নীলাদের কথা

নীলাদের বাড়ি খুঁজতে বেশ কষ্ট করতে হলো আমাকে। পৃথিবীর বায়ান্নোটা দেশ ঘুরেছি আমি কিন্তু বাংলাদেশের কেরানিগঞ্জে অঁজপাড়াগাঁর অষ্টাদশী নীলাদের বাড়ি খুঁজে পেতে এতো কষ্ট করতে হবে আমাকে বুঝতে পারিনি আগে। গাড়ি রেখে এসেছি সেই কেরানিগঞ্জ প্রপারে। তারপর একটা অটোতে এলাম দীঘুপড়াতে। সেখান থেকে খোলা রিক্সাভ্যানে উঠে বসেছি খাসখালি বাজার যেতে। কিন্তু পথেই ঝুম বৃষ্টি নামলো আকস্মিক। কাকভেজা হয়ে ভ্যান দাঁড়ালো এক চায়ের দোকানে। বৃষ্টি একটু কমলে আবার ভ্যানওয়ালা প্যাডেলে পা রাখলো খাসখালি যেতে। গ্রামের কাঁচা রাস্তা বৃষ্টিতে বেশ কর্দমাক্ত। তার মাঝে বেশ কষ্ট হচ্ছিল ভ্যান চালকের গাড়ি টেনে নিতে। খাসখালি পৌঁছতে পৌঁছতে বৃষ্টি থেমে গেলো প্রায়। নীলাদের গ্রামের নামও খাসখালি। কিন্তু ওদের বাড়ি একদম খাসখালির শেষপ্রান্তে। যা একটা বিলের মাঝ দিয়ে যেতে হয়। ভ্যান চলেনা বিলের ঐ অপ্রসস্ত রাস্তায়। অতএব, বর্ষার ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে জুতা ভিজিয়ে হেঁটেই চলতে হলো আমায় একাকি পথে।

:

বিলের মাঝে এসে আবার ফোন দিলাম নীলাকে। বৃক্ষঘেরা বাড়ি ছেড়ে সে একটু এগুলো বিলের দিকে। দুটো মেয়ে হেঁটে আসছে আমার দিকে। সম্ভবত নীলা আর তার ছোটবোন। ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে নীলা বলেছিল অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে সে স্থানীয় কলেজে। আর তার ছোট বোনটি পড়ে ক্লাস টেনে। সম্ভবত ওরা দুবোনই হবে। না হলে হাত তুলে আমার দিকে আসছে কেন ওরা! কাছাকাছি হলে আমিই বললাম – “তুমি কি নীলা”! নীলা হেসে বললো – “না হলে কি এই জলকাদাতে আপনাকে এগিয়ে নিতে আসি দাদা”! নীলার বোন মিলা হেসে বললো – ” নীলাপু একা আসেনি দাদা, আমিও এসেছি নীলার ছোটবোন মিলা”। আমার হাত থেকে মিলা টেনে নিলো আম আর মিষ্টির প্যাকেট দুটো। অনেকদূর পিচ্ছিল পথে দুহাতে দুটো শপিং ব্যাগ টেনে হাঁটতে কষ্ট হ্চছিল আমার! মিলা কিছুটা ভারমুক্ত করলো আমাকে!

:

বিলের কাঁচা সড়ক শেষ হতেই নানাবিধ গাছগাছালি ঘেরা টিনের ঘর দেখলাম নীলাদের। ওদের ঘরে ঢোকার আগে ৩-জনের পা ধুতে হলো আমাদের। জলকাদাতে জুতো ভিজে একাকার। নীলা বললো – “দাদা জুতা দরজার সামনে ছেড়ে দিন। ওটা ধুতে হবে। আপনি ঘরে রাখা ষ্পঞ্জ পরে ভেতরে ঢুকুন”। তাই করলাম আমি। নীলা বলেছিল ওরা দরিদ্র। কিন্তু এতোটা দরিদ্র বুঝতে পারিনি আমি! ঘর ও এর সাজসজ্জা দেখে বোঝা যাচ্ছে, সত্যিই ওরা অতি দরিদ্র। নীলা ম্যাসেঞ্জারে বলেছিল, ওদের দুখের কাহিনি। দুবোন আর মাকে ছেড়ে বাবা আরেকটি বিয়ে করে চলে গেছে গাজিপুর। ওদের আর কোন খোঁজ নেয়নি বহু বছর হলো। মা-ই নানাবিধ কষ্ট করে বড় করছিল মেয়ে দুটোকে। কিন্তু গত বছর থেকে প্যারালাইজড তিনি। বিছানা থেকে খুব একটা উঠতে পারেননা এখন। ওয়াশরুমে যেতেও সাহায্য নিতে হয় কারো। মায়ের এ দুরবস্থায় কলেজের কাছে কেরানিগঞ্জে ৪/৫-টি টিউশানি জোগার করেছে নীলা। টিউশানির টাকাতেই নিজের আর বোনের পড়ার খরচ আর সংসারের দায় এসে পড়ে নীলার ওপর। কিন্তু এর মাঝে এলো করোনা। ভয়াবহ করোনার কারণে সব টিউশানিগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং সংসার এখন বলতে গেলে অচল প্রায়!

:

এসব আগেই জানতাম আমি। তাই দুপুরের খাবারের আগেই আমায় ফিরতে হবে বলে তাড়া দিলাম, যাতে আমার জন্য কোন খাবারের আয়োজন না করে ওরা। দুবোন আম কেটে আনলো আমার জন্যে, সাথে আমার নেয়া ছানার মিষ্টি। ওদেরসহ খেলাম আমি। ওর মায়ের বিছানার পাশে গিয়ে বললাম – “আপনাকে দেখতেই এসেছি খালাম্মা”। সেও আম-মিষ্টি খেলো মেয়েদের হাতে। আবার বৃষ্টি আসার আগে উঠতে চাইলাম আমি। কিন্তু দুবোন আর মায়ের আব্দার, তাদের সাথে দুপুরে খেতে হবে আমাকে। অতদূর থেকে কষ্টকর পিচ্ছিল পথ ভেঙে এতোদূর এসেছি আমি। না খেয়ে কিভাবে যাবো! অবশেষে সম্মতি জানালাম যে, “হ্যা, খেয়েই যাবো”! আমার খাওয়ার কথা শুনে ফ্যাকাশে হলো নীলার মুখ। দুবোন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো খানিকক্ষণ! ছোট্ট ঘরের পাশের রুমে মায়ের কাছে নীলা ফিশফিশিয়ে বললো – “মা দাদাতো খেয়ে যাবেন বললেন। কিন্তু ঘরে যে একফোটা চালও নেই। আর কি দিয়ে খাওয়াবো তাকে”! মা বললো নীলাকে – “তোর কাছে কোন টাকাই নেই”? ‘না’ – বললো নীলা। মা আবার বললো – “তবে দেখ করিমের দোকান থেকে বাকি চাল ডাল আনতে পারিস কিনা”!

:

অষ্পষ্ট হলেও প্রায় সব কথা শুনলাম আমি! নীলাকে বললাম – “তোমরা বাজার করো কই? দোকানপাট কি কাছাকাছি আছে”? “জি দাদা, খাসখালি বাজার কাছেই, দশ মিনিটের হাঁটা পথ পশ্চিম দিকে”! বললো নীলা আঙুল উঁচিয়ে। আমি পুব দিকের রাস্তা দিয়ে এসেছি। ওদের বাড়ি থেকে আরেকটি সরু কাঁচা রাস্তা গেছে পশ্চিম দিকে। নীলাকে বললোম – “চলো তোমাদের বাজারটা দেখে আসি একবার”। কিন্তু বাকিতে জিনিসপত্র কিনবে নীলা। তাই আমাকে সাথে নিতে কেমন সঙ্কোচিত হলো সে। বললো – “দাদা আপনি রেস্ট করুন না, গ্রামের বাজারে আবার কি দেখবেন এ পানিকাদার মাঝে”! কিন্তু তারপরো আমি গেলাম নীলার সাথে। বললাম – “করিমের দোকানে যেতে হবেনা বাকিতে কিনতে। যে কোন দোকান থেকে কিনো মালপত্র, আমি টাকা দেব। বাকিতে কেনা পছন্দ নয় আমার”। আবার সঙ্কুচিত হলো নীলা। বললো – “দাদা, বেড়াতে এসে বাজার করে খাবেন? আমরা যে খুব ছোট হয়ে গেলাম আপনার কাছে”! হেসে বললাম – “কাভি কাভি এ্যায়সা ভি হোতা হ্যায়”! “কি বললেন দাদা কিছুই বুঝতে পারিনি” মুখ আঁধার করে বললো নীলা। আমি হেসে বললাম – “হিন্দি কথা বুঝতে পারোনা? হিন্দি ছবি দেখো নাই কখনো”?

:

চাল কিনলাম, ডাল কিনা, আলু কিনলাম, ফার্মের মুরগি কিনে দুজনে হাঁটা শুরু করতেই নীলা বললো – “দাদা পিয়াজ আর তেলও নিতে হবে! না হলে মুরগি রান্না করবো কিভাবে”? আবার ফিরে গিয়ে দুকেজি পিঁয়াজ আর দুলিটারের একটা বোতল কিনলাম তেলের। দুজনে ভাগাভাগি করে বাজার নিলাম দুহাতে। আবার ভেজা মাটির রাস্তায় পা টিপে টিপে হাঁটতে গিয়ে পিছলে পড়ে গেলো নীলা আকস্মিক। হাতের পলিথিনের ব্যাগ ছিঁড়ে পুরো চাল ছড়িয়ে গেল কাদামাখা রাস্তায়। এবার হাসার বদলে অনেকক্ষণ কাঁদলো নীলা দাঁড়িয়ে। আমি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম – “কান্না করছো কেন নীলা? আমার হাত থেকেও এমনটা পড়ে যেতে পারতো। তুমি ঐ গাছটার ওখানে দাঁড়াও! আমি ৫-কেজির একটা বস্তা নিয়ে আসছি এবার”! চাল নিয়ে ফিরে এসে দেখি নীলা ওপরের কিছু চাল তুলেছে কাদা থেকে। কিন্তু তা কিসে করে বাড়িতে নেবে তার পাত্র খুঁজে পাচ্ছেনা সে!

:

বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে আবার বৃষ্টি নামলো। আমরা ভিজতে ভিজতে প্রায় বেঁচে গেলাম একটুর জন্যে। পরিবেশ হালকা করতে নীলাকে বললাম – “ভালইতো আছাড় গেলে, এবার গোসল করে জলকাদা ধুয়ে নাও শরীর থেকে”! রান্না করতে করতে প্রায় তিনটা বেজে গেলো। আমার জন্যে আলাদা খাবার দেয়া হয়েছে মিলার পড়ার টেবিলে বইগুলো সরিয়ে। কিন্তু আমি বললাম – “তোমার মায়ের বিছানার পাশের মাটিতে কিছু বিছিয়ে খাবার দাও সবার। তোমার মাও আমাদের সাথেই খাবে”! তাই হলো। ওর মাকে পিঠে বালিশ দিয়ে বসিয়ে খাইয়ে দিলো ছোট মেয়ে মিলা। নীলা আর আমি বসলাম মাটির বিছানায় মাদুর পেতে।

:

আমার গাড়ি রেখে এসেছি কেরানিগঞ্জ প্রধান সড়কে। ড্রাইভার নেই আমার। নিজেই ড্রাইভ করে চলি একাকি পথ। ঢাকার চোর বাটপারেরা তক্কে তক্কে থাকে। ওরা খালি গাড়ি দেখে অনেক সময় চুরি করে নিয়ে যায় গ্যারেজে। কুড়ি পচিশ লাখ টাকার গাড়ি এক দুই লাখে বিক্রি করে দেয়। গ্যারেজওয়ালারা যন্ত্রপাতি খুলে বিক্রি করে নানাভাবে। কখনো নাকি গাড়ির রঙ পাল্টে তা বিক্রি করে দেয় চোরা পার্টির কাছে। সুতরাং চিন্তিত হয়ে নীলাকে বলি – “নীলা এবার উঠতে হবে! গাড়িটা রেখে এসেছি সেই সকাল বেলা। তাই চিন্তা হচ্ছে খুব”! ওর মায়ের ক্লেদাক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বিদেয় নেই এক সময়। মিলা হেসে বলে – “দাদা আপনার গাড়িতে ঘোরাবেন না একদিন? গাড়ি চড়ার খুব সখ আমার। কিন্তু গরিব বলে কে ওঠাবে গাড়িতে কন”! টেন পড়ুয়া ছোট্ট টিনএজ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলি – “নিশ্চয়ই উঠবে মিলা! আজতো চলে যাচ্ছি। আরেকদিন আসবো। তখন মাওয়াঘাটে পদ্মাতীরে বেড়াতে যাবো তোমাদের নিয়ে!

:

আষাঢ়ের এক প্রাগৈতিহাসিক সোনামাখা পাখি-রঙা বিকেলবেলায় বিদায় নিতে চাই এবার নীলা থেকে। সে আমায় ঘরের সামনে এগিয়ে দিতে এসে বলে – “দাদা আপনার সাথে বড়রাস্তা পর্যন্ত যাবো। টিউশানগুলোর খোঁজ নিয়ে আসি একবার”! আসলে সে এগিয়ে দিতে চায় আমাকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত! এ হৈমন্তিক বৃষ্টিভেজা মাটির পৃথিবীর এসব কষ্টক্লেদ ভেঙে আবার বিলের সরু রাস্তায় উঠে যাই আমি। আমার সাথে নীলাও এসেছে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আমার হাত ধরে নীলা। চোখ ভিজিয়ে বলে – “দাদা বড়ই ভাল মানুষ আপনি! না হলে এ দরিদ্র বাড়িতে এমন কষ্ট করে কেউ আসে! এমন বাজার করে খায়”! জগতের লিঙ্গসাম্যে – শ্রেণিসাম্যে উড়ে যাই আমি নীলার কথাতে। বিলের জলে প্রতিফলিত উজ্জ্বল মোম হয়ে জ্বলে যেন অমাবস্যার আঁধেরা হয়ে নীলার দিকে তাকিয়ে থেকে বলি – “তুমিও অনেক ভাল মেয়ে নীলা”! আজকের বিশ্বায়নের পণ্যায়নে মানুষ আর আমার মানবিকতা দেখে গলে যায় নীলা। বলে – “দাদা, আবার আসবেন! বড় সুন্দর সময় কাটালাম আপনার সাথে”! নীলার দিকে চেয়ে জীবনের এসব খণ্ড খণ্ড মানচিত্রে মোহমুদ্রা হয়ে হাঁটতে থাকি আমি পাকা সড়কের দিকে। ঐ যে রাজপথ দেখা যাচ্ছে! ওখানে পৌঁছতে হবে আমাকে!

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 − = 73