কাব্যিক স্বাপ্নিক বাছুর

আমার জন্মেরও আগে আমাদের গরু মহিষের বড় বাথান ছিলো। নতুন জেগে ওঠা মানুষ বসতিহীন ঘাসচরে ওসব গরু মহিষ ঘুরে ঘুরে ঘাস খেতো সারাদিন। ওসব চরেই নাকি টংঘর করে রাখালেরা থাকতো গরু মহিষ রক্ষণাবেক্ষণে। দিনে বাড়িতে আসতো চাল ডাল নিত্য দরকারি জিনিসপত্র নিতে। আমরা বড় হয়ে শিক্ষিত শহুরে হওয়ার পরও আমাদের গ্রামের বাড়িতে গরু পালার যে ঐতিহ্য, তা চলমান ছিল। কদিন আগে নদীতে ভেঙে নেওয়ার আগ পর্যন্ত গ্রামের বাড়িতে পাকা “গরু-ঘর” ছিল আমাদের। অনেকদিন আগে আমার বড়ভাই অর্ডার দিয়ে একটা বিশাল মশারী তৈরি করেছিল পুরো গরুঘরকে ঢাকতে, যাতে মশা না কামড়াতে পারে আমাদের দুধেল গাইকে।
:
কিশোর বয়সে স্কুলে পড়ার সময় একটা লাল মেয়ে বাছুর ছিল আমার, এটাকে সারাক্ষণ যত্ন করতাম আমি। মাথার চুলের দিকে একটু কালচে রঙ ছিল। আমি স্কুলে যাওয়ার পথে সেটাও চলতে থাকতো আমার পিছু পিছু। কুকুররা যেমন প্রভুভক্ত হয়, এ গরুর বাছুরটাও তেমনি প্রভু হিসেবে আমাকে ভক্তি করতো খুব। স্কুল শেষে নদীতীর ধরে ফেরার পথে কখনো বাছুরটার জন্যে তাজা ঘাস হাতে করে নিয়ে আসতাম আমি! বিকেলে নিজে যখন বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যেতাম নদীর চরে, বাছুরটাও থাকতো আমার সাথে। একবার বিলেতে বসবাসকারী আমার এক বোন এলো দেশে বেড়াতে। সাথে তার ফুটফুটে চার বছরের কন্যা। কন্যাটি আমার এ বাছুরটির এমনই প্রেমে পড়লো যে, একদিন গরুটির সাথেই সে ঘুমিয়ে পড়লো আমাদের গোয়াল ঘরে। লন্ডন ফেরত যেতে সে কিছুতেই যাবেনা এ বাছুর ফেলে। নানাবিধ ছল-চাতুরী আর মিথ্যে বলে তাকে তুলতে হয়েছিল শহরে যাওয়ার স্পিডবোটে। বোট ছাড়লে সে নদীতীরে দাঁড়ানো বাছুর দেখিয়ে কাঁদতে থাকে অবিরাম! এবং দেখতে দেখতে পরিণত বয়সে একদিন অনেক সুন্দর স্বাস্থ্যবতী হলো বাছুরটি। তার রঙও হলো আরো ঝকঝকে!
:
একদিন গ্রাম্য বাজারের মসজিদের ইমাম সাহেব অভিযোগ তুললেন, গ্রামের জেলে পল্টু বিশ্বাসকে সে দেখেছে, ঘন বৃষ্টির মাঝে আমার বাছুরটির সাথে যেনা করতে। যা পুরোই হারাম। তারপরো আমার গরুটি একজন মুসলমানের মালিকানাধীন মানে গরুটিও মুসলিম কিন্তু যিনাকারী একজন হিন্দু। সুতরাং কাজটি একটা মারাত্মক ধর্মীয় ও সামাজিক অপরাধ! ইমাম সাহেব মসলা-মাসায়েলের বিভিন্ন কিতাব খুলে দেখালেন যে, পশুর সাথে যিনাকারীর শাস্তি কি! এক্ষেত্রে নাকি ষ্পষ্ট সহিহ হাদিস আছে যে, এমন ঘটনা ঘটলে যিনাকারী পুরুষ ও পশুটিকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে। তবে বাংলাদেশের আইনে যেহেতু রজম বা পাথর মেরে মানুষ হত্যার সরকারি বিধান নেই, তাই মালাউন পল্টু বিশ্বাসকে একশ ঘা জুতাপেটা ও গরুর দাম বাবদ ২,০০০/- টাকা গরুর মালিককে পরিশোধ করতে হবে। আর গরুটিকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দিতে হবে। এর মাংস হারাম হয়ে গেছে বিধায়, ঐ মাংস কেউ খেতে পারবে না।
:
বাজারে ও মসজিদে পল্টু বিশ্বাসের এ ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলো। পল্টুকে যে শাস্তিই দিক, তাতে কোন মাথাব্যথা হলোনা আমার। আমার মাথা গরম হলো যখন আমি শুনলাম, আমার বাছুরটিকেও হত্যার রায় দিয়েছেন ইমাম সাহেব। বন্ধুদের নিয়ে ইমাম সাহেবের হুজরাতে গিয়ে নানাবিধ তর্ক জুড়ে দিলাম। কিন্তু তিনি আমার মত “চ্যাংড়া” ছেলেদের কথাকে উড়িয়ে দিলেন আমরা ইসলামের “অ”ও জানিনা বলে। গ্রামের বয়স্ক বুড়ো মুসল্লিরা সব পক্ষ নিলো ইমাম সাহেবের। রাতে তারা সিদ্ধান্ত নিলো – পরদিন শুক্রবার বাজারে কার্যকর করবেন শাস্তি। মানে পল্টু বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে জুতাপেটা ও আমার বাছুরটিকে হত্যা করে তা ফেলে দেয়া হবে নদীতে। বাছুরটার জন্য দারুণ মনখারাপ হলো আমার! কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। গ্রামের মুরব্বিরা যেখানে সবাই একমত ধর্মীয় ব্যাপারে, সেখানে আমার মত ১১-১২ বছরের কিশোর ছেলেদের গ্রুপ কি করতে পারে তাদের বিরুদ্ধে!
:
বর্ষা ঋতু ছিল তখন। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাড়ি ছাড়লাম আমি প্রতিবেশী বাদলদের বাড়ি যাবো বলে। সেখানে সকল কিশোর বন্ধুরা সমবেত হলাম এ বিপদ কাটাতে। নানাবিধ যুক্তিতর্কের পর সিদ্ধান্ত হলো – “এ রাতেই আমাদের গোয়াল ঘর থেকে বাছুৃরটি চুরি করবো আমরা। ভোর হওয়ার আগেই তা ভাসিয়ে দেব নদীর স্রোতে। সাঁতার জানা গরু এটা। ভাসতে ভাসতে এটা কোন চরে বা লোকালয়ে গিয়ে উঠবে। আমার না থাক, অন্তত জীবনটা বাঁচবে ওর। তারপর ভাগ্য ভাল হলে হয়তো একদিন দেখাও পেতে পারি বাছুরটির”! আমার এগারো বন্ধুর সবার পছন্দ হলো এ সিদ্ধান্ত! তাই গভীর রাতে চোরের মত পা টিপে টিপে এগারো জন উপস্থিত হলাম আমাদের ঘোয়াল ঘরে। অন্ধকারের মাছে দেখা যাচ্ছিলনা আমার বাছুর কোনটি। কিন্তু মাথায় হাত দিয়ে পশম ধরে বুঝতে পারলাম আমার হতভাগ্য বাছুরটিকে!
:
বর্ষা ঋতু! খরস্রোতা আমাদের প্রবাহমান মেঘনা। ঢেউ আর প্রবল বেগে প্রবাহিত জলস্রোতের শোঁ শোঁ শব্দ কানে আসছে আমাদের। বর্ষার নবমীর ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ দেখা দিয়েছে পশ্চিম আকাশে। তারই মাঝে এমন মায়াবী বাছুরটাকে ঠেলে দিতে হবে এ প্রবল স্রোতে। জানিনা সেটা ভেসে যায় কোথায়! চোখ ফেটে কান্নায় জড়িয়ে যাচ্ছিল কণ্ঠ আমার! কিন্তু এতো চিন্তা করার সময় নেই আমাদের। নদীর ঘাটে জেলেদের যে কেউ চলে আসতে পারে যে কোন সময়। তাদের নৌকো মাঝে মাঝে দেখতে আসে তারা। কিন্তু নদীতে ঠেলে দেয়ার উদ্যোগ নিতেই বাছুরটা চাটতে থাকলো আমার পিঠ। তার মায়াবি পেলবতা দেখে চোখের জল আটকাতে পারলাম না আমি। বন্ধু বাদলকে বললাম – “আমি পারবো না, তোরা বাছুরটাকে নদীতে ছেড়ে দে”! তাই করলো ওরা। কিন্তু ভেসে যাওয়ার বদলে তীরের দিকে সাঁতরে এলো বাছুরটি। প্রায় উঠে যাচ্ছে দেখে, আমার সকল বন্ধুরা নৌকোয় উঠে ওকে টেনে নিয়ে গেলো অনেকটা দূরে, যেখানে মূল স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। চাঁদের ক্ষীণ আলোতে আমি ভেসে যেতে দেখলাম আমার ভালবাসার স্বপ্নের বাছুরটাকে। আমাদের চোখ থেকে হারিয়ে যেতে সময় লাগলোনা খুব। প্রবল ভাটার টানে ভেসে যেতে থাকলো অনাথ তৃণের মত আমার স্বপ্নময় লাল বাছুর! সকালে পল্টু বিশ্বাসকেও আর খুঁজে পাওয়া গেলনা। জানতে পারলাম, রাতেই পালিয়েছে সে ঢাকার পথে। গ্রামে রটে গেলো, ইমাম সাহেবের কুদরতি জ্ঞানে “হাওয়া” হয়ে গেছে ঐ হারাম গরু। ওটা গ্রামে থাকলে নাকি অনেক বালা-মুছিবত আসতো গাঁয়ে! সবই ইমাম সাহেবের কেরামতি!
:
অনেকদিন পর স্বপ্নে দেখা দিলো আমার বাছুরটি। চরফ্যাশানের অদূরে সাগর মোহনায় “কুমারীর চরে” একাকি ঘাসবনে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার সেই বাছুরটি। বন্ধুদের বললাম – “কাল থেকেতো স্কুল ছুটি। চল কুমারীর চরে যাই, সেখানে হয়তো খুঁজে পাবো আমাদের হারিয়ে যাওয়া গরুটি”। চরতো বেশ দূরে। ভাটির স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে হয়তো সহজেই পৌঁছে যাবো বেলাবেলি। কিন্তু ফেরা কি অতো সহজ? রাতে থাকবো কই আমরা? কিন্তু লাল বাছুরের মায়াবি কান্না ঘরে থাকতে দিলোনা আমাকে। নিজেদের ঘাটে বাঁধা নৌকো খুলে এক কাক ডাকা ভোরে কাউকে না জানিয়ে ভাটিতে পাড়ি দিলাম আমরা। ভাল করে জানিনা দক্ষিণের কুমারীর চর কোথায় আর কতদূরে! তারপরো হারিয়ে যাওয়া সেই গরুকে খুঁজতে অজানা চরের দিকে যাত্রা করলাম আমরা এগারো জনে। নৌকো ছুৃটে ছুটে চলছে অজানা কুমারী দ্বীপের খোঁজে, যেখানে হয়তো ঘাসবনে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার কাব্যিক বাছুর!
 
 
 
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

82 + = 88