত্যুর উৎসবকে মেনে নিতে হবে… এই বা কেমন কথা?

যদি মানুষের মঙ্গলই আসল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে এই সমস্ত নিতান্ত বাজে উপলক্ষ্য ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু আজকাল তো আবার সবেতেই

লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষ্য বেশি!

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 73 = 76