জন্মান্তর (উপন্যাস: শেষ পর্ব)

তোরো

 

প্রাণ প্রাচুর্যে শোভিত সত্যিকারের ছায়াময়-মায়াময় পাহাড়-অরণ্য ছেড়ে পাঁচদিন পর সকালবেলায় পা রাখি ধাতু-কংক্রিটের নিষ্ঠুর জঙ্গল ঢাকা শহরে! সূর্য উঠেছে কি ওঠেনি, তা বোঝার উপায় আছে এই শহরে? তবে চারদিক পরিষ্কার, সংখ্যায় কম হলেও বাস-রিক্সা চলতে শুরু করেছে, একটু একটু করে বাড়ছে ব্যস্ততা। সাতসকালেই ভ্যাবসা গরমে গা ঘামতে শুরু করে, মনে হয় এ কোন চুলোয় এসে পড়লাম! বান্দরবানের সঙ্গে আমার নাড়ির টান নেই, সেখানে নেই কোনো রক্তের সম্পর্কের স্বজন-প্রিয়জন; তবু প্রত্যেকবার বান্দরবান থেকে ফিরে আসার সময় প্রেয়সীকে ছেড়ে আসার মতোই মন কেমন করে, ফিরে আসার পরও হৃদয় আচ্ছন্ন করে রাখে বান্দরবানের বিপুল বৃক্ষরাজি, বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড়, বর্ষার খরস্রোতা সাঙ্গু নদী, বিস্ময় জাগানো ঝিরিপথ, অপার মেঘসমুদ্র আর প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা সহজ-সরল মানুষেরা; সবকিছু যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে! এই মন কেমন করা ভাবটা বেশ কয়েকদিন থাকে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

বাসার সামনে এসে রিক্সা থামলে মন চাইলেও শরীর চায় না রিক্সা থেকে নামি, সারা শরীর ব্যথা। প্রত্যেকবারই বান্দরবান থেকে ফেরার সময় কিছুক্ষণ একভাবে বসে থাকার পর মনে হয় হাঁটু, কোমর, কনুইসহ শরীরের ভাঁজগুলো লক হয়ে গেছে! জোর করে সোজা করতে গেলে কষ্ট হয়। পাহাড়ী পথে হাঁটার ফলে শরীরের এই ব্যথা থাকে বেশ কয়েকদিন। ব্যথা উপেক্ষা করে রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে পা বাড়াই গেটের দিকে। ব্যাগ থেকে চাবি বের করে তালাটা খুলতেও যেমনি আলস্য তেমনি কষ্ট। এরশাদুলকে ডাকতে গিয়ে থেমে যাই ওর ঘরের দরজায় তালা দেখে, বোধ হয় বাড়িতে ঈদ করতে গেছে। অগত্যা নিজেই ব্যাগ থেকে চাবিটা বের করে তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আবার তালা লাগিয়ে দিই। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ উঠতে বেশ ধকল যায় হাঁটু আর কোমরের ওপর দিয়ে। দরজার সামনে গিয়ে কলিংবেল বাজাই। পরনে হাফ প্যান্ট, পায়ে রুমাবাজার থেকে কেনা সেই প্লাস্টিকের স্যান্ডেলটাই রয়েছে। দরজা খোলেন বাবা, আমি কাঁধের ব্যাগটা মেঝেতে নামিয়ে স্যান্ডেল খুলে সবে ঘরের ভেতরে এক পা এগিয়েছি অমনি বাবা আমার বাম গালে ঠাস করে এক চড় কষে প্রায় চিৎকার করে ওঠেন, ‘তোর মোবাইল বন্ধ কেন?’

আমি হতবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাই, ফোন করে আমাকে পায় নি বলে এমন জোরালো থাপ্পড়! পর মুহূর্তেই বাবা দু-হাত বাড়িয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অবোধ শিশুর মতো কেঁদে ওঠেন! কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাকে বুক থেকে ছাড়িয়ে আমার কপালে-গালে পাগলের মতো চুমু খেয়ে আবারও বুকে জড়িয়ে ধরেন! আমি বাবার বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে থাকি, মা ছুটে এসে বাবাসহ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন; আমার মাথার চুলে আদর বুলান।

ঘটনার আকর্ষিকতায় আমি হতভম্ব! হচ্ছেটা কী, বাবার হাতের কড়া চড় খেয়ে পরক্ষণেই আবার বাবা-মা উভয়ের বাঁধভাঙা আদরে আর চোখের জলে সিক্ত হচ্ছি! আমি ঘটনা কিছুই বুঝতে পারি না। বাবা-মা কি এমন কোনো দুঃসংবাদ পেয়েছেন যে আমি মরে গেছি? কিংবা বান্দরবানে কি বাস দূর্ঘটনায় পর্যটক মারা গেছে, আর বাবা-মা আমাকে ফোনে না পেয়ে ধরে নিয়েছেন যে ওই দূর্ঘটনায় আমার কিছু হয়েছে? ঘটনা যাই-ই হোক আমি নিশ্চিত তারা আমাকে বারবার ফোন করেছেন আর ফোন বন্ধ পেয়ে উত্তরোত্তর তাদের টেনশন বেড়েছে। বান্দরবানে কোনো দূর্ঘটনা ঘটে থাকলেও আমি সে খবর জানি না, এই পাঁচদিন বাকি পৃথিবীর কোনো খবরই আমি নিই নি। নৌ-পথে রুমাবাজার যাবার সময়ই আমি ফোনের ইনকামিং কল বন্ধ করে রেখেছি, কারণ সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কয়েকটা দিন আমি প্রকৃতির মধ্যে ডুবে থাকতে চেয়েছি। বান্দরবান এসে ফেরার বাসে উঠেও ইনকামিং কল চালু করার কথা মনে নেই।

ঘটনা জানার কৌতুহলের চেয়ে আমার মন ভাললাগায় বুদ হয়ে থাকে বাবা-মায়ের আদরে। কতোদিন আমি এভাবে বাবা-মায়ের আদর পাই না, কতোদিন আমি বাবা-মায়ের গায়ের চেনা গন্ধ এমন নিবিড়ভাবে অনুভব করতে পারি না, কতোদিন বাবার বুকে মাথা রাখি না, কতোদিন আমার চুলগুলো মায়ের হাতের স্পর্শ পায় না! এক বাড়িতে থেকেও বিগত চার বছর আমি তাদের কাছে দূরের মানুষ হয়ে আছি, আমি আর তাদের কাছে আগের মতো আদুরে আবদার করতে পারি না, দুষ্টমি করতে পারি না, তাদের অনাদরে এই চার বছরে আমি যেন বড়ো বেশি পরিণত আর কিছুটা রুক্ষও হয়ে গেছি! চার বছর পর তাদের আকর্ষিক অপ্রত্যাশিত স্নেহ-ভালবাসা, আদর, গন্ধ-স্পর্শ পেয়ে আমার চোখে জলে এসে যায়। চার বছর বঞ্চিত থাকার পর আজ সুযোগ পেয়ে আমিও তাদেরকে আঁকড়ে ধরি, যেমনি আগে ধরতাম। দু-জনই আমাকে জড়িয়ে ধরায় আমার ব্যথাময় শরীরে আরো ব্যথা লাগে, লাগুক ব্যথা, আমার হাড়-গোড় ভেঙে চুরমার হয়ে যাক; তবু আমি বাবা-মাকে ছাড়বো না, চার বছর পর আমি আবার আমার সেই আগের বাবা-মাকে ফিরে পেয়েছি!

এই অনাকাঙ্খিত ভালবাসায় ভিজতে ভিজতে হঠাৎ আমি বেশ বিব্রতবোধ করি বাবার কথা শুনে, ‘ভুল বুঝে তোরে আমরা অনেক বকাঝকা করছি, তোর ওপর অনেক অন্যায় আচরণ করছি, তুই সে-সব মনে রাখিসনে বাবা।’

বাবা আমায় ছেড়ে দিয়েছেন কিন্তু তার ডানহাত আমার বাম কাঁধে, আর আমার ডানহাত মায়ের কাঁধে। আমি চোখের জল মুছে বাবার দিকে তাকিয়ে বলি, ‘এসব কী বলছো বাবা? তোমরা আমাকে হাজার বকাঝকা করলেও আমি কখনোই তোমাদের অশ্রদ্ধা করি নি।’

ছোট আপু আগেই এসে দাঁড়িয়েছিল ডাইনিংয়ে, এবার দাদী দরজার কাছে এসে বলেন, ‘পোলাডা আইলো জান্নি কইরা, ওরে বইতে না দিয়া খাড়া করাইয়া রাখছো তোমরা।’

কিছু একটা হয়েছে সেটা বুঝতে পারি, কিন্তু কী হয়েছে সেটা আঁচ করতে না পেরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলি, ‘মা, কী হয়েছে?’

‘যা, আগে গোসল কইরা খাইয়া-দাইয়া নে, পরে শুনিস।’

‘না, আগে বলো কী হয়েছে? প্লিজ। বাবা বলো না?’

আমার মাথায় হাত রেখে বাবা বলেন, ‘ফাহাদ আর নেই!’

ফাহাদ আর নেই! মানে ফাহাদ মারা গেছে? আমার চাচার একমাত্র ছেলে, ধর্মের প্রতি অনাস্থা আর লেখালেখির কারণে ও আমার ওপর বিরক্ত হলেও আমি ওকে আপন ভাইয়ের মতোই সেন্হ করি; অথচ বাবা বলছেন ফাহাদ আর নেই! মা আমার বুকে মাথা রেখে আবার আমাকে আবার জড়িয়ে ধরেন। আমার পা কাঁপতে থাকে, তবু ডানহাতে মাকে জাপটে ধরে বাবার দিকে তাকিয়ে বলি, ‘কীভাবে হলো বাবা?’

‘পরশুদিন রাতে, র‌্যাবের গুলিতে!’

‘মানে! ও না চিল্লায় গেছে?’

‘ও চিল্লায় যায় নি, জঙ্গিদের দলে ভিড়েছিল। র‌্যাব অভিযান চালিয়েছে ওদের আস্তানায়।’

আমি হাঁ হয়ে যাই শুনে! যদিও এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়; কেননা খুব ছোটবেলা থেকেই আমাদের মতো ধর্মান্ধ পরিবারের সন্তানদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যায় ধর্মীয় অনুশাসন, যারা খুব ছোট থেকেই অমুসলিমদের কাফের-বিধর্মী ভাবে আর তাদেরকে ঘৃনা করতে শেখে, একটু বড়ো হলে কোরান-হাদিস পড়ে জানতে পারে যে মুসলমানদের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিহাদ করা এবং বিধর্মীদেরকে হত্যা করা ফরজ, জিহাদের সময় প্রাণ গেলে বেহেশত নিশ্চিত; ফলে আমাদের মতো পরিবারের সন্তানদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়াটা খুবই স্বাভাবিক, যেখানে জঙ্গিদের ফলন এখন বাম্পার, প্রচার-প্রচারণাও ব্যাপক!

আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে চাচার মুখ; যিনি আমাদের পরিবারের ধর্মান্ধতা-সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষটি কঠোরভাবে আগলে রেখেছেন, লালন-পালন করেছেন, বিস্তারলাভ করতে প্রয়োজনীয় সার-ওষুধ দিয়েছেন; আর তারই ধারাবাহিকতায় তার একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হয়েছে। জানি না এতে তিনি ব্যথিত নাকি গর্বিত; ব্যথিত হলে দেখতে এখন কেমন লাগছে একজন অসহায় পিতার মুখ, আর গর্বিত হলেই বা কেমন দেখতে লাগছে একজন পাষণ্ড পিতার মুখ!

মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কবে কীভাবে আমাকে কষ্ট দিয়েছেন তার জন্য অনুশোচনা করতে শুরু করেন- রোজার মাসে আমাকে নিজহাতে খেতে না দিয়ে কষ্ট দিয়েছেন, আমার একার জন্য ভাল কিছু রান্না করে দেন নি; এইসব। ফাহাদ নিজের জীবন দিয়ে আমার বাবা-মায়ের চোখের পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে গেছে, বাবা-মায়ের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাওয়া আমাকে পুনরায় তাদের হৃদয়ে বসিয়ে দিয়ে গেছে। চার বছর আগে আমজাদ ওসামা থেকে যে সবুজ সমতলের পুনর্জন্ম হয়েছিল, বাবা-মায়ের ভালবাসায় আজ সেই পুনর্জন্মের স্বীকৃতি মিললো। জন্মান্তরবাদের চক্র মৃত্যুর পরে নয়, এই মানব জীবনেই বারবার আবর্তিত হয়; প্রচেষ্টা থাকলে ভুলভ্রান্তি ঝেড়ে ফেলে মানুষ একজীবনেই পুনর্বার জন্মাতে পারে। বিজ্ঞানের আলোয় অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এখন সময় পুনর্জন্মের। আর বাবা-মায়ের স্বীকৃতি পেলে যে কোনো সন্তানের পুনর্জন্ম অধিকতর সহজ, সুন্দর আর শান্তিময় হয়ে উঠতে পারে। আজকের বাবা-মা তারুণ্যের পুনর্জন্মকে স্বীকৃতি দিলে আগামীর বাবা-মা অনেক কাল আগে আরব মরুভূমিতে সৃষ্ট- সৃজন, মনন, সাহিত্য, দর্শন, শিল্পকলা তথা সভ্যতা ধ্বংসকারী রক্তলোলুপ মরুঝড় ইসলামকে রুখবেই, তাদের সন্তানকে এই ঝড় থেকে রক্ষা করবেই। সেদিন কেবল বিচ্ছিন্নভাবে একজন বা দু-জনের নয়, পুনর্জন্ম হবে গোটা জাতির। মৃত্যুর পর কাল্পনিক জন্মান্তর নয়, পৃথিবীর শান্তির জন্য একজীবনেই সত্য হোক জন্মান্তরবাদ।

 

সমাপ্ত

 

 

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

36 + = 43