জন্মান্তর (উপন্যাস: পর্ব-আঠারো)

দশ

 

এখন অনেক রাত, চারপাশ ঝিমিয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেছে, গরমে বারান্দার চেয়ারে এসে বসতেই হঠাৎ সন্ধ্যায় দেখা বাসের লোকটির কথা মনে পড়ে। সন্ধ্যার পর আবির আর আমি বান্দরবান ভ্রমণের জন্য কলাবাগান থেকে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ আর টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনে শাশ্বতীদি-পরাগদার বাসায় গিয়েছিলাম ভ্রমণ সংক্রান্ত শলাপরামর্শ করতে। মিরপুর থেকে যাবার সময় আমার পাশের সিটে বসে এক বৃদ্ধ, বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে জিকির শুরু করে। লোকটা সামনে-পিছনে মাথা দুলিয়ে জিকির করার ফাঁকে ফাঁকে আমার দিকে তাকায়, তার মুখের পান-সুপারি-জর্দা পচা গন্ধে গুলিয়ে ওঠে আমার পেট। একবার চোখে-মুখে বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকালে জিকিরের শব্দ এবং গতি আরো বেড়ে যায়। মুখের দূর্গন্ধে টিকতে না পেরে এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে নিজেই উঠে দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। পাবলিক বাস যে জিকির করার জায়গা নয়, সেটা বোঝাতে গেলেই হয়তো বাসের অধিকাংশ যাত্রী আমার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যেতো, ফলে আমি নিজেই সরে যাই অন্যখানে। এটাও সংখ্যালঘুর প্রতি সংখ্যাগুরুর এক ধরনের নিপীড়ন, কিন্তু তা বোঝার মতো বোধ অধিকাংশ সংখ্যাগুরুর নেই।

মোবাইলে ফেসবুকে ঢুকে দেখি আরশাদ ফকিরের আখড়ায় হামলার প্রতিবাদে আবির একটা স্ট্যাটাস দিয়েছে। কে আরশাদ ফকির, কোথাকার আরশাদ ফকির, এই সমাজের কয়জনই বা তার আখড়া পোড়ানোর খবরে বিচলিত হয়! অধিকাংশ মানুষ-ই ফেসবুকে ব্যস্ত মুখ বিকৃত করে তোলা বাহারি সব সেলফি শেয়ার আর লাগামহীন আত্মপ্রচার করায়। সামাজিক অবক্ষয় খুব বেশি মানুষের চেতনায় নাড়া দেয় না, কিন্তু অবক্ষয় এমনই সংক্রামক যে ক্রমান্বয়ে সকলকেই ক্ষয় করে।

আবিরের স্ট্যাটাস পড়ার পর নিচের দিকে নামতেই দেখি শাশ্বতীদি জন্মান্তরের শেষ পর্ব শেয়ার দিয়েছে। যথারীতি গালির বন্যা বইয়ে দিয়েছে ছাগুর দল, আছে অসময়ের বৃষ্টির মতো ছিটেফোঁটা প্রশংসাও। পল্লবী লিখেছে, ‘আমার কী ঈর্ষা হচ্ছে? না, কান্না পাচ্ছে। বেঁচে থাকার অক্সিজেন পেলাম দিদি।’

শাশ্বতীদির বাসাতেই পল্লবীর সঙ্গে আমার সামনাসামনি পরিচয়, তবে তার আগে থেকেই ওকে নামে চিনতাম। শাশ্বতীদি-ই বলেছিল ওর কথা, দিদির ফেসবুক স্ট্যাটাসেও ওকে মন্তব্য করতে দেখতাম মাঝে মাঝে। পল্লবীর জৈবলিঙ্গ পুরুষের হলেও মনোলিঙ্গ নারীর। ওর পিতৃ-মাতৃ প্রদত্ত নাম আনোয়ার হোসেন, পল্লব নামে ডাকতো সবাই। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ থেকে ও পুরোপুরি নারীর বেশ ধারণ করে সারাফ আতিকা পল্লবী নামে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করে। প্রথম পরিচয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের দু-জনের জন্যই খানিকটা তেতো। তখন শাশ্বতীদি আমাদের জন্য খাবার বানাচ্ছিল। ড্রয়িংরুমে ছিলাম আমি, পরাগদা, পল্লবী আর ওর বান্ধবী।

আমি পল্লবী নামের আগে সহি শব্দদ্বয় ‘সারাফ আতিকা’ নামের অর্থ জানতে চাইলে ও বেশ ভাবের সঙ্গে বলে, ‘গানরত সুন্দরী!’

‘বা, খুব ভাল নাম তো! কে রেখেছে, আপনি নিজেই না অন্য কেউ?’

মুখে গর্বের হাসি ছড়িয়ে বলে, ‘আমিই!’

‘সারাফ আতিকা আরবি কিংবা ফারসি শব্দ, আপনার এই নাম গ্রহণের কোনো বিশেষত্ব আছে কী?

পরিস্থিতি আগাম আঁচ করতে পেরেই কিনা কে জানে পরাগদা শাশ্বতীদির কাজের অগ্রগতির খোঁজ নিতে কিচেনের দিকে চলে যান।

পল্লবী বলে, ‘না তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই, নামটা আমার পছন্দ হয়েছে তাই।’

‘এই আরবি কিংবা ফারসি ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো ভাষার নাম আপনার পছন্দ হলো না কেন?’

‘আসলে আরবি নাম রাখা তো ইসলামী রেওয়াজ, তাই।’

‘কিন্তু ইসলামে তো সুন্দরীদের গান গাওয়াই নিষেধ!’

‘কে বললো আপনাকে?’

‘কোরান-হাদিস বলেছে। আমার কথা বিশ্বাস না হয় আপনি কোনো মাওলানাকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন।’

‘ওগুলো তো এক নম্বর হারামি! আমি ওদের কথা বিশ্বাস করি না, ওরা ভণ্ড, ভেক ধরে থাকে আর মিথ্যা কথা বলে, আকাম-কুকাম করে!’

আমি মৃদু হেসে বলি, ‘আপনি আল্লাহ্-নবী-ইসলাম এসবে বিশ্বাস করেন?’

‘অবশ্যই করি।’

‘আপনার আল্লাহ’র নবী আপনার মতো মানুষদেরকে কী করতে বলেছেন জানেন?’

‘কী?’

‘ঘর থেকে বের করে দিতে বলেছেন, নির্বাসনে পাঠাতে বলেছেন।’

‘এসব মিথ্যে কথা।’

‘সত্য কথা।’

‘ইসলামে এসব থাকতেই পারে না, কোনো ধর্মেই না।’

ও বেশ উত্তেজিত। ওকে কিছুক্ষণ ধর্মের ছাফাই গাওয়ার সুযোগ দিই। ওর বান্ধবীও বলতে শুরু করে। ওরা বেশ জ্ঞানগর্ভ কথা বলে আর আমি শুনি। তারপর বলি, ‘আমি যদি আপনাদেরকে প্রমাণ দেখাই, তাহলে বিশ্বাস করবেন?’

‘আপনি দেখান প্রমাণ।’

ততোক্ষণে খাবার নিয়ে পরাগদা আর শাশ্বতীদি চলে এসেছেন। আমি মোবাইলে রাখা বোখারি শরিফের পিডিএফ ফাইল খুলে পল্লবী আর ওর বান্ধবীকে দেখাই যে হিজড়া কিংবা ছেলেদের মতো আচরণ করা মেয়ে অথবা মেয়েদের মতো আচরণ করা ছেলেদের সম্পর্কে ওদের পেয়ারের নবী কী বলেছে!

ওরা হাওয়া বের করা বেলুনের মতো চুপসে যায়, বিশেষত পল্লবী! সেদিন সন্ধ্যায় আমার সামনে ওরা আর স্বতস্ফুর্ত হতে পারেনি। কয়েকদিন পরেই ফেসবুকে দেখি সারাফ আতিকা ছেটে ফেলে ও শুধু পল্লবী হয়ে গেছে। আর আমকে পাঠিয়েছে একটি বার্তা- ‘সেদিন আপনার সঙ্গে তর্ক করার জন্য দুঃখিত। আসলে ধর্ম সম্পর্কে আমি খুব বেশি কিছু জানি না। আমার জানা ততোটুকুই যতোটুকু শুনেছি বড়োদের মুখে। তবে সেদিনের পর থেকে ধর্মগ্রন্থ পড়তে শুরু করেছি। আবার দেখা হবে, শুভরাত্রি।’

তারপর আমাদের মধ্যে ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেছে, একই বয়সী হওয়ায় আপনি’র ব্যবধান ঘুচিয়ে আমরা এখন তুই সম্বোধন করি। অনেকবার শাশ্বতীদির বাসায় আমাদের আড্ডা হয়েছে। আমরা একবার একসাথে ঘুরতেও গেছি গারো পাহাড়ে। জেনেছি ওর ভেতরের গোপন ব্যথার কথা। ওর বাবা-মা ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেননি ঠিকই, কিন্তু ওর প্রতি তাদের আচরণ খুব একটা সুখকর নয়। বিশেষত ওর ভাই-বোনেরা ওর প্রতি খুবই বিরূপ, তারা সমাজে ওর পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে। সামাজিক, ধর্মীয় বা যে-কোনো ধরনের অনুষ্ঠানে তারা ওর সঙ্গে যায় না। কৈশোরে ওকে অনেকবার ধর্ষণ করেছে ওর মামাতো-খালাতো ভাইয়েরা। ওর দ্বিগুণ বয়েসের এক মামাতো ভাই ঘন ঘন ওদের বাড়িতে বেড়াতে আসতো, যেহেতু বাড়িতে অতিরিক্ত ঘর ছিল না, তাই মামাতো ভাই এলেই ওর সঙ্গে শুতো আর নানান রকম প্রলোভন দেখিয়ে ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনসঙ্গম করতো। ভয়ে-লজ্জায় ও সে-সব কথা কাউকেই বলতে পারে নি। ওর সেই মামাতো ভাই এখন দাড়ি রেখে, টুপি-পাঞ্জাবি পরে হুজুর হয়েছে; এলাকার মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছে।

