জন্মান্তর (উপন্যাস: পর্ব-একুশ)

বারো

 

ঘুম ভাঙে নরখেলেই্মদার ডাকে। চোখ মেলে দেখি খোলা জানালা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকছে মেঘ! ওরা তিনজন এখনো ঘুমাচ্ছে। আমি গায়ের কম্বল সরিয়ে উঠে দরজা খুলতেই নরখেলেই্মদা বলে, ‘দাদা রেডি হন, একনই রওনা করি।’

আমি ওদেরকে জাগিয়ে ব্রাশ নিয়ে বারান্দায় দাঁড়াই, সাদা মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে আছে পুরো বগালেক এবং লেকের আশপাশ। পুরু মেঘের কারণে অল্প দূরের জিনিসও ঝাপসা দেখাচ্ছে, আর বেশি দূরে তো মেঘ ছাড়া অন্য কিছু দেখাই যাচ্ছে না। বেশ শীত অনুভূত হচ্ছে। সমতলে এখন গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত, আর এখানে কাল সারারাত ঘুমিয়েছি কম্বল গায়ে দিয়ে!

কাঠের সিঁড়ি দিয়ে কয়েক পা নামতেই চোখে পড়ে বিরাট এক মাকড়সার জাল, মাঝখানে মাকড়সা; এতো বড় মাকড়সা আগে কখনো দেখিনি। মেঘে ভিজে গেছে জাল, সুতো থেকে মুক্তার মতো ঝুলছে জল। ঘর থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে এসে নানান অ্যাঙ্গেল থেকে কয়েকটা ছবি তুলি। মাকড়সাকে খুব বেশি বিরক্ত না করে ক্যামেরা ঘরে রেখে নিচে নেমে যাই। ব্রাশ করে প্রাতঃকৃত্য সারতে টয়লেটে ঢুকি, বেরিয়ে দেখি চারদিক পরিষ্কার, দূরের গাছপালাও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে; আসলে ডাকাত বাতাস বগালেকের শরীর থেকে খুলে নিয়ে গেছে মেঘের আবরণ! সকালবেলার বগালেক আমাদের মিরপুরের এক পাগলীর মতো; এই শরীরে কাপড় আর একাগাদা ছেঁড়া ন্যাতা তো কিছুক্ষণ পরই সম্পূর্ণ নগ্ন!

ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে যাত্রা শুরু করি কেওক্রাডাংয়ের পথে। ঘরটা আবার বুকিং দিয়ে রাখি, আজ আর কাল কেওক্রাডাং কাটিয়ে পরশু রাত আবার এখানে থাকবো, তার পরদিন বান্দরবান গিয়ে ধরবো ফেরার বাস। বগালেক থেকে কেওক্রাডাং তিনঘন্টার পথ। আমাদের কোনো তাড়া নেই, আজ আর কাল বরাদ্দ কেওক্রাডাংয়ের জন্য; সুতরাং ধীরে-সুস্থে কাছে-দূরের পাহাড়, গাছপালা আর মেঘপুঞ্জ দেখতে দেখতে যেতে চাই।

কোথাও গাঢ় সবুজ পাহাড়, আবার কোথাও হালকা সবুজ। অরণ্যের বুকের গন্ধ নিতে নিতে আমরা অসমতল পথ চলি আর মাঝে মাঝে ছবি তুলি। যতো ওপরে উঠি ততো বিমোহিত হই মেঘ-পাহাড়ের সঙ্গম দেখে; কোথাও পাহাড়ের ঊরুর মাঝখানে চিৎ-উপুড় হয়ে আছে ললিত মেঘ, কোথাওবা পাহাড়ের কপালে-মুখে চুমু খেয়ে লালাস্রাব রেখে বা চুলে বিলি কেটে চলে যাচ্ছে লাস্যময়ী মেঘ।

পথশ্রমে ভিজে ঘামে যায় গায়ের গেঞ্জি, সবার মাথা-মুখ ঘেমে দরদর করে ঘাম ঝরে। গলা শুকিয়ে গেলে দাঁড়িয়ে কয়েক ঢোক জল খেয়ে আবার পথ চলতে শুরু করি। এভাবে কয়েকদিন হাঁটলে শরীরের বাড়তি চর্বি ঝরে যাবে। আমরা কেউ-ই অবশ্য মোটা নই; আমার আর শাশ্বতীদির স্বাস্থ্য স্বাভাবিক, আবিরের শরীরে মাংসের কিছুটা ঘাটতি আছে, শুধু পরাগদার ভুড়িটা সামান্য সামনে ঝুঁকেছে। নরখেলেই্মদার কথা আর কী বলবো, মাঝারি আকৃতির পিটানো শরীর, কোথাও বাড়তি চর্বি নেই। থাকবে কী করে? তার তো দিন কাটে এভাবে পাহাড়ে হেঁটে হেঁটেই! এই যে আমাদের নিয়ে এসেছে, ফিরে গিয়ে যদি আবার পর্যটক পায় তো সঙ্গে সঙ্গেই চলে আসবে; শরীরে চর্বি জমানোর মতো অবসর বেশি নেই তার। গাইডবৃত্তির উপার্জনেই সংসার চালাতে হয় তাকে; বাড়িতে মা, স্ত্রী আর দুই ছেলে-মেয়ে আছে তার।

মাঝপথে পর্যটকদের সাময়িক বিশ্রামের জন্য একখানা বেড়াহীন টিনের দো-চালা ঘর রয়েছে, বসার জন্য তিনদিকে চাঙা পাতা। হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়ি সবাই। আমাদের পায়ের নিচে এবং পাহাড়ের ঢালে ছড়ানো-ছিটানো পলিথিন, চকলেট-চিপসের মোড়ক, সিগারেটের প্যাকেট ইত্যাদি। এসব আমাদের মহান বাঙালীদের কীর্তি! পাহাড়ে বেড়াতে এলে পণ্যের মোড়ক, প্লাস্টিক প্রভৃতি ব্যাগে জমিয়ে রেখে পরে নির্দিষ্ট ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে হয় যাতে পাহাড়ের পরিবেশ নষ্ট না হয়; কিন্তু সেই বোধ অধিকাংশ বাঙালী পর্যটকের নেই। এদের অন্তরে মাধুর্য নেই, তাই পাহাড় কিংবা সমতলের সৌন্ধর্য ম্লান করতে এদের একটুও বাধে না!

আমাদেরই বয়সী এক যুবক একটা গাধা তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে বগালেকের দিকে। নরখেলেই্মদার কাছ থেকে জানতে পারি ও রুমাবাজার যাচ্ছে। রুমাবাজার থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনে নিয়ে আবার ফিরে আসবে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী বিভিন্ন পাড়ার দোকানে এবং বাড়িতে বাড়িতে বিক্রি করে ছেলেটি।

যাত্রাবিরতি শেষে উঠে পড়ি আমরা, রোদ উঠলেও মেঘের কড়া শাসনে তা তেমন তীব্র নয়। পাহাড়চূড়ায় এই রোদ তো এই ছায়া, আলো-ছায়ার নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে নয়ন-প্রাণের ক্ষুধা মিটাতে মিটাতে পৌঁছই দার্জিলিংপাড়া। ছবির মতো সুন্দর পাড়াটি! পাড়ার দোকান থেকে কলা-বিস্কুট খেয়ে, চা হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখি পাড়াটা। গাছপালা-মানুষ থেকে শুরু করে মুরগি-কুকুর সবকিছুর ছবি ধারণ করে শাশ্বতীদির ক্যামেরা। আমিও মাঝে মাঝে ক্লিক করি। ঘুরতে ঘুরতে আমরা একটা চার্চের সামনে এসে দাঁড়াই; চার্চের বেড়া বাঁশের চাটাইয়ের, ছাউনি টিনের। ছাউনির বাটামের সাথে বাঁধা একটা মাইক। কোনো লোকজন নেই, দরজায় তালা দেওয়া। এই চার্চ ওয়ালারা মুসলমানদের মতো তরবারি ব্যবহার করেনি। এরা মিষ্টি কথায় নানা প্রলোভন দেখিয়ে আর মাথায় হাত বুলিয়ে বহু আদিবাসীকে ধর্মান্তরিত করেছে, নষ্ট করেছে আদিসবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি। আমাদের অর্থমন্ত্রী আবিরের তাড়া খেয়ে আবার যাত্রা শুরু করি কেওক্রাডাংয়ের পথে!

দার্জিলিং পাড়া অতিক্রম করে কিছুটা নিচে নেমে আবার ওপরে উঠতে হয়। পথ কোথাও কোথাও একেবারেই সরু, দু-পাশের অরণ্যের লতা-পাতা আর লম্বা ঘাস ঝুলে আছে পথের ওপর, গায়ে-পায়ে ঘষা লাগছে। পথ ভাল নয়, পূর্বে বৃষ্টি হওয়ায় কোথাও কোথাও জল জমে আছে, লোকজনের চলাচলে কাদাও হয়েছে। কিন্তু এখন আর কোনো কিছুতেই ‘কুছ পরোয়া নেহি’ আমাদের! কেবল পরাগদার জোঁকের ভয় আছে। এছাড়া আমাদের সবারই যেন জল-কাদা, রোদ-বৃষ্টির কষ্ট আর সাপ-জোঁকের ভয় লুপ্ত হয়েছে! যন্ত্রের মতো শরীর চলছে তো চলছেই, যেন এভাবেই পাড়ি দিতে পারবো আরো অনেক পথ! সবার পিছনে হাঁটছে আবির, আবিরের আগে আমি, আমার আগে পরাগদা, শাশ্বতী, নরখেলেই্মদা। কিছুদূর এগিয়ে একটু ফাঁকা মতো জায়গায় এসে সবাইকে অর্ধগোলাকৃতি হয়ে দাঁড়াতে বলি। আমার লাঠিটা আবিরের হাতে দিয়ে দুইহাত তুলে এপিঠ-ওপিঠ দেখিয়ে বলি, ‘আমার হাতে কিছু আছে?’

আবির বলে, ‘কী বলবি সোজা কথায় বল না ব্যাটা।’

‘আরে অধৈর্য্য হোসনে, জাদু দ্যাখাবো।’

লম্বা আকৃতির একটা সবুজ পাতা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে বলি, ‘দ্যাখো, আমার হাতে একটা সবুজ পাতা। এখন আমি এই পাতাটিকে প্রাণ দিয়ে একটা প্রাণিতে রূপান্তর করবো!’

শাশ্বতীদি বলেন, ‘যাঃ, ফাজলামি করিস না, হাঁট।’

‘আরে দাঁড়াও, দ্যাখোই না!’

সবাই তাকিয়ে আমার হাতের দিকে। আমি একটু মিথ্যে তুকতাকের অভিনয় করি, মুঠো করা হাত মুখের সামনে কয়েকবার ঘুরিয়ে ফুঁ দিয়ে দ্রুত পরাগদার লাঠির মাথার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলি, ‘এই দ্যাখো!’

সবাই পরাগদার লাঠির মাথার দিকে ঘাপটি মেরে থাকা প্রায় দুই ইঞ্চি দৈর্ঘে্যর সবুজ জোঁকের দিকে তাকায়, পরাগদা দেখামাত্র হাতের লাঠি ছুড়ে ফেলে দিয়ে ‘ওরে ভোদা’ বলেই ভোঁ-দৌড়!

পরাগদার কাণ্ড দেখে আমরা সবাই শব্দ করে হেসে উঠি, আমাদের হাসি যেন থামেই না! শাশ্বতীদি হাসতে হাসতে পারলে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে! নরখেলেই্মদা জোঁকটা ফেলে দিয়ে লাঠিটা হাতে নেয় পরাগদাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য। পরাগদা দূর থেকে চেঁচিয়ে বলেন, ‘দাদা, ওই লাঠি ফেলে দাও, আমি আবার নতুন লাঠি নেব!’

পরাগদা দার্জিলিং পাড়ায় যেখানে লাঠিটা রেখে চা খেয়েছে, হয়তো সেখান থেকেই জোঁকটা উঠে পড়েছে তার লাঠিতে; অথবা হাঁটার সময় পথের দিকে ঝুঁকে থাকা গাছের লতা-পাতা থেকে কোনোভাবে জড়িয়ে ধরেছে। ‘ওরে ড্যাশ’ বলে পরাগদাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করতে করতে অবশেষে আমরা পৌঁছাই কেওক্রডাংয়ের চূড়ায়।

স্নান করার সময় আরেক কাণ্ড! স্নান করতে হয় নিচে নেমে এসে ক্ষেতের হাতাইল দিয়ে হেঁটে গিয়ে জংলা মতো জায়গার একটা গর্ত থেকে মগ ভরে জল তুলে। আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই যে জলের ভেতর কিছু ছিঁনেজোঁক কিলবিল করছে, আশপাশের ঘাসের ডগায় থাকা ছিঁনেজোঁক শুঁড় বাড়িয়ে দিচ্ছে, সুযোগ পেলেই তেনারা পায়ে উঠে পড়ছেন! পরাগদা ওখানে নামামাত্র জোঁক দেখে চিৎকার করে লাফিয়ে হাতাইলের ওপর গিয়ে ওঠেন। আমি আর আবির দুষ্টুমি করে বলি, ‘ওরে ড্যাশ, ওরে ড্যাশ!’

কোনোভাবেই তিনি এখানকার জলে গোসল করবে না, আবার এছাড়া স্নানের কোনো উপায়ও নেই। শেষে শাশ্বতীদি বালতি ভরে জল নিয়ে তাকে স্নান করাতে চাইলে রাজি হয়। অগত্যা আমি বালতি ভরে জল নিয়ে দিলে সেই জল ভাল মতো চেক করে শাশ্বতীদি মগ ভরে ভরে তার দামড়া সোয়ামীকে গোল করাতে থাকেন! আমি জোঁক দেখে পরাগদার মতো অতটা ভয় পাই না ঠিকই, কিন্তু ছিঁনেজোঁকে ভরপুর গর্ত থেকে জল তুলে স্নান করার পর আমার কেমন অস্বস্থি হতে থাকে। কেবলই মনে হয় যে আমার শরীরের কোথাও ছিঁনেজোঁক লেগে নেই তো? শরীরের কোথাও সামান্য চুলকালেই সেই অস্বস্তিটা আরো বেড়ে যায় আর চুলকানো জায়গা তো বটেই আশপাশও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেক করি।

রাতে কম্বল গায়ে জড়িয়ে কাঠের ঘরের বারান্দার চেয়ারে বসে আছি আমরা চারজন, কারো মুখে কোনো কথা নেই। আমরা কথা বলবো কী? কথা তো বলছে প্রকৃতি, নাচছে, গাইছে, হাসছে! আমরা দর্শক, রীতিমতো বাকরুদ্ধ প্রকৃতির সাবলীল নৃত্যনাট্য দেখে! আদিবাসী নারী যেমনি মাথার চুল থেকে পা পর্যন্ত গহনায় সাজে, তেমনি পাহাড়ও সেজেছে মেঘের গহনায়; পরেছে মেঘের ঘাঘরা, বুকে মেঘের কাঁচুলি! দিগন্তে আকাশ ছড়াচ্ছে আলোর রোশনাই; মুহুর্মুহু বিদ্যুৎ চমকে বদলে যাচ্ছে আকাশের রঙ, ঝলসে উঠছে মেঘ, যেনবা আকাশ চমকে চমকে মুঠোয় মুঠোয় উড়িয়ে দিচ্ছে দোলের বর্ণিল আবির! দুরন্ত দলছুট বালকের মতো কিছু মেঘ আমাদের ছুঁয়ে ভেসে যাচ্ছে বাতাসে। মনে হচ্ছে আকাশ কতো কাছে! আমরা যেমনি বিদ্যুৎ চমক, মেঘ আর আকাশের এই বর্ণিল রূপ দেখে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে আছি, তেমনি প্রতিদিন প্রতিক্ষণ পৃথিবী এমনিভাবে আরো কতো বিচিত্র রূপ ধারণ করে, আমরা তার কতোটুকুই বা দেখতে পাই! ঠিক এই সময়েই পৃথিবীর আনাচে-কানাচে হয়তো কতো বিস্ময়কর নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি হচ্ছে, যা হয়তো কেবল পশু-পাখিরাই অবলোকন করতে পারছে; হয়তো কোনোদিন মানুষের পাড়া-ই পড়েনি সেখানে!

অন্ধকার রাত্রে মরিচাগাছে কিছু জোনাকি বসলে যেমন লাগে, অনেক নিচে দূরের রুমাবাজার, দার্জিলিংপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামকেও এখান থেকে ঠিক তেমন লাগছে। প্রকৃতির এই সৌন্ধর্যের প্রাচুর্য এবং এই সময়ের অনুভূতি শতবার শতভাবে ভাষায় ব্যক্ত করলেও কিছু অব্যক্ত-ই থেকে যাবে, যা কেবল অনুরণিত হবে হৃদয়ে। নিবিড় নৈঃশব্দে শাশ্বতীদি হঠাৎ গেয়ে উঠেন-

‘মেঘ রাঙানো পদ্ম আকাশ

দিগন্তে কতো রঙ ছড়ায়

তোমার বাঁশি আমার প্রাণে

মৌমাছিদের সুর ঝরায়।

ভালবাসার স্বপ্ন আনে

অলির প্রাণে ফুলবাহার

সাদা মেঘের পাখায় পাখায়

উধাও হলো মন আমার…

অনেকরাতে ঘুমালেও পরাগদা ব্যতিত আমরা বেশ সকালেই উঠে পড়ি, প্রাতঃকৃত্য সেরে নাস্তা করে চা হাতে নিয়ে বাঁধানো লম্বা সিঁড়ি বেয়ে উঠি কেওক্রাডাং চূড়ায়। এই সিঁড়ির পাদদেশেই লালমুন থন লালার উঠোন লাগোয়া বাড়ি আর পর্যটকদের থাকার ঘর। শীতল পরিবেশে সকালের অল্প আলোয় চূড়ার চারপাশের পাহাড়গুলো যেন চোখে আদর বুলিয়ে দেয়! এই আলোয় ছবি ভাল হবে, আবির নিচে নামে ক্যামেরা আনতে। ফিরে আসে পরাগদাকে নিয়ে। সকালটা পাহাড়ের সৌন্ধর্য অবলোকন করে, ছবি তুলে আর পাকা ছাউনির নিচে বসে হাসি-ঠাট্টা-আড্ডায় কেটে যায়। তারপর নিচে নেমে নরখেলেই্মদার সঙ্গে রওনা হই কেওক্রাডাংয়ের পরের পাসিংপাড়ার উদ্দেশ্যে। খুব বেশি দূরে নয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই পাসিংপাড়ায়। অসম্ভব সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন এই পাড়াটি; লম্বা আকৃতির; দু-পাশে জঙ্গলময় খাদ আর সবুজ পাহাড়ের পর পাহাড়। পাসিংপাড়া মেঘের স্বর্গরাজ্য, এখান থেকে সবচেয়ে ভালভাবে উপভোগ করা যায় মেঘ। দূরন্ত কিশোরের মতো এদিক-সেদিক দিয়ে ছুটে যায় মেঘ, আপনা-আপনিই গায়ে এসে পড়ে।

এ পাড়ার বাসিন্দারা মুরং সম্প্রদায়ের, পঞ্চাশটির মতো পরিবার বাস করে, জুম চাষ-ই তাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস। আমরা এ বাড়ির-ওবাড়ির সামনে দাঁড়াই, স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প করি, ছবি তুলি, আবার পথ চলি।

পাড়ার একদম চূড়ায় উঠে এনজিও পরিচালিত একটি স্কুলের কাছে এসে থামি, এপাড়া তো বটেই আশপাশের বেশকিছু পাড়ার ছেলেমেয়েরাও এই স্কুলে পড়ে। এখন অবশ্য ঈদের ছুটি। শিক্ষকদের কক্ষ বন্ধ থাকলেও ক্লাসরুমগুলোর দরজা খোলা। স্থানীয় একজনের অনুমতি নিয়ে দুটো বেঞ্চ বাইরে বের করে এনে বসি আমরা। সামান্য দূরে ছোট্ট একটা দোকান, নরখেলেই্মদা দোকানদারের সঙ্গে গালগল্প করছে, আবির গলা চড়িয়ে তাকে চায়ের কথা বলে, তারপর নিজেই উঠে যায় চায়ের সঙ্গে কী খাবার পাওয়া যায় তা দেখতে। একটু পর দু-জনে আমাদের জন্য নিয়ে আসে চা আর শুকনো খটখটে বিস্কুট। অবশ্য এখানে এই শুকনো খটখটে বিস্কুটই অমৃত’র মতো লাগে পথক্লান্ত পর্যটকদের কাছে!

এপাড়ার মানুষ মুরগি পোষে। বেশ তাগড়া দুটো মোরগের লোভনীয় গতর দেখিয়ে চোখের সামনে দিয়ে তিড়িং-বিড়িং করা দেখে পরাগদা নরখেলেই্মদাকে বলেন, ‘দাদা, মোরগ কি বিক্রি করবে এরা?’

‘করবে, তবে দাম একটু বেশি হবে।’

‘তা হোক, দ্যাখো, একটা মোরগ পাও কিনা; রাতে বারবিকিউ করবো।’

নরখেলেই্মদা চলে যায় মোরগ কিনতে।

পাসিংপাড়ার চারপাশের সৌন্ধর্য, মেঘের মণিপুরি মুদ্রা আর বিশুদ্ধ বাতাস উপভোগ করতে করতে চলে আমাদের আড্ডা, কবিতা আবৃত্তি আর গান। সময় যে কী করে বয়ে যায় তা বুঝতেই পারি না!

হঠাৎ একটু তালভঙ্গ হয় পরাগদার মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠায়, পরাগদা পকেট থেকে মোবাইল বের করে স্ক্রীনে দৃষ্টি বুলিয়েই বিস্ময়ে তাকান শাশ্বতীদির দিকে, তারপর আবার মোবাইলের স্ক্রীনে।

শাশ্বতীদি বলেন, ‘কে?’

‘মা।’

‘ধরো।’

ফোন ধরেন পরাগদা, ‘মা…।’

চিঠি পাঠানোর পর থেকেই হয়তো শাশ্বতীদি মনের কোনে একটু হলেও আশা জিইয়ে রেখেছিল এমন কিছুর কথা ভেবে, তাই পাঁচ বছর পর মায়ের ফোন আসায় পরাগদার চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলেও শাশ্বতীদির বুকের কল্লোলিত আনন্দ উছলে পড়ে মুখে!

পরাগদা ফোন ধরে থাকেন কানে, কিছু বলেন না, শুধু শোনেন। আমরা তাকিয়ে থাকি তার মুখের দিকে। শাশ্বতীদির চিঠির কথা জানা থাকায় আমার ভেতরেও প্রবল উত্তেজনা আর কৌতুহল। পরাগদার চোখ ছলছল করে, বলেন, ‘কেঁদো না মা প্লিজ, বাবা কেমন আছে?….. আসবো, আমরা তো এখন ঢাকায় নেই, বান্দরবান এসেছি ঘুরতে, বান্দরবান থেকে ফিরে আমরা আসবো।…নাও কথা বলো।’

পরাগদা মোবাইল বাড়িয়ে দেন শাশ্বতীদির দিকে।

 

কেওক্রাডাংয়ে আমাদের দ্বিতীয় রাত, আবছা অন্ধকারে আমি কেওক্রাডাংয়ের চূড়ায় একা দাঁড়িয়ে। ওরা সবাই নিচে, আমিও নিচে নেমেছিলাম; কিন্তু এই উন্মুক্ত আকাশ, আকাশের বুকে জ্বলতে থাকা অজস্র নক্ষত্র, মেঘের বজ্রনাট্য আর অপুষ্ট-অনুজ্জ্বল হলেও পৃথিবীর সবেধন চন্দ্রমণি রেখে ছাদের নিচে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। তাই আবার ওপরে উঠে আসি, আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার ইচ্ছে করে মেঘ হয়ে ভেসে যাই আকাশে!

দিনটা দারুণ কেটেছে, আনন্দঘন দিন! একটা তাগড়া মোরগ কিনেছিলাম পাসিংপাড়া থেকে, লালমুন থন লালার বাড়ি থেকে মসলাপাতি আর জ্বালানি কাঠ নিয়ে সন্ধ্যার পর সেটাকে বারবিকিউ করেছিল পরাগদা আর নরখেলেই্মদা। আমরা কেবল ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে বাবুর মতো খেয়েছি, সঙ্গে হুইস্কি। বেশ নেশা হয় আমার, গুনগুন করে গান গাইতে থাকি মাঝে মাঝে কিন্তু নিজেই বুঝতে পারি যে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করে ঘাসের ওপর শুয়ে ঐ দূর আকাশের নক্ষত্ররাজির দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু তাহলে হয়তো রাশি রাশি নক্ষত্র দেখতে দেখতে এখানেই ঘুমিয়ে পড়বো, আর সারারাত রাশি রাশি জোঁক এসে শরীরের সব রক্ত খেয়ে আমাকে ছিবড়ে করে রেখে দেবে! তাকিয়ে থাকি অসীম আকাশের দিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩১৯৬ ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে নক্ষত্রগুলোকে অনেক বড় মনে হয়। মোবাইলে Leo Rojas এর প্যান ফ্লুট ছেড়ে দিই। Juan Leonardo Santillia Rojas, ইকুয়েডরের তরুণ শিল্পী; আমার ভীষণ প্রিয়। দিনে-রাতে যখনই Rojas এর Der ensame Hirte, El condor pasa কিংবা circle of life শুনি; আমার হাত দুটো অসংখ্য পালকসমৃদ্ধ ডানা হয়ে যায়, মানুষ থেকে আমি হয়ে যাই হলদে পাখি, কল্পনার রাজ্যে ডানা মেলে উড়তে থাকি! কেওক্রাডাং এর চূড়ায় দাঁড়িয়ে El condor pasa শুনতে শুনতে আমি হলদে পাখি হয়ে যাই, ডানা মেলে উড়তে থাকি, উড়তেই থাকি! আমার উড়ানযাত্রা সহজে থামে না; আমি উড়ে বেড়াই চৈনিক, এশিরিয়া, ব্যাবিলন, সুমেরীয়, মিশরীয়, হিব্রু, গ্রীক, রোমান, ইনকা সভ্যতার ওপর দিয়ে। অনেক নদী-সমুদ্র-পাহাড়-অরণ্য পেরিয়ে ইনকা সভ্যতার মাচুপিচু নগরের ভূমি স্পর্শ করতেই আমি মানুষ হয়ে যাই আর দেখা পাই অনেক মানুষের। প্রাণোচ্ছল, সংগীত-নৃত্যপিপাসু মানুষের নগর মাচুপিচু। মানুষ হাঁটছে, মনের আনন্দে গান গাইছে, নাচছে! আমি ঘুরে ঘুরে দেখি আর হাঁটতে থাকি, হঠাৎ একটা পানশালার এক অচেনা নারীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার অতিথি হই। জাদুকরী তার কথা, প্রাণ জুড়ানো তার গানের গলা। তার সুরেলা গলার গানে আমার প্রাণের তৃষ্ণা মেটে! তারপর তার বাড়িয়ে দেওয়া সুস্বাদু লামার মাংস খেতে খেতে চিচার পাত্রে চুমুক দিই। আহা, অমৃত! পাত্র শূন্য করে আরেকপাত্র চিচার অনুরোধ জানাতেই আমি তার দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে যাই! কোথায় অচেনা নারী? এতো শায়লা!

মাচুপিচু থেকে দুম করে আমি ফিরে আসি কেওক্রাডাংয়ের চূড়ায়! শায়লা, শায়লা, শায়লা; যেন আমার এক মনোরোগের নাম শায়লা! ওকে ভুলে থাকতে চাই কিন্তু বারবার আমার সামসে এসে দাঁড়ায়, ওকে ভুলে থাকতে অন্য নারীকে কল্পনা করি, কিন্তু সেই অন্য নারী একসময় হয়ে যায় শায়লা!

Leo Rojas এর সুরে ভাসতে ভাসতে তাকিয়ে থাকি আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে। জীবনে এতোসব অপ্রাপ্তি, এতো অবহেলা, বঞ্চনা, ঘৃণা; তবু ঐ আকাশ, নক্ষত্র ও চারিপাশের এই সুন্দর প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে যখনই মনে হয় একদিন আমি এই পৃথিবীতে থাকবো না আর এসব কিছুই দেখবো না; তখন ভেতরটা হুহু করে ওঠে, শীতের শেষের বাতাসের মতো হাহাকার করে বুকের ভেতর! নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মুখ থেকে বেরিয়ে আসে জীবনানন্দের পংক্তি-

‘কোথাও চলিয়া যাব একদিন- তারপর রাত্রির আকাশ

অসংখ্য নক্ষত্র নিয়ে ঘুরে যাবে কত কাল জানিব না আমি…’

কোথায় যাব? মরে যাব, এই পৃথিবীর বাতাসে মিশে যাবে আমার বুকের শেষ বাতাসটুকু, এই পৃথিবীর মাটিতে মিশে যাবে আমার দেহ। চিরকালের জন্য বিলীন হয়ে যাব আমি। আমিও পৃথিবীতে থাকবো না, শায়লাও থাকবে না, দুঃখ শুধু এই আমরা কেউ কাউকে পাব না!

 

(চলবে……)

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 − 74 =