ভাঙ্গা গড়ার খেলা

ভাঙ্গা গড়ার খেলা ।

ইতিহাসে সাক্ষী আছে, যুগ যুগ ধরে কালের পর কাল ধরে নতুন নতুন ধর্মের জন্ম হয়েছে, সেই ধর্মগুলোর মধ্যে বহু ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিছু ধর্ম বিলুপ্ত হওয়ার পথে, আবার কিছু টিকে আছে, কিছু ধর্মের চরিত্র কালের পরিবর্তনে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পাল্টে গেছে, কিছু ধর্ম পুরোনো খোলস পাল্টে নতুন খোলস ধারণ করেছে, এর মাঝখানেই আবার বহু নতুন ধর্মের জন্মও হয়েছে -তাঁরা ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে গাছের মতো করে । কোনো ধর্মের আয়ু ২০০-৩০০-৪০০ বছর গেছে, কিছু ধর্মের ৫০০-১০০০ বছর কিংবা কিছু ধর্মের বয়স ১৫০০,২০০০,৩০০০ বছর । এই ধর্মগুলোকে মানুষ জন্ম দিয়েছে । আকাশ থেকে টপকে পড়ে কিংবা এলিয়েনের মতো কেউ এসে জন্ম দিয়ে যায়নি, বলেও যায়নি যে আমি ঈশ্বর এবং তোমরা আমাকে মানো, আমার পুঁজা করো, ইবাদত করো হ্যান ত্যান ইত্যাদি করো… যা করেছে সবটাই নারীর পেট থেকে জন্ম নেওয়া মানুষ করেছে, মানুষের বিশ্বাস সৃষ্টি করেছে । কোনো এক গোষ্ঠীর হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট কিংবা পথপ্রদর্শক নিজেকে ঈশ্বরের অবতার, নবী দেবতা ইত্যাদি রুপে পরিচয় দিয়েছে এবং মানুষ বিশ্বাসের জোরে সেটা মেনে নিয়েছে কিংবা মানুষ নিজেই কোনো উদ্বারকারিকে ঈশ্বর বা পয়গম্বরের জায়গা দিয়েছে । বেশিরভাগ ধর্মের ঈশ্বর নামক চরিত্রগুলো গোষ্ঠী বদ্ধ, অর্থাৎ কোনো এক গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন নেতা,নায়ক, পথপ্রদর্শক কিংবা বিপদ থেকে উদ্ধারকারীই কল্পনাবাদের সঙ্গে জড়িত হয়ে ভবিষ্যতে ঈশ্বর নামক চরিত্র, ঈশ্বর চরিত্রের অবতার কিংবা নবী, দেবতা, গড ।

