রুব আল খালির দাবেরী, লায়লা আর জাররা কাহিনি [পর্ব : ৪]

সময় গড়িয়ে যেতে থাকলো। আমি দাবেরীর সাথে তার খামারে কাজ করি, তার উট-ছাগল-দুম্বাগুলোকে মাঠে চড়াই, কখনো তাদের দুধ দোহন করি, সব্জি ও দুধ এলাকায় বিক্রি করি, ঘরে রান্নাবান্না ও স্নানের জন্য কুপ থেকে জল তুলে দেই। মোটকথা সারাদিন আমার কেটে যায় কাজের মাঝে। একটুও সময় পাইনা অন্য কিছু চিন্তা করার। এর মধ্যে একদিন ভীষণ জ্বর এলো দাবেরীর। ক্রমে তা বাড়তে থাকলো। দাবেরীর এক প্রতিবেশী জ্বরের ঔষধ এনে দিলো তাকে। অত্যন্ত কর্মঠ দাবেরী বিছানায় পড়লো কদিনের জন্যে। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতেই তার খামার, পশুগুলো, কুয়ো থেকে পানিতোলা, দুধ বিক্রি ইত্যাদি সব সামলাতে লাগলাম আমি। এখন খাবার আনতে বা কেনা রুটি দিতে সামনের ঘরে প্রায়শ ঢুকি আমি। কখনো দুধের পাত্র আনতে ডাক দেই ছোটকন্যা ফাতিমাকে। কিন্তু ফাতিমা আসার আগেই বড় ৩-কন্যা ছুটে আসে পাত্র নিয়ে। ঘরে বোরকা পরেনা ওরা। তাই ওদের চেহারা এখন চিনতে পারি আমি। ফর্সা ইয়ামেনি গোত্রের দাবেরী পরিবার। তাই মেয়েগুলো বেশ সুন্দরী। কার কি নাম তাও জানি। ওরা কথা বলতে চায় আমার সাথে। কিন্তু মা ও বাবার ভয়ে একদম কাছাকাছি আসেনা ওরা। কিংবা এলেও শব্দ করে কথা বলেনা। সুযোগ পেলে চোখ টিপে হাসে তিনজনেই। নিষিদ্ধ সমাজে হয়তো পুরুষের প্রতি টান ওদের অনেক বেশী, যা ওরা বলতে পারেনা মুখ ফুটে। কখনো দুধের পাত্র নেই ওদের হাত থেকে কিংবা কুয়া থেকে জল তুলে তা ঢেলে দেই ওদের মাথায় রাখা পাত্রে। ঢালতে গিয়ে কখনো জল পড়ে ওদের বোরখা ঢাকা শরীরে, তাতে পুলকিত হয়ে ওরা হাসে আমার দিকে চেয়ে! বড় তিন মেয়ের মাঝে ছোটটির বয়স ১৮। সে খুব চঞ্চল। মাঝে মাঝে আমাকে চোখ টিপ দেয়। বাবার অসুস্থ্যতায় দুধ দোহন করতে আসে বড় মেয়ে লায়লা। দুধ দোহনে সে খুব পটু। তার বাবার মত হাতের স্পিড তার। কিন্তু সে খুব একটা কথা বলেনা। দুধ দোহন শেষ হলে আমার দিকে কেবল একবার চেয়ে হেসে চলে যায় ঘরের ভেতর। আমি দুধ সব্জি বিক্রির টাকা তুলে দেই অসুস্থ্য দাবেরীর হাতে। তখন কাছে দৌঁড়ে আসে চঞ্চল জাররা। সে টাকা নিতে চায় আমার হাত থেকে!
:
৭/৮ দিন জ্বরে ভোগার পর সুস্থ্য হয় দাবেরী। নিজের উট ছাগল দুম্বা আর খামার দেখে খুশী হয় খুব। আমি নিয়মিত তা বিক্রি করে টাকা দিয়েছি তাকে, প্রতিদিন ১৫/২০ বালতি জল তুলে দিতাম কন্যাদের মাথায় এসব কথা শুনে সে বেশ দরদী হয় আমার প্রতি। আমাকে বলে – “তোমার কাজে খুব খুশি আমি! তুমি খুব ভাল মানুষ”! আমি মুখ কালো করে বললাম – “আমাকে তো ভাল মানুষ বললে, তারপরো একা আমাকে ঘুমাতে বাধ্য করছো ঐ ক্ষেতের মধ্যে। নিজের ঘরে খেতে দাওনা। ঘরের সামনে ছেঁড়া কার্পেটে বসে খেতে হয় আমাকে মিসকিনের মতো”! দাবেরী বললো – “আমাদের এ সমাজে এ কঠিন রীতি না থাকলে তোমাকে ঘরে ঢুকতে দিতাম আমি। ভেতরে বসে আমার সাথে খেতে”! আমি বললাম – “কিন্তু আমিওতো মুসলমান। তাকে বাইরে বসে খাওয়াবে তুমি? এ কেমন রীতি”! এটা সম্ভবত মনে লাগলো সহজ সরল গ্রাম্য মানুষ দাবেরীর। সে ঐদিন থেকে আমাকে তার ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল খাবার খেতে। বুঝলাম আমি ভেতরে যাওয়াতে তার সব মেয়েরা খুব খুশি! বিশেষ করে জাররা নামের সেঝো মেয়েটি সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে লাগলো আমাকে।
:
৩/৪ দিন পর মুখ অন্ধকার করে দাবেরী বললো – “বিরাট ঝামেলা হয়েছে রে বাবা! তোমাকে ঘরে ঢুকিয়ে খাবার দিয়েছি। তুমি আমার ঘরে প্রবেশ করছো, আমার ঘরে বিবাহযোগ্য ৩-মেয়ে আছে, এটা কানে গেছে আমাদের গোত্র প্রধান আবদাল্লাহ আল ঘামদির। এটা দারুণ অপরাধ হয়েছে তোমার ও আমার। এখন তোমার ও আমার শাস্তি পেতে হবে এ কাজের”। আমি ভয় পেয়ে বললাম – “হায় হায়! বলো কি”? এখন কি করবে আমাদের”? দাবেরী বললো – “শাস্তি হলো, তোমাকে ও আমাকে ১০০-দোররা মারবে সবার সামনে। আর কুড়িটা উট বা ১০০-বকরি জরিমানা দিতে হবে আমাকে। কিন্তু অতগুলো উট বা ছাগল নেই আমার”! আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম – “হায়রে! ১০০-টা বেত মারলে তো মারা যাবো আমি! আর কোন পথ নেই”? দাবেরী বললো – “আছে! যদি তুমি আমার বড় মেয়েকে বিয়ে করো, তবে আমার জামাই হিসেবে ঘরে ঢুকতে পারবে তুমি! কিন্তু আমাদের এ গোত্রের রীতি অনুযায়ী বিয়ের জন্যে কুড়িটা উট বা ১০০-বকরি বা সমমূল্যের রিয়াল দিতে হবে ‘মোহরানা’ হিসেবে। তাতো নেই তোমার”! আমি বললাম – “তাতো নেই! কিন্তু তা তুমি মাফ করে দিতে পারো না”? “না, মাফ করা যায়না, কারণ মোহরানার টাকার মালিক হবে যাকে তুমি বিয়ে করবে সে! তাই আমি মাফ করতে পারিনা, তবে এই টাকা তুমি কাজ করে শোধ করবে, এমন শর্তে বাকিতে বিয়ে দেয়া যায়, যদি আমাদের গোত্রপ্রধানকে রাজি করাতে পারি”!
:
গোত্রপ্রধান আল ঘামদি দাবেরীর ঘনিষ্ঠ কজন বদুকে নিয়ে মিটিং করলো বালুর মাঠে, যেখানে রাতে থাকে সে তাবুতে। সবার অনুরোধে বাকি বিয়েতে রাজি হলো গোত্র প্রধান কিন্তু রাজি হলোনা বড় মেয়ে লায়লা। কারণ হিসেবে বাবাকে বললো – “ছোটবোন জাররা বিয়ে করতে চায় ঐ রাজ্জালকে” মানে আমাকে! কিন্তু এ গোত্রের রীতি নেই বড় দুই মেয়ে ঘরে রেখে তৃতীয় মেয়েকে বিয়ে দেয়া। তা ছাড়া এ সমাজে মেয়েদের পছন্দ বা অপছন্দ বলে কিছু নেই। গোত্রপ্রধান বা বাবা-ভাই যেখানে রাজি, মেয়েকেও সেখানেই রাজি থাকতে হয়। অবশেষে কুড়িটা উটের বাকি মোহরানায় বিয়ে করলাম আমি ২২-বছরের বড় মেয়ে লায়লাকে। ঐদিনই একটা পতাকা নামানো হলো ঘরের ছাদ থেকে। নিজের আতালের একটা উট জবেহ করে দাবেরী ওয়ালিমার আয়োজন করলো এলাকার মানুষের জন্যে। আমি হলাম দাবেরীর বড় মেয়ের বর। ঘরে বৈধ প্রবেশাধিকার পেলাম আমি এবার!
[শেষ পর্ব কাল]
 
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 41 = 45