জন্মান্তর (উপন্যাস: পর্ব-ঊনিশ)

এগারো

 

আধো ঘুম আধো জাগরণে উপলব্ধি করি বাস ক্রমশ ওপর দিকে উঠছে; চোখ খুলে জানালার বাইরে দৃষ্টি ছুড়ে দিতেই দেখি ঘন সবুজ গাছপালা, আদুরে আলো-ছায়াময় শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতি। অরণ্যের ভেতর দিয়ে মৃত অ্যানাকোন্ডার মতো একে-বেঁকে পড়ে আছে কালো পিচের রাস্তা, আর বড়ো আকৃতির পিঁপড়ার মতো তার গা বেয়ে চলেছে বাসটি। বান্দরবান শহরের খুব কাছেই চলে এসেছি আমরা, সাত-আট মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাব বাসস্ট্যান্ডে। আমার পাশের সিটে ঘুমে অচেতন আবির, ওকে জাগিয়ে দিই। সামনের সিটে শাশ্বতীদি আর পরাগদা, ওরা আগেই জেগেছেন, তাকিয়ে আছেন জানালার বাইরের সবুজে। বাসের যাত্রীরা একে একে জেগে ওঠে। পিছন দিকের কেউ একজন মোবাইলে গান চালায়-‘লাল পাহাড়ের দেছে যা, রাঙামাটির দেছে যা’।

আমাদের সঙ্গে আফজাল ভাইয়ের আসার কথা থাকলেও আরশাদ ফকিরের আখড়ায় জঙ্গি হামলার কারণে আসা হয়নি তার, আফজাল ভাই এখনো মেহেরপুরে। দুঃসময়ে মর্মাহত গুরু এবং আহত গুরু-ভাইদের পাশে আরো কিছুদিন থাকতে চান তিনি। আমরাও তাকে আসার জন্য জোর করিনি। ওখানকার আহত বাউলদের পাশে তার থাকা দরকার। আফজাল ভাই এমনই, তিনি যতো না নিজের জন্য বাঁচেন, তার চেয়ে বেশি বাঁচেন মানুষের জন্য।

বাস থেকে নেমে ইজিবাইকে চেপে লামা বাসস্ট্যান্ডে যাই আমরা, এখান থেকেই ছাড়বে কৈক্ষংঝিরিগামী বাস। বাসের টিকিট কাটার পর টয়লেট সেরে, ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিই। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর সিট পূর্ণ হলে হেলপারের ইশারায় আমরা বাসে গিয়ে উঠি, গজরাতে গজরাতে পাহাড়ী পথে চলতে শুরু করে বাস। শুরু হয় রোমাঞ্চকর যাত্রা; কোথাও উঁচু পাহাড়ের কোল ঘেঁষা রাস্তা, কোথাও রাস্তার পাশে আদিবাসী গ্রাম, অদূরে সাঙ্গু নদী, কোথাওবা রাস্তার দু-পাশে কয়েক’শ ফুট নিচু খাদ। রাস্তার বাঁকগুলো ঘোরার সময় বা কোথাও খারাপ রাস্তার কারণে বাস যখন কাত হয়, তখন নিচের দিকে তাকালে বুকের ভেতরে শিরশির করে একটা বেতাল হাওয়া বয়ে যায়! তবে বুকের বেতাল হাওয়ায় বেশি মনোযোগ না দিয়ে পাহাড়ের কোল-বুক-পিঠ জড়িয়ে থাকা দুধের নদীর মতো সাদা মেঘমালা উপভোগ করাই শ্রেয়, পথের ঝুঁকির প্রতি মনোযোগ দিতে গেলেই যাত্রাপথের আনন্দ মিইয়ে যায়! কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর দিয়েই ধীরলয়ে উড়ছে শিমুল তুলোর মতো কিংবা তার চেয়েও পাতলা মেঘ; ঘাতকের মতো মেঘের গোছালো সংসার এলোমেলো করে, মেঘের বুক চিঁড়ে ধাবিত হয় বাস। বাসের খোলা জানালা দিয়ে বিচ্ছিন্ন মেঘ ঢুকে পড়ায় আমাদেরও হয় মেঘের সাথে আলিঙ্গন, মধুর চুমোচুমি!

রুমা রোড ধরে চলতে চলতে ভাললাগায় বিভোর হয়ে একসময় পৌঁছে যাই কৈক্ষংঝিরি বাসস্ট্যান্ডে, বাস থেকে নেমে সাঙ্গু নদীর ঢাল বেয়ে হেঁটে গিয়ে ঘাটে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা ট্রলারে উঠি। মাঝারি আকৃতির ট্রলার; আমরা চারজন ব্যতিত আরোহী আরও পাঁচজন পর্যটক, বাকিরা স্থানীয় আদিবাসী। ট্রলার স্টার্ট করে ঘাট ছাড়ার আগ মুহূর্তে একজন বৃদ্ধা দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করেন তাকে তুলে নেবার জন্য, অপেক্ষা করে চালক; দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে বৃদ্ধা উঠতেই ঘাট ছাড়ে ট্রলার। বৃদ্ধা পিঠের টুকরিটা সামনে রেখে পাটাতনে বসেন। আমি তাকিয়ে থাকি তার দিকে; ঊর্ধ্বাঙ্গে ব্লাউজের মতো পোশাক, চাকমা ভাষায় যাকে বলে খাদি; আর নিন্মাঙ্গে লুঙ্গির মতো পোশাক-পিনন, পায়ে বার্মিজ স্যান্ডেল, মাথার কাঁচা-পাকা চুল পিছনদিকে খোঁপা করা, মুখে কালো রঙের পাইপ, আয়েশ করে পাইপ টেনে ধোঁয়া ছাড়ছেন। ভদ্রমহিলা সম্ববত বম সম্প্রদায়ের। ট্রলারে এতোগুলো পুরুষ রয়েছে, সেদিকে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, নদীপারের দিকে তাকিয়ে আপন মনে পাইপ টানছেন। মনে মনে এই বৃদ্ধার সঙ্গে আমার দাদীর তুলনা করতে গিয়ে নিজেকে কেমন বোকা মনে হয়! এই বৃদ্ধা হয়তো লেখাপড়া জানেন না, কিন্তু লেখাপড়া জানা অনেক বাঙালী নারীর চেয়েও তিনি অধিক স্বাধীন, স্বতন্ত্র এবং ব্যক্তিত্বময়ী। অধিকাংশ বাঙালী-ই বেশ গর্বের সঙ্গে বলে যে আমরা বাঙালীরা আদিবাসীদের চেয়ে অধিক শিক্ষিত-সভ্য-আধুনিক! কিন্তু সেইসব তথাকথিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত-সভ্য অনেক পুরুষই আজও নারীদেরকে গৃহবন্দী করে রাখতে পছন্দ করে, মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম-ওলামাদের কথা বাদই দিলাম! অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালী নারীকেই পুরুষের শারীরিক এবং মানসিক নিপীড়ন সইতে হয়। আমরা তথাকথিত সভ্য সমাজের মানুষেরা আজও নারীকে যে সম্মান দিতে পারিনি, অনেক বাঙালীর ভাষায় বন্য-জংলি আদিবাসীরা তাদের নারীদেরকে বাঙালীদের চেয়ে অধিক সম্মান দিয়েছে। অনেক আদিবাসী সমাজ-ই মাতৃতান্ত্রিক। আমাদের তথাকথিত সভ্যতা-আধুনিকতা বন্য আদিবাসীদের সামনে মাথা হেঁট করে থাকে লজ্জায়; আমরা অনেকেই হয়তো তা বুঝি এবং স্বীকার করি, আর অধিকাংশ মানুষই বুঝি না বা বুঝেও স্বীকার করতে চাই না!

বৃদ্ধার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আমি দৃষ্টি এবং মন দিই সাঙ্গুর দু-পারের সবুজ প্রকৃতিতে। সবুজ অরণ্যের ফাঁকে ফাঁকে জনপদ, দৃষ্টিনন্দন ঘর-বাড়ি। কোনো কোনো বাড়ি কিংবা পথের মুখ থেকে শান বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি নেমে এসেছে সাঙ্গুর বুকে; ঘাটে স্নান অথবা কর্মরত নারী-পুরুষ, হুটোপুটিতে ব্যস্ত কিশোর-কিশোরী আর উদোম শিশুরা। কোথাও জুমচাষে ব্যস্ত কৃষক, কোথাওবা আশার ঝাঁপি খুলে নদীতে বড়শি ফেলে ঝিম মেরে বসে আছে কোনো যুবক কিংবা বৃদ্ধ। জীবনে পদ্মা-মেঘনা-যমুনাসহ অনেক বড়ো বড়ো নদী দেখেছি, নৌ-ভ্রমণ করেছি; সে-সব নদী এবং নদীপারেরও আলাদা মনোমুগ্ধকর সৌন্ধর্য আছে; কিন্তু সাঙ্গুর সৌন্ধর্য আর দু-পারের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য দৃষ্টিতে অধিক মায়াঞ্জন বুলায় এবং মনে অধিক প্রশান্তি এনে দেয়! আমি আগে বেশ কয়েকবার বান্দবান এসেছে, একবার বান্দরবান থেকে ট্রলারে চড়ে আট ঘণ্টায় থানচিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সাঙ্গু আর দু-পারের মানুষ-প্রকৃতি কখনোই আমাকে ক্লান্ত করেনি, বরং উজ্জ্বীবিত করেছে। ক্যাচ ক্যাচ শব্দ শুনে শাশ্বতীদির দিকে তাকিয়ে দেখি তার ক্যামেরা একের পর এক বুকে ধারণ করছে নদীপারের নয়ন জুড়োনো দৃশ্য, আমাদেরকেও।

রুমাবাজার পৌঁছে প্রথমেই একটা আদিবাসী হোটেলে ঢুকি। ওদেরকে ফ্রেশ হয়ে খাবারের অর্ডার দিতে বলে আমি যাই গাইডের খোঁজে। খাওয়ার পর গেলে গাইড পাব না তা নয়, আজ ঈদের পূর্বদিন হওয়ায় পর্যটকের খুব বেশি চাপ নেই। পর্যটকের চাপ বাড়বে ঈদের পরদিন থেকে। তারপরও না খেয়েই যাই এজন্য যে যদি আমাদের পূর্ব পরিচিত নরখেলেই্ম দাদাকে পাই, তো ভাল হয়। গলি পেরিয়ে এগোতেই আমাকে দেখে কয়েকজন গাইড এগিয়ে আসে, এদের মধ্যে একজন আমার পূর্ব-পরিচিত শফিকুল। শফিকুল সালাম দিয়ে বলে, ‘ভাই আমারে চিনছেন?’

আমি সালামের জবাব না দিয়ে মৃদু হেসে বলি, ‘হুম।’

‘ভাই গাইড লাগবো?’

‘হুম।’

‘আমি যাব।’

‘আবার! তোমারে তো ভাই ঘাড়ে করে আনতে পারবো না আমরা!’

শফিকুলের মুখের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষা না করে একজন আদিবাসী গাইডের কাছে জিজ্ঞাসা করি, ‘নরখেলেই্মদাকে কোথায় পাব বলতে পারেন?’

‘নরখেলেই্ম? ওই সামনের গলিতে একটা পানের দোকান, ওকানে দেকিছি একটু আগে।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ আমি পা বাড়াই।

শফিকুলকে নিয়ে একবার আমাদের চরম শিক্ষা হয়েছে! মহা অলস, হেঁটে আমাদের চেয়েও পিছনে পড়ে। সে-বার কেওক্রাডাং থেকে জাদিপাই ঝর্ণা দেখতে যাব, দুপুর গড়িয়ে গেছে, গিয়ে আবার ফিরতে হবে। তো সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা জাদিপাই থেকে ফিরে একবারে ফ্রেস হয়ে ভাত খাব। ও জানায় ভাত না খেয়ে এক পা-ও যেতে পারবে না। ও ভাত খায় আর আমরা বসে ওর জন্য অপেক্ষা করি। ফেরার পথে জানায়, ‘ভাত না খাইলে আমারে ঘাড়ে করে নেওয়া লাগতো আপনাগো।’ খাওয়ার ব্যাপারটি আমরা ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি, বেচারার ক্ষুধা পেলে তো থাবেই। কিন্তু সমস্যা হলো ও একে তো অলস তার ওপর একটুও আন্তরিকতা নেই। লাঠি কিংবা প্রয়োজনীয় কিছু দরকার হলে ওকে কয়েকবার অনুরোধ করতে হতো, সব কাজে ওর অনীহা। ভাবখানা এমন যে আমি তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি এই তো তোমাদের পরম সৌভাগ্য! ফেরার সময় আবার চাঁদের গাড়ির ভাড়া নিয়ে ঝামেলা পাকিয়েছিল। এরপরই আমরা সিদ্ধান্ত নিই আর কোনোদিন বাঙালী গাইড নেব না। সব বাঙালী গাইডই যে অপেশাদার তা নিশ্চয় নয়, কিন্তু সর্বক্ষেত্রে বাঙালীর অপেশাদার আচরণ দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত-বিরক্ত; ফলে উত্তম বিকল্প যেহেতু আছে, ঝুঁকি এড়ানোই শ্রেয়। পূর্ব অবিজ্হতায় দেখেছি বাঙালী গাইডদের চেয়ে আদিবাসী গাইডরা অনেক বেশি পেশাদার, পরিশ্রমী, সৎ এবং আন্তরিক। অবশ্য শফিকুল বাঙালী না রোহিঙ্গা তা বলা মুশকিল, বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে জানিয়েছিল কক্সবাজার, পরিচয় দিয়েছিল বাঙালী।

যথাস্থানে নরখেলেই্মদা’কে পেয়ে যাই, আমাকে দেখেই একগাল হেসে এগিয়ে আসে, ‘বালো আচেন দাদা?’

‘হ্যাঁ, তুমি কেমন আছো নরখেলেই্মদা?’

‘বালো।’

‘জাদিপাই যাব, তুমি ফ্রি আছো তো?’

‘হা ফ্রি আচি। কিন্তু জাদিপাই তো যাইতে দেবে না।’

‘কেন?’

‘নিরাপত্তার কারণে আর্মি ওদিকে যাইতে দিচ্চে না।’

ইস্, কতো আগ্রহ নিয়ে এসেছি যে জাদিপাই যাব! যদিও এর আগে বর্ষায় ভরা যৌবনবতী অপূর্ব সুন্দরী জাদিপাই ঝর্ণাকে দেখেছি, অবগাহন করেছি স্বচ্ছ জলে। তবু আফসোস হচ্ছে, কেননা জাদিপাই ঝর্ণার সৌন্ধর্য এমন মনোমুগ্ধকর যে সেখানে হাজারবার যেতেও আমি রাজি আছি! কিন্তু আমার নিজের চেয়েও বেশি আফসোস হচ্ছে পরাগদা আর শাশ্বতীদির জন্য, ওরা কখনো জাদিপাই যাননি, ওরা বগালেকের পরে আর যায়নি। খুব আশা করে এসেছেন জাদিপাই যাবার জন্য।

নরখেলেই্মদাকে নিয়ে হোটেলে ফিরি, ওরা ফ্রেশ হয়ে খাবারের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছেন। নরখেলেই্মদাকে দেখে ওরাও খুব খুশি হন, কিন্তু খুশিতে খানিকটা ভাটা পড়ে যখন শোনে যে জাদিপাই যাওয়া যাবে না। হাত-মুখ ধুয়ে এসে আমি আর নরখেলেই্মদাও বসে পড়ি টেবিলে। অর্ডার মতো টেবিলে আসে ভাত, আলু ভর্তা, শুটকি ভর্তা, ডাল আর মুরগির মাংস।

হোটেলটা খুব পরিচ্ছন্ন, আদিবাসীদের হোটেল। গাইডের ক্ষেত্রে যেমনি আমরা বাঙালী গাইড বর্জন করেছি, তেমনি পাহাড়ে এসে সর্বক্ষেত্রেই আমরা বাঙালীদের চেয়ে পাহাড়ীদের প্রাধান্য দেই। বলা যায় বাঙালী হয়েও পাহাড়ে এসে আমরা বাঙালীদের সংস্পর্শ যতোটা সম্ভব এড়িয়ে চলি। এর কারণ আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা। বান্দরবানে একবার একটা বাঙালী হোটেলে খেতে বসে ঝোলের ভেতর তেলাপোকা পেয়েছিলাম। একবার থানচিতে পৌঁছেছিলাম বড়ো অবেলায়, তাই বাধ্য হয়ে আমাদের একটা বাঙালী হোটেলে খেতে হয়েছিল। ভীষণ নোংরা হোটেল; থালা-গ্লাস, জগ, টেবিল সমস্ত নোংরা। নোংরা পরিবেশের কারণে পেট পুরে খেতেও পারিনি, রাতেরবেলা এক আদিবাসী হোটেলে খেয়েছিলাম তৃপ্তি করে। আরেকবার বান্দরবানের এক বাঙালী হোটেলে রুটির মধ্যে বেশ বড়ো একটা চুল পেয়েছিলাম। চুল না হয়ে বাল হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু ছিল না; কেননা বাঙালী হোটেলের অধিকাংশ ময়রা আটা মাখা, গোল্লা বানানো আর বেলনার ফাঁকে ফাঁকেই অণ্ডকোষ কি পাছা চুলকায়; হাত না ধুয়ে ওভাবেই পুনরায় কাজ শুরু করে! বাঙালী হোটেলের অপরিচ্ছন্নতার নমুনা ঢাকাসহ সারাদেশের অলি-গলিতে পাওয়া যায়।

পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য এখন বাঙালীদের নিয়ন্ত্রণে, এইসব বাঙালীরা এখানে সেটেলার নামে পরিচিত। পাহাড়ী আদিবাসীদের শান্তিময় জীবনে এই সেটেলাররা দাবানলস্বরূপ! ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান পরিকল্পিতভাবে পাহাড়ে এই দাবানল ঢুকানো শুরু করে। বরিশাল-নোয়াখালিসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিপুল সংখ্যক মানুষকে লোভ-লালসা দেখিয়ে পাহাড়ে আনা হয়, তারপর জোরপূর্বক আদিবাসীদের বাড়ি-জমি দখল করে তাদেরকে পুনর্বাসন করা হয়, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে রেশনও দেওয়া হয় সেটেলারদেকে। স্বৈরশাসক এরশাদও বিপুল সংখ্যক সেটেলার পুনর্বাসন করে পাহাড়ে। এই সেটেলারদের অনেকেই ছিল নদীভাঙন কবলিত চরাঞ্চলের অপরাধপ্রবণ মানুষ-চোর-ডাকাত, ধর্ষক, জেলখাটা কয়েদি। পাহাড়ে সেটেলারদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত আছে এবং দাবানলস্বরূপ এই সেটেলারা সহজ-সরল আদিবাসীদের জীবনে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে ভূমি দখল, খুন, ধর্ষণসহ নানারকম নিপীড়নের মাধ্যমে; আর সেটেলারদের মাথায় বটগাছের মতো সুরক্ষিত ছায়া দিয়ে রেখেছে আমাদের সেনাবাহিনী!

অনেকবারের পাহাড়ী অভিযানে, আদিবাসীদের জীবনযাপন অবলোকন করে আমার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে যে বাঙালীদের চেয়ে আদিবাসীরা অধিক সৎ, সভ্য, এবং পরিচ্ছন্ন জাতি। আমি যখন এই কথাগুলো আমার সহপাঠীদের কাছে বলি, প্রায় সবাই তখন রেগে যায়; বলে- ‘যা, তুই একটা খাসিয়া-খুসিয়া বিয়ে করে পাহাড়েই থাক গিয়ে!’

অথচ আমি অযৌক্তিক বা মিথ্যা কিছু বলিনি। প্রতিনিয়ত বাঙালীদের অসভ্য-বর্বরোচিত আক্রমণ-আচরণের শিকার হচ্ছে আদিবাসীরা। আমাদের শহরগুলোর রাস্তাঘাটের দিকে, নদী-নালার দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে বাঙালীরা কতোটা নোংরা। আমাদের সমতলের হাজার হাজার বাঙালী গ্রাম ঘুরেও আদিবাসীদের গ্রামের মতো পরিচ্ছন্ন গ্রাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং আদিবাসীদের এই গ্রামগুলো যতোটুকু নোংরা করার আমরা বাঙালীরা ঘুরতে এসে করি; যত্রতত্র চকলেট, চিপস, সিগারেটের প্যাকেট, কলার খোসা ইত্যাদি ফেলি; আর ওরা সে-সব পরিষ্কার করে। আদিবাসীদের বেশিরভাগ ঘর কিংবা দোকানের সামনেই ময়লার ঝুড়ি থাকে, তারপরও বাঙালী পর্যটকরা যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ নোংরা করে। আর যে পথ দিয়ে পর্যটকরা হেঁটে যায়, পথের মাঝে নানান রকম পণ্যের মোড়ক ফেলতে ফেলতে যায়। বাঙালীর এই নোংরা স্বভাবের প্রমাণ কেবল পাহাড় নয়, খোদ ঢাকা শহরেই মেলে, জায়গায় জায়গায় ডাস্টবক্স থাক সত্ত্বেও তার আশে-পাশেই ময়লা ফেলে মানুষ।

আদিবাসীরা অনেক সৎ; যত্রতত্র জিনিষ ফেলে রাখলেও ওরা কখনো কারো জিনিসে হাত দেয় না। এতোবার পাহাড়ে এসেছি কিন্তু কোনোদিন আমাদের কোনো জিনিস হারায়নি, শুধু একবার আমার একটা টি-শার্ট ছাড়া। আর এই টি-শার্টটাও কোনো আদিবাসী চুরি করেনি, চুরি করেছে শহর থেকে অবকাশ যাপনে আসা তথাকথিত সভ্য কোনো বাঙালী পর্যটক। এক বিকেলে ঘাটের কাছে প্যান্ট আর টি-শার্ট রেখে বগা লেকে স্নান করছি, সেখানে আরো পনের-বিশজন বাঙালী পর্যটক, কেউ স্নান করছে কেউবা স্নান সেরে উঠেছে, কোনো আদিবাসী নেই। ট্র্যাকিংয়ের ক্লান্তি বগা লেকে ধুয়ে ফুরফুরে দেহ-মনে ওপরে উঠেই দেখি আমার টি-শার্ট হাওয়া! ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, আর বাঙালী তীর্থে কি পর্যটনে গেলেও চুরি করে!

খেতে খেতে আমাদের পাশের টেবিলে বসা চৌদ্দ-পনের বছর বয়সী এক আদিবাসী কিশোরের দিকে আমার দৃষ্টি পড়ে। ছেলেটা বাঁ-হাতি, বাঁ-হাত দিয়ে যত্ন করে ভাত মেখে খাচ্ছে। কোনো ছন্দপতন নেই, কোনো অস্বাভাবিকতা নেই, একদম সহজাত। অথচ হযরত মুহাম্মদ বলেছের ডানহাতে খেতে। যে জন্মগত বাঁ-হাতি, সে ডানহাতে খাবে কী করে? একজন বাঁ-হাতিকে ডান হাত দিয়ে খেতে বলা কিংবা জোর করে ডান হাত দিয়ে খেতে শেখানো তো প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ। দেশ যে-দিকে এগোচ্ছে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাঁ-হাত দিয়ে খাবার জন্য বাঁ-হাতিদেরও চাপাতির কোপ খেতে হতে পারে!

কেবল খাওয়া নয়, মুহাম্মদ সব কাজ ডান দিক থেকে শুরু করতে বলেছেন। যে কারণে দেশের প্রচলিত আইনে রাস্তার বাঁ-দিক দিয়ে চলার নির্দেশ থাকলেও অধিকাংশ হুজুর আর বোরকাওয়ালী রাস্তা বা ফুটপাতের ডানদিক দিয়ে হাঁটে। হুজুর আর বোরকাওয়ালীদের সঙ্গে প্রায়ই আমার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হয়, বিপরীত দিক থেকে এদেরকে রাস্তার ডানদিক দিয়ে আসতে দেখলে আমিও আমার বাঁ-দিক দিয়ে যাবার সিদ্ধান্তে অনড় থাকি। আমার হাঁটার ধরন দেখে অধিকাংশই মুহাম্মদের আদেশ অমান্য করতে বাধ্য হয়; আবার অনেকে আশা করে যে আমি তাদেরকে সাইড দেব, কিন্তু সাইড দেওয়া দূরে থাক আমি তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাই তাদের চোখে আমার বিরক্তিমাখা চোখদুটো রেখে! বাধ্য হয়ে তারাই সাইড দেয়, আমি বিজয়ীর আনন্দে চলতে শুরু করি।

খাওয়ার পর ট্র্যাকিংয়ের জন্য প্লাস্টিকের স্যান্ডেল কিনি সবাই। চারটে ব্যাগ দুটো করি, মানে চারজনের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস দুটোয় ঢুকিয়ে নিই আর বাকি জিনিস অন্য দুটোয় ঢুকিয়ে নরখেলেই্মদার পরিচিত এক দোকানে রেখে দিই। তারপর থানায় গিয়ে এবং আর্মি ক্যাম্পে নাম এন্ট্রি করে উঠে পড়ি চাঁদের গাড়িতে, আমরা ছাড়াও স্থানীয় আরো তিনজন ওঠে।

চাঁদের গাড়ির যাত্রা ভীষণ রোমাঞ্চকর, মাঝে মাঝে মনে হয় রোলার কোস্টারে চড়েছি; কখনো ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নামতেই থাকে, আবার কখনো ষাট-সত্তর ডিগ্রি খাড়া ঢাল বেয়ে ওপর দিকে ওঠে! অতিরিক্ত খাড়া ঢালগুলো উঠার সময় পিছন দিকে তাকালে মনে হয় এই বুঝি গাড়ি উল্টে যাবে! ঢালগুলো উঠার সময় মাঝে মাঝে আমরা সবাই সমস্বরে ‘ও…’ বলে চিৎকার করে উঠি, শাশ্বতীদি একেকবার আমাদের একেকজনের হাত নয়তো হাঁটু খাঁমচে ধরেন। ধার্মিকেরা বলে প্রাণের মালিক আল্লাহ বা ভগবান, আমি বলি যতোদিন বাঁচবো ততোদিন প্রাণের মালিক আমি; কিন্তু এই পাহাড়ী পথে প্রাণের মালিক চাঁদের গাড়ির চালক এতে কোনো সন্দেহ নেই! একটু এদিক-ওদিক হলেই এক-দেড়শো ফুট নিচের গাছপালায় কি পাথরে আছড়ে পড়বো। তবে এ পথের চালকেরা খুবই দক্ষ।

পথের পাশের একটা পাড়ায় স্থানীয় একজন নেমে যায়, এখানেই তার বাড়ি। ছোট্ট পাড়াটি পেরোলেই আবার জনশূন্য পাহাড়ী পথ। একের পর এক পাহাড় অতিক্রম করে সবুজ অরণ্যের ভেতর দিয়ে চাঁদের গাড়ি এগিয়ে চলে সামনের দিকে। রাস্তার বাঁকে একটা জায়গা খুব খারাপ, ড্রাইভার আমাদের নামিয়ে দিয়ে খালি গাড়ি নিয়ে জায়গাটা পার হয়। এই ফাঁকে জলবিয়োগের জন্য আমি গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াই। অরণ্যের ঝোঁপঝাড়-লতাগুল্মের দারুণ একটা বিশুদ্ধ গন্ধ এসে লাগে নাকে, লম্বা নিশ্বাস নিয়ে বুকের হাপর ভরে ফেলি বিশুদ্ধ বাতাসে। আমার দেখাদেখি আবির আর পরাগদাও মূত্র বিসর্জনে দাঁড়িয়ে যায়। এক লাইনে তিনজনকে দাঁড়াতে দেখে দূরে দাঁড়ানো শাশ্বতীদি দুষ্টুমি করে বলেন, ‘দাঁড়া, ছবি তুলবো!’

আমাদের ছবি আর তোলেন না, এই অবসরে তিনি তুলতে থাকে প্রকৃতির ছবি। জলবিয়োগ সেরে আবার গিয়ে উঠি গাড়িতে। শৈরাতং পাড়ার কাছাকাছি এসে ঢাল বেয়ে নামার সময় পরাগদা নরখেলেই্মদাকে বলে, ‘দাদা, ড্রাইভারকে বলো আমরা এই পাড়ায় একটু থেমে চা খেয়ে যাই।’

কথামতো শৈরাতং পাড়ার চায়ের দোকানের সামনে গাড়ি থামায় ড্রাইভার। নেমে সবাই বিস্কুট আর কলা খাই, পাহাড়ী কলা দারুণ সুস্বাদু, তার ওপর ফরমালিনমুক্ত, খেয়ে ফেলি হালি খানেক। তারপর চা-টা হাতে নিয়ে আমরা এগিয়ে যাই শৈরাতং পাড়ার ভেতরের দিকে, দারুণ পরিচ্ছন্ন আর সুন্দর পাড়াটা। রাস্তার পাশের দোকান আর কয়েকটি ঘর মাটিলগ্ন হলেও, পাড়ার ভেতরের দিকের ঘরগুলো বাঁশ আর কাঠের খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে, মাটি থেকে তিন-চার ফুট উঁচুতে। কাঠের মেঝে, বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া, চালে ছন। দুটো মুরগী আর একটা মোরগ মাটিতে কিছু খুঁটে খাচ্ছিল, আগন্তুক দেখে ঘরের কোনে সরে যায় ওরা। ঘরের সামনে দুটো শূকর নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময়ে ব্যস্ত, আগন্তুক দেখে ভীত কিংবা রাগত নয় তারা। দু-জন লোক পিঠে দুটো ভারি বস্তা বয়ে নিচের দিক থেকে ওপর দিকে উঠছে। নারীরা নিজেদের মতো কাজ করছে, বাচ্চারা আপনমনে খেলছে। আমাদের বাঙালীদের মতো এরা অতি কৌতুহলী নয়; বাঙালীরা নিজেদের গ্রামে অপরিচিত কাউকে দেখলে নাম, ঠিকানা, কার বাড়িতে এসেছে ইত্যাদির পরও একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কে অযাচিত প্রশ্ন করতেও ছাড়ে না; অনধিকার চর্চা বাঙালীর মজ্জাগত! কিন্তু এরা তা নয়, এরা নিজেদের মতো কাজ করে, পর্যটকদের প্রতি বিশেষ কৌতুহল নেই, কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেয়, ছবি তুলতে চাইলে একটু দাঁড়িয়ে ক্যামেরার দিকে তাকায় কিংবা হাসে।

আকাশে মেঘের অবস্থা এখন-তখন, ড্রাইভারের তাড়া পেয়ে আবার এসে গাড়িতে উঠি। রুমাবাজার থেকে যখন চাঁদের গাড়িতে উঠি, তখনো আকাশ বেশ পরিষ্কার ছিল, ছিল ঝলমলে রোদ্দুর। এটুকু আসতে আসতেই রূপ বদলে গেছে আকাশের, বৃষ্টি যে হবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

রাস্তার দু-পাশে কোথাও কাছে, কোথাওবা দূরে ঋষির মতো মৌনী-ধ্যানি পাহাড়; পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জমাট মেঘ। হঠাৎ হঠাৎ পাহাড়ের গায়ে এক বা দু-জন মানুষ চোখে পড়ে, কলা কি ভুট্টা সংগ্রহে ব্যস্ত তারা। বংশ পরম্পরায় এদের জীবন একইভাবে একই ধারায় বয়ে চলেছে। এরা পৃথিবীর কোনো ক্ষতি করে না, এরা বিশ্বাস করে এই ধরিত্রীমাতা তাদের খাওয়ায় তাই তার কোনো ক্ষতি করা উচিত নয়; নদী তাদের প্রাণ বাঁচায়, তাতে আবর্জনা ফেলা উচিত নয়। এরা বায়ু দূষণ কিংবা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী নয়, পৃথিবীতে শিল্প বিপ্লব না ঘটলেও এদের কিছু আসতো-যেতো না। যুগের পর যুগ এরা পাহাড়কে দিয়েছে ঘাম আর পাহাড় এদের হাতে তুলে দিয়েছে আহার, তাতেই সন্তুষ্ট থেকেছে এরা। কিন্তু তারপরও পৃথিবীর তথাকথিত সভ্য মানুষের ডেকে আনা বিপর্যয় থেকে প্রকৃতির সন্তান এই শান্ত-স্নিগ্ধ-সরল জীবনগুলি রেহাই পাবে না!

একটা সুউচ্চ পাথুরে পাহাড়ের পাদদেশে পথের বাঁকে এসে গাড়ি থামে। পথ সামনে আরো এগিয়ে গেছে, কিন্তু আমরা ওদিক দিয়ে যাব না, ওদিক দিয়ে গেলে খাড়া পাহাড় বেয়ে অনেকটা পথ উঠতে হয়। পরিশ্রম হয় খুব, আবার ঝুঁকিপূর্ণও। একবার ও পথে গিয়েছিলাম, যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছিল। তাই এখান থেকে আমরা বাঁ-দিক দিয়ে নেমে অদূরের ঝিরিপথ দিয়ে যাব, ঝিরিপথ চলে গেছে বগালেকের কাছ দিয়ে; ওখান থেকে খাড়া পাহাড় বেয়ে অল্প একটু পথ।

আমরা গাড়ি থেকে নামি। ব্যাগ একটা আমার কাঁধে, আরেকটা আবিরের। নরখেলেই্মদা ঝাড় থেকে পাঁচটা চিকন বাঁশের লাঠি কেটে এনে চারটে আমাদের হাতে দেয়, আরেকটা রাখে নিজের হাতে। তারপর রাস্তা থেকে নেমে সরু পথ ধরে আগে আগে হাঁটতে শুরু করে সে, আমরা পিছে পিছে; সকলের পিছনে আমি। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলে পরাগদা আবিরের কাছে জানতে চান, ‘পলিথিনগুলো ব্যাগে ঢুকিয়েছিলি?’

‘হ্যাঁ।’ জানায় আবির।

ঝিরিতে নামতে নামতেই বৃষ্টির বালিকা ফোঁটাগুলো হঠাৎ-ই যেন কৈশোর টপকে যুবতী হয়ে যায়। আবির চটজলদি ব্যাগ থেকে পলিথিন বের করলে দেখা যায় বড়ো পলিথিনগুলো আছে কিন্তু ছোটগুলো নেই, নিশ্চয় রেখে আসা ব্যাগেই রয়ে গেছে। ছোট পলিথিনগুলো এনেছিলাম মাথায় বেঁধে বৃষ্টির হাত থেকে কিছুটা রেহাই পেতে। পরাগদা সুযোগ পেয়ে আবিরকে খোঁচা মারে, ‘ভাগ্যিস প্রিয়তি আসেনি, নইলে তো তুই ও বেচারিকেও রুমাবাজারে ভুলে রেখে আসতি!’

অগত্যা সবার মোবাইল-মানিব্যাগ আর আমার ক্যামেরা কাঁধের ব্যাগে রেখে, আমি আর আবির ব্যাগদুটো কয়দা করে বড়ো পলিথিনের মধ্যে ঢুকিয়ে কাঁধে নিই যাতে বৃষ্টিতে ভিজে না যায়। বাইরে থাকে কেবল শাশ্বতীদির ওয়াটারপ্রুফ ক্যামেরা। আমরা এই কাজটুকু করতে করতেই দেখি ঝিরির উজান থেকে নেমে আসা জলে পায়ের পাতা ডুবে গেছে, ছোট ছোট পাথরগুলো চোখের সামনে জলের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। নরখেলেই্মদাকে অগ্রবর্তী করে আমরা হাঁটতে শুরু করি। গা ছেড়ে তুমুল বৃষ্টি নামে, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আমাদের সমতলের চেয়ে কয়েকগুণ বড়। দেখতে দেখতে হাঁটুজল হয়ে যায়, আমরা সামনে লাঠি ফেলে তারপর সাবধানে পা ফেলে হাঁটি। পাথুরে পথ; ছোট, বড়ো, মাঝারি নানান মাপের পাথর; কোনো কোনোটার দৈর্ঘ্য মানুষ সমান, চওড়াও অনেক; কোনোটা গোলাকার, কোনোটা বর্গাকার বা এবড়ো-থেবেড়ো। জলের নিচের ছোট কিংবা মাঝারি পাথর দেখতে পাই না, কেবল লাঠি দিয়ে অনুভব করে এগোই; এর মধ্যে পড়ে গেলেই বিপদ।

জল এখন কোথাও হাঁটু কোথাওবা ঊরু সমান! ঝিরি যেন পাহাড়ের যোনি; কামুক জল পাহাড়ের গলা, বুক, পেট বেয়ে খুঁজে নিয়েছে এই গুপ্তদ্বার; বিপুল সুখে আর উচ্ছ্বাসে ধেয়ে আসছে সামনে থেকে! শাশ্বতীদি এই তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই তার ওয়াটারপ্রুফ ক্যামেরা দিয়ে প্রকৃতি এবং আমাদের ছবি তোলে মাঝে মাঝে। আমি ছবি তোলার সময় ক্যামেরায় এক ঝলক তাকিয়ে পরক্ষণেই দৃষ্টি রাখি নিচের দিকে, একটু অমনোযোগি হয়ে পা পিছলে পড়লেই মাথা ফাটবে না হাঁটুর বাটি ছুটে যাবে তার ঠিক কী! ভাবতে না ভাবতেই পা পিছলে পড়ে যায় আবির। দ্রুত ওর কাছে যাই সবাই। ওকে টেনে তুলি, জলের ওপর পড়েছে, কোনো ধারালো পাথর ছিল না ওখানে, তাই রক্ষা। যখন দেখি ওর বিশেষ কিছু হয়নি, তখন আবার হাঁটতে হাঁটতে ওকে নিয়ে রসিকতা শুরু করি আমরা। পরাগদা ওর কাছে গিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘কিরে, বিচি গলে নাই তো!’

‘খুব মজা নিচ্ছো না, একবার পড়লে বুঝবা গলে কী না গলে!’

শাশ্বতীদি পরাগদার কথা শুনতে পাননি, কিন্তু আবিরের কথা শুনে হয়তো কিছুটা অনুমান করেছেন। না বোঝার ভান করে তিনিও যোগ দেন রসিকতায়, ‘এই তোরা কী গলার কথা বলছিসরে!’

শাশ্বতীদির রসিকতা ধরতে পেরে আবির বলে, ‘তুমিও ওদের সাথে যোগ দিচ্ছো না! দাও, সুযোগ পেয়েছো! তবে সময় আমারও আসবে সামনে, তোমাই জামাইয়ের জায়গা মতো একটা জোঁক যদি এবার আমি না লাগায়ে দিছি, তাইলে আমার ঠাকুরদার নাম পাল্টায়ে দিও!’

পরাগদা জোঁক দেখলে ভীষণ ভয় পান। তার প্যান্টের পকেটে একটা গুলের কৌটা আর পলিথিনে লবণ আছে। ঝিরিতে নামার আগে লবণ আর গুল মিশিয়ে হাতে-পায়ে লাগিয়েছেন। তার এই জোঁকভীতি নিয়েও আমরা খুব রসিকতা করি। পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘোরার কথা শুনলে এক পা উঁচিয়ে থাকেন, অথচ জোঁক দেখলে ভয় পান! আবিরের মুখে জোঁকের কথা শুনে আপসে আসেন তিনি, ‘ভাই, তুই আমার বড়ো আদরের ছোট ভাই, আমরা একই সরকারি দলের লোক, আমি না হয় সামান্য একটু রসিকতা করেছি, তাই বলে তুই আমার গায়ে জোঁক দিবি? এতে তো বিরোধী দল খুশি হবে, হাততালি দেবে!’

বিরোধী দল মানে আমি আর শাশ্বতীদি। যেকোনো বিষয়ে আমার সঙ্গে শাশ্বতীদির মতের মিল বেশি থাকে, আর আবিরের সঙ্গে পরাগদার। অধিকাংশ বিষয়েই আমি আর শাশ্বতীদি একাট্টা থাকি, তুমুল তর্ক-বিতর্ক করি ওদের সঙ্গে। ওরা সরকারি দল এই জন্য যে আমাদের ট্যুরের টাকা-পয়সা সব আবিরের কাছে থাকে, সব খরচ ওর হাত দিয়েই হয়। এজন্য আমরা ওদের বলি সরকারি দল, আর ওরা আমাদেরকে বলে বিরোধী দল।

চারিদিকে এখন বৃষ্টি আর ঝিরির উজান থেকে আসা তীব্র জলস্রোতের শব্দ। মেঘ-বৃষ্টির কারণে এমনিতেই আলো কম, তার ওপর মাথার ওপর ঘন গাছপালা, জায়গা বিশেষে গাছপালার ঘনত্ব এতোই বেশি যে মনে হয় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সতর্কতার সাথে জলস্রোত আর একের পর এক পাথর ডিঙানোর ফাঁকে গল্প-কথা আর হাসি-ঠাট্টা করতে করতে এক সময় দারুণ রোমাঞ্চকর ঝিরিপথ ছেড়ে উঠি আমরা, ঝিরি চলে গেছে আরো ওপরের দিকে, কিন্তু আমাদের এখন ডানদিকের একটা খাড়া চড়াই বেয়ে উঠতে হবে বগাকাইন হ্রদ কিংবা সংক্ষেপে বগা হ্রদ বা বগালেকের পাড়ে। ঝিরির পাড়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বোতলের অবশিষ্ট জলটুকু এক ঢোক করে সকলে পান করি। পানীয় জল শেষ, এমনিতে ঝিরির জল পান করা যায়, কিন্তু বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড় ধুয়ে নামা জলে মাটি মিশে ঘোলা হয়ে গেছে। আমরা সবাই ভীষণ পরিশ্র্রান্ত, হাঁটু কাঁপতে থাকে, একনাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শীত লাগে। মনে হয় এখনই যদি একটা উষ্ণ বিছানায় কাঁথা গায়ে দিয়ে একটু গড়িয়ে নিতে পারতাম! পাহাড়ী অভিযান এমনই, একনাগাড়ে চলতে চলতে ক্লান্তি আসে, ঝিমুনি আসে, তারপর উঠে গা ঝাড়া দিয়ে আবার চলতে হয়। আসলে না চলে তো উপায় নেই, পাহাড়ী অরণ্যে না আছে আরামদায়ক গাড়ি না আছে গড়িয়ে নেবার জন্য বিশ্রামাগার! ফলে অলস মানুষও এখানে এলে কর্মঠ হয়ে ওঠে। প্রত্যেক মানুষেরই উচিত মাঝে মাঝে পাহাড়ে ট্র্যাকিং করা। পাহাড় মানুষকে যেমনি উদারতা শেখায়, তেমনি শেখায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই-সংগ্রাম করতে।

বৃষ্টিস্নাত পিচ্ছিল খাড়া পাহাড়ের সঙ্গে লড়াই-সংগ্রাম করতে করতে অবশেষে আমরা বগালেকের পাড়ে উঠে বুক ভরে নিশ্বাস নিই। এখন আর বৃষ্টি নেই, রোদও নেই; আকাশ বেশ পরিষ্কার। চায়ের দোকানের ধোঁয়া ওঠা গরম জলের কেটলি দেখে পরাগদা দোকানের চাঙায় বসে বলেন, ‘আগে চা খেয়ে শরীরটা একটু চাঙ্গা করি, তারপর নিচে নামবো।’

নিচে বলতে খুব বেশি নিচে নয়; লেকের পাড়ের ঢাল দিয়ে একটুখানি এগোলেই কিছুটা সমতল জায়গা, সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো কাঠের ঘর, ঘরগুলো পর্যটকদের থাকার জন্য। কাঁধের ব্যাগ নামাই চাঙায়। খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে আসায় হাঁটু কাঁপে, তৃষ্ণায় কাতর বুক। এক জগ জল পাঁচজনে শেষ করে ফেলি, তারপর পা ছড়িয়ে বসি চাঙায়। বসামাত্র কোমরে দারুণ আরাম অনুভূত হয়। দোকানদারের বাড়িয়ে দেওয়া চায়ের কাপ হাতে নিয়ে মুখের কাছে ধরতেই চায়ের ধোঁয়া যেন ক্রমাগত বৃষ্টিতে ভেজা মুখের থমথমে মাংসপিণ্ডে উষ্ণ আদর বুলিয়ে দেয়! গরম রং চা মুখে আর পেটে পড়তেই শরীরটা চনমনিয়ে ওঠে, আর সেই সঙ্গে চাগাড় দিয়ে ওঠে ক্ষিধেটাও। রোমাঞ্চকর পথের ধকলে আর অরণ্যের সৌন্ধর্য উপভোগে এতোক্ষণ ক্ষিধের কথা মনেই ছিল না! নরখেলেই্মদা তার চা দ্রুত শেষ করে বলে, ‘আপনারা চা খায়ে আসেন, আমি গিয়ে ঘর ঠিক করি আর খাবার কথা বলি।’

‘ঠিক আছে যাও।’ সায় দেন পরাগদা।

 

(চলবে…..)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − = 10