আমি শাশ্বতীদির ব্লগ পোস্টের লিংকে ঢুকে পড়তে শুরু করি-

 

জন্মান্তর (শেষ পর্ব)

 

অনার্সের রেজাল্ট হওয়ার পরপরই আমি ফুলটাইম চাকরিতে ঢুকে পড়লাম-এনজিও’তে, আর অরিত্র একটা স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলো। পড়াশোনার ক্ষতি হবে বলে অরিত্র’র বাড়ি থেকে ওর বাবা-মা ওকে মাস্টার্স শেষ করার পর চাকরি করার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু ও চাকরি ছাড়েনি। আসলে তখন আমরা আর হলে থাকতে চাইছিলাম, বাসা নিয়ে নিজেদের মতো থাকতে চেয়েছিলাম, ফলে টাকার প্রয়োজন ছিল আমাদের। আমরা দুই রুমের ছোট্ট বাসা ভাড়া নিলাম আজিমপুরে; একটা আমাদের থাকার ঘর, আরেকটা বসার। একটু একটু করে আমরা সবকিছু নিজেদের রুচি মতো গুছিয়ে নিচ্ছিলাম, কিন্তু দুই মাসের মাথায় আমাদেরকে বাসা ছাড়তে হলো। পহেলা বৈশাখে আমি শাড়ি-চুড়ি পরে সেজেগুঁজে বেরিয়েছিলাম অরিত্র’র সঙ্গে, সেই প্রথম আমি নারীর বেশে প্রকাশ্যে ওর সঙ্গে বের হলাম। আমি লালপাড় সাদা শাড়ি আর লাল ব্লাউজ পরেছিলাম, নববর্ষ উপলক্ষে চাঁদনী চক থেকে কিনে অরিত্র আমায় উপহার দিয়েছিল। সেই প্রথম আমার নিজের একটা শাড়ি হলো, একদম নিজের! এর আগে আমি বাড়িতে বেশ কয়েকবার দরজা বন্ধ করে মায়ের শাড়ি লুকিয়ে পরেছিলাম, তুলিভাবীও কয়েকবার তার শাড়ি আমাকে পরিয়ে দিয়েছিল, সে-ও বদ্ধ ঘরে! নববর্ষের আগের রাতে আমি শাড়িটা হাতে নিয়ে বারবার গন্ধ শুকেছিলাম, ভীষণ উত্তেজনায় ছিলাম এই ভেবে যে কাল আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে, কাল আমি আমার প্রিয়জনের উপহার দেওয়া শাড়ি পরে তার হাত ধরেই ঘুরতে যাব। আমিও অরিত্রকে উপহার দিয়েছিলাম পাঞ্জাবি আর পাজামা। দু-জন দু-জনের উপহার দেওয়া পোশাক পরে নববর্ষের সকালে বেরিয়েছিলাম; চাঁদি ফাটানো রোদে সারাটা দিন টিএসসি, সোহরওয়ার্দী উদ্যান, চারুকলায় ঘুরে আর নিজেদের পছন্দ মতো খাবার খেয়ে কী যে ভাল কেটেছিল আমাদের সময়! অরিত্র তো আগেও বেরিয়েছে ওর আগের প্রেমিকাকে নিয়ে, কিন্তু আমি তো প্রথম, তাই আমার উত্তেজনা আর উচ্ছ্বাস ছিল বাঁধ ভাঙা! সারাটা দিন অতুল আনন্দে কাটিয়ে বাসায় ফেরার দশ মিনিটের মধ্যেই আমাদের সারাদিনের আনন্দ মাটি করতে হাজির হলো বাড়িওয়ালা, আমাদের বাসা ছেড়ে দিতে হবে!

আমি তখন ভেতরের ঘরে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার ফুলের মালা খুলছিলাম। কিন্তু আমার কান অরিত্র আর বাড়িওয়ালার কথায়। অরিত্র বললো, ‘আংকেল, আমরা গতমাসে উঠলাম, আর এখনই আমাদের বাসা ছেড়ে দিতে বলছেন কেন?’

‘এমনিই, আমার এক আত্মীয়রে তুলুম।’

‘আপনার আত্মীয়কে তুলবেন বেশ ভাল কথা, তাহলে শুধু শুধু দুই মাসের জন্য বাসা ভাড়া দিয়ে আমাদেরকে হয়রানি করলেন কেন? কী হয়েছে বলেন তো?’

‘কিছু অয় নাই, তোমরা বাসা ছাইড়া দ্যাও।’ বাড়িওয়ালার কথাবার্তা শুরু থেকেই রুক্ষ।

‘বাসা ছাড়তে হলেও এ মাসে ছাড়তে পারবো না, তিনমাস সময় দিতে হবে।’

‘না, তোমাগো এই মাসেই বাসা ছাড়তে অইবো।’

অরিত্র বেশ চড়া গলায় বললো, ‘আপনি বললেই হলো! আজকে মাসের চৌদ্দ তারিখ, চৌদ্দ তারিখে আপনি কোনো ভাড়াটিয়াকে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিতে পারেন না। কথা ছিল আমরা বাসা ছাড়লে পাঁচ তারিখের মধ্যে বলতে হবে, আবার বাসা ছাড়তে হলে আপনিও আমাদেরকে পাঁচ তারিখের মধ্যে বলবেন।’

বাড়িওয়ালাও গলা চড়ালো, ‘বাসা ভাড়া নেওনের সময় তোমরাও তো কইছিলা যে তোমরা দুই বন্ধু, অহন তো দেখতাছি তোমার লগেরডা হিজড়া; মাইয়াগো মতো কাপড় পইরা ঘর থেইকা বাইর অয়!’

শুনে আমি তো থ! শাড়ির আঁচলটা বিছানায় ফেলে সবে কোমর থেকে কুঁচিগুলো বের করেছি; থমকে গেল আমার হাত।

অরিত্র বললো, ‘একজন মানুষ নিজেকে ছেলে ভাববে নাকি মেয়ে ভাববে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সে শাড়ি পরে বাইরে যাবে নাকি জিন্স পরে বাইরে যাবে, সেটাও তার ব্যক্তিগত ব্যাপার; আমি বা আপনি তার পোশাক-পরিচ্ছদ ঠিক করে দিতে পারি না।’

‘আমার বাসা আমি কারে ভাড়া দিমু আর কারে দিমু না সেইডাও আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার বাড়িতে আমি হিজড়া ভাড়া দিমু না।’

আমি হাতে ধরে থাকা কুঁচিগুলো পুনরায় কোমরে গুঁজে, আঁচলটা বিছানা থেকে কুড়িয়ে কাঁধে ফেলে দু-জনের বাক-বিতণ্ডার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম, বাড়িওয়ালা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জোর গলায় কথা বলছিল আর তার বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে অরিত্র। বাড়িওয়ালা আমাকে দেখে আমার দিকে আঙুল তুলে বললো, ‘অয় তো একটা হিজড়া, অস্বীকার করতে পারবা? অস্বীকার করো তো পাঁচজনরে ডাক দিয়া দ্যাহাই, দেহুক সবাই অয় হিজড়া কিনা!’

অরিত্র’র চোখ-মুখ রক্তবর্ণ, বাড়িওয়ালা আবার বললো, ‘অ্যাদ্দিন ওরে প্যান্ট পইরা ঘুইরা বেড়াইতে দেখছি, আইজ আবার পরছে কাপড়; ব্যাটা মানুষ আবার কাপড় পরেনি! ওরে তো আমি দাড়িও কামাইতে দেখছি, মাইয়া মাইনষের মুহে দাড়ি গজায় এই কতা বাপের জন্মে কেউ কোনোদিন হুনছে? পরথমে বুঝি নাই, অহন তো কিলাশ টুয়ের বাচ্চাও ওরে দেইখা বুঝবো যে অয় একটা হিজড়া!’

অরিত্র বললো, ‘পুরুষের দেহ নিয়ে জন্মালেও নিজেকে ও মেয়ে-ই মনে করে।’

‘আস্তাকফিরুল্লাহ্! কয় কী, কোনো পোলায়নি নিজেরে মাইয়া ভাবে, হিজড়া কুনহানকার একটা!’

‘আপনি ভদ্রভাবে কথা বলেন, অসভ্যের মতো কথা বলবেন না।’

‘একটা হিজড়ারে নিয়া হুইয়া থাহো, আবার আমারে ভদ্রতা শেহাও!’

‘আমি কাকে নিয়ে শুয়ে থাকবো সেটা আপনি ঠিক করে দেবেন?’

আমি বললাম, ‘আংকেল আমি একজন নারী, কেন আমি নারী সেই ব্যাখ্যা আপনাকে দিতাম যদি তা বোঝার মতো নূন্যতম সু-শিক্ষা আপনার থাকতো; কিন্তু আপনার সেই সু-শিক্ষা নেই, সুতরাং আপনাকে বলেও কোনো লাভ নেই।’

‘কি মনে করছো তোমরা, আমি অশিক্ষিত? ছিয়াত্তর সালে বি এ পাশ করছি। তহন তোমাগো জন্মও অয় নাই!’

‘আপনি খেটেখুটে একটা অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট বগলদাবা করেছেন, কিন্তু সু-শিক্ষা পাননি।’

‘তুমি চুপ থাহো, বেহায়া হিজড়া কুনহানকার!’

অরিত্র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো বললো, ‘আপনি যান, আমরা এই মাসেই আপনার বাসা ছেড়ে দেব, আপনার মতো অসভ্য ইতরের বাসায় আমার আর ভাল ঘুম হবে না।’

‘মুখ সামলাইয়া কথা কও বেয়াদ্দপ, চিনো আমারে!’

অরিত্র বাড়িওয়ালার চোখে রক্তচক্ষু রেখে আঙুল তুলে বললো, ‘আপনি যে চ্যাটের বাল হরিদাস পাল-ই হন, আপনারে বাল দিয়েও পোছার টাইম নাই আমার! বলছি বাসা ছেড়ে দেব, আর একটা কথাও বাড়াবেন না, আমার সামনের থেকে বিদায় হন।’

‘মুখ সামলাইয়া কতা কও, বেয়াদ্দপ পোলা! আমার বাসার থাইকা তুমি আমারে বাইর করে দেওনের ক্যাডা?’

‘আপনার বাসায় মাঙনা থাকি না, টাকা দিয়ে ভাড়া নিয়েছি, আপনি অসভ্যতা করলে আপনাকে বের করে দেবার রাইট আমাদের আছে।’

দু-জনের তর্ক-বিতর্ক শুনে বাড়িওয়ালার মেয়ে এবং স্ত্রী আমাদের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। তারাও পিছন থেকে টুকরো টুকরো বাক্য নিক্ষেপ করতে লাগলো। আমি অরিত্র’র কাছে গিয়ে বললাম, ‘বাদ দাও, আর একটা কথাও বলবে না।’

বাড়িওয়ালার উদ্দেশে বললাম, ‘আপনি যান, আমরা এক তারিখে বাসা ছেড়ে দেব।’

বাড়িওয়ালা আমার দিকে তাকালোও না। অরিত্র’র দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমি চাইলে এই মুহূর্তে তোমাগো ঘাড় ধইরা বাড়ি থেইকা বাইর কইরা দিতে পারি।’

নারাচের বিপরীতে অরিত্রও পাল্টা ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করলো, ‘ঢাকা কলেজের হল থেকে আমার নাম এখনো কাটা যায় নাই, আপনার বাড়ি শ্মশান বানাইতে আমার ত্রিশ মিনিটও লাগবে না!’

ব্রহ্মাস্ত্রে যে কাজ হলো তা বুঝলাম বাড়িওয়ালার মুখাবয়বের আকর্ষিক পরিবর্তন দেখে, কিন্তু তিনি মুখে হারতে চাইলেন না, ‘আমারে হলের গুণ্ডা পোলাপাইনের ভয় দ্যাহাও! তোমারে কি করতে পারি জানো?’

‘আপনি যা পারেন ছিঁড়েন যান, তারপর আমিও দ্যাখাবো আমি কেমন আঁটি বাঁধতে পারি!’

বাড়িওয়ালার মেয়ে পিছন থেকে তার হাত ধরে টানলো, ‘আব্বু চলে আসো, হোস্টেলের এইসব ছেলেরা খুব ডেঞ্জারাস হয়।’

বাড়িওয়ালাকে তার মেয়ে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল। এরই মধ্যে সিঁড়ির কাছে অন্য ভাড়াটিয়ারা জড়ো হয়েছে। নিচের দিকের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একজন বললো, ‘ছি ছি, ভদ্রলোকের বাসায় এসব কী! দুনিয়ায় এ কী শুরু অইলো, কেয়ামতের আর দেরি নাই!’

লোকটাকে কিছু বলার জন্য অরিত্র দরজার দিকে এগোতেই আমি ওর হাত ধরলাম, আমার হাত ছাড়িয়ে দরজার বাইরে গিয়ে ও লোকটার উদ্দেশে বললো, ‘ওই তুই কোন বালের ভদ্রলোকরে, পিছন থেকে উঁকি দিয়ে কথা বলিস ক্যান, সামনে এসে কথা বল তোর কেয়ামত এক্ষুনি দ্যাখায়ে দেই!’

কোনো কথা না বলে লোকটা সুড়সুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল, অন্য ভাড়াটিয়ারাও সরে পড়লো। বাড়িওয়ালা, তার স্ত্রী আর মেয়ে গজগজ করতে করতে চলে গেল। অরিত্র ক্ষোভের সাথে শব্দ করে দরজা বন্ধ করলো।

ওইদিনের আগে আমি ওকে কখনোই রাগ করতে দেখিনি, ও যে ওভাবে রেগে যেতে পারে তা আমি ভাবতেও পারিনি। ও আমার অপমান হজম করে বাড়িওয়ালার সাথে পুতুপুতু ভাষায় কথা না বলে জোর গলায় প্রতিবাদ করেছিল, এমনকি স্ল্যাং-ও ব্যবহার করেছিল; এটা যে কী ভাল লেগেছিল আমার তা বলার নয়, ওর জন্য গর্বে বুকটা ভরে উঠেছিল! সেদিন আমি আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম, ওকে ভালবেসে আমি একটুও ভুল করিনি, প্রয়োজনে ও আমার জন্য জীবন দিতেও দ্বিধা করবে না; ও আমার জীবনের এক অমূল্য প্রাপ্তি!

পরের মাসেই আমরা মোহাম্মদপুরে নতুন বাসায় উঠলাম। নতুন ভাবে নিজেদের মতো করে সাজালাম বাসাটা। তবে আমি আর শাড়ি পরে বাইরে বের হতাম না নতুন কোনো ঝামেলার আশঙ্কায়, এ ব্যাপারে অরিত্রও আমাকে কিছু বলতো না।

এরপরই আরেক আঘাত পেলাম আমার বাড়ি থেকে। আব্বা-আম্মা আমার জন্য আগে থেকেই পাত্রী ঠিক করে রেখেছিলেন, আব্বার ফুফাতো বোনের মেয়ে। তারা কাবিন করে রাখতে চায়, তারপর দু-এক বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে বউকে বাড়িতে আনা হবে। শুনে আমি মোটেও অবাক হইনি, কেননা আমি জানতাম যে কোনো একদিন আমাকে এই বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হবে। কিন্তু নিজে থেকে কী করে আব্বা-আম্মাকে খুলে বলি! আমি খুলে বললে আব্বার যে উগ্র প্রতিক্রিয়া হবে, আম্মার যে বেদনাতুর নীরবতা আর কান্না আমাকে দেখতে হবে, সেই পরিস্থিতি আমার জন্য মোটেও সুখের হবে না। তাই তুলিভাবীর স্মরণাপন্ন হলাম, তুলিভাবী আগে বাড়িতে বলুক, আব্বা-আম্মা আগে প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলাক তারপর আমি তাদের মুখোমুখি হবো। তুলিভাবী আমার আর অরিত্র’র ব্যাপারে আগে থেকেই সব জানতো, অরিত্রকে সে দেখেছেও। সেই যে আমি যশোর থেকে চলে এলাম, তারপর কথা মতো ঢাকায় ফেরার পথে অরিত্র আমাদের বাড়িতে এসেছিল, তিনদিন ছিল। আমার আব্বা-আম্মা আর বুবুরা ওকে আমার বন্ধু হিসেবে খুব পছন্দ করেছিল। তখনই অরিত্র’র সঙ্গে তুলিভাবীর পরিচয় করিয়ে দিই, তাকে সব খুলে বলি, আর তখন থেকেই ওর সঙ্গেও তুলিভাবীর দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে; যা আজো অটুট। তুলিভাবী সম্পর্কে সব কথা আমি আগেই বলেছিলাম অরিত্রকে। শ্মশানঘাটে আমাদের নতুন জীবন শুরুর আগে থেকেই আমরা দু-জন দু-জনের অতীতের সকল কথা জানতাম।

তুলিভাবী বাড়িতে বলার পর আব্বা আমাকে ফোন দেননি, আমার তিন বুবু, দুই দুলাভাই আর মা ফোন দিয়েছিলেন; ছোটবুবুর তখনো বিয়ে হয়নি। আম্মা ফোন করে রীতিমতো কান্নাকাটি শুরু করলেন। আমি তাদেরকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমার শরীর যা চায়, মন যা চায়, তার ওপর তো আমি জোর করতে পারি না; তোমরা আঘাত পাবে বলেই আমি এতোদিন একথা কাউকে বলিনি বা মেয়ের মতো জীবন-যাপন করিনি; কিন্তু নিজেকে আমি মেয়ে বলেই মনে করি। তারা আমায় বাড়ি যেতে বললেন, পরদিনই গেলাম বাড়িতে। বাড়ি যাবার আগে অরিত্র আমাকে বারবার বোঝালো যে আমি যেন কোনোভাবেই রেগে না যাই, সবাইকে ঠান্ডা মাথায় বোঝাই। বাড়ি গিয়ে ঘরে ঢোকামাত্র আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ-মাউ করে এমনভাবে কাঁদতে শুরু করলেন যেন আমার কোনো মৃত্যুরোগ হয়েছে! ছোটবুবু নীরবে চোখের জল ফেললো অদূরে দাঁড়িয়ে। সেদিন বিকেলেই বড়ো বুবু এলো ছোটো ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে, কাজ থাকায় বড়ো দুলাভাই আসতে পারলেন না; সন্ধ্যায় এলো মেজো বুবু আর মেজো দুলাভাই। আব্বার সাথে একবার মুখোমুখি দেখা হলেও আমার সাথে কথা বললেন না। আব্বা আমার কাছ থেকে লুকোতে চাইলেন, কোথায় যেন গেলেন, রাতের আগে আর বাড়ি ফিরলেন না।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আমাদের বসার ঘরে সবাই আমাকে নিয়ে বসলেন, ভাগ্নেকে অন্যঘরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল আগেই। সকলেই উদ্বিগ্ন, সেটা স্বাভাবিক; কেননা আমি সবার ছোট এবং সকলেরই আদরের; সবাই যেখানে অপেক্ষায় আছে আমার একটা লাল টুকটুকে বউ দেখার, সেখানে আমি নিজেই কিনা আরেকজনের বউ হতে চাই! যদিও তুলিভাবী আব্বা-আম্মাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছে, তবু সকলেই আমার মুখ থেকে বৃত্তান্ত শুনতে চাইলেন। আব্বার সামনে আমার বলতে লজ্জা লাগলেও আমি তাদেরকে বুঝিয়ে বললাম মনোলিঙ্গ-জৈবলিঙ্গ সম্পর্কে; বোঝালাম যে আমার দেহটা পুরুষের হলেও মনটা নারীর; নিজেকে আমি নারী-ই মনে করি।’

আব্বা বিষন্ন-শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘পুরুষ মানুষের লিঙ্গ থাকলি সে কখনো মেয়ে হয় না।’

আমি আব্বার দিকে না তাকিয়েই বললাম, ‘আব্বা হয়। এটা বৈজ্ঞানিকভবেও প্রমাণিত।’

‘বিজ্ঞান যদি সবকিছু প্রমাণ করবার পারতো, তালি তো হায়াত-মউত সব বৈজ্ঞানিকরাই নিয়ন্ত্রণ করতো। মানুষ আর আল্লারে না ডাকে বৈজ্ঞানিকদের আল্লাহ’র জায়গায় বসাতো।’

আমার আব্বা অশিক্ষিত নন, শিক্ষিত এবং সরকারী চাকুরে। তাকে বেশি বোঝাতে গেলে তিনিও হয়তো আমাকে বলবেন যে তুমি আমার চেয়ে বেশি বোঝো, আমি অমুক সালে বিএ পাশ করেছি, তোমার জন্ম দিয়েছি! এরা বিজ্ঞান মনস্ক নয়, আল্লাহ মনস্ক! সেন্ট মার্টিন থেকে সাঁতরে অষ্ট্রেলিয়া যাওয়া আর এদেরকে বিজ্ঞান বোঝানো একই কথা! আমি অসহায়ের মতো কথা খুঁজতে লাগলাম, কীভাবে আব্বাকে বোঝাবো তা ভাবতে লাগলাম। জীবনে এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি আমি কখনো হইনি।

তারপর আমার ওই অসহায় অবস্থার মধ্যেই আব্বা যা বললেন তা শুনে আমি রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেলাম! আব্বা গম্ভীরকণ্ঠে বললেন, ‘আমি ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলছি। তিনি বলছেন যে ওর তো পুরুষ লিঙ্গ আছে, যার পুরুষ লিঙ্গ আছে সে কখনো মেয়ে হয় না। ওর ওপর কালা জ্বীনের আছর পড়ছে, ঝাড়ফুঁক করলি-ই সব ঠিক হয়ে যাবেনে।’

আমি হাঁ হয়ে তাকালাম আব্বার দিকে। আব্বা আবার বললেন, ‘কাল রাততিরি ইমাম সাহেব দোয়া-দরুদ পড়ে ঝাড়ফুঁক করবার আসপেনে।’

আমি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম, ‘আব্বা জ্বীন-ভূত বলে পৃথিবীতে কিছু নেই, ঝাড়ফুঁক করে জগতের কোনো রোগই নিরাময় করা সম্ভব নয়। আর আমার কোনো রোগ হয়নি, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।’

‘কালা জ্বীনের আছর লাগা রোগী কখনো নিজের রোগ বোঝে না। কাল ইমাম সাহেব ঝাড়ফুঁক করবার আসপি, এইটাই আমার শেষ কথা।’

আমি মেজো দুলাভাই আর বুবুদের উদ্দেশে বললাম, ‘বুবু তোমরা চুপ করে আছো কেন, দুলাভাই আপনি কিছু বলেন, আব্বা এসব কী বলে!’

বড়ো বুবু বললো, ‘আব্বা তো ঠিকই কোতেছে, ঝাড়ফুঁক করে দ্যাহা যাক ঠিক হয় কি-না!’

‘বুবু আমি তো অসুস্থ নই।’

‘অসুস্থ না হলি তুই নিজেরে মেয়ে ভাবিস ক্যান?’

‘বুবু আমি তো তোমাদের বুঝিয়ে বললাম। কিছু মানুষের প্রকৃতি-ই এমন, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যাদের জৈবলিঙ্গ আর মনোলিঙ্গ এক নয়; আমারও তাই।’

‘বাপের জন্মে এমন আজগুবি কথা শুনি নাই!’

মেজো বুবু বললো, ‘শোন, তুই আমাদের একটা ভাই, তোরে নিয়ে আমাদের কতো আশা। তাছাড়া তুই যদি এখন নিজেরে মেয়ে ভেবে মেয়েদের মতো কাপড়-চোপড় পরে ঘুরে বেড়াস, আব্বা-আম্মার মান-সম্মান থাকবে! আমরাই কী সমাজের মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারবো!’

আমি তীব্র স্রোতে ভেসে খড়কুঁটো আঁকড়ে ধরার মতো মেজো দুলাভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে বললাম, ‘দুলাভাই, আপনি কিছু বলেন, আপনি এদেরকে বোঝান।’

আমার কলেজ শিক্ষক মেজো দুলাভাই অন্যদের বোঝাবে কী, উল্টো তিনি আমাকেই বোঝালেন, ‘অনেকক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা বিয়ের পর ঠিক হয়ে যায়! ইমাম সাহেব যখন ঝাড়ফুঁকের কথা বলেছেন, উনি এসে ঝাড়ফুঁক করুক। আর পাত্রী তো রেডি-ই আছে, খুব দ্রুতই বিয়েটা করে ফেলো। বিয়ের পরও যদি একই ধরনের সমস্যা ফিল করো, তাইলে আমি নিজে ভারতে নিয়ে গিয়ে তোমার ট্রিটমেন্ট করিয়ে আনবো। ট্রিটমেন্ট করালে এ ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

আব্বা মেজো দুলাভাইয়ের উদ্দেশে বললেন, ‘ভারতে নিয়ে ডাক্তার দ্যাহানোয় আমার কোনো আপত্তি নাই। তয় ইমাম সাহেব যহন নিজে মুখে ঝাড়ফুঁক করার কথা বলিছেন, ঝাড়ফুঁক করে দেখা যাক। আর এর মইদ্যে তুমি তোমার আর ওর পাসপোর্ট-ভিসার ব্যবস্থা করো, কোলকাতায় যাও আর দিল্লী-বোম্বাই যেহানে যাবার যাও, চিকিৎসা করায়ে আনো। টাকা-পয়সা যা লাগে লাগুক, দরকার হলি জমি বেচে চিকিৎসা করাবো।’

মাথা নিচু করে বললাম, ‘আব্বা, আমার তো কোনো অসুখ হয়নি যে চিকিৎসা করাতে হবে। আমার মনের ওপর জোর কোরো না, তোমরা যদি আমার পিছনে টাকা ব্যয় করতেই চাও তো লিঙ্গ রূপান্তর করে আমি শারীরিকভাবেও মেয়ে হয়ে যাই।’

আব্বা প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ্, আল্লারে এই ছিল আমার কপালে!’

আম্মা কাঁদতে লাগলেন, বুবুদের চোখে জলের আভাস। অনেক কথার পর শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত হলো যে- আমাকে ঝাঁড়ফুক করা হবে, দরকার হলে আরো ভাল কোনো পীরের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে, তাতেও কাজ না হলে ভারতে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে হবে এবং পরিবারের মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে আমাকে আব্বার ফুফাতো বোনের মেয়েকে বিয়ে করে পুরুষ হয়েই সংসার করতে হবে। আমি সবার সব কথা শুনলাম, তারপর আমার কথাটি বললাম, ‘তোমরা আমার মনের ওপর জোর কোরো না, হয় আমার লিঙ্গ রূপান্তরের ব্যবস্থা করো, নয়তো আমি যেমন আছি তেমনই থাকি; কিন্তু বিয়ের জন্য আমাকে জোর কোরো না। আর কালকেই আমি ঢাকা যাব, পরশু আমার অফিস আছে।’

বলে আমি নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম; শুয়েই রইলাম কিন্তু ঘুম আর এলো না চোখে। আমাকে ঘিরে আব্বা-আম্মা, বুবু, দুলাভাই সকলেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন; তাদের সেই স্বপ্নে হঠাৎ বজ্রাঘাত হয়েছে, তারা তো তাদের স্বপ্ন বাঁচানোর মরিয়া শত চেষ্টা করবেনই। শুধু কি স্বপ্ন বাঁচানোর চেষ্টা? তাদের কাছে এটা সম্মান রক্ষার চেষ্টাও। কেননা আমি নারী হতে চাইলে তারা যে সমাজে বাস করে সেই সমাজে একটা ঘাই লাগবে আর হাজারো বুদ্বুদের মতো ফুটতে থাকবে কথা, সমাজের মানুষ আড়ালে হাসি-তামাশা করবে, ঠোঁটকাটা কেউ কেউ শুনিয়ে দেবে সুচের মতো তীক্ষ্ণ কথা; যা তাদের কাছে অপমানের-অসম্মানের। তবে আমারও তো মন আছে, স্বপ্ন আছে; তাদের কাছে এটা মান-সম্মানের ব্যাপার কিন্তু আমার কাছে তো জীবনের। আমি জানি যে আমাদের এই সমাজে একজন পুরুষ কতোটা সুবিধা ভোগ করে, ঘরে-বাইরে নারীর চেয়ে পুরুষ এই সমাজে অধিক স্বচ্ছন্দ-নিরাপদ, পুরুষ হয়ে জন্মানো এখানে সৌভাগ্যের প্রতীক! তারপরও আমি এই সুবিধা এবং সৌভাগ্য স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে পায়ে ঠেলে দিচ্ছি, কেননা প্রতিনিয়ত অনুভব করি যে আমি পুরুষ নই, নারী। পরিবারের কথা মেনে পুরুষের ভেগ ধরে বিয়ে-সংসার করলে নিজের সঙ্গে তো বটেই অন্য একটি মেয়ের সঙ্গেও প্রতারণা করা হবে। সমাজের কিছু অন্ধ মানুষের কথা ভেবে আমি আমার এবং অন্য একটি মেয়ের জীবন নষ্ট করতে পারি না; দুটো জীবনের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারি না। তাই মনকে শক্ত করে আমাকে কঠিন হতেই হয়।

পরদিন সকালে আমি ঢাকায় আসতে গেলে, সকলেই বাধা হয়ে দাঁড়ালো; কিছুতেই তারা আমাকে ঢাকায় ফিরতে দেবে না, কেননা রাতে ইমাম আমাকে ঝাড়ফুঁক করবে। আমিও নাছোড় বান্দা, ঢাকায় আসবোই। সেই সকালেই প্রথম আমি আব্বার মুখে মুখে তর্ক করলাম। এক পর্যায়ে আব্বা বললেন, ‘হয় তুমি আমাদের ছেলে হয়ে বিয়ে-থা করে ঘর-সংসার করবা, নয়তো চির জীবনের জন্য তুমি এই বাড়ি থেকে চলে যাবা, তোমার সঙ্গে আমাদের কারো কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আমরা জানবো যে আমাদের ছেলে মরে গেছে!’

জলভরা চোখ নিয়ে সে-ই যে আমি বাড়ি ছেড়েছি, আর আমার বাড়িতে ফেরা হয়নি। তবে বাড়ির সব খবরই আমি পাই তুলিভাবীর কাছ থেকে। তুলি ভাবী তার কথা রেখেছে, সে এখনো আমার সই হয়েই আছে, ফোনে কথা হয় প্রায়ই। সে এখন দুই সন্তানের জননী। ইকবাল ভাই দেশে ফিরে ফরিদপুরে ব্যবসা করছেন। ইকবাল ভাই তুলিভাবীর স্বামী, যথার্থ প্রভু; বন্ধু হতে পারেনি। বাংলাদেশের আরো অসংখ্য নারীর মতো তুলিভাবীও সমাজের কথা ভেবে, সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনোরকমে মানিয়ে নিয়ে জীবনটা পার করে দিচ্ছে। মাঝে মাঝেই সে তার দুঃখের ঝাঁপি খোলে আমার কাছে। আমি আর নতুন করে কী দুঃখের ঝাঁপি খুলবো, আমার মতো বরভাগ্য ক’জনের হয়! আমি ফেলি আমার হারানো শিকড়ের জন্য দীর্ঘশ্বাস!

আব্বা তো অবসর নিয়েছেন সেই কবেই। এখন আব্বা-আম্মার দায়িত্ব ছোটবুবু আর দুলাভাইয়ের ওপর, ওরা আমাদের বাড়িতেই থাকে। ছোটবুবুর বিয়ে আমি দেখিনি, আমাকে জানায়নি কেউ। আমিই তুলি ভাবীর কাছ থেকে শুনে বাড়িতে ফোন করেছিলাম, আমার ফোন কেউ ধরেনি। বড়োবুবুকে ফোন করেছিলাম, বড়োবুবু বলেছিল, ‘তুই আসলি বড়োপক্ষের কাছে আমরা তোর কী পরিচয় দেব, শ্যাষে না বিয়েটাই ভাঙে যায়! আমাগের মান-সম্মান যা নষ্ট করার তা তো করছিসই, নতুন করে আর নষ্ট করার জন্যে তোর আসার দরকার নাই।’

হায়, আমাকে বোন বলে পরিচয় দিতে বুবুদের লজ্জা করবে, আমাকে মেয়ে বলে পরিচয় দিলে আব্বা-আম্মার সম্মান নষ্ট হবে! আমি এখন তাদের কাছে ছেলেও নই, মেয়েও নই; আমি এক মানহানিকর আজব জীব! আসলে আমাকে তো তাদের আর প্রয়োজন নেই, যে প্রয়োজন বা চাহিদার জন্য তারা আমাকে বড়ো করেছেন, আমি তাদের সেই চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছি; তাহলে তারা আর শুধু শুধু আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন কেন? বাবা-আম্মার ছেলের প্রয়োজন ছিল, তিন মেয়ে জন্মানোর পরও তাই তারা আবার সন্তান নিয়েছিলেন, দৈহিকভাবে একটি ছেলে সন্তান পেয়ে তারা দারুণ খুশি ছিলেন। স্বপ্ন বুনেছিলেন আমাকে নিয়ে-ছেলে বড়ো হবে, বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ আনবেন, নাতি-নাতনি হবে, বংশ রক্ষা হবে, আরো কতো স্বপ্ন! তাদের সেই স্বপ্নে আমি জল ঢেলে দিয়েছি; আসলে আমি তো ঢালিনি, ঢেলেছে প্রকৃতি। কিন্তু তারা তো সেটা বোঝেননি, বুঝতে চানও নি, তারা শুধু বুঝতে চেয়েছেন আমি পুরুষ; তাদের পুত্রবধু চাই, নাতি-নাতনি চাই। আমি এসবের কিছুই তাদেরকে দিতে পারিনি। তাদের কাছে আমি এখন এক উটকো ঝামেলা, ঝামেলা তো দূরে থাকাই ভাল! তাছাড়া ছোটবুবুর বিয়েতে আমি গেলে তাদের পুরনো ব্যথা যেমনি চাগাড় দিয়ে উঠতো, তেমনি অনুষ্ঠান বাড়িতে আমাকে দেখে লোকেও নতুন করে আলোচনার রসদ পেতো। কে জানে, ছোটবাবুর শ্বশুরবাড়ির মানুষের কাছে হয়তোবা আমার কথা গোপনই রেখেছেন! হয়তো জানিয়েছেন যে তাদের তিন মেয়ে, আর কোনো সন্তান নেই। এতসব মাথায় রেখেই তারা হয়তোবা আমাকে উপেক্ষা করেছেন।

আমাদের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হলো, রেজাল্টও হলো, অরিত্র ফার্স্টক্লাস আর আমি পেলাম সেকেন্ড ক্লাস। মাস্টার্স রেজান্টের কিছুদিন পর অরিত্র ভাল একটি কলেজে জয়েন করলো, আমিও অন্য একটি এনজিও’তে ঢুকলাম। দু-জনের রোজগার আরো বাড়লো, আমরা বাসা বদল করে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে আরও ভালো একটি বাসা নিলাম লালমাটিয়ায়। এই বাসা নেবার সময় থেকেই আমি পুরোপুরি নারীর বেশ ধারণ করে শাশ্বতী নামে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করলাম।

আমার তো বাড়ির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন, তবু আমি একবার আব্বার নামে কিছু টাকা পাঠিয়েছিলাম, টাকা ফেরত এসেছিল। অরিত্র প্রতিমাসে তিন হাজার ওর বাবা-মাকে আর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আমার দেবর অলককে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতো। এসব খরচ বাদেও আমাদের দু-জনের বেতনের প্রায় অর্ধেক টাকা বেঁচে যেতো, ব্যাংকে দু-জনে একটা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খুললাম, টাকা জমতে লাগলো। অরিত্র আমাকে প্রায়ই বলতো, ‘আমাদের অনেক টাকা দরকার।’

আমি বলতাম, ‘আমরা যা বেতন পাই তাতে তো আমাদের দিব্যি চলে যাচ্ছে, ব্যাংকেও জমছে, অতো চিন্তার কী আছে?’

ও শুধু বলতো, ‘দরকার দরকার।’

এর বেশি কিছু ভেঙে বলতো না।

আমাদের গভীর প্রণয়ের কথা ওর বাড়ির কেউ জানতো না, জানতো যে আমি ওর বন্ধু, একসঙ্গে থাকি। অলক কিংবা আমার শ্বশুর-শাশুড়ি যখন ঢাকায় আসতো, তখন আমি আমার এক বান্ধবীর বাসায় চলে যেতাম। আমার কথা জিজ্ঞেস করলে ও জানাতো যে এনজিও’র কাজে আমি ঢাকার বাইরে। এই লুকোচুরি খেলতে খেলতে অনেকদিন কাটলো। ওর আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে আমাদের সম্পর্কের কথা জানতো কেবল ওর পিসতুতো ভাই তনয়। তনয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকতো তাঁতীবাজার। ও অনেক উদার, আমাদের সম্পর্কটাকে সহজভাবেই নিয়েছিল। মাসে দু-তিনদিন আমাদের বাসায় আসতো, এখানো আসে।

এরপর একসময় অরিত্র’র বাড়ি থেকে ওকে বিয়ে দেবার জন্য জোরাজুরি করতে শুরু করলো। ও ‘এখন নয় এখন নয়’ বলে কালক্ষেপণ করতো, কিন্তু এক পর্যায়ে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি রীতিমতো উঠে-পড়ে লাগলেন ওর বিয়ের জন্য; পাত্রীদের বায়োডাটাও সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। আমাদের দু-জনের সামনেই তখন কঠিন বাস্তবতা। আমার বাবা-মা আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন, আমি চাইতাম না ওর ক্ষেত্রেও তাই হোক। আমরা দু-জন পরামর্শ করে অলককে ঢাকায় আসতে বললাম, অলক এলো; তনয় আগে থেকেই বাসায় ছিল। তনয়কে সামনে রেখে অলককে সব খুলে বললাম আমরা। অরিত্র ওদেরকে বললো, ‘আমরা টাকা জমাচ্ছি, যদি বাবা কিছু সাহায্য করতে পারে তাহলে শীঘ্রই সেক্স চেঞ্জ করে ও দৈহিকভাবেও নারী হবে। বাবা-মা চাইলে তখন না হয় আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করবো।’

অরিত্র যে আমাকে নিয়ে এতোকিছু ভেবে রেখেছে এর আগ পর্যন্ত সত্যিই আমি তা জানতাম না। এজন্যই ও বলতো যে আমাদের অনেক টাকার দরকার। আমার ইচ্ছে থাকলেও কখনো ওকে বলিনি যে আমি সেক্স চেঞ্জ করতে চাই, কেননা আমি জানি যে সেই সামর্থ্য আমাদের এখনো হয়নি। কিন্তু আমি যে আমার বাড়ির সবাইকে বলেছিলাম “তোমরা যদি চিকিৎসা করে আমার পিছনে টাকা ব্যয় করতেই চাও, তাহলে লিঙ্গ রূপান্তর করে আমি শারীরিকভাবেও মেয়ে হয়ে যাই।” সে-কথা অরিত্রকে বলেছিলাম, ও যে সে-কথা মনে রেখে টাকা জমানোয় মন দিয়েছিল তা আমি বুঝতে পারিনি।

ওর মুখ থেকে সেক্স চেঞ্জের কথা শুনে আনন্দে আমার চোখে জল এসে গেল, ইচ্ছে করলো তখনই ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করি, পাগলের মতো চুমু খাই, কামড়ে ওর গাল লাল করে দিই! কিন্তু তনয় আর অলক সামনে থাকায় তখনকার মতো আর তা সম্ভব হলো না, সম্ভব হলো আরও ঘণ্টা দুয়েক পরে!

যাইহোক, তারপর আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে বুঝিয়ে বলার জন্য তনয় আর অলককে পাঠালাম যশোর। অলকের মুখ দেখেই আমি ওর মনের অসন্তুষ্টি সম্পর্কে আঁচ করতে পারলেও অরিত্রকে কিছু বললাম না। ওরা যেদিন যশোর গেল সেদিন রাতেই আমার শাশুড়ি অরিত্রকে ফোন করলেন শীঘ্র বাড়িতে যাবার জন্য, এর বেশি কিছু তারা অরিত্রকে বলেননি অথবা বললেও ও আমাকে বলেনি। বুঝলাম যে অলকের মতো তারাও অসন্তুষ্ট, তবু আমি বিশ্বাস করতে চাইলাম যে তারা আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন। অরিত্র দু-দিন পরই বাড়িতে গেল, ওর যাবার সময় আমার খুব কান্না পেলো, ওকে জড়িয়ে ধরে আমি কাঁদলাম এই আশঙ্কায় যে ওকে যদি আমি হারিয়ে ফেলি? ও আমার কপালে চুমু খেয়ে আদর করে বললো, ‘তুমি ভয় পেয়ো না। যে করেই হোক আমি বাবা-মাকে রাজি করাবো।’

আমিও এই আশায় বুক বাঁধলাম যে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি সমাজের কথা ভেবে প্রথমে অরাজি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সন্তানের সুখের কথা ভেবে নিশ্চয় রাজি হবেন। আমার পরিবার আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে সামাজিক এবং ধর্মীয় কারণে। ইসলাম ধর্মে সমপ্রেমী বা সমকামী এবং রূপান্তরকামীর কোনো স্থান নেই। ইসলামে সমকামীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুগে যুগে ইসলামী দেশগুলোতে অসংখ্য সমকামীকে পাথর নিক্ষেপ, শিরোচ্ছেদ, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। হাদিসে বৃহন্নলাদের তো বটেই এমনকি মেয়েদের মতো আচরণ করা ছেলে কিংবা ছেলেদের মতো আচরণ করা মেয়েদেরকেও নির্বাসিত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে মসজিদের ইমাম প্রভাবিত আমার আব্বা ধর্মীয় কারণে এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে আমাকে নির্বাসিত করেছেন। দেশে ইসলামী শাসন চালু থাকলে নিশ্চিত ইমাম আমাকে হত্যার নির্দেশ দিতেন!

সেই তুলনায় বহু সংস্কৃতি ধারণ করা হিন্দুধর্ম অনেকটাই উদার। ধর্মটির আইন-কানুন যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে; ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কখনো উদারতার পরিচয় দিয়েছে আবার কখনো নিষ্ঠুরতার। ব্রাহ্মণদের দ্বারা ধর্মটির বিপুল ক্ষতি হয়েছে, উদারতার জায়গাগুলো ক্রমশ হয়েছে সংকুচিত। মনুসংহিতায় নারী সমকামিতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, কোনো বয়স্কা নারী যদি অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে বয়স্কা নারীর মস্তক মুণ্ডন করে এবং দুটি আঙুল কেটে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরাতে হবে। দুই কুমারীর মধ্যে দৈহিকসম্পর্ক স্থাপিত হলে তাদের শাস্তি হিসেবে দুইশত মুদ্রা জরিমানা এবং দশটি বেত্রাঘাতের কথা বলা হয়েছে। আর পুরুষ সমকামীদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে দু-জন পুরুষ অপ্রাকৃত কাজে লিপ্ত হলে তাদেরকে জাতিচ্যূত করা হবে এবং জামা পরে তাদেরকে জলে ডুব দিতে হবে।

তবে মনুর এই বিধান একপাশে সরিয়ে রেখে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক রামায়ণ-মহাভারত এবং পুরাণের দিকে তাকালে প্রাচীন ভারতীয় সমাজের দেব-দানব-মানবদের মধ্যে বিষমকামিতা ছাড়াও সমকামিতা, রূপান্তরকামিতার মতো বিচিত্র যৌনাচার লক্ষ্য করা যায়। এমনকি পশুকামিতাও! ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দিরের গায়ের টেরাকোটাতেও যৌনতার বৈচিত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়, এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রাচীন প্রত্নসামগ্রীতে প্রাচীন ভারতীয় সমাজের বিচিত্র যৌনাচারের প্রমাণ মিলেছে। সেই কারণেই আমি ভীষণ আশাবাদী হয়েছিলাম যে সেক্স চেঞ্জ করলে হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী আমার শ্বশুর-শাশুড়ি নিশ্চয় আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন। হিন্দুধর্মে শিব-পার্বতীর অর্ধনারীশ্বর রূপের কথা সর্বজন বিদিত।

পুরাণ অনুসারে বিষ্ণু নিজেই তো কতোবার নারীতে রূপান্তর হয়েছেন, সন্তানও জন্ম দিয়েছেন! সমুদ্র মন্থন করে অমৃত পাওয়া গেলে সেই অমৃত নিয়ে দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে, দ্বন্দ্ব নিরসনে স্বয়ং বিষ্ণু মোহিনী মায়ায় স্ত্রী-রূপ ধারণ করে দানবদের কাছে যান, দানবরা বিষ্ণুর মোহিনী রূপ দেখে মোহিত হয়ে তাকে বিশ্বাস করে তাঁর হাতে অমৃত সমর্পণ করে। মোহিনীরূপী বিষ্ণু দেবতা এবং দানবদের শ্রেণিবদ্ধভাবে বসিয়ে উভয়ের মধ্যে অমৃত সমবণ্টন করার নামে ছলনা করে তিনি কেবল দেবতাদেরকেই অমৃত পান করাচ্ছিলেন আর অসুরদেরকে পান করাচ্ছিলেন সোমরস। দানব রাহু মোহিনীরূপী বিষ্ণুর এই ছলনা ধরতে পেরে চুপিসারে দেবতাদের মধ্যে গিয়ে বসে পড়লো আর মোহিনীরূপী বিষ্ণুও রাহুকে দেবতা মনে করে অমৃত দান করলেন। চন্দ্র এবং সূর্য রাহুকে চিনতে পেরে মোহিনীরূপী বিষ্ণুকে বলে দিলেন আর সঙ্গে সঙ্গে বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দিয়ে রাহুর মুণ্ডচ্ছেদ করলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে অমৃত রাহুর পেটে চলে যাওয়ায় মুণ্ড আর ধড় বিচ্ছিন্ন হলেও সে অমরত্ব লাভ করলো। আর তখন থেকেই চন্দ্র এবং সূর্যের সঙ্গে রাহুর চিরশত্রুতার শুরু, শুরু রাহু কর্তৃক চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ। রাহুর মুণ্ডচ্ছেদের পর বিষ্ণু মোহিনীরূপ ত্যাগ করে স্বরূপে আবির্ভূত হয়ে দেবতাদের সঙ্গে দানবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

দূর্গা মহিষাসুর বধ করার পর মহিষাসুরের বোন মহিষী বদলা নেবার শপথ করে ব্রহ্মার তপস্যা শুরু করে। তার তপস্যায় সন্তুষ্ট ব্রহ্মা বর দিতে চাইলে সে বললো, ‘কেউ যেন আমাকে যুদ্ধে হারাতে এবং বধ করতে না পারে।’

বিব্রত ব্রহ্মা জানালেন, ‘তা কী করে সম্ভব! তুমি অন্য বর চাও।’

কিন্তু মহিষী অটল, সে তার অভীষ্ট বর-ই চায়।

তখন ব্রহ্মা তাকে এই বর দিলেন, ‘দু-জন পুরুষের মিলনে উৎপন্ন সন্তান ব্যতিত অন্য কেউ তোমাকে পরাজিত বা বধ করতে পারবে না।’

মহিষী মহা খুশি! কেননা সে জানে যে দু-জন পুরুষের মিলনে সন্তান জন্মানো অসম্ভব, ফলে তাকে বধ করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মহিষী স্বর্গ আক্রমণ করে দেবতাদের বিতাড়িত করলো। সংকট নিরসনে দেবতারা ছুটে গেল শিবের কাছে। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব মন্ত্রণায় বসলেন কী উপায়ে মহিষীকে বধ করা যায়। তখন বিষ্ণু মোহিনীরূপ ধারণ করে মিলিত হলেন শিবের সঙ্গে। মোহিনীরূপী বিষ্ণু আর শিবের মিলনে জন্ম হলো অয়প্পানের। অয়প্পান মহিষীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাকে বধ করলেন।

বিষ্ণুর অবতার শ্রীকৃষ্ণ, তিনিও মোহিনীরূপ ধারণ করে অর্জুন এবং নাগরাজকন্যা উলুপীর পুত্র ইরাবানকে বিয়ে করে তার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। অর্জুনপুত্র হওয়ায় স্বভাবতই ইরাবান কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে পাণ্ডবপক্ষের হয়ে যুদ্ধ করেন। তিনি প্রতিদিন যুদ্ধে যাবার আগে কালীপূজা করতেন এবং কালীও ভক্তকে ভবিষ্যতবাণী করতেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সপ্তম দিনে কালী ভবিষ্যতবাণী করলেন যে আগামীকাল অর্থাৎ যুদ্ধের অষ্টম দিনে ইরাবানের মুত্যু হবে। মৃত্যু আসন্ন জেনে বিচলিত-ব্যথিত ইরাবান অর্জুনকে সব জানালেন। পুত্রের মৃত্যু আসন্ন জেনে অর্জুন দুঃখ পেলেন, পুত্রকে আলিঙ্গন করে জানতে চাইলেন, ‘পুত্র তোমার শেষ ইচ্ছা কী?’

‘পিতা আমি যুবক, এখনো বিবাহ করিনি; কখনো নারী সংস্পর্শ পাইনি। মৃত্যুকালে এই অতৃপ্তি আমার থেকে যাবে।’

অর্জুন তখনই দিকে দিকে দূত পাঠালেন পুত্রের জন্য পাত্রীর সন্ধানে। কিন্তু দূতরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো, ইরাবানের মৃত্যু আসন্ন জেনে কোনো পিতাই তার সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিতে সম্মত নয়। অর্জুন চিন্তায় পড়লেন, তবে কী পুত্রের অন্তিম ইচ্ছা পূরণ হবে না! তখন শ্রীকৃষ্ণ সব জানতে পেরে এই সংকট থেকে তাঁর সখাকে উত্তরণ করলেন নিজে মোহিনীরূপ ধারণ করে ইরাবানকে বিয়ে এবং তার সঙ্গে মিলিত হয়ে। তৃপ্ত ইরাবান পরদিন অর্থাৎ যুদ্ধের অষ্টম দিন যুদ্ধে গেলেন, প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলেন; এক পর্যায়ে রাক্ষস অলম্বুষের হাতে তার মৃত্যু হলো। ইরাবানের মৃত্যুর পর মোহিনীরূপী কৃষ্ণ শাস্ত্র অনুযায়ী বৈধব্য দশা পালন করেন।

কৃষ্ণসখা অর্জুনও অপ্সরী উর্বশীর শাপে মৎস্যরাজ্যে অজ্ঞাতবাসের এক বছর নপুংসক হয়ে ছিলেন। নারীবেশ ধারণ করে বৃহন্নলা নাম নিয়েছিলেন তিনি। এই এক বছর তিনি মৎস্যরাজ বিরাটের কন্যা উত্তরা এবং তার সখিদেরকে নৃত্য-গীত-বাদন শিখিয়েছিলেন।

একদা মৃগয়ায় গিয়ে ইন্দ্রের ছলনায় মোহিত রাজর্ষি ভঙ্গাসন অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে তৃষ্ণার্ত হয়ে এক সরোবরে অবগাহন করামাত্র স্ত্রীরূপ পেয়েছিলেন। অতঃপর এক ঋষির ঔরসে তার গর্ভে শতপুত্রের জন্ম হয়েছিল।

বাহ্লীকদেশে ইল নামে এক রাজা ছিলেন, তিনি প্রজাপতি কর্দমের পুত্র। একবার অনুচরবর্গ সহ মৃগয়া করতে গিয়ে কার্তিকেয়র জন্মস্থানে উপস্থিত হলেন। সেখানে মহাদেব এবং পার্বতী ক্রীড়া করছিলেন, আর তাদের মনোরঞ্জনের জন্য ভগবান ঋষভরাজ তখন স্ত্রী-রূপে ছিলেন, সেই কাননে তখন যতো প্রাণি ছিল সবাই স্ত্রীত্ব পেয়েছিল। রাজা ইল এবং তার অনুচরবর্গও উক্ত স্থানে পৌঁছামাত্র স্ত্রীত্ব পেলেন, ইল হলেন ইলা। দুঃখভারাক্রান্ত ইলা মহাদেবের শরণাপন্ন হলে মহাদেব তাকে বললেন, ‘পুরুষত্ব ব্যতিত তুমি অন্য বর চাও।’

ইলা তখন পার্বতীর শরণাপন্ন হলেন। পার্বতী তাকে বললেন, ‘মহাদেব তোমাকে অর্ধ বর দিয়েছেন, অপর অর্ধ আমি দিচ্ছি।’

ইলা তখন বর চাইলেন, ‘দেবী আমি যেন একমাস স্ত্রী-রূপ এবং একমাস পুরুষরূপ পাই।’

পার্বতী বললেন, ‘বেশ, তুমি যখন পুরুষরূপে থাকবে তখন স্ত্রীভাব তোমার মনে থাকবে না, আবার যখন তুমি স্ত্রী-রূপে থাকবে তখন পুরুষভাব ভুলে যাবে।’

এভাবেই মহারাজ ইল একমাস পুরুষরূপে ইল এবং একমাস স্ত্রী-রূপে ইলা হয়ে বিচরণ করতে লাগলেন। সরোবরে তপস্যারত চন্দ্রপুত্র বুধ ইলার সৌন্ধর্যে মুগ্ধ হন, তিনি ইলার গর্ভে পুরুরবা নামে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।

এতো গেল রূপান্তরকামিতার গল্প, সমকামিতার গল্পও দূর্লভ নয়। রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ মহারাজ সগরের প্রপৌত্র দিলীপ নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে বংশরক্ষার সংকট উপস্থিত হলো। শিব তখন দিলীপের দুই বিধবা স্ত্রীকে দৈহিক মিলনের আদেশ দিলেন। দুই বিধবা রানির মিলনের ফলে অস্থিহীন এক পুত্র সন্তানের জন্ম হলো, ঋষি অষ্টাবক্রের বরে সেই অপূর্ণাঙ্গ দেহের পুত্র পূর্ণাঙ্গ দেহ লাভ করলো। তার নাম রাখা হলো ভগীরথ। ভগীরথের বংশধরই উত্তরকালের বিখ্যাত রামচন্দ্র।

যে ধর্মের দেব-দেবীগণ সমকামিতা-রূপান্তরকামিতায় বিশ্বাসী, যে ধর্মের দেব-দেবী এবং তাদের আশির্বাদপুষ্ট মানুষেরা সমকামী-রূপান্তরকামী, যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে যারা সন্তান উৎপাদনও করেছেন; সেই ধর্মের মানুষ কি আমাদের সম্পর্ক অস্বীকার করতে পারেন? নিশ্চয় নয়। আমাদের সম্পর্ক অস্বীকার করলে তো স্বয়ং দেবতাদের সম্পর্কই অস্বীকার করা হয়। আর ধর্মপ্রাণ মানুষ কি কখনো দেবতাদের সম্পর্ক অস্বীকার করতে পারেন? নিশ্চয় নয়!

অরিত্র বাড়িতে যাবার পর এমনিভাবেই নিজেকে প্রবোধ দিয়েছি, মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে চেয়েছি যে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি নিশ্চয় আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন; আশায় বুক বেঁধে স্বপ্ন দেখেছি যে আমি বধূবেশে তাদের বাড়িতে পা রেখেছি, তারা আমায় বরণ করে নিচ্ছেন। কেনইবা আশায় বুক বাঁধবো না? অরিত্র’র কাছে শুনেছি ওদের বাড়ির ঠাকুরঘরে রাধাকৃষ্ণের পিতলের বিগ্রহ আছে, আমার শাশুড়ি প্রতিদিন সেই বিগ্রহ স্নান করিয়ে পূজা করেন; যে কৃষ্ণ মোহিনীরূপ ধারণ করে ইরাবানের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন, অবিবাহিত পরকীয়া সঙ্গিনীসহ তাঁকে পূজা করেন আমার শাশুড়ি; এরপরও আশাবাদী না হওয়াটা তো আমার অন্যায়! শ্বশুর-শাশুড়ির ঘরের দেয়ালে শিবের ছবি থাকে, যে শিব মোহিনীরূপী বিষ্ণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন; আমার শাশুড়ি রোজ সেই শিবকে প্রণাম করেন, ধূপ-সন্ধ্যা দেন। এরপরও আমি কী করে অবিশ্বাস করবো যে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন না? অবিশ্বাস করা মানে তো ধার্মিক গুরুজনকে অশ্রদ্ধা করা!

তাই আমি বিশ্বাস করে, স্বপ্ন দেখে, আশায় বুক বেঁধে সুসংবাদ শোনার অপেক্ষায় রইলাম। বিশ্বাস করলাম যে অরিত্র ওর বাবা-মা’র কাছ থেকে আমার জন্য এক নতুন পৃথিবী নিয়ে আসবে, যে পৃথিবীতে আমি নতুন করে বাঁচতে পারবো। কিন্তু আমার সকল বিশ্বাস-স্বপ্ন-আশা মিথ্যে প্রমাণ করে, দেবতা এবং দেবতার অবতারের সম্পর্ক অস্বীকার করে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি অরিত্রকে ফেরালেন শূন্য হাতে! তারা অরিত্রকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে আমাদের এই সম্পর্ক কোনো সম্পর্ক নয়, এটা পাপ; নারী-পুরুষের সম্পর্কই চিরন্তন! হায়, যারা দেবতায় বিশ্বাস করেন, দেবতার পূজা করেন; অথচ সেই দেবতার সম্পর্ক তাদের কাছে পাপ!

সমাজ-সম্মানের কথা ভেবেই আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাদের সম্পর্ক মেনে নেননি। সে-ই যে ম্লান মুখে বাড়ি থেকে এলো অরিত্র, আর কখনো বাড়ি যায়নি। আমারই মতো ওর জন্যও বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের দু-জনেরই রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, মূলোৎপাটিত হয়ে আমরা কেবল দু-জন দু-জনার হয়ে বেঁচে আছি।

বৃষ্টিটা আবার বেড়েছে। এখন কতো রাত কে জানে, ভোর হতে বোধ হয় বেশি দেরি নেই। অথচ ঘুম আসছেই না চোখে। ক্ষুধা অনুভূত হচ্ছে। উঠে ডাইনিংয়ে গিয়ে ফ্রিজ থেকে একটা চমচম প্লেটে নিয়ে আবার এসে চেয়ারে বসেছি, আসবার সময় দেখলাম অরিত্র যেভাবে পাশ ফিরে শুয়েছিল এখনো সেভাবেই আছে।

আমাদের সম্পর্কের বয়স বারো বছর, দশ বছর হলো আমরা একসঙ্গে থাকছি। দশ বছর পর হঠাৎ মনে হচ্ছে যে আজ আমাদের বাসর রাত। এই দশ বছরে যতো রাত আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি প্রত্যেকটা রাতই সুখের ছিল, কিন্তু আজকে উপচে পড়া সুখের কারণ আমি লিঙ্গ রূপান্তর করার পর আজই প্রথম আমাদের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। আমার এতোদিনের সাধ পূরণ হয়েছে। এখন আমি কেবল চৈত্তিকভাবে নয়, দৈহিকভাবেও নারী। আজ পুরোপুরি সার্থক হয়েছে আমার জীবন; আহা, সুখের নারী জীবন!

চমচমটা খেয়ে প্লেটটা ডাইনিংয়ে রেখে জল পান করে আবার এসে বসেছি। কিছুক্ষণ পর হামাগুড়ি দিয়ে ঘর থেকে বারান্দায় এসে কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে, তারপর আমাকে অতিক্রম করে রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বেশ কায়দা করে রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছে নক্ষত্র! এরপর ধরেছে গ্রিল, হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে এখন ঠোঁটে ছোঁয়াচ্ছে। বৃষ্টির ছাটে ওর গা ভিজে যাচ্ছে দেখে আমি ওকে জোর করে কোলে নিই। আবার নেমে যেতে চাইলে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে-গালে চুমু খেয়ে আদর করাতে এখন আর নামতে চাইছে না, আমার কানের কাছের একগোছা চুল নিয়ে খেলছে। খেলতে খেলতে নিজেই চঞ্চল হাতে আমার স্তন উন্মক্ত করার চেষ্টা করছে। ক্ষিধে পেয়েছে ওর, ক্ষিধে পেলে এমন করে! মুখে স্তনবৃন্ত পুড়ে দিতেই শান্ত হয়েছে, দু-হাতে স্তন ধরে চু চু শব্দে স্তন পান করছে, আর আমি মাতৃস্নেহে ওকে বুকে আঁকড়ে ধরে বিপুল সুখে তাকিয়ে আছি বৃষ্টির দিকে!

নক্ষত্রও আমার মতো বৃষ্টি ভালবাসে, হামাগুড়ি দিয়ে বারান্দায় এসে গ্রিল ধরে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছোঁয়, মুখে-মাথায় জল মাখে। নক্ষত্র, আমাদের একমাত্র সন্তান! আমার গর্ভজাত নয়, অরিত্র’র ঔরসজাতও নয়; নক্ষত্র আমাদের দু-জনের মনোজাত সন্তান! আমরা দু-জন ছাড়া ওকে কেউ দেখতে পায় না। আমরা ওকে খাওয়াই, পরাই, ঘুম পাড়াই, ওর সঙ্গে খেলা করি, দুষ্টুমি করি! সেই কবে আমাদের মনে ওর জন্ম হয়েছে, বছর সাতেক তো হবেই, কিন্তু এখনো ও হামগুড়ি দিয়ে হাঁটে আমাদের মনের অন্দরে। বোধহয় আমরা যতোদিন বেঁচে থাকবো আমাদের মনোজাত সন্তান নক্ষত্র ততোদিন হামাগুড়ি দিয়েই হাঁটবে। তারপর আমাদের দু-জনের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হবে নক্ষত্রের গল্প; অথবা শেষ হবে না, আমাদেরই মতো কোনো দম্পতির মনোজগতে হয়তো অন্য নামে বেঁচে থাকবে নক্ষত্র। থাকুক নক্ষত্র, অনন্তকাল নক্ষত্র বেঁচে থেকে সঙ্গ দিক আমাদের মতো দম্পতিকে। এই সঙ্গটুকু বড়ো মধুর! আমরা যেভাবে নক্ষত্রকে আদর করি, একজন আরেকজনের কোল থেকে ওকে কেড়ে নিই, ঘুম পাড়াই; এসব বাইরের কেউ দেখলে নির্ঘাত আমাদেরকে পাগল বলবে! কিন্তু এই পাগলামিটুকু নিয়ে সত্যিই আমরা সুখে আছি; আমাদের দুঃখ কেবল একটাই, আমরা শিকড়চ্যূত। এছাড়া আমাদের আর কোনো দুঃখ নেই। আমাদের মতো সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষের কাছে নক্ষত্র’র এই সঙ্গটুকু বড়ো মধুর, বেঁচে থাকার প্রেরণা। নক্ষত্রকে নিয়ে আমরা দারুণ সুখে আছি। নক্ষত্র এসো বাবা এসো, ঘুম পাড়িয়ে দিই। ওলে বাবা…

আয় ঘুম আয় ঘুম আয় মোর গোপাল ঘুমায়

বহু রাত্রি হলো আর জাগাসনে মায়।।

কোলে লয়ে তোরে ধীরে ধীরে দোলাবো

ঘুম-পাড়ানিয়া গান তোরে শোনাবো

গায়ে হাত বুলাবো পাঙ্খা ঢুলাবো

মন ভুলাবো কতো রূপকথায়।।

 

সমাপ্ত

 

আখ্যান শেষ। কিন্তু আমি জানি, এই আখ্যান এখানেই শেষ নয়। এই আখ্যান, শাশ্বতীদির আত্মজৈবনিক আখ্যান; তার জীবনের সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া, যন্ত্রণা-বঞ্চনার আখ্যান। প্রতিদিন এই আখ্যানের ব্যাপ্তি বাড়ছে। শাশ্বতীদি গত বছর ভারতে গিয়ে সেক্স চেঞ্জ করেছেন; এখন তিনি কেবল চৈত্তিকভাবেই নয়, দৈহিকভাবেও নারী। আমার দেখা বহু দম্পতির মধ্যে সবচেয়ে সুখী দম্পতি শাশ্বতীদি আর পরাগদা। তারপরও আমাদের চারপাশের অনেক মানুষ শাশ্বতীদি আর পরাগদার সম্পর্কের স্বীকৃতি দিতে চায় না, রাষ্ট্রীয়ভাবেও তাদের সম্পর্ক স্বীকৃত নয়; এই অশিক্ষা মানুষের, এই দৈন্যতা রাষ্ট্রের। কারো স্বীকৃতির অপেক্ষায় থেমে নেই শাশ্বতীদি-পরাগদার জীবন, জীবন চলছে জীবনের নিয়মে। মহাকালের নিরিখে এই জীবন খুবই ছোট, ছোট এই জীবনে দুটো মানুষ একে অন্যকে ভালবেসেছে, কাছে এসেছে, নিজেদের মতো করে উপভোগ করছে জীবনটা; এর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা বা প্রকৃতিবিরুদ্ধতা নেই। তাদের প্রেম-ভালবাসা, কামনা-বাসনা; প্রকৃতির মতোই চিরন্তন সত্য।

 

(চলবে…..)

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =