জন্মান্তর (উপন্যাস: পর্ব-কুড়ি)

কিছুক্ষণ পর চায়ের বিল মিটিয়ে আমরাও উঠে নিচের দিকে পা বাড়াই। নরখেলেই্মদা আমাদের থাকার জায়গা ঠিক করে একটা কাঠের দোতলায়, আর খাওয়ার ব্যবস্থা অন্য এক জায়গায়। সে আমাদের ব্যাগ দুটো রেখে আসে দোতলায়, তারপর আমরা তার সাথে যাই পাশের আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে। একজন আর্মি চেয়ারে বসে আছে, তার সামনের টেবিলে একটা মোটা খাতা আর কলম; আর অন্য তিনজন আর্মি বসে আছে পাশের বেঞ্চে, বেড়ায় ঠেস দিয়ে রাখা তাদের বন্দুক। চারজন আর্মি-ই বাঙালী। আমরা একে একে নাম এন্ট্রি করি আর এর ফাঁকে ফাঁকে চলে আর্মিদের সঙ্গে গল্প; আর্মিদের প্রশ্ন আর আমাদের উত্তর, আবার আমাদের প্রশ্ন আর আর্মিদের আন্তরিক উত্তর। একজনের বাড়ি আবিরদের উপজেলায়, তিনি আবিরের বাবাকে চেনেন।

আমার কয়েকবারের পাহাড়ী অভিযানে একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি যে পাহাড়ের বাঙালী আর্মি এবং পুলিশ বাঙালীদের সঙ্গে খুবই আন্তরিক ব্যবহার করে। যেচে কথা বলে আর কথা একবার শুরু করলে শেষ করতে চায় না। বছর কয়েক আগে এই বগা লেকেই একবার স্নানাহার সেরে সন্ধ্যা নামার আগে নাম এন্ট্রি করতে এসেছিলাম, কয়েকজন আর্মি কথা শুরু করে আর শেষ-ই করতে চাইছিলো না। যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে আর মশা কামড়াতে শুরু করে, তখন অডোমাস মাখার দোহাই দিয়ে উঠতে চাইলে একজন আর্মি পকেট থেকে নতুন অডোমাস বের করে দিয়ে মেখে নিতে বলে। ফেরত দিতে গেলে বলে, ‘রেখে দিন আপনাদের কাছে, আমাদের অনেক আছে।’

আর একবার থানচির পুলিশ আমাদেরকে একগাদা পেয়ারা দিয়েছিল খাওয়ার জন্য। ঝুড়ি ভরা পেয়ারা, কতো আর খাবে তারা, আঁজলা ভরে ভরে দিয়েছিল আমাদের একেকজনের তোয়ালে আর গামছায়! জীবনে অমন আন্তরিক পুলিশ দেখিনি।

পাহাড়ের বাঙালী আর্মি আর পুলিশের বাঙালীদের প্রতি এই আন্তরিকতার বড়ো কারণ হলো- দিনের পর দিন পরিবার, বন্ধু-স্বজন ছেড়ে এরা অরণ্যে পড়ে থাকে; নিজেরা ছাড়া কথা বলার মানুষ তেমন পায় না। একঘেয়ে হয়ে ওঠে এদের জীবন, অরণ্যের নৈঃশব্দ যেন এদের গলা টিপে মারে! একজন আর্মি বলেছিল, ‘ভাই, সখ করে কেউ এই জায়গায় বেড়াতে আসে! পয়সা খরচ করে এখানে এসে কী যে মজা পান আপনারা!’

এই বাক্য এমনি এমনি বলেনি সে, বলেছিল দিনের পর দিন একঘেয়ে জীবন-যাপনের অভিজ্ঞতায়। আমরা যেমনি শহরের যান্ত্রিক জীবনে একঘেয়ে হয়ে উঠলে অবকাশ যাপনের জন্য সমুদ্রে-অরণ্যে ছুটি, তেমনি একনাগাড়ে পাহাড়ে থাকার ফলে এই বিজন অরণ্যও এদের কাছে একঘেয়ে হয়ে ওঠে। মুক্তি পাবার জন্য ছটফট করে এরা। কথা বলার জন্য বুকের ভেতরটা আঁকু-পাঁকু করে, কথা বলার মানুষ পেলে ছাড়তে চায় না।

তবে যে আন্তরিকতাটুকু এরা বাঙালীদের দেখায়, সেটুকু পাহাড়ীদের প্রতি দেখালেই আমরা বেশি খুশি হই। কেননা অধিকাংশ বাঙালী স্বীকার করতে না চাইলেও আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে আমাদের আর্মিরা পাহাড়ী আদিবাসীদের ওপর নির্মমভাবে নির্যাতন চালায়। সামান্য কারণে আদিবাসীদের মারধর করা, প্রয়োজনো-অপ্রয়োজনে তাদেরকে বাস্তুচ্যূত করা, আদিবাসী নারীদেরকে ধর্ষণ করাসহ অনেক অভিযোগ আমাদের সেনাদের বিরুদ্ধে; যার কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়।

আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে ব্যাগ থেকে শুকনো কাপড় নিয়ে স্নানে উদ্দেশ্যে যাই বগালেকের ঘাটে। ঝড়ে উপড়ে পড়া একটা গাছের বাকলহীন ডালে জামা-কাপড় রেখে আমরা নেমে পড়ি লেকের স্বচ্ছ জলে। আবির আর আমি কিছুদূর সাঁতরে গিয়ে আবার ফিরে আসি। ভয় লাগে আমার। একে তো জলজ উদ্ভিদে পা জড়িয়ে যায়, তার ওপর এখানে নাকি অনেক বড়ো বড়ো মাছ আছে; এই ভরা যৌবনে মাছের খাবার হতে চাই না!

বগালেকের জল এই সময়ে দারুণ স্বচ্ছ থাকায় অনেকটা গভীরের মাছও দৃষ্টিগোচর হয়। গভীরতা আনুমানিক ১৫০ ফুট, বিস্তৃতি ১৫ একর জায়গায়। আশপাশের গাছপালার ছায়া পড়েছে এখন লেকের কোনার দিকে, আর মাঝখানে আকাশ এবং মেঘের প্রতিবিম্ব। বগালেক নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে লোকগাঁথা চালু আছে যে- অনেককাল আগে চোঙা আকৃতির পাহাড়ের গুহায় এক অদ্ভুত প্রাণি বাস করতো, লোকে সেই অদ্ভুতদর্শন প্রাণিকে বগা নামে ডাকতো। বম ভাষায় বগা শব্দের অর্থ ড্রাগন। পাহাড়ের পাদদেশে বাস করতো আদিবাসীরা, তারা বগাকে সন্তুষ্ট রাখতে নানা ধরনের জীবজন্তু ছেড়ে আসতো গুহার মুখে। হঠাৎ করেই আদিবাসীদের গ্রাম থেকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে হারিয়ে যেতে শুরু করে। সকলের সন্দেহের তীর বগার দিকে। এক রাতে গ্রামের সাহসী মানুষেরা মশাল জ্বালিয়ে লাঠি, তীর-ধনুক, বল্লম প্রভৃতি অস্ত্র নিয়ে বগার গুহায় গিয়ে তাকে আক্রমণ করে, মানুষের হাতে প্রহৃত বগা পালানোর জন্য চেষ্টা করলে তারা বগার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, আগুনে পুড়ে বগা তো মরেই সেই সঙ্গে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ভেঙে খান খান হয় পাহাড় আর জন্ম নেয় এই হ্রদ, তখন থেকেই এই হ্রদের নাম বগাকাইন হ্রদ বা বগা হ্রদ কিংবা বগা লেক।

লোকগাঁথা লোকগাঁথাই, বংশ পরম্পরায় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত লোকগাঁথায় যৌক্তিক তত্ত্ব কিংবা সত্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে কখনো কখনো লোকগাঁথার মধ্যে সত্যের একটি সুতো পাওয়া যায়। ভূতাত্ত্বিকদের ধারণা লেকটি সম্ভবত মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ অথবা মহাশূন্য থেকে বৃহৎ উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ হলে সত্যের সুতোর মতো লোকগাঁথার আগুনের ব্যাপারটাই শুধু সত্য, বাকিসব মানুষের কল্পনা। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ হবার সম্ভাবনাই বেশি, লেকের তলদেশে উষ্ণ জলের একটি প্রস্রবণ রয়েছে, এপ্রিল-মে মাসে প্রস্রবণ থেকে উষ্ণ পানি বের হবার সময় লেকের জলের রঙ বদলে ঘোলাটে হয়ে যায়।

হৃদয় স্তব্ধ করা ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঝিঁঝির কোরাস, অরণ্যের নাম না জানা পাখির সুর। সামনে বগালেকের নিস্তরঙ্গ জলরাশি। মাথার ওপর বহুদূরে জ্বলজ্বল করছে অজস্র নক্ষত্র। মনে হচ্ছে আমি যেন ওই দূর নক্ষত্রজগতের অসংখ্য নক্ষত্রের ভেতর থেকে টুপ করে খসে পড়েছি এখানে, মনে হচ্ছে ভিন্ন এক জগতে এসে পড়েছি হঠাৎ! মনে হচ্ছে এই জগতে কেউ নেই, আমি একা!

আজ চানরাত, কাল ঈদ। একারণেই আমরা ছাড়া আর মাত্র কয়েকজন পর্যটক আছে এখানে, পরশু থেকে পর্যটক বাড়তে শুরু করবে। পর্যটক বেশি থাকলে এতোটা সুনসান থাকে না, এদিক-সেদিক দিয়ে পর্যটকরা হাঁটাচলা করে, মদ্যপান করে জোরে জোরে কথা বলে, গান গায়, কোথাও আগুন জ্বালিয়ে বারবিকিউ করে হই-হুল্লোর করতে করতে। তখন বগালেকের আসল সৌন্ধর্য আর হৃদয় হিম করা নীরবতা উপভোগ করা যায় না এখনকার মতো।

আবেগাক্রান্ত আমি; এমনিতেই আমি আবেগী মানুষ, তার ওপর পেটে তিন পেগ পড়ায় আবেগ উথলে ওঠে। তিন পেগ পেটে চালান করেই আমি লেকের পাড়ের মরা গাছটার ওপর এসে বসি একা একা কিছুটা সময় কাটাবো বলে, নিজের মুখোমুখি হবো বলে। পরাগদা, শাশ্বতী আর আবির এখানো ঘরে বসে পান করছে। আমি সখের পানশৌণ্ড, ন’মাসে-ছ’মাসে একবার পান করি। পান করলেই খুব আবেগাক্রান্ত হই আর শায়লাকে মনে পড়ে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে, অথচ আমি নীরবে কাঁদি! বাইরে থেকে দেখে অনেকেই আমাকে অরসিক অবেগশূন্য মানুষ মনে করে। আমার সাথে যারা গভীরভাবে মেশে কেবল তারাই পড়তে পারে আমার হৃদয়টা। আমাকে গভীরভাবে জানে পরাগদা, শাশ্বতীদি আর আবির।

এক বছর হলো, শায়লার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ভেঙে গেছে। আমার অপরাধ? আমি নাস্তিক! আমাদের সম্পর্ক হবার আগে থেকেই আমি নাস্তিক, শায়লা তা জানতো। কিন্তু তখন আমার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে ওর কোনো অসুবিধা হয়নি। ও নাকি ভেবেছিল নাস্তিকতা আমার পাগলামি, এক সময় আমার মাথা থেকে নাস্তিকতার ভূত চলে যাবে; মুখে মুখে নাস্তিকতার কথা বললেও ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনেই ওকে বিয়ে করবো। কিন্তু যখন একের পর এক ব্লগার খুন হতে থাকে, তখন থেকেই ও আমাকে লেখালেখি বন্ধ করার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে। কিন্তু যখন দ্যাখে যে নাস্তিকতা কেবল আমার মুখের বুলি নয়, আমি হৃদয়েও ধারণ করি। ধারণ করি অসাম্প্রদায়িক-মানবিক চেতনা, তখনই ঘুরে দাঁড়ায় ও। ১৪৪ ধারা জারি করে আমার ওপর যে আমি যদি নাস্তিকতার পথ ছেড়ে ধর্মের পথে না ফিরি তাহলে ও আমার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। আমি ওকে বলি, ‘আমরা কোর্টে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করবো। বিয়ের পর তুমি ধর্ম পালন করলে আমার কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমাকে ধর্ম পালনের জন্য চাপাচাপি করতে পারবে না।’

কিন্তু ও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, ওর বাবা-মা নাকি নাস্তিক জামাইকে মেনে নেবেন না। আমিও ওর শর্ত মানতে পারিনি। আমি ওকে ভালবাসি, ভীষণ ভালবাসি, ওর জন্য আমি নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত; কিন্তু কখনোই আমি আমার আদর্শ, বিশ্বাস, নৈতিকতা, সত্তা বিসর্জন দিতে পারবো না। কারো জন্যই পারবো না, প্রয়োজনে পৃথিবীতে একা বাঁচবো। ও আমাকে নাস্তিকতা ত্যাগ করতে বলেছিল, ভবিষ্যতে বিয়ের পর নিজের সুবিধার জন্য ও যে আমার বাবা-মাকেও ত্যাগ করতে বলবে না এর নিশ্চয়তা কোথায়! আমি আমার মনুষ্যত্ব বিকিয়ে সাজানো ধার্মিক হতে পারবো না, পারিওনি; তাই দু-জনের পথ বদলে গেছে। ও হয়তো সহজেই ভুলে গেছে যে দু-বছর আগে এই বগালেকেই আমরা কী দারুণ সময় কাটিয়েছি, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বসে থেকেছি বাকি পৃথিবী ভুলে! ও হয়তো ভুলে গেছে যে রুমা বাজারের একটা হোটেলে আমরা প্রথম রাত্রিযাপন করেছি, শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছি। গত মার্চে ওর বাগদান হয়েছে এক প্রবাসী ছেলের সঙ্গে। ও হয়তো অনেক কিছুই ভুলে গেছে, আমিও ভুলতে চাই; কিন্তু পারি না। বার বার অশরীরি শায়লা আমার কাছে আসে; যখন যে কল্পনা করি; তার মধ্যেই ও ঢুকে পড়ে। আমি হয়তো ওকে ভুলতে পারবো না কোনোদিন, দূর থেকে সারাটা জীবনই ওকে ভালবেসে যাব!

আমার একলা মগ্ন চৈতন্যের ঘোর কাটে শাশ্বতীদির উচ্চস্বরের ডাকে, ‘সবুজ…সবুজ…।’

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দোতলার দিকে দৃষ্টি ছুড়ে দিই। দূর থেকে শাশ্বতীদিকে ভালভাবে দেখতে না পেলেও ঘরের আলোর একফালি চুইয়ে তার পিঠের দিকে পড়ায় অনুমান করতে পারি যে ওটাই শাশ্বতীদি। সাড়া দিই, ‘আমি এখানে দিদি।’

‘কী করছিস?’

‘এমনি বসে আছি।’

‘মোবাইলের আলোটা জ্বালা, আমি আসছি।’

শাশ্বতীদি এসে বসেন আমার পাশে, ‘এই তুই একা একা এখানে এসে বসে আছিস, কাছেই জল, যদি পড়ে যেতি?’

‘ধুর, তুমি আমাকে অতো মাতাল ভাবো! আমি মাত্র তিন পেগ খেয়েছি।’

‘এখানে মশা কামড়াচ্ছে না রে?’

‘না, অডোমাস মেখেছি ভাল মতো। ওরা কী করছে?’

‘ওরা এখন দার্শনিক বনে গেছে!’

পেটে মদ পড়লেই পরাগদা দার্শনিক বনে যান, অনর্গল জ্ঞানগর্ভ কথা বলতে থাকেন; কম যায় না আবিরও। আমিও আগে মদ খেয়ে বেশি কথা বলতাম, কিন্তু শায়লা ছেড়ে যাবার পর থেকে মদ খেলেই ওর কথা মনে পড়ে, ওর কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এক কথা আর কতোবার বলে বিরক্ত করবো ওদের? তাই দু-জনের বিগত দিনের স্মৃতির সরোবরে ডুব দিয়ে আমি চুপ করে থাকি। শায়লার বিষয়ে শাশ্বতীদি এবং পরাগদা সবই জানে; আর আবির তো জানেই, ও-ই তো আমাদের প্রেমের দূতিয়ালি করেছে। এখন কেন জানি না শায়লার কথা বলতে ইচ্ছে করছে শাশ্বতীদিকে, হয়তো আগে বলেছি এসব কথা, তারপরও আবার বলতে ইচ্ছে করছে। শায়লার প্রসঙ্গ তুলতে যাব তার আগেই শাশ্বতীদি বলেন, ‘তোকে বলবো বলবো করে আর বলা হয়নি, আমি না একটা কাণ্ড করে ফেলেছি।’

অগত্যা নিজের কথাটা চেপে রেখে বলি, ‘কী কাণ্ড?’

‘আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে চিঠি লিখে পাঠিয়েছি তনয়ের হাতে।’

‘কবে পাঠিয়েছ?’

‘তনয় আজকে বাড়ি গেছে, নিশ্চয় এতোক্ষণে চিঠি পৌঁছে দিয়েছে ওর মামা-মামির কাছে।’

‘পরাগদা জানে?’

‘না। তুই বলিস না ওকে। আগে দেখি কী রেজাল্ট আসে, তারপর বলবো। হাতে লেখা দীর্ঘ চিঠির ছবি তুলে রেখেছি মোবাইলে।’

শাশ্বতীদি চিঠির প্রথম পাতাটা বের করে মোবাইল এগিয়ে দেয় আমার দিকে, ‘পড়ে দ্যাখ, পরপর আছে পাতাগুলো।’

আমি মোবাইল হাতে নিয়ে চোখ রাখি স্ক্রীনে-

মা-বাবা,

আমার প্রণাম ও ভালবাসা নিও। পুলককে আমার স্নেহাশীষ জানিও। তোমাদেরকে আমি তুমি করেই বলি, কেননা তোমরা তো আমার দূরের মানুষ নও; আমার জন্মদাতা-জন্মদাত্রীর মতো তোমরাও এখন আমার শ্রদ্ধা-ভালবাসার মানুষ, আপনজন। আপনজনকে আমার আপনি বলতে ইচ্ছে করে না, তাই তোমাদেরকে তুমি করেই বলি।

মা-বাবা, তোমরা কেমন আছো? নিশ্চয় ভাল আছো; পরাগকে তোমরা দূরে সরিয়ে দিলেও এখনো তো তোমাদের সামনে পুলক আছে, পুলক এখন তোমাদের চোখের মণি, তোমাদের ভবিষ্যত। অবন্তীদি আছে, জামাইবাবু আছে, ফুটফুটে দুটো নাতি-নাতনিও আছে তোমাদের। তনয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে পুলকের জন্য সু-পাত্রী খুঁজছো। সু-পাত্রী নিশ্চয় পেয়ে যাবে, নিশ্চয় পুলকের বউ হবে তোমাদের মনের মতোন বউ। তোমরা ভালই আছো, ভাল থাকো তাই-ই চাই। মা, আমরা ভাল নেই; বাবা, আমাদেরও ভাল থাকতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু কী করে ভাল থাকবো বলো? গত এক দশক আমি আমার বাবা-মাকে দেখি না, আর পরাগ তোমাদেরকে দ্যাখে না পাঁচ বছর। বাবা-মা থাকতেও আমরা মাকে মা, বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারি না। মানুষ একজীবনে কতো বছর বাঁচে বলো, সত্তর-আশি-নব্বই কিংবা একশো বছর? এই ছোট্ট জীবনে বাবা-মাকে পায় আরো অল্প সময়ের জন্য; আর এই অল্প সময় থেকে যদি রাগারাগি কিংবা মান-অভিমানে আরো পাঁচ-দশ বছর চলে যায়, তবে আর থাকেটা কী বলো? আমরা বড় দূর্ভাগা!

এই দ্যাখো না, ঈদের ছুটিতে বেশিরভাগ মানুষ শিকড়ের টানে কেউ বাড়ি যাচ্ছে, কেউবা যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। আর আমরা দু-জন? আমরা না যেতে পারছি বাবার বাড়ি, না যেতে পারছি শ্বশুরবাড়ি। ভাইবোন-আত্মীয়-স্বজন থেকেও এখন আমাদের না আছে কোনো ভাইবোন, না আত্মীয়-স্বজন। ব্যতিক্রম কেবল তনয়, ও-ই মাঝে মাঝে বাসায় আসে, বৌদি বলে ডেকে আমার প্রাণ জুড়ায়। এজন্য ওকে গঞ্জনাও সইতে হয়। আমি এবার পরাগকে বলেছিলাম, ‘চলো আমরা গিয়ে বাড়ি উঠি, বাবা-মা নিশ্চয় আমাদেরকে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দেবেন না!’ কিন্তু জানো তো, তোমাদের বড় অভিমানী ছেলে, একদিন দূর করে দিয়েছিলে, তাই না ডাকলে আর ফিরে যাবে না কোনোদিন; কেবল তোমাদের জন্য কষ্ট পাবে আর চোখের জল ফেলবে। জানো মা, ও মাঝে মাঝেই ঘুমের মাঝে তোমাকে স্বপ্নে দেখে ‘মা’ বলে চিৎকার করে ওঠে। আমি হয়তো তখন জেগে থাকি কিংবা ওর চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি স্বপ্ন দেখার পর ও বাচ্চা ছেলের মতো হু হু করে কাঁদছে। ওর কান্না আমাকেও ছোঁয়, আমরা দু-জন দু-জনকে ছুঁয়ে বিছানায় বসে কাঁদি।

মা-বাবা, তোমাদের কাছে এবং আমার বাবা-মা’র কাছে আমরা দু-জনই অপরাধী। তোমাদের ভাষায় পরাগের অপরাধ, ও একটা ছেলের সঙ্গে সংসার করছে, তাও আবার মুসলমান ছেলে; আর আমার বাবা-মায়ের ভাষায় আমার অপরাধ, আমি ছেলে হয়ে নিজেকে মেয়ে বলে পরিচয় দিয়ে একটা ছেলের সঙ্গে সংসার করছি। তার ওপর আবার আমরা বিয়েই করিনি!

মা, এটা কি নিন্দনীয় কিছু? বাবা, এটা কি আমাদের অপরাধ? তোমাদের ছেলে আর আমি না হয় কোনো প্রথাগত ধর্মে বিশ্বাসী নই, নাস্তিক; কিন্তু তোমরা তো ধর্মে বিশ্বাস করো, পৌরাণিক দেবদেবীদের কাহিনী বিশ্বাস করে তাদেরকে পূজা করো। আমাদের দু-জনের মিলন যদি অপরাধ হয় তবে বহুকাল আগেই তোমাদের অনেক দেবদেবী এবং দেবতুল্য মানুষেরা সেই অপরাধে অপরাধী। তাহলে আমাদের মতো তোমরা তাদেরকে কেন বর্জন করছো না; কেন তাদেরকে মন্দিরে স্থান দিয়ে ফুল-মালা-চন্দন পরিয়ে, নিজেরা ব্রত থেকে ঘটা করে পূজা করছো? পরাগের মুখে শুনেছি, তোমরা বছরে একবার বাড়িতে নারায়ণ পূজা করো; নারায়ণের অন্য নাম বিষ্ণু। বাবা-মা, দেবতা এবং অসুরদের সমুদ্রমন্থনের গল্প তোমরা নিশ্চয় জানো, সমুদ্র মন্থন করে অমৃত পাওয়া গেলে সেই অমৃত নিয়ে দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে, আর দ্বন্দ্ব নিরসনে স্বয়ং বিষ্ণু মোহিনী মায়ায় স্ত্রী-রূপ ধারণ করে দানবদের কাছ থেকে অমৃত নিয়ে দেবতাদের পান করিয়েছিলেন। মা, আমি শুনেছি তুমি শিব পূজা করো। জানো নিশ্চয় মহিষাসুরের বোন মহিষীকে বধ করার জন্য বিষ্ণু মোহিনী রূপ ধারণ করেছিলেন, আর শিব এবং মোহিনীরূপী বিষ্ণুর মিলনের ফলে জন্ম হয়েছিল অয়প্পানের। মা, পরাগ যদি অপরাধী হয়ে থাকে, তাহলে শিবও তো সমান অপরাধী; আমি যদি পাপী হয়ে থাকি, তাহলে বিষ্ণুও সমান তো পাপী। কিন্তু তোমরা সেই শিব-বিষ্ণুকে পূজা করছো, অথচ নিজেদের গর্ভজাত-ঔরসজাত সন্তান আর তার স্ত্রীকে ত্যাগ করেছ! তোমাদের বিশ্বাস মতে যদি ধরে নিই যে পরকাল আছে, তাহলে পরকালে গিয়ে ভগবান শিব আর বিষ্ণুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের সন্তানকে ত্যাগ করার প্রশ্নে কী জবাব দেবে তোমরা?

তোমাদের ধর্মগ্রন্থগুলোতে রূপান্তরকামিতার গল্প অনেক আছে, আছে তাদের বিয়ে এবং সংসার করার গল্পও; সেখানে এই বিয়েকে কেউ পাপ বলেনি, স্বাভাবিক বিয়ে বলেই গণ্য করেছে। যদিও আমি আর তোমাদের ছেলে প্রথাগত নিয়েমে বিয়ে করিনি; কিন্তু এই যে আমরা দু-জন দু-জনকে ভালবেসেছি, কাছে এসেছি, একসঙ্গে জীবন-যাপন করছি; এটাই আমাদের কাছে বিয়ে। শুধু আমাদের কাছে কেন, হিন্দুধর্ম মতেও এটা বিয়ে। তোমরা নিশ্চয় মহাভারতের দুষ্মন্ত এবং শকুন্তলার জানো, মহারাজ দুষ্মন্ত মৃগয়ায় গিয়ে ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত হয়ে কন্ব মুনির আশ্রমে গিয়েছিলেন; কন্ব আশ্রমে ছিলেন না, ছিলেন তার কন্যা শকুন্তলা। শকুন্তলার সৌন্ধর্যে মুগ্ধ হয়ে রাজা দুষ্মন্ত তাকে তাঁর ভার্যা হবার অনুরোধ জানালে শকুন্তলা তার পিতার ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলেন। কিন্তু রাজা দুষ্মন্ত তাকে ধর্মানুসারে গান্ধর্ব মতে বিয়ে করার কথা বলেন; যে বিয়েতে কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হয় না, কোনো তৃতীয় পক্ষের স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না, পাত্র-পাত্রী নিজেরাই নিজেদেরকে পছন্দ করে একে অন্যের কাছে সমর্পণ করেন। রাজা দুষ্মন্ত আর শকুন্তলাও গান্ধর্ব মতে বিয়ে করে একে-অন্যের সংস্পর্শে আসেন। তারপর রাজা চলে যাবার পর কন্ব মুনি আশ্রমে ফিরে এলে লজ্জিত-বিব্রত শকুন্তলা পিতার কাছে গেলেন না, কন্যার এই সংকুচিত ভাব লক্ষ্য করে কন্ব মুনি দিব্যদৃষ্টিতে সব জানতে পারেন এবং প্রীত হয়ে কন্যাকে জানান যে সে কোনো পাপ করেনি, নির্জনে বিনা মন্ত্রপাঠে সকাম পুরুষের সকামা স্ত্রীর সঙ্গে যে মিলন তাকেই গান্ধর্ব বিবাহ বলে, এটাই শ্রেষ্ঠ বিবাহ।

শুধু কী দুষ্মন্ত আর শকুন্তলাই গান্ধর্ব বিবাহ করেছেন? না, আরো উদাহরণ আছে-মহাভারতের শান্তনু-গঙ্গাকে, অর্জুন উলুপী ও চিত্রাঙ্গদাকে, ভীম হিড়িম্বাকে এবং ইক্ষাকু বংশের পরীক্ষিত সুশোভনাকে গান্ধর্ব মতে বিবাহ করেন।

বাবা, আর্যরা ভারতে আসার আগে হাজার-হাজার বছর ধরে আমাদের অনার্য সমাজে গান্ধর্ব বিবাহ প্রচলিত ছিল, তখন মন্ত্রপাঠ করা ব্রা‏হ্ম বিবাহ অনার্য সমাজে প্রচলিত ছিল না। আমরা তো আমাদের সেইসব পূর্বপুরুষদেরই উত্তরসুরি, আমরা তো তাদেরকেই অনুসরণ করেছি। এবার তোমরাই বলো, আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি? আমরা তো ধর্মানুসারেই একজন আরেকজনের কাছে এসেছি, ভালবেসেছি, গান্ধর্ব বিবাহ করেছি।

আজকাল চারদিকে তাকালেই দেখতে পাই যে অনেক নারী-পুরুষ নিজেরা পছন্দ করে অথবা পরিবারের পছন্দ মতে বেশ ঘটা করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, শত শত কি হাজার মানুষকে খাইয়ে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে জৌলুস ছড়িয়ে বিয়ে করে; তোমাদের ভাষায় এই সম্পর্ক চিরন্তন, স্বাভাবিক, মঙ্গলজনক। কিন্তু কিছুদিন বাদেই অনেকেরই ডিভোর্স হয়, আবার তারা বিয়ে করে একইভাবে। এভাবে কেউ কেউ চার-পাঁচটি বিয়েও করে। আর তোমাদের ভাষায় আমাদের সম্পর্ক চিরন্তন না হলেও, বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে বিয়ে না করেও, একে-অন্যের সঙ্গে আমরা বারো বছর কাটিয়ে দিয়েছি। আমাদের এই বারো বছরের প্রেম-ভালবাসা, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ; এ কী সত্য নয় মা? এ কী চিরন্তন নয় বাবা?

আমি জানি যে আমাদের জন্য সমাজের মানুষের কাছে তোমাদের মাথা হেঁট হয়েছে, তোমাদের হয়তো অনেক তীক্ষ্ণ কথা শুনতে হয়েছে; নিশ্চয় এখানো মানুষ তোমাদেরকে বিব্রত করে। কিন্তু যে সমাজ অন্ধ, সেই সমাজের মানুষের কাছে তোমরা কেন মাথা হেঁট করে থাকবে? যে সমাজ কূপমণ্ডুক, সেই সমাজের মানুষের কথা তোমরা কেন গায়ে মাখবে? আমাদেরকে তোমরা বুকে নাইবা ঠাঁই দিলে, কিন্তু তোমরা মানুষের মাঝে মাথা উঁচু করে বাঁচো। তোমরা যেমনি কোনো অপরাধ করোনি, তেমনি অপরাধ করিনি আমরাও। কেউ ফোঁড়ন কাটতে এলে তাকে শুনিয়ে দাও তারই ঘরের ঠাকুরের আসনে বসা বিষ্ণুর মোহিনী রূপের গল্প, বিষ্ণু আর শিবের মিলনের গল্প, দুষ্মন্ত-শকুন্তলার গল্প, অর্জন-উলুপী কিংবা চিত্রাঙ্গদার বৃত্তান্ত। দেখবে নিতান্ত বর্বর হলেও জিভ গোটাতে বাধ্য হবে।

বাবা, তনয়ের কাছে শুনেছি তোমার ডায়াবেটিসের কথা। কিন্তু তুমি নাকি চুরি করে মিষ্টি খাও? বাড়িতে মা এখন মিষ্টি রাখে না বলে তুমি নাকি বাজারে গিয়ে অনাথ ঘোষের দোকান থেকে মিষ্টি কিনে খাও? প্লিজ বাবা, একটু নিয়ম করে চলবে; সকাল-বিকাল একটু হাঁটবে। পলকের জন্য মেয়ে খুঁজছো, নাতি-নাতনির মুখ দেখে যেতে হবে না!

মা, তুমিও নাকি অনিয়ম করো, নিজের শরীরের প্রতি ঠিক মতো যত্ন নাও না? প্লিজ মা, তোমরা দু-জনেই একটু নিয়ম করে চলবে। এই পৃথিবীতে তোমাদের থাকতে হবে আরো অনেকদিন, পৃথিবীর আরো অনেক পরিবর্তন তোমাদের দেখে যেতে হবে।

মা-বাবা, আমার ভীষণ ইচ্ছে করে তোমাদের আদর-স্নেহ পেতে, ইচ্ছে করে নিজে হাতে রান্না করে তোমাদেরকে খাওয়াতে, তোমাদের সাথে তোমাদের ছায়ায় থাকতে ইচ্ছে করে। জানি না আমার এই ইচ্ছে কোনোদিন পূরণ হবে কি না, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই, তাই স্বপ্ন দেখি যে অভিমান ভুলে তোমরা আমাদেরকে বুকে টেনে নিয়েছো। সেই দিনের অপেক্ষায় আছি আমরা। ভাল থাকো মা, ভাল থাকো বাবা; আনন্দে থাকো।

 

ইতি

তোমাদের বৌমা

শাশ্বতী

 

চিঠি পড়া শেষ হলে আমি মোবাইলটা নিচের দিকে ধরি যাতে আলো আমার মুখে না পড়ে, শাশ্বতীদি আমার মুখের অভিব্যক্তি পড়তে না পারে। এমনিতেই শায়লার কথা ভাবতে ভাবতে মনটা ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়েছে, তার ওপর এই চিঠি পড়ে আমার ভেতরটা কেদে ওঠে, চোখ ভিজে যায়। শাশ্বতীদি আর পরাগদার বাবা-মা ওদেরকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন, কিন্তু আমার বাবা-মা আমাকে দূরে ঠেলে দেননি; আমি তাদের কাছেই থাকি। একই বাড়িতে থাকি, খাই, ঘুমাই; তবু মনে হয় তারা আমার থেকে অনেক দূরে থাকেন, যে দূরত্ব পরিমাপ করা সম্ভব নয়, কেবল অনুভব করা সম্ভব; আমার বাবা-মাকে আমি আমার মতো করে পাই না, যেভাবে আগে পেতাম। দু-দিনের পৃথিবীতে মানুষের সংকটের শেষ নেই; সংকটের বিবিধ রূপ; বিবিধ রঙ!

চিঠি পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি, হৃদয় বলে যদি কিছু থাকে, তবে এই চিঠি পড়ার পরও কি কোনো বাবা-মা পারে তার সন্তান আর সন্তানসম বৌমাকে দূরে সরিয়ে রাখতে? যদি পারে তবে পাষণ্ড সেই বাবা-মা!

আমার নীরবতার অবসরে নৈঃশব্দ অন্ধকারে শাশ্বতীদি হঠাৎ গেয়ে ওঠেন-

‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই

আকাশ তো বড়

এ মন বলাকা মোর অজানার আহ্বানে

চঞ্চল মাখা মেলে ধরো…।’

 

(চলবে…….)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

60 − 59 =