অধিকার পেতে চাওয়া দোষ নয়, না পাওয়া অধিকার কেড়ে নিতে হয়

অধিকার পেতে চাওয়া দোষ নয়, না-পাওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে হয়! আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস সফল হোক। বিশ্বের দুই শক্তিধর অন্যতম দেশ ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির ডামাডোলে তথাপি বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী ভয়ংকর সংকটের সময় অনলাইনে সীমিত পরিসরে ৯ আগষ্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২০ পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অন্যন্যা বছরের ন্যায় এবারেও আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে অনলাইন ভার্চ্যুয়াল জগতে নানা আয়োজন করা হয়েছে। কভিড-১৯ এর মহামারীর কারণে সীমিত পরিসরে হলেও এই দিবসটি উপলক্ষে অনলাইনে ভার্চুয়াল আলোচনা হয়েছে, নাচ, গান, কবিতা পাঠসহ বিভিন্ন আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনের কোন কমতি নেই। আদিবাসী দিবস উদযাপনের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পক্ষ থেকে এসকল আয়োজন করা হয়েছে। আদিবাসী ফোরাম কর্তৃক এবারে আদিবাসী দিবসের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে, “কভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসী জীবনজীবিকার সংগ্রাম”। এই প্রতিপাদ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে অনলাইন ভার্চুয়াল জগতে নানা আয়োজনে মেঠে উঠেছে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আদিবাসীরা। গণসংগীতের মাধ্যমে আদিবাসী মানুষকে জাগ্রত করার চেষ্টারও কমতি নেই, নানা আয়োজনের মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অনলাইন পোর্টাল আইপিনিউজ.কম ও অন্যান্য অনলাইন পোর্টালসহ ফেসবুকে আদিবাসী জনগোষ্ঠী মানুষের ওয়ালে ওয়ালে এসকল অনুষ্ঠান মালা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা গভীর উদ্বেগ আর উৎকন্ঠিত না হয়ে পারে না। কেননা, বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠী কিংবা বহিরাগত মুসলমান বসতিকারী জনগোষ্ঠীর আগ্রাসন, আক্রমণ ও উচ্ছেদের কারণে নিজ ভূমি থেকে উৎখাত হয়ে পড়ছে আদিবাসীরা এবং নিজ ভূমিতে পরবাসীর মতন জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ, এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা বাংলাদেশে সবচেয়ে দরিদ্র, বঞ্চিত, অবহেলিত, নিপীড়িত, উপেক্ষিত, শোষিত ও প্রান্তিক অংশে অন্তর্ভুক্ত। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন দাম নেই, জীবনের কোন মান-মর্যাদা ও মূল্য নেই, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তথাকথিত উন্নয়নের নামে ভূমি আগ্রাসন। আদিবাসীরা এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিরোধী করলে তাদের হতে হচ্ছে দেশদ্রোহী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও হতে হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহের উপর এই অমানবিক বৈষম্য ও বঞ্চনার পেছনে রহস্য কি তা উদঘাটন করা দরকার। এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে পশ্চিমা দুনিয়ার ঔপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা। এই জাতিরাষ্ট্র উৎপত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রসমূহের মূলনীতি হলো এই, “ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহকে দমন-পীড়ন ও বঞ্চনার মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে অঙ্গীভূত করা নতুবা তাদের জাতীয় অস্তিত্ব চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া”। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়ার পশ্চিমা ঔপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্রের এই মূলনীতি কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রটি সেটি অনুসরণ ও অনুকরণ করুক তা আমাদের কখনো কাম্য নয়।

আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে একটি দেশের রাষ্ট্র কতটুকু গনতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল সেটার উপর। গনতান্ত্রিক পরিবেশ কোন পর্যায়ে বিরাজ করছে, সেটির উপরই নির্ভর করবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বিষয়টি। আজ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে? বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের চরিত্র কি গনতান্ত্রিক নাকি স্বৈরাচারী? অথচ আমরা দেখেছি, আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে গনতন্ত্রকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনায় গনতন্ত্রকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করলেও তা কতটুকু চর্চা, অনুশীলন ও প্রয়োগ করা হচ্ছে সন্দেহ থেকে যায় নয় কি? যদিও সংবিধানের মূলনীতি অংশে ” গনতন্ত্র ও মানবাধিকার” বিষয়ে ১১নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গনতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে”। এসব মূলনীতির বাংলাদেশের কোন বালাই নেই। আছে কেবল স্বৈরাচারী, একনায়কতন্ত্রের কাঁটা ছড়াছড়ি।

যদি আমরা ৭২ এর সংবিধানে ফিরে তাকায় তাহলে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণ করা হয়েছিল। শাসকগোষ্ঠী উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ঔপনিবেশিক খোলস থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেনি ও শাসকগোষ্ঠীর চরিত্রের মধ্যে যেটিই প্রতিফলন ঘটেছে বারবার সেটি হলো, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদ, গনতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার বদলাতে ইসলামী সম্প্রসারণবাদ এবং সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে ঔপনিবেশিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ফলে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা প্রতি পদে-পদে উপেক্ষিত হয়েছে। এই ধারা চলমান রয়েছে এবং থাকবে যতক্ষণ না এই রাষ্ট্র গনতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল না হবে। তাহলে রাষ্ট্রের এই চরিত্রের মধ্যে থেকে কিভাবে আদিবাসীদের অধিকার আদায় হবে? এই প্রশ্নের মীমাংসা পেতে হলে দরকার নিরন্তর সংগ্রাম। সংগ্রাম ছাড়া আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে ভেবে থাকলে তাহলে বলবো কোন চোরাবালিতে ডুবছে আদিবাসীরা! সেই খোলস থেকে বেড়িয়ে এসে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।

আমরা এক সময় মনেপ্রাণে বিশ্বাস এবং প্রত্যাশা করেছিলাম, যে জাতি জাতিগত নিপীড়ন ও বঞ্চনার যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে সে জাতির শাসকগোষ্ঠী দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসবে। এই প্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সদলবলে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য যে, শহীদের রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ন্যায় জাতিগত শোষণের আশ্রয় নিয়ে মহান পবিত্র সংবিধানে আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের অধিকার অস্বীকার করা হল। সংবিধানে বলা হল যে, “বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন”। এরই ফলে সেদিন শুধুমাত্র আদিবাসীদের জাতিগত আত্মপরিচয়ের অধিকার অস্বীকার করা হয়নি, সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিসমূহকে বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। আমাদের জুম্ম জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সেদিন মহান সংসদে তীব্র কন্ঠে প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ” আমি একজন চাকমা, আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ কেউ বলেন নাই, আমি বাঙালি”। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের কাছে অনেক কাকুতি মিনতি করেও কোন লাভ হয়নি। সর্বশেষ অন্য পথ ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন, যে পথ রক্ত পিচ্ছিল, আঁকাবাঁকা ও কণ্টকাকীর্ণ। এই পথ ধরে যুগে যুগে, কালে কালে মানব সমাজের পরিবর্তন ঘটেছিল, অনিবার্য পরিণতি হলো আগামীতেও তা ঘটবে। এই পথই একমাত্র আদিবাসীদের মুক্তির পথ।

বাংলাদেশের আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের অধিকার স্বীকৃতি নেই, নেই বেঁচে থাকার মৌলিক মানবাধিকারও। এদেশে চলছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার বহুমুখী ষড়যন্ত্র। চলছে আদিবাসীদের স্বভূমি থেকে উচ্ছেদের মহা আয়োজন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আশ্রয় প্রশ্রয়ে ভূমি বেদখলের মহোৎসব। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী মানুষের বেঁচে থাকার ভিত্তিভূমি ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি আজ পদদলিত। আদিবাসী নারীদের ধর্ষণের পর হত্যা করার এধরণের বর্বরোচিত বহু ঘটনা আদিবাসী সমাজের মধ্যে বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সংগঠিত হচ্ছে। এহেন কঠিন পরিস্থিতি ও বাস্তবতার মহাসংকটের সময়ে বাংলাদেশের আদিবাসী মানুষের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের অধিকার স্বীকৃতি পাওয়ার দাবী নিয়ে হাজির হয়েছে ৯ আগষ্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। কিন্তু আদিবাসীদের এই ন্যায়সঙ্গত দাবী সরকার কি কোনদিন আমলে নিয়েছে? নেয়নি, বরং প্রতিটি মুহূর্তে এবং বারবার উপেক্ষিত হয়েছে আদিবাসীদের এই দাবীগুলো। বাংলাদেশ শাসকগোষ্ঠী যে ভাষায় কথা বলবে, আদিবাসীদেরও সেই একই ভাষায় জবাব দিতে না পারলে আদিবাসীদের অধিকার অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই গানে-গানে উচ্চারিত হয়, অধিকার পেতে চাওয়া দোষ নয়, না-পাওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে হয়। অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার কেড়ে নিতে হয়, অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। এটাই সময়ের ন্যায়সঙ্গত দাবী। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস সফল হোক, নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে সকল আদিবাসী মানুষেরা সামিল হউন।

লেখকঃ বাচ্চু চাকমা, সাবেক সভাপতি, পিসিপি
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 49 = 52