The Violin Player : মগজে ভাবনার খোড়াক

The Violin Player সিনেমার একটি দৃশ্য
সমাজের শিল্পীবোধ যত বেশি গভীরে সমাজ ততবেশি মানবিক। আজ থেকে কয়েক দশক পূর্বে আমাদের দেশের সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবলেই তা স্পষ্ট হবে। বিশেষ করে পাড়া গ্রামে, যেখানে রোজ না হলেও অন্তত একটি সপ্তাহ পালাগান, যাত্রাপালার মত শিল্প কর্মগুলো আয়োজিত হতো তখন গ্রামগুলোতে মাদক দ্রব্যের রমরমা অবস্থা ছিলো না। অবশ্য পারফর্মিং আর্ট আর আর্ট বা শিল্প এক বিষয় নয়। তবু শিল্পের অংশ হিসেবে এই কর্মগুলো অন্তত মানুষকে মানবিকবোধ সচেতন রাখতে চেষ্টা চালাতো। হ্যাঁ, শৈল্পিক বিচারে গেলে পারফর্মিং আর্টগুলো সমাজে যুতসই জায়গা করে নিতে পারে নি কারণ আমাদের সামাজিকবোধ শক্তি ছিলো খুবই নড়বড়ে। তার কারণ হলো আমাদের চিন্তার জগত সীমিত। বিস্তৃতভাবে ভাবার জন্য যে উপকরণ প্রয়োজন তা যথেষ্ট পরিমাণে সমাজে বিদ্যমান না থাকায় এমনকি জন্ম থেকেই সে বোধ গড়ে না উঠায় পারফর্মিং আর্ট কালানুক্রমে হারিয়ে গিয়েছে এবং আমাদের মানবিক অবক্ষয় দিন দিন বিপর্যস্ত হতে হতে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
Art washes away from the soul the dust of everyday life.
অর্থাৎ শিল্প আত্মার থেকে দৈনন্দিন জীবনের ময়লা ধুয়ে ফেলে।
পাবলো পিকাসোর এ কথার যথার্থতা সমাজ বাস্তবতায় কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে The Violin Player নামক একটি সিনেমায়। সিনেমায় খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে সমাজ বাস্তবতায় অপরাধপ্রবণতা মগজে গেঁড়ে বসে থাকার কথা থাকলেও শিল্পবোধ সে অপরাধকে ধুয়েমুছে সাফ করে দেয় এক নিমিষেই।
মুম্বাই শহরে এক স্বপ্ন নিয়ে বসবাস করা শিল্পীর জীবনের সংগ্রাম তুলে ধরে এগিয়েছে সিনেমার গল্প। তবে এ সিনেমার প্রেক্ষাপটকে আমার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, আমরা প্রতিটা মানুষই নিজের মননে নিজস্ব একটা পৃথিবী তৈরী করে বাস নিজে নিজে বাস করি। যেখানে আমরা পাখির মত উড়ি, হাঁসের মত জলে ভাসি আমার চোখ বন্ধ করে অন্ধকারে ডুব দেই। শিল্পীর ক্ষেত্রেও এ বিষয়গুলো থাকে। তবে শিল্পীর ভিন্নতার প্রকাশ ঘটে আত্মার পরিশুদ্ধি দিয়ে। সিনেমার গল্পে সমস্ত সাধারণ ঘটনার অবতারণা করা হলেও শেষটাই ঠিক করে সাধারণ আর শিল্পের তফাৎ। এবং নির্মাতা দর্শক মননে সুচিন্তিতভাবে ভাবনার তাড়না ঢুকিয়ে দেন। প্রশ্ন করে উত্তর খোঁজার জন্য যে মানুষকে ভাবতে হয় তা নয়। বরং উত্তর নিয়েও যে ভাবা যায় এবং গভীরভাবেই ভাবা যায় তা এ সিনেমা থেকে স্পষ্ট।
সিনেমার গল্প আপনার আত্মতৃপ্তি না জোগাতে পারলেও ভাবনার খোড়াক জোগাবে বেশ ভালোভাবেই। তাই সিনেমাটি দেখে আপনার আত্মতৃপ্তি আক্ষরিক অর্থে না ঘটলেও মগজের স্ফুরণ ঘটাতে সফল হবে।
সিনেমার একটি দৃশ্য
সিনেমায় ভায়োলিন বাদকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী। একজন স্বপ্নবাজ অথচ বেকারত্বের চাপে বিষাদগ্রস্থতা ভর করলেও ভায়োলিনের সুরে তা দূরে সরিয়ে চোখেমুখে আলো নিয়ে তিনি তার চরিত্রটিকে দারুণভাবে দাঁড় করিয়েছেন। এবং সিনেমাটির গল্প এই ভায়োলিন বাদকের হাত ধরে চিন্তার জগতে ভ্রমণ করতেই এসেছে, ফলে ঋত্বিককেই গল্পের হাত ধরতে হয়েছে শক্ত করে। আর সুনিপুণ অভিনেতার মত তিনি কয়েক পাঁক ঘুরে এসে চূড়ান্ত জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন। আদিল হুসেন সিনেমায় আগন্তুকের চরিত্রে ছিলেন। সহযোগীর সঙ্গে মনস্তত্ত্বিক বোঝাপড়া না হলে অল্প সংলাপে দারুণ অভিনয়টা করা সম্ভব নয়। ঋত্বিক ও আদিল হুসেনের সে বুঝাপড়াটা খুব বেশি ছিলো বলেই সিনেমায় দুজনের নির্বাক অভিনয়টা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। অন্যান্য চরিত্রগুলো স্ক্রিনে অল্প সময়ের জন্য থাকলেও বাড়তি অভিনয় করে ঘেটে দেন নি।
সিনেমাটিতে নির্মাতা বুদ্ধায়ন মুখার্জি নিজস্বতা তৈরী করেছেন। গল্প বলায়,উপস্থাপনে এবং ভিজ্যুয়ালাইজেশন। অল্প সময়ে একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে সমাজের বাস্তব প্রেক্ষাপটকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। আত্মতৃপ্তি আক্ষরিক অর্থে না হলেও গল্প যে খোড়াক আপনাকে দিয়েছে তা নির্মাতা হিসেবে বুদ্ধায়ন মুখার্জি ও তার সিনেমা নিয়ে দু/চার কথা ভাবতে, বলতে, লিখতে সাহায্য করবে।
দৃশ্যপট নিয়ে বলতে হলে বলতে হবে সব মিলিয়ে ঠিকঠাক। গল্পের সঙ্গে প্রতিটা দৃশ্যের সম্পৃক্ততা ছিলো। ক্যারিশমা দেখানোর কোনো চেষ্টা ছিলো না এবং সেটার কোনো প্রয়োজনও অবশ্য ছিলো না। ফলে সাদামাটা ভাবে বেশ ভালো ছিলো।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। মিউজিক্যাল জনরার হলেও সঙ্গীতের ক্ষেত্রটি ছিলো প্রসঙ্গক্রমে। হুটহাট মিউজিক দিয়ে মিউজিক্যাল বিষয়টাকে জোর করে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা ছিলো না।
পরিশেষে, The Violin Player একটি সামাজিক মূল্যবোধ গড়তে শিল্পের ভূমিকা নিয়ে সিনেমাটিকে এ উপমহাদেশের ভাবনার এক খোড়াক বলা যেতেই পারে।
 
বিঃদ্রঃ এটি হিন্দি ভাষার একটি ফিচার ফিল্ম।
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 2 =