প্রদীপের কল ধর্মে নড়ে

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কাঁকড়াকে ক্যাঁড়া বলা হয়। সেখানকার একটি বহুল প্রচলিত আঞ্চলিক প্রবাদ দিয়ে প্রারম্ভে যাওয়া যাক। প্রবাদটি এমন ; ” জাতে জাত টানে ক্যাঁড়ায় গাঁত টানে “। অর্থাৎ সহজভাবে ব্যাপারটি দাঁড়ায় কাঁকড়ার গন্তব্য যেমন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গাঁত বা গর্তের দিকে থাকে ঠিক তেমনি ধর্মের ভাই, দেশী ভাই, জাতিভাই ইত্যাদি এক্সকিউজে আমাদের মাঝে নৈতিক স্খলনকে জায়গা দিয়ে হলেও এক প্রকার স্বজনপ্রীতির আমেজ কাজ করে৷ যা বহুলাংশেই সুফল বয়ে আনেনা, আদৌ আনেনা কোনো মানবিক ফিলিংস। যে পুলিশের কারণে আমরা আজ প্রতিনিয়তই থ্রেড সম্মুখে দিনাতিপাত করছি, সেই পুলিশেই একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দের নাম ” দেশী “। এখানে দেশী বলতে ইঙ্গিত করা হয় অঞ্চল ভিত্তিক সেই মানুষ যিনি আজ আমার সহকর্মী। যেমন আমার দেশের বাড়ি ও সহকর্মীর দেশের বাড়ি বরিশাল হলে আমরা একে অপরের দেশী। এক্ষেত্রে যেটা ঘটে ; আমার দেশী এবং আমার মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে, মানষিক টান কাজ করে। ফলে স্বভাবতই আমাদের মানষিকতায় এমন কিছু শক্তি গড়ে ওঠে যা বহুক্ষেত্রে নৈতিক স্খলনকেও পরাজিত ও সুযোগ করে দেয়ার সামর্থ্য রাখে।

একইভাবে পেশা কিংবা ট্রেড ভিত্তিক টানাটানির একটা ট্রেন্ডও হরহামেশাই দেখা যায় যাকে প্রচলিত ভাষায় ট্রেডবাজি বলে৷ এক্ষেত্রেও ঘটতে পারে অনৈতিক আবদার, দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলা, দূর্নীতি কিংবা পক্ষপাতদুষ্টতার মত কর্মকাণ্ড যেদিকটায় আমরা খুব একটা নজর দিইনা বললেই চলে। আজকের বাংলাদেশের সাংসদ, মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী প্রমুখদের ভেতরেও পেশাভিত্তিক মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। জাতি বা জনগণের সেবাকে এনাদের একাংশ পেশা ভেবে বসে আছেন, ব্যবসা ভেবে বসে আছেন। ফলে, রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্রের মানুষদের উন্নতি চোখে পরেনা। এনারাও নিশ্চিতভাবেই একে অপরকে শেল্টার দিয়ে চলেন, ফলশ্রুতিতে এদের প্রত্যেকে অল্প সময়ে বিশালকার দৈত্যে পরিণত হন। আর তাদের পারষ্পরিক অনৈতিক সৌহার্দ্যে দৃশ্যমান হয় এক ভঙ্গুর রাষ্ট্রের। টেকনাফের মেরিন ড্রাইভে মেজর (অবঃ) মোহাম্মদ রাশেদ সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর যখন আমরা ক্রসফায়ার বাণিজ্যের টেকনাফের আরো এক ম্যাগনেট খুনি ওসি প্রদীপ কুমার দাশের প্রকৃত অবয়ব দেখে ফেললাম, তখন আমাদের আশেপাশের কিংবা দূরের বহু সুশীল ও প্রগতিশীলদের দেখতে পাচ্ছি; যারা পথভ্রষ্ট এই নষ্ট পুলিশ অফিসারকে মৌলবাদীদের মত শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ে নির্দোষ প্রমাণের অপচেষ্টা ও প্রচার করে চলেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি কেবলই ধর্মীয় পরিচয় অবলম্বন করে এক শ্রেণীর ভণ্ড সুশীল ও প্রগতিশীলরা, এই অফিসারকে নিষ্পাপ প্রমাণের অব্যর্থ চেষ্টা করছে প্রকৃতঅর্থে যেখানে ন্যায়সঙ্গত কোনো মূল্যবোধই নেই! আসলেই এর কোনো ন্যায্যতা আছে?

বাস্তবিকভাবে একজন সচেতন ও মানবিক মানুষ আসলে কেমন হওয়া উচিত? সে যে ধর্মের বা ধর্মহীন, যে অঞ্চল, দেশ বা পেশারই হোকনা কেনো প্যালেস্টাইনে ইজরায়েলি আগ্রাসন ও মানুষ হত্যার প্রতিবাদ করবে। রেসিস্ট বিজেপি’র কব্জাগ্রস্ত হওয়া ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম নির্যাতনের সত্য তুলে ধরবে, কাশ্মীরিদের অধিকার চাইবে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিপক্ষতা করবে সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াবে। পার্বত্য চট্রগ্রামে আদিবাসীদের ওপর চলা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে বলবে, এমনটাই তো হওয়া উচিত তাই না? আমরা কি তার শতভাগের একভাগেও নেই? নির্মম বাস্তবতা হল আমাদের মাঝে এই নৈতিকতা এক ভাগও নেই। যদি থাকতই ভন্ড সুশীল ও প্রগতিশীলরা গর্ত সন্ধানে থাকতনা, টানতনা ধর্মগত কোনো টান, আর প্রদীপ কুমার দাশ পেতনা সামান্যতমও নিরপরাধীর তকমা। তবে হ্যাঁ আমাদের অবশ্যই একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, পারষ্পরিক সহযোগিতা অটুট রেখেই চলতে হবে এবং এটাই প্রাকৃতিক চাহিদা। এটুকুই প্রার্থনা এসবের মাঝে স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতদুষ্টতা, অন্যায়, মিথ্যাচার কিংবা ধর্মের বলিরেখা টেনে কোনোভাবেই যেনো প্রদীপদের মত নষ্টের পক্ষে না যাই।

পরিশেষে একটা ঘটনা বলে ইতি টানা যাক। যারা বাংলাদেশে ইউএস এম্বাসি ফেইস করেছেন তারা ভালো জানেন ; ইউএস এম্বাসি কে সাদা কে কালো, কে উঁচু কে নিচু কিংবা কে হিন্দু কে মুসলমান এসবের নিরিখে কাউকে ভিসা দেয়না। যার ডকুমেন্টস ভালো, বিষয়বস্তু ভালো, যাওয়ার কারণ যৌক্তিক এবং যিনি মার্কিন নীতিমালা অনুযায়ী সেখানে যাওয়ার যোগ্যতা রাখেন একমাত্র তার ক্ষেত্রেই ভিসা পাওয়া সম্ভব। আমার এক পরিচিত ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ান ভিসা পায়নি, পেয়েছে দাড়ি টুপিওয়ালা এক হুজুর। এম্বাসিতে যে মার্কিনী বসে আছেন সে নিশ্চয়ই ঘাস খায়না? সে কেনো নিজ ধর্মের ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ানকে ভিসা না দিয়ে, মুসলিম হুজুরকে ভিসা দিতে গেলো? ভাবুন, ভাবার ব্যপ্তি ঘটান।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 + = 69