হলুদবনি : ভরা নদী ক্ষীণ হয় কূলের ভালোবাসায়!

হলুদবনি সিনেমার একটি দৃশ্যে পাওলি দাম ও নুসরাত ইমরোজ তিশা

এই তো কয়েক মাস আগেই কি একটা কারণে যেনো ‘অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হলো জনমের সমান’ কথাটা বলেছিলাম। আজ ‘হলুদবনি’ সিনেমার শেষটা দেখে এই কথাটাই বারবার মনের কোণে উঁকি মারছিলো – ‘আমাকে নিয়েই তোমাকে লিখতো হবে’ বলে।
সত্যিই এ কথাটাই এ সিনেমার জন্য উপযুক্ত। হলুদবনির অপেক্ষা, ট্রেন আসে চলেও যায় – কিন্তু ফিরে আসে না আর! ফিরবে কিনা জানা নেই – সে অপেক্ষা তো জনমেরই সমান।
নদীর এক কূল ভাঙে আরেক কূল গড়লেও এ সিনেমায় কস্তুরী দি (পাওলি দাম) কূলহীন নদী। ভাঙতে ভাঙতে দু’কূলই ভেঙেছে। বিষাদের প্রস্থ এত বড় যে তা লুকাতে গিয়েও পারে নি।
একটি বাড়ী, একটি ছাদ এবং হলুদবনি’র সোনালী মেয়েবেলা! কস্তুরী দি’র ছোটবেলা কেটেছে ; বাবার সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে ছুটতে গিয়ে দীর্ঘ সময় হলুদবনির সঙ্গে বিচ্ছেদ ছিলো। গোসাই পাহাড়, সুবর্ণরেখা, পাহাড়ী পথে সাইক্লিং সে সব স্মৃতি ফাঁকা হৃদয়ে একটা সময় গেঁড়ে বসে। ফের নাড়ীর টানে ফিরে আসা। কিন্তু ওই যে কূলহীন নদী বয়ে চলে অবিরাম কূলের খোঁজে৷ কস্তুরী দি এসেছে তার বাড়ীটা, ছাদটা আর সেই মেয়েবেলা ফিরে পেতে, যার পরতে পরতে লেগে আছে তার ঘ্রাণ। কিন্তু যখনই টের পেলো তার ঘ্রাণ ম্রিয়মান হয়ে গেছে অন্যজনের ঘ্রাণের কাছে। তখনই আঁকড়ে ধরতে চাইলো প্রেমকে! কিন্তু তাও কি ধরতে পারলো?
সব কিছু রেখে, কূল না খুঁজে এবার গন্তব্যহীন হলো তার চলা! কিন্তু ভাঙনের তোড়ে যারা অন্যত্র গিয়ে বাসা বাঁধলো তারা তীর্থের কাক হয়ে বসে আছে চর জাগার আশায়, ভিটেমাটি ফিরে পাবার আশায়!

পাওলি দাম ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়

‘পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে, কাজ সেরে গাড়ীতে বসে যখন চোখটা বুজে আসতো – তখন এই ছাদটার কথা মনে পড়ে যেতো’। সংলাপে সাহিত্যের মাধুর্যতার জন্যেই সিনেমার প্রেমে পড়া যাবে। তবে সবচেয়ে বেশি টানবে গল্পের দ্বান্দ্বিকতা, চরিত্রের সঙ্গে চরিত্রের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্ব শারীরিক মারামারি নয়, এ দ্বন্দ্ব মনস্তাত্ত্বিক। প্রেম গল্পের উপজীব্য হলেও খুঁটিনাটি বিষয় হয়ে উপস্থাপিত হয়েছে বেশ কয়েকটি বিষয়।

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হলুদবনি’ উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত। সাহিত্য থেকে সিনেমার জন্য স্ক্রিপ্ট বের করে আনাটা সোজাসাপ্টা বিষয় নয়৷ সাহিত্য সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান নয় বরং বিস্তরভাবে জানাবোঝা না হলে সাহিত্যটাকে সিনেমায় গাঁড় মারা হবে৷ তবে পদ্মনাভ দাশগুপ্ত যে সাহিত্য থেকে স্ক্রিপ্ট বের করে আনায় একজন পারদর্শী তা ‘হলুদবনি’তে প্রমাণিত৷ সংলাপের কারুকার্যময়তা, দৃশ্যে শেষে এবং পরবর্তী দৃশ্যের শুরু হওয়ার খালি জায়গাটায় পুরু একটা স্তর তৈরী করে অতীতের ঘটনাগুলোকে জুড়ে দেয়াটাও দূর্দান্ত ভাবেই ফুটে উঠেছে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রকে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দোদুল্যমান পাওয়া গেছে। অনু নাকি কস্তুরী দি! পাওলি দাম অবশ্য তার ওই চরিত্রের জন্যেই ঠিকঠাক। তিশাকে বরাবরের মতই এখানে পাওয়া গেছে। বিশেষ করে যদি ‘হালদা’ সিনেমার কথাই বলি। একই অভিনয়, একই স্বরে সংলাপ দিয়ে যাওয়া, একই এক্সপ্রেশন!
এ বিষয় নিয়ে একটি উদাহরণ দেই। হলুদবনি’তেই পাওলির প্রতিটা সংলাপ অনুসরণ করলে দেখা যাবে সংলাপ দেয়ার আলাদা আলাদা স্তরগুলো। যা শুনতেও শ্রুতিমধুর৷ আপনি একই সুরে, একই জায়গা থেকে প্রতিটা সংলাপ দিতে থাকলে কথার ইমোশন বুঝার জন্য শব্দের মানের উপর নির্ভর করতে হবে। তবে পরম ও পাওলির অভিনয়ের সহযোগী হিসেবে তিশা মোটামুটি একটা জায়গায় ছিলো৷

নির্মাতার কথা বলতে গেলে, ছাদে কি এমন মূহুর্ত তৈরী হলো যে সেখানেই শুয়ে পড়তে হলো? একজন আরেকজনের বুকে মাথা রাখলেই কি শুয়ে পড়ার ইচ্ছে জাগে? যা হোক, ছাদটাকে কস্তুরী দি ভালোবাসে, সে ভালোবাসাকে এভাবে অপমান করা সে মেনে নিতে পারে নি – বিষয়টা বুঝাতে গিয়ে ওই দৃশ্যটাকে এক প্রকার জোর করেই ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে৷ এছাড়া বাদবাকি বিষয় মোটামুটি ঠিক আছে।

পরিশেষে একটা কথা, সম্পর্ক বরাবরই কূলহীন নদীর মত। কূল পেয়ে গেলে নদী তার গতিপথ শ্লথ করে ফেলে।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − 93 =