প্রসঙ্গ: পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম’রা আদিবাসী নাকি উপজাতি? এবং আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের তাৎপর্য্য।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে দেশের মোট আয়তনের দশ ভাগের একভাগ অঞ্চল নিয়ে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান। জনসংখ্যায় বৃহৎ বাঙ্গালি জাতির পাশাপাশি তিন পার্বত্য জেলায় ১৩ টি ভাষাভাষির ১৩ টি এথনিক জাতিসত্তার বসবাস। কিন্তু বলাবাহুল্য ১৩ টি এথনিক জাতিসত্তাদের মাঝে জাতি গঠনে সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকাস্বত্তেও বাংলাদেশ সরকার এখনো সাংবিধানিকভাবে এ জাতিবৃন্দকে জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সংবিধানে বিগত ১৫তম সংশোধনীতে ২৩ক অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ- গোষ্ঠী হিসেবে। যেটা জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কেননা সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাতে বলা আছে- প্রত্যেক মানুষ বা সম্প্রদায় নিজেদেরকে সংগঠিত করে একতাবদ্ধ হয়ে তাদের পরিচয় দিতে পারবে। এটা তাদের মানুষ হিসেবে অধিকার। তদ্রুপ দেশে সমতল ও পাহাড় মিলে মোটে ৪৫ টির মতো এথনিক জাতিসত্তারা সরকার যাতে তাদেরকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে স্বীকৃতি দেয় সে যৌক্তিক দাবী করেছিলো। কিন্তু সরকার সবকিছু বুঝেও আমলাতান্ত্রিক নির্ভর হয়ে জাতিসত্তাদের মৌলিক দাবিটুকু স্বীকৃতি না দিয়ে জোর করে বা কৌশলে সংবিধানে স্বীকৃতি দিলো উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, বা নৃ- গোষ্ঠী।

এবার জানা যাক আদিবাসী অর্থ – “শব্দের অর্থটি পর্যালোচনা করলে পাওয়া যাবে ‘আদি’ মানে পুরনো বা আদিম, আর ‘বাসী’ মানে নাগরিক জনসমষ্টি বা জনমানব। তার মানে আদিবাসী শব্দের বাংলা অর্থ আদিকাল হতে যে জনসমষ্টি একই এলাকায় বসবাস করে তারাই আদিবাসী।”

এবার জানা যাক উপজাতি শব্দের অর্থ- “শব্দের অর্থ পর্যালোচনা করলে পাওয়া যাবে ‘উপ’ মানে শাখা, আর ‘জাতি’ মানে জনসমষ্টি (যারা নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে)। তার মানে উপজাতি হচ্ছে কোন জাতির শাখা বা অন্যজাতি থেকে উৎপত্তি জনসমষ্টি।”

এবার জানা যাক “আদিবাসী” শব্দের ইংরেজি Indigenous Peoples meaning টা “Indigenous communities, peoples, and nations are those that, having a historical continuity with pre- invasion and pre- colonial societies that developed on their territories, consider themselves distinct from other sectors of societies now prevailing in those teritories, or parts of them.” (Source: wikipedia) এবং এই meaning টি United Nation ও স্বীকৃতি দিয়েছে।

এবার জানা যাক “উপজাতি” শব্দের ইংরেজি Tribe meaning টা ” A tribe is a group of distinct people, dependent on their land for their livelihood, who are largely self-sufficient, and not integrated into the national society. It is perhaps the term most readily understood and used by the general public. (Source- Wikipedia)

মূলত উপরের দুটি ইংরেজি শব্দ “Indigenous and Tribe” meaning অনেকটা একই বা পরিপূরক। যা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৩ টি এথনিক জাতিসত্তাদের সজ্ঞায়িত করলে পরিপূর্ণভাবে মিলে যায়। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে এথনিক অধিবাসীরা পাহাড়ে বসবাস করে চলেছে সেই ১৫৪৬ সাল থেকে; যাদের রয়েছে ঐতিহাসিক পথভূমি, নিজস্ব সঙ্কৃতি, প্রথা, বর্ণমালা, ভাষা, লোকগাথা ইত্যাদি এবং তারা রাজা(Chief) বা সমষ্টিগত গোত্র প্রধান দ্বারা একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে শতশত বছর যাবৎ প্রথাগতভাবে শাসিত। অতএব পার্বত্য চট্টগ্রামের এথনিক জনজাতিদের নির্দিধায় বলা যায় ইংরেজিতে Indigenous বা Tribe. যা বাংলায় কোনমতে উপজাতি নয়।

তাহলে এখন সমস্যাটা কোন জায়গায়?- সমস্যা হলো বাংলাদেশের অনুবাদকারক ও ধর্মীয় মৌলবাদী ভাবধারার দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক আমলাওয়ালা মানুষদের। যারা নিজেদের অবস্থান সবসময় জটিল সব লালফিতায় আবদ্ধ রেখে চলেছে।
আজকে যদি ইংরেজি Indigenous এর অর্থ বাংলায়ও “ইন্ডিজিনাস” বা ইংরেজি Tribe এর অর্থ বাংলায়ও “ট্রাইব” হতো তাহলে কোন সমস্যা ছিলোনা। কারণ যত সমস্যা এখন বাসা বেধেছে বাংলাই সেই- “আদি” ও “উপ” শব্দে। আদি নিয়ে গঠিত “আদিবাসী” শব্দটি একটা উৎকৃষ্ট যা দেশে বৃহৎ বাঙ্গালি জাতি মনে করে। সেটা অন্য জাতি ব্যবহার করুক তারা তা অধিকাংশজনে চায় না। অনেকে আক্ষেপ করে এটাও বলে আমরা বাঙ্গালিরাই “আদিবাসী”। পার্বত্য চট্টগ্রামের সেটেলার বাঙ্গালিদের উগ্র মৌলবাদী ভাবধারার সংগঠন সমঅধিকার (দেশে যাদের অধিকার প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের থেকে দেড় বেশি) তো এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। তারা বলছে দেশে কোন আদিবাসী নেই, আছে শুধু উপজাতি এবং তাদের সাথে আমাদের অধিকার সমান চায়। অবশ্য এসব গালবাক্য বিএনপি সরকারের আমলে খাগড়াছড়ির এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়া অনেক আগেই BBC কে সাক্ষাতকার সহকারে বলেছে। কতটা উগ্র বা সাম্প্রদায়িক হলে অধিকারহীন, মানবাধিকার লংঘনের শিকার প্রতিনিয়ত সেইসব এথনিক জাতিদের সাথে সমঅধিকার দাবি করে সেটেলার বাঙ্গালিরা এই যুদ্ধ ঘোষণা ও ভূমি জবর দখল করতে পারে তা অবশ্য অনুমান করা যায়।

আর অন্যদিকে “উপ” দিয়ে সৃষ্টি উপজাতি শব্দটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা ব্যবহার করতে বা মানতে সম্পূর্ণ নারাজ। কেননা তাদের পরিষ্কার দাবি আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি কোন “উপ” বা “শাখা” নই। এমনকি কোন জাতি থেকে আমাদের উৎপত্তি হয়েছে ইতিহাসেও এরকম কোন নজির নেই। বাংলাদেশ সরকার অনভিপ্রেত জাতির আগে “উপ” উপাদি বসিয়ে নিম্ন মনমানসিকতার নজির স্থাপন করেছে। অথচ সরকার এবং পার্বত্য চুক্তির অনন্য সুবিধাভোগী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উৎকৃষ্ট মানসিকতা সৃষ্টি করতে পারেন ত্রিপুরা জাতি, চাকমা জাতি, মারমা জাতি সহ অন্যান্য জাতিদের সংবিধানে সুষ্পষ্ঠভাবে স্বীকৃতি দিয়ে।

আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তারা অনেকে নিজেদের সম্মিলিতভাবে জুম্মজাতি বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আদি জাতিদের সকল পূর্বপুরুষরা পাহাড়ে জুম চাষাবাদ করেই জীবন জীবিকা করেছেন, তাই তারা সেই অর্থে জুম্ম। এমনকি বর্হিবিশ্বে অনেক মিডিয়াও অনেক আগ থেকে জুম্ম(Jumma) শব্দটি পাহাড়ের আদিবাসীদের পরিচয় দানে ব্যবহার করে আসছে। উপজাতি শব্দটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে পাহাড়ের এথনিক জাতিদের কোন আগ্রহ বা ইচ্ছা নেই।

অনেক লেখক ও শিক্ষিত ভাবধারার মানুষ সাদাচোখে আদিবাসী শব্দটা মনে করেন একটা মানবাধিকার ধারণা। এটা কোন জাতির মুক্তির ক্ষেত্রে রাজৈনতিক অবিধা হতে পারেনা।

অবশ্য আবার অনেকের মতে জাতির মুক্তিতে আদিবাসী বা ইংরেজি Indigenous শব্দটি পার্বত্য চট্টগ্রামে এথনিক জাতিদের কোন বাঁধা নয়। বরং তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেতে সহজ হবে। কারণ আন্তর্জাতিভাবে যেকোন দেশের প্রান্তিক এথনিক জাতিদের সম্মিলিতভাবে Indigenous বলা হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারসহ জনজীবনের মূলস্রোতে আসার জন্য এই Indigenous পরিচিতিটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার্য বিষয় বা প্লাটফর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোন পদক্ষেপ নিলে অবস্থা হবে যেন আন্তর্জাতিক সমাজকে অস্বীকার করা। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম এথনিক জাতিসত্তাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে স্বীকার করেই পরিপক্ব হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অবশ্য তার জন্য দরকার যথাযথ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং মুক্তির আকাঙ্খা। বলাবাহুল্য তাই ঐক্য অবধারিত, জাতির মৌলিক ইস্যুতে কোন ভেদাভেদ বা মারামারি রাজনৈতিকভাবে কখনো ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবেনা।

এবারের ৯ আগষ্ট ২০২০ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের Theme হচ্ছে “Indigenous Language (আদিবাসী ভাষা)”। ভাষা যেকোন জাতির অস্তিত্বের শক্তি ও অভিপ্রায়, কারন একটি জাতি স্বতন্ত্রভাবে মাথা উচু করে দাঁড়াতে হলে তার ভাষা অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভাষাকে যথাযথভাবে টিকিয়ে রাখতে হয়। ঠিক যেমনি ইতিহাসে বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলনের ফলে স্বতন্ত্র জাতীয়তা অর্জনের নজীর আজ দৃষ্টান্ত উজ্জ্বল হয়ে আছে।

সর্বোপরি আদিবাসী নেতাদের ভাষ্য International Indigenous Peoples Day পালন এথনিক প্রান্তিক স্বতন্ত্র জাতিদের একটা বিশ্ব ঐক্য ধারণা সৃষ্টিতে অবদান রাখবে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও পথ অনেকাংশে সুগম হবে।

পরিশেষে সবাইকে International Day of the World’s Indigineous People’s -2020 এর শুভেচ্ছা রইল।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 + = 55