আমি কেনো কোরবানীর বিরোধিতা করি?

আমি কেনো কোরবানীর বিরোধিতা করি?
———
আমি এখনও মাংস খাই। তাই আমি বিশ্বাস করি আমার নৈতিক অধিকার নেই পশু হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলার। আমি পশু হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসও দেখাই না। কিন্তু আমি অপরাধবোধ করি এই জন্য যে, নিজেকে প্রাণিজগৎ এর বুদ্ধিমান ও মানবিক প্রজাতির দাবি করছি অথচ এখনও প্রাণিদের হত্যা করছি কেবল মাত্র নিজেদের উদরপূর্তি করার জন্য যাদের কিনা আমারই মত মৃত্যু যন্ত্রণার অনুভূতি আছে। যা খুবই নির্দয় একটা আচরণ। এখন অনেকে হয়তো বলতে পারে মানুষের খাদ্য তালিকায় যা কিছু আছে সবকিছুরই প্রাণ আছে যেহেতু উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। তাই উদ্ভিদ খাওয়া মানে প্রাণের কষ্ট দেওয়া। আমরা জানি উদ্ভিদের ব্রেন নেই এবং সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম নেই তাই উদ্ভিদ সংবেদনশীল হলেও ব্যথা অনুভব করতে পারে না।
 
আমার চোখে যেহেতু পশু হত্যা এবং তা খাওয়া অমানবিক এবং নির্দয় আচরণ তাই আমার উচিত এই নির্দয় আচরণ বর্জন করা। আমি জানিনা কবে পারবো তবে হয়তো খুব বেশি দেরি নেই এই খাবারের লোভ, খাই খাই স্বভাব থেকে একদিন বের হয়ে আসবো।
 
একটি অপরাধ করা এবং সেটিকে জাস্টিফাই / ন্যায্যতা প্রতিপাদন করার মত নোংরা কাজ আর হতে পারে না। আমরা পশু হত্যা করছি এটা অন্যায়। এবং এই অন্যায়ের পক্ষে কোনো যুক্তি হয় না। প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খল ও খাদ্য চক্রের দোহাই দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। অনেকে মানুষের মাংস খাওয়াকে বাঘ সিংহের সাথে তুলনা করে বসে। অর্থাৎ সিংহ যেমন হরিণ খাবে মানুষও তেমন মাংস খাবে কারণ এরা ফুড চেনের উপরে অবস্থান করে। না হলে মানুষ প্রটিনের চাহিদা কোথা থেকে পাবে? আদিকাল থেকেই আমাদের পুর্বপুরুষেরা মাংস দিয়েই প্রটিনের চাহিদা পূরণ করে আসছে। যদিও নিজেদের সুপিরিয়র ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই কারণ আমরা সবাই প্রকৃতির অংশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের এইটা মানতে হবে যে আমাদের বিবেকবোধ আছে, চিন্তা শক্তি আছে, যা অন্যান্য প্রাণিদের নেই। তাই আমরা সুপিরিয়র না হলেও প্রকৃতির প্রতি, পৃথিবীর প্রতি একটা দায়বদ্ধতা আছে, কর্তব্য আছে। এই কর্তব্যটা ঠিক কী?
 
আমরা জানি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হচ্ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং। আমাদের পৃথিবীর প্রতি অনেকগুলো দায়বদ্ধতার মধ্যে একটা দায়বদ্ধতা হচ্ছে যত দূর সম্ভব কার্বন ফুট প্রিন্ট কম রেখে যাওয়া। কিন্তু আমাদের এই খাই খাই স্বভাব প্রতিদিন পশু হত্যা, ধর্মের নামে একই দিনে লাখ লাখ পশু হত্যা এই সবকিছুই গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর জন্য অনেকাংশে দায়ী।
 
একটা গরু প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ লিটার মিথেন গ্যাস উৎপাদন করে। পৃথিবীতে সম্ভাব্য মোট গরুর সংখ্যা ৯৮৭.৫ মিলিয়ন। এই সংখ্যা গুন করলেই আমরা বুঝতে পারি ঠিক কত পরিমাণ মিথেন গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে গরু পালন এবং ভক্ষণ দিয়ে। মিথেন গ্যাসকে ধরা হয় কার্বন ফুট প্রিন্ট এর সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হিসেবে। কারণ এটি কার্বন ডাই-অক্সাইডের থেকেও ২১ গুন বেশি শক্তিশালী এবং ১৮% গ্রীনহাউজ গ্যাসের জন্য দায়ী। পৃথিবীতে ৬০% কার্বন ফুট প্রিন্ট এর জন্য দায়ী এই গরুসহ অন্যান্য গবাদিপশুর উৎপাদন। এই উৎপাদন কমানো প্রয়োজন।
 
মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে এতটা অগ্রসর হলো অথচ এখনো নিজেদের খাদ্য শৃঙ্খল পরিবর্তন করতে পারলো না। মানুষ চাইলেই বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে। শরীরের প্রোটিনের অভাব মেটাতে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন গ্রহণ করতে পারে। প্রতি একশো গ্রাম স্পিরুলিনায় ৭৫ গ্রাম এবং মশুর বা ছোলাতে ৬৫ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। এইরকম অনেক উদ্ভিজ্জ প্রোটিন আছে যা চাইলেই শরীরের ওজন পরিমাপ করে সেই অনুযায়ী plants based protein গ্রহণ করতে পারে। মানুষের শরীরের মোট ওজনের প্রতি কেজির জন্য মাত্র ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। কিন্তু এখনো মানুষ এতো সহজ এবং স্বাভাবিক বিকল্প পথ অনুসরণ না করে প্রাণী হত্যা করছে।
 
আমি নিজেও এখনো বাজার থেকে মাংস কিনে খাই। কিন্তু আমার মধ্যে অপরোধবোধ কাজ করে। অন্তত নির্লজ্জের মত পশু হত্যা জাস্টিফাই করতে যাই না। পশু হত্যাকে উৎসব বানাচ্ছি না। মেনে নিচ্ছি এটি অন্যায় এবং নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা অবশ্যই করবো।
 
কোরবানীর বিরোধিতা করার অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তো আছে। আমাদের দেশে যেভাবে প্রকাশ্যে কোরবানীর পশু হত্যা করা হয় তা ভয়ংকরভাবে মানুষের মস্তিষ্কের প্রভাব পড়তে পারে। শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্কে এটি সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। এসব শিশু-কিশোর পরবর্তীতে হিংস্র ও অমানবিক হয়ে উঠতে পারেন।
 
এ ছাড়া যে উদ্দেশ্যে পশু হত্যা করা হয় তা অযুক্তিক। কাউকে খুশি করার জন্য বা সোয়াব পাওয়ার জন্য লাখ লাখ পশু বাজার থেকে কিনে সেই পশুর জীবন কেড়ে নেয়ার মধ্যে আত্মত্যাগের কিছু নেই। আত্মত্যাগ মানে প্রাণ কেড়ে নেয়া নয়। কাল্পনিক স্রষ্টা’কে রক্তের সাগরে ভাসিয়ে সুখি করার মাঝে কোনো সার্থকতা নেই। হত্যাযজ্ঞ, রক্তক্ষরণ কখনো দয়ালু সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি হতে পারে না। এসব কাজ যুক্তি-বুদ্ধিহীন একদল মানসিক রোগীর অসুস্থতা ছাড়া আর কিছুই না। অন্যের প্রাণ কেড়ে নেয়ার মধ্যে নিশ্চয়ই আত্মত্যাগ থাকতে পারে না।
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

93 − = 88