ইতিহাস সাক্ষী আছে, গির্জা ভেঙ্গে সেখানে নতুন করে মসজিদ তৈরি করা হয়েছে, ফের মসজিদ ভেঙ্গে গির্জা তৈরি করা হয়েছে, প্যাগোডা ভেঙ্গে মসজিদ তৈরি করা হয়েছে, আবার অন্য কোথাও মসজিদ ভেঙ্গে হয়তো সেখানে সিনাগণ, কিংবা সিনাগণ ভেঙ্গে মসজিদ ।
এই যেমন পৌত্তলিকদের সংস্কৃতি,নিয়ম আচার অনুষ্ঠান ধ্বংস করে এবং অসংখ্য মূর্তি ভেঙ্গে মুহাম্মদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসলাম ধর্ম ।
এই যেমন, দেড় হাজার বছরের পুরোনো ইস্তাম্বুলের হাইয়া সোফিয়া এক সময় ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় গির্জা, পরে সেখানে ক্ষমতায় মুসলিম শাসক আসলে সেই গীর্জা ভেঙ্গে তৈরি করা হয় হাইয়া সোফিয়া মসজিদ । এরপরে কিছুকাল পরে সেখানে সেক্যুলার শাসক ক্ষমতায় আসলে সেই মসজিদকে বদলে ফেলা হয় জাদুঘরে । এরপর সেখানে আবার মুসলিম শাসক ক্ষমতায় আসলেন এবং সেই যাদুঘরকে আবার মসজিদে রুপান্তর করা হলো মাত্র কয়েকদিন আগেই ।
এই যেমন, গাজার বড় মসজিদ ‘আল-উমরি আল-কাবির’ মসজিদ । পঞ্চম শতকে বাইজেন্টাইনদের তৈরি করা একটি গির্জা ছিল এই মসজিদটি । সপ্তম শতকে মুসলিমরা যুদ্ধ করে সেই অঞ্চল দখল করে নেয় এবং গির্জাটিকে মসজিদে রুপান্তরিত করে । একাদশ শতকের দিকে ভূমিকম্পের কারণে মসজিদটির কিছু অংশ ভেঙ্গে যায় । এতদিনে গির্জা থেকে মসজিদে রুপান্তরিত হওয়ার তিনশো বছর পেরিয়ে গিয়েছিল । দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে খৃষ্টান ধর্মযোদ্ধারা ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যাওয়া মসজিদটিকে আবার গির্জা বানিয়ে ফেলে, এরপর আবার ১৩শ শতাব্দীর শুরুর দিকে মামলুক এটিকে একটি মসজিদ হিসেবে পুনঃনির্মাণ করে । এরপরে আবার ভূমিকম্প হয়, এবং মসজিদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় । এর প্রায় ৩০০ বছর পরে উসমানীয়রা সেই ধ্বংসস্তূপে পূনরায় নতুন রুপে মসজিদ গড়ে তোলেন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ গোলাবর্ষণের পর এই মসজিদ আবার ভেঙ্গে যায়, পরবর্তীতে আবার সেখানে মসজিদ তৈরি হয় । যার নাম এখন আল-উমরি আল-কাবির মসজিদ । জানিনা আবার কবে মসজিদটি ধ্বংস হবে, কিভাবে হবে এবং ভবিষ্যতে সেখানে কি হবে !!
এই যেমন গ্রীসের প্রাচীন মিথের ঈশ্বর দেবতারা আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে খৃষ্টান ধর্মের আগমনে ।
এই যেমন মিশরের দেবতারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে ।
এই যেমন আফ্রিকার প্রাচীন দেবতারা আজ প্রায় বিলুপ্তর দিকে ।

যাইহোক, এবার ভারতে আসি ।
প্রাচীন ভারতে বিদেশি আর্যরা এসে মূলনিবাসীদের সামাজিক কাঠামো, বিশ্বাসের প্রকৃতি, আচার অনুষ্ঠান এবং ধর্মিয় সিস্টেম ধীরে ধীরে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে যায় রাজা মহারাজাদের সহযোগিতায় , নিজেদের মতো করে রুপ দেয় সিস্টেমকে…। মূলনিবাসীদের কুল দেবতারা আজকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে । প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে, মূলতঃ প্রি-বৈদিক যুগে কত ধরনের দেবদেবীর চরিত্র ছিল ভারতে! সেগুলো সব আজ বিলুপ্ত(গুগলে গিয়ে “Indian religion” লিখে সার্চ দিলেই উইকিপিডিয়াতেই দেখতে পারবেন প্রাচীন ভারতে কত ধরনের দেবদেবী ছিল) ।

এইতো, ব্রিটিশ এরায়, সালটা ঠিক আমার মনে নাই, সম্ভবত উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশদের দ্বারা করা আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে অসুরের বংশ কিংবা অসুরকে দেবতারুপে মানা ভক্তের সংখ্যা ছিল কয়েক লক্ষ । সেই সংখ্যাটা মাত্র একশো বছরের মধ্যেই ১৯৯১ এর আদমশুমারিতে নেমে এসেছে মাত্র ১০ হাজারে, আর ২০১১ তে ৪ হাজারে এসে ঠেকেছে । অসুর মূলনিবাসীদের দেবতা ছিল এবং একজন নায়ক মূলনিবাসীদের কাছে । অসুরকে দেবতা মানা ভক্তের বংশ যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তা নয়, আসলে আর্য তথা তথাকথিত ব্রাহ্মণ নামক গোষ্ঠী বিপক্ষে দূর্গা চরিত্রকে দাঁড় করিয়ে অসুরকে ভিলেইন বানিয়ে কালের পর কাল ধরে চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে মানুষের মধ্যে, বিশ্বাসের হাতিয়ারকে নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে ধীরে ধীরে… যতদিন যাচ্ছে ততবেশি করে দূর্গা চরিত্র সার্বজনীন হচ্ছে । এসবকিছুই শাসকের আলিঙ্গনে । আর মূলনিবাসীরাও যুগের পরিবর্তনে জঙ্গলের কালা দেবতা ছেড়ে শহুরে সাদা ধপধপে সুন্দর দেবদেবীর সন্ধান পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হয়ে গেছে ।(অসুরের বংশ বা অসুরকে দেবতা মানা পরিবার এখনোও আছে জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা, পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়ে) ।
অনেকটা এই উদাহরণের মতো করেই বিবর্তিত হতে হতে হতে তথা সিন্ধু থেকে ছড়িয়ে পড়া বৈদিক আর্যদের তৈরি মিথোলজি এবং নিয়ম কানুনের মিক্সার-ই বিভিন্ন ইতিহাস এবং ঘটনাবলী পার হয়ে আজকের হিন্দু ধর্ম(হিন্দু নামকরণীয় ইতিহাস এই আলোচনায় অনাবশ্যক) ।

এটা সত্য যে ভারতে সুলতানি, মোঘল আমলে বহু মন্দির, প্যাগোডা, জৈন মন্দির ভাঙ্গা হয়েছে, এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে, যেমন সত্য ভারতের মূলনিবাসীদের সংস্কৃতি, বিশ্বাসের রুপ ধ্বংস করে দিয়েছে এবং মূলনিবাসীদের কে শোষন করে গেছে যুগের পর যুগ ধরে ঐ আর্যদের বংশধরেরা ক্ষমতার জোরে ।

এই যে, এতসব ভাঙ্গা গড়ার খেলা । সবটাই রাজনীতির ক্ষমতার জোরে । যে রাজা শক্তিশালী, যার সেনাবাহিনী যত বড়ো, যে যুদ্ধে বিজয়ী, যার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তাঁর ইচ্ছাতেই পুরোনো উপসনালয় ভেঙ্গেছে, পুরোনো ধর্ম ভেঙ্গেছে এবং নতুন গড়েছে । রাজা যদি পৌত্তলিক হয়, তবে সে পৌত্তলিকতা ধরে রাখার এবং গড়ার চেষ্টা করেছে, আশপাশের যত ভিন্ন মতাবলম্বী, দৃষ্টিভঙ্গি, ভিন্ন বিশ্বাসী ছিল তাকে ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করেছে, ভেঙ্গে দিয়েছে । মুহাম্মদ যত বেশি যুদ্ধ জয় করেছে, সে তত বেশি করে ইসলামের বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে । স্পেনে মুসলিম শাসক জয় লাভ করলে সেখানে মসজিদ গড়েছে, আবার কখনো খৃষ্টান ধর্মিয় রাজা বা শাসক যুদ্ধে জয়লাভ করলে সে মসজিদ ভেঙ্গে গির্জা বানিয়েছে । ভারতে ব্রিটিশ এসেছে নিজেদের শক্তি আর বুদ্ধি প্রদর্শন করে গির্জা বানিয়ে দিয়ে গিয়েছে । এই মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা,সিনাগণ যাই-হোক, এগুলো তৈরি হয়েছে-ভেঙ্গেছে রাজার ক্ষমতা জোরে, রাজার দৃষ্টিভঙ্গিতে । রাজার শক্তির জোরে । রাজার শক্তি যদি কম হয় তবে ঈশ্বর আল্লাহ ভগবানের শক্তিও কম । ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছা করলে এখনই যখন তখন মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশ বোম দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে, উড়িয়ে দিয়ে সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের স্টাচু পুতে দিতে পারে, ঘর বানিয়ে নাম দিতে পারে ‘টেম্পল অফ ডোনাল্ড ট্রাম্প’ । চীনের যেমন ইচ্ছে হয়েছে চীনের মসজিদ গুলি ভেঙ্গে দিতে, ভেঙ্গে দিয়েছে । চীনের ইচ্ছা হয়েছে কুরআনের সূরা আয়াত কাটছাট করে নিজের মতো করে আল্লাহকে উপস্থাপন করা, চীন করেছে এবং আল্লাহ জিন পিংয়ের ইচ্ছামতোই উপস্থাপন হচ্ছে এখন । ভারতে যতদিন মুসলিম শাসন ছিল ততদিন মন্দির ভেঙ্গেছে, মসজিদ গড়েছে । ব্রিটিশ এসেছে, মন্দির মসজিদ ভাঙার ইতিহাস নাই কিন্তু মানুষের পুরোনো চিন্তাভাবনা ভেঙ্গে দিয়ে মন্দির মসজিদের পাশেই গির্জা বানিয়ে দিয়েছে । যদি মুসলমান শাসক-ই থাকতো তাহলে বেধর্মি কাফেরদের গির্জা নামক উপসনালয় তৈরি করতে দিতো না, যদি মুঘল আমলে হিন্দু রাজা বিজয়ী হতো তাহলে মসজিদ নির্মাণ করতে দিতো না তাঁর সাম্রাজ্যে, এই যেমন দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর সাম্রাজ্য, যতদিন হিন্দু শাসক ছিলেন ততদিন সেখানে কোনো আল্লাহ দাঁত ফোটাতে পারেনি, বিজয়নগরের হিন্দু রাজা হেরেছে আল্লাও মাটির তল থেকে বের হয়ে মসজিদে বসে গেছে…এই যেমন ভারতে এখন মুসলমান সংখ্যালঘু, তাই ভগবান,দেবতা যেখানে সেখানে মাটির তলা থেকে বের হচ্ছেন, কারন ভারতের রাজার দৃষ্টিভঙ্গি এখন হিন্দুত্ব । এই যেমন বাংলাদেশে, মন্দিরগুলো দিনকে দিন শকুনের মতো বিলুপ্ত হচ্ছে, কারন বাংলাদেশের শাসক মুসলমান, ক্ষমতার জোর মুসলমানের, শাসক যদি হিন্দু হতো তাহলে বাংলাদেশেও ভারতের মতো যেখানে সেখানে ভগবান বের হতো ।

তো এইসব আল্লাহ, ভগবান, গড, ঈশ্বরের শক্তি রাজার বিশ্বাস এবং শক্তির উপর নির্ভরশীল । সাম্রাজ্যের রাজা,শাসক যত শক্তিশালী তাঁর ইচ্ছার ঈশ্বর, আল্লাহ তত বেশি শক্তিশালী । গোষ্ঠীর রাজা যতদিন আছে ততদিন সেই গোষ্ঠীর ঈশ্বর শক্তিশালী, মহা পরাক্রমশালী । গোষ্ঠী এখন মতাদর্শে কনভার্টেড হয়ে গেছে, রাজা এখন গণতান্ত্রিক নেতায় কনভার্টেড হয়ে গেছে । কোনো একটা মতাদর্শ বা বিশ্বাস যতবেশি সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ঐক্য, তাদের দেবতা,গড, নবী, আল্লাহ, ততবেশি শক্তিশালী । ভারতে রাম বেশি শক্তিশালী আর তুরস্কে আল্লাহ বেশি শক্তিশালী কারন ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাদের রাজা হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির, আর তুরস্কের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাদের রাজা ফোবিয়া ইউনিভার্সিটির ।
এভাবেই চলবে, মন্দির মসজিদ গির্জা ধার্মিক বিশ্বাসীরাই ভাঙ্গবে, ওরাই আবার গড়বে ।
আজ ভেঙ্গে যেটা গড়া হচ্ছে, সেটা কাল অন্য কেউ ভেঙ্গে অন্য কিছু বানাবে, পরশু আবার সেটাকেই ভাঙ্গবে এবং সে তাঁর মতো করে আবার অন্য কিছু গড়বে । পৃথিবীতে কোনোকিছুই চিরস্থায়ী নয়, আল্লাহ ভগবান, গড,দেবতা এইসব চরিত্র তো ন-ই ।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

39 − = 30