সহজপাঠের সহজ গপ্পো

(১)
খুব চেনাজানা গল্পকে সিনেমায় রূপ দেওয়া বেশ ঝক্কি-ঝামেলার কাজ। বিশেষ করে বহুল পঠিত, বহুল চর্চিত চিরচেনা কোনো গল্পকে অবলম্বন করে কেউ যখন সিনেমা বানায়, তখন তা আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠে। পাঠকের মাথায় বিশেষ করে ধ্রুপদী সাহিত্যের পাঠকের মাথায় এক ধরণের স্বাভাবিক চিত্ররূপ গাঁথা থাকে। পাঠক তার মতো করে কল্পনায় তা একের পর এক বিনির্মাণ করে চলে। সিনেমার মতোই একের পর দৃশ্য রচিত হয়। পাঠকভেদে তা সামান্য হেরফের হলেও, এসব ক্ল্যাসিক সাহিত্যের পাঠকদের মন-মননে তার চিত্ররূপ প্রায় কাছাকাছিই থাকে। সুতরাং সহজ ও খুব চেনাজানা প্লট নিয়ে সিনেমা বানানো খুব সহজ কাজ তা কিন্তু নয়। ধ্রুপদী সিনেমা, সফল সিনেমা এসব তো আরও পরের ব্যাপার। আর তা যখন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পকে ঘিরে হয় তখন তা আরও কঠিন কাজই বটে। কারণ একটাই বিভূতিভূষণের কাহিনি অবলম্বনে অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। তাই পাঠক ও দর্শক মনে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত পরিষ্কার। সহজ ও ঝরঝরে। এই সহজ ও ঝরঝরে একটি গল্প হলো ‘তালনবমী’। এই ‘তালনবমী’ গল্পের যে রূপ তা বলতে গেলে বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে তা খুব পরিষ্কার। এই চেনা গল্পের, জানা গল্পের, পড়া গল্পের সিনেমা হলো এই ‘সহজ পাঠের গপ্পো’।

(২)

“মাত্র তিন পাতার একটা গল্প থেকে আমি ৬৫ পাতার স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছি৷ সেদিক দিয়ে চেষ্টাটা অন্য রকমের৷”

সিনেমার পরিচালক মানস মুকুল পাল ‘তালনবমী’ গল্পটিকে কীভাবে নিজের মতো করে আত্মস্থ করেছেন তা উপরের উক্তিতে তাঁর নিজের মতো করে বলেছেন। তিন পাতার একটি গল্পকে সিনেমায় উন্নীত করার প্রচেষ্টা যে খুব সহজ ছিলো তা কিন্তু নয়। এই অস্থির সময়ে এসে, এই গল্পকে নিয়ে তাঁর সিনেমা বানানোর কথা নয়। বিশেষ করে একজন নতুন পরিচালকের জন্য এরকম গল্পকে ঘিরে সিনেমা বানানো মানে জেনেশুনেই একটি লস প্রজেক্টে হাত দেওয়া। আর যদি সিনেমাটি যথাযথ সিনেমা না হয়ে ওঠে, তাহলে তো আর সবই গেলো! এ সমস্ত মিলিয়ে এই অস্থির-টালমাটাল সময়ে ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ সিনেমাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হিসেবেই নিজের স্বতন্ত্র স্থান দখল করে নিয়েছে। নবীন সিনেমা নির্মাতাদের জন্য এই সিনেমা, এই সিনেমার পরিচালক ও কলাকুশলী একটা আদর্শ হিসেবেই পরিগণিত হবে বলে মনে হয়। সিনেমা নির্মাণ করতে গেলে যে ধৈর্য, সাহস আর ক্ষ্যাপাটেপনা থাকতে হয়; তা পরিচালক মানস মুকুল পালের কাছ থেকেই অনেকেরই শেখার আছে।

(৩)
“ও ভগবান, ওরা আমাদের নেমন্তন্ন করবে তো ভগবান?”

নেমন্তন্ন কি আদৌ পায়? নেমন্তন্ন কি শেষমেশ খাওয়া হয়? এই অতি কৌতূহলী প্রশ্নগুলিকে পাশ কাটিয়ে গেলে দেখতে পাবো; এই গোটা সিনেমাটি ততক্ষণে বেশ রাজনৈতিক একটি সত্ত্বা নিয়ে হাজির হয়ে গিয়েছে। সিনেমাটি এখন আর ঠিক সহজ গপ্পোর, সহজ সিনেমা নয়! এ রীতিমতো রাজনৈতিক হয়ে চরিত্রগুলিকে এক সম্ভাব্য পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। না, ভয়ের কিছু নেই। এ ঠিক বৈপ্লবিক সিনেমাও না। কিংবা তত্ত্ব-তাত্ত্বিকতার ভারে ভারি কোনো সিনেমাও নয়। তেমনি ঠিক বিভূতিভূষণেরও গল্প নয়। এ গোপালের গল্প। এ ছোটু”র গল্প। এ এক রোজকার গল্প। এক সাদামাটা সাধারণ গল্প। খুব চেনাজানা গল্প। কিন্তু রাজনৈতিক। রোজকার মুড়ি আর গুড়ের অনুপস্থিতে যখন পাতে কালেভদ্রে সাদা ভাত আর কলমি সেদ্ধ করা থালায় গোপাল ও ছোটুদের এক আধবেলা খেয়ে না খেয়ে চলতে হয়; সেখানে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পেটপুরে পোলাও খাওয়া তো এক দিবাস্বপ্ন বটে। দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়া আজও এই অঞ্চলের বড়ো অংশের জন্য তা স্বপ্নের মতোই। আজও ক্ষুধা-দারিদ্রতা এই গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যমান আছে। ক্ষুধা-অভাব নিয়ে একবেলা কোনোরকমে পেটপুরে খাওয়া আজও এই উপমহাদেশের জন্য জ্বলজ্বলে সত্য! আর এজন্যই বোধহয় ‘জন্মাষ্টমী‘ উপলক্ষে কাঙালিভোজই বলি বা ভোজসভাই বলি তাতে খোদ ‘গোপালে‘রই ভোগ জোটে না!

(৪)
বিভূতিভূষণের সময়কাল, তাঁর চেনাজানা ভূগোল, তাঁর চারপাশ, নিসর্গতা আর রাজনৈতিক নির্মোহতা অথচ তাঁর একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান না বুঝলে তাঁর কাহিনি নিয়ে সিনেমা ফাঁদলেও তা ভালো কিছু হওয়ার আশা নেই। ‘সহজ পাঠের গপ্পো নির্মাণে পরিচালক মানস মুকুল পাল এসব খুব ভালো করেই জানতেন। ভালোভাবে জেনেবুঝেই তিনি এই কঠিন পথটি বেছে নিয়েছেন। দীর্ঘ একটি জার্নি’র ফসল হলো এই সিনেমা। সিনেমার একটা দৃশ্যের কথা না বললেই নয়। ধাবমান ট্রেনের দিকে মা দিক্বিদিক ছুটে চলেছে। পেছন পেছন গোপাল। সে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে মায়ের পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে। গোপাল বড্ড ক্লান্ত। ভীত, অসহায়-করুণ আর্তনাদ করে মাকে চিৎকার করে বলছে…

“ও মা! কোথায় যাচ্ছো মা? ও মা! যেও না মা…!”

ততক্ষণে ট্রেন এসে যায়। গোপাল মায়ের শাড়িটিও খপ করে ধরে ফ্যালে। মাকে কি আদৌ রক্ষা করতে পেরেছে গোপাল…? বছর দশেকের গোপাল যখন এই কঠিন-রূঢ় বাস্তবতাকে নিমিষেই জেনে ফ্যালেছে; ততোদিনে সে কলমিশাক, পুকুরের পাশঘেঁষা কুড়িয়ে পাওয়া তালসহ ফসলি জমির পাশঘেঁষা এটাওটা নানা ধরণের শাক সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে সংসারের হাল ধরতে শিখে যাচ্ছে। তাই মায়ের অগোচরে, লুকিয়ে মায়ের আঁচলে তার জমানো টাকাগুলো গুঁজে রাখছে। নিয়ম করে অন্যের বাড়িতে গিয়ে কামলা দেওয়া শিখে যাচ্ছে। এ আর ঠিক বছর দশেকের গোপাল নেই। এ যেনো এক পরিপূর্ণ গোপাল। রীতিমতো ঘরসংসারি গোপাল! এ আর ঠিক ভোগাকাঙ্খী গোপাল নয়; রীতিমতো ভোগ-বঞ্চিত জীবনযোদ্ধা, এক চির পরিচিত হার না মানা দৃঢ়চেতা, অনমনীয়, অন্য এক গোপাল!

(৫)
‘সহজ পাঠের গপ্পো’ জুড়ে পুরোটাই বর্ষাকাল। একটি বিস্তীর্ণ অজপাড়া গাঁ। যেখানে দিনের আলো মানেই জীবন। দিন মানেই এক ধরণের প্রাণের স্পন্দন। দিনের আলোর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক যে রূপ, তা এই সিনেমার বেশিরভাগ দৃশেই তা লঙ ও ক্লোজআপ শটে ধারণ করা হয়েছে। বাংলায় বিশেষ করে গ্রামে বর্ষার যে স্যাঁতস্যাঁতে রূপ তা সিনেমায় ফটোগ্রাফিকারে অনেকটা সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীকে সামনে নিয়ে এলেও; তা এই সিনেমা তার স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেই ভিন্ন একটা আবহ জারি রেখেছে। ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ সব দিক থেকেই তা আলাদা। ভিন্ন। সত্যজিৎ রায়ের সাথে কেউ হয়তো পুকুরপাড়ের ঢিল ছুঁড়ে মারা, শাপলা ফুল, কাশবন, ফড়িং বা কচুপাতায় বৃষ্টি আগলিয়ে বাড়ি ফেরার নানান ক্লোজআপ শটের মিল খুঁজে নিতে পারে। কিন্তু এসব দৃশ্য এই সিনেমায় একটাও অনুকরণ নয়। বা অপ্রাসঙ্গিকও নয়। এখানে পরিচালক তাঁর মতো করেই তাঁর পূর্বসূরি থেকে ধারণ করেছেন। সিনেমার ফটোগ্রাফি, লঙশটগুলো মাঝেমধ্যে অমনোযোগীও করতে পারে; কিন্তু পরক্ষণেই চোখ ফেরালে মনে হবে, এই যা আরেকটু হলে এটা মিসড করে গিয়েছিলাম! ডায়ালেক্টিক ও ইন্টেলেকচুয়াল ‘মন্তাজ’ সিনেমায় যে আরও সহজ করে তুলে আনা যায়, তা ‘সহজ পাঠের গপ্পো‘তে পুরোপুরি পাওয়া যায়। বাংলা সিনেমা থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ‘মন্তাজ’কে একদম তত্ত্ব-তাত্ত্বিকতায় ভারি না করেও, একদম স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে যে তোলা যায়; তা মানস মুকুল পাল তাঁর ‘সহজ পাঠের গপ্পো’তে যথার্থ সফলভাবেই করতে পেরেছেন।

(৬)
অভিনয়ের ‘অ’ও জানে না, এরকম আনকোরা অজপাড়াগাঁয়ের নয়া দুই ছেলেকে নিয়ে এরকম একটি চ্যালেঞ্জিং সিনেমা বানানো যে কী কঠিন কাজ তা কমবেশি সিনেমা নিয়ে যারা কাজ করে তারা ভালোই জানে। আর একজন নবীন পরিচালকের পক্ষে তা কতোখানি ঝামেলার ও কতোখানি হঠকারী সিদ্ধান্ত হতে পারে, তা এই সিনেমা না দেখলে বোঝা যাবে না।

সহজ পাঠের গপ্পো
গোপাল ও ছোটু’

গোপাল ও ছোটু’র চরিত্রে একদম অজপাড়াগাঁ’র নুর ইসলাম, সামিউল আলমকে খুঁজে নিয়ে তাদেরকে যথাযথ ট্রেনিং দেওয়া, তাদের অঞ্চলের লোকাল ডায়ালেক্টকে সিনেমায় রূপ দেওয়া খুব সহজ ব্যাপার ছিলো না। বিশেষ করে প্রথাগত প্রমিত ভাষারীতির বাইরে এসে; পুরো আলালাভাবে প্রথাগত ছক ভেঙে বশিরহাট অঞ্চলের কথ্যরীতিকে সিনেমায় উপস্থাপন; আর তা সমান ও সাবলীলভাবে সব চরিত্রের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তোলা এ তো রিস্ক বটেই; তা অত্যন্ত সাহসিকতার কাজও বটে। কলকাতার মূল ধারার সিনেমায় এই সিনেমার স্ট্রাকচার, ভাষারীতি, গঠনশৈলী সব মিলিয়ে ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ আরেকটি নয়া সংযোজন। এই সিনেমায় মায়ের চরিত্রে স্নেহা বিশ্বাসকে দেখলে মনেই হয় না এই অভিনেত্রী সিনেমায় নয়া আগন্তুক! নুর ইসলাম, সামিউল আলম এদের দুইজনের যে স্বাভাবিক চলনবলন, তাদের যে গল্প, হাসি-কান্নার যে এই ধারাবাহিক বয়ান তা দেখলে এদেরকে নবীন অভিনেতা বলে মনে হবে না। মনে হবে এরা এর আগে বেশ অভিনয় করেটরে অভ্যস্থ। নাহলে এ অসম্ভব সম্ভব হতো না! আর এই দুই শিশু-কিশোর দু’জনের যে চোখ, চোখের যে ভঙি-চাহনি তা সত্যিই অন্যরকম। অদ্ভুত মায়াকাড়া। এদের চাহনিতেই কেমন যেনো অর্ধেক কথা এরা বলে যায়!

(৭)
“না! আমি আর কোত্থাও যাবো না। কোত্থাও না…!”

ছোটু’র এই কথাটি কানে বাজতে বাজতে কেমন জানি অসহায় লাগে। ঘোর তমসাচ্ছন, অস্থির এই মহামারিক্রান্ত সময়ে এসে বিভূতিভূষণের সময়কাল খুব বেশি মনে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর সময়ে সহিংসতা, যুদ্ধ-মারি, ক্ষুধা-দারিদ্রতা, অভাব-অনটন, ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-জাতপাত, দেশ-মানচিত্র, সাদা-কালো এসব কি আজও খুব বেশি কমেছে?! না কি তা আরও বেড়েছে? না কি নানা রূপে, নানা ভাবে, নানা রঙে, নানা মোড়কে তা আবার বারবার ফিরে ফিরে এসেছে? এসব প্রশ্ন নিয়েই দেখলে দেখবো; এসবের কিছুই আসলে কিছুই কমে নি! বরং তা নানাভাবে বেড়েছে। অন্তত এই মহামারি করোনাক্রান্ত সময়ে এসে তা আরও নগ্নভাবে চোখের সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে! মানুষ-মানবতার অবক্ষয় আগের থেকে এখন এই সময়ে এসে দ্বিগুণ বেড়েছে। অস্থির, হিংস্র-ভয়াল হিসেবেই বর্তমান পৃথিবী এক অনিশ্চিতির দিকে ধাবমান হিসেবেই যাত্রা করে চলেছে!

বহুদিন পর এরকম একটি ভালো সিনেমা দেখলাম। বেশ আনন্দ ও তৃপ্তি পেয়েছি এই ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ দেখে। এরকম সিনেমা বহু বছর হয় দেখি নি। পরিচালক মানস মুকুল পালকে এজন্য ধন্যবাদ নয় তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো উচিৎ যে, এরকম একটি সুন্দর পরিপাটি সিনেমা বানানোর জন্য। জয় হোক বাংলা সিনেমার।

‘সহজ পাঠের গপ্পো’

পরিচালকঃ মানস মুকুল পাল
অভিনয়ঃ নুর ইসলাম, সামিউল আলম, স্নেহা বিশ্বাস প্রমুখ।
প্রযোজকঃ অভিজিৎ সাহা
দৈর্ঘ্যঃ ৮১ মিনিট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

86 − = 80