ভারত চীন সম্পর্ক ও বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব- চতুর্থ পর্ব

পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে জানা যায় ভারত সরকারের লক্ষ্য হল ভারতকে সুপার পাওয়ারে পরিণত করা কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে চীন সর্বাধিক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে! চীন সর্বদা ভীত থাকে ভারত যদি শক্তিশালী হয় তাহলে এশিয়া তথা বিশ্ব শাসন করার যে স্বপ্ন চীন দেখে তা অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই চীন সর্বদা ভারতকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ‘মাল্লাকা প্রণালীর’ দুর্বলতা হেতু ভারতকে ঘেরার চেষ্টা করে। চীনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল চীনের প্রধান বাণিজ্য ক্ষেত্রগুলি দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত যা চীনের একার নিয়ন্ত্রণে নেই! তাই চীন শত চেষ্টা করে ও এই অঞ্চল নিজেদের অধিকারে আনতে পারেনি। অন্যদিকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, যা তাঁর উন্নয়নে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে!

বিশেষজ্ঞদের মতে কোন দেশ তত বেশি এগিয়ে যেতে পারে যত বেশি তাঁর সমুদ্রসীমা রয়েছে। পৃথিবীর সর্বাধিক বাণিজ্য জলপথের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়, এছাড়া সমুদ্রের মৎস সম্পদ, খনিজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ একটি দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ভারতের বৃহৎ উপকূলীয় অঞ্চল বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের দ্বারা পরিবেষ্টিত যা ভারতের উন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিশেষত পৃথিবীর একমাত্র মাহাসাগর যা কোন একটি দেশের নামে পরিচিত তা হল ‘ভারত মহাসাগর’।বিশেষজ্ঞদের মতে ভারত মহাসাগর প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চল এই অঞ্চলের সম্পদের অনেক কিছুই এখনও ব্যবহৃত হয়নি। তাই ভারত যেহেতু ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতি তাই ভারতের উন্নয়নে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে! সেই লক্ষ্য হেতু ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারত নিজের প্রভাব বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

ভৌগলিক দিক থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার থেকে খুব বেশি দূরে নয় যা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রায় মধ্যে অবস্থিত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব প্রচুর। ভারত এই অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার কারণে চীন এটা ভালো চোখে দেখে না! চীন সর্বদা মনে করে ভারতের সমৃদ্ধি রুখতে গেলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের প্রভাব হ্রাস করতে হবে। তাই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতকে রুখতে চীন একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছ। চীনের যুক্তি হল ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ভারতের প্রভাবাধীন হলে ও ভারত মহাসাগর শুধু ভারতের একার নয়। তাই চীনের লক্ষ্য হল যেমন করেই হোক ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ দখল করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করা।

সেই লক্ষ্যে চীন যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তাকে বলা হয় ‘String of pearls বা মুক্তোর মালা’ নীতি। যদিও চীন এই পরিকল্পনার বিষয়ে কোন দিন প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে চীন গোপনে বহু বছর ধরে এই নীতিতে কাজ করে চলেছে। এই নীতি অনুসারে চীন ভারতের চারিদিকে বিভিন্ন প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলিতে পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে ব্যাপক ঋণ প্রদান করে সে দেশগুলিকে চীনের অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত করে এবং যখন এই দেশগুলি চীনের অর্থ প্রদানে ব্যর্থ হয় তখন সেদেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলি দখল করবে। এইসব অঞ্চলে সামরিক নৌ বন্দর গড়ে তুলে ভারতকে চারিদিকে ঘিরে ধরবে! এই লক্ষ্যে চীন কম্বোডিয়া, মায়ানমারের কোকো দ্বীপ ও সিট্টইউ বন্দর, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, শ্রীলঙ্কার হাম্বারটোটা, মালদ্বীপের মারাও, পাকিস্তানের গওদর, কেনিয়ার মোম্মাসা ও লুমা, সুদান বন্দর, সোমালিয়ার জিবুতি বন্দর ইত্যাদি দখল করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। চীনের লক্ষ্য হল ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য কায়েম করা এবং এভাবে নতুন উপনিবেশ গড়ে তোলা।

বলাইবাহুল্য চীনের ফাঁদে পা দিয়ে বহু দেশই নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতে বসেছে যার উৎকৃষ্ট নিদর্শন শ্রীলঙ্কার হাম্বারটোটা বন্দরের ক্ষেত্রে দেখা যায়। শ্রীলঙ্কা চীনের কাছ থেকে পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে উচ্চহারে ঋণ নিয়ে, ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা হেতু হাম্বারটোটা বন্দর চীনকে নিরানব্বই বছরের জন্য লিজে দিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে শ্রীলঙ্কা সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে ভারতকে গুরুত্ব না দিয়ে চীনের সঙ্গে এই রকম পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্প করা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য ঠিক হয়নি, তাই শ্রীলঙ্কা সরকার তাঁর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে India first policy শুরু করেছে। এই নীতি অনুসারে শ্রীলঙ্কা সরকার আর এমন কোন কাজ করবে না যা ভারতের স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর এবং চীনের সঙ্গে সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখবে। সেইসঙ্গে শ্রীলঙ্কা সরকার ভারত সরকারের সঙ্গে এই মর্মে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী যাতে আগামী দিনে শ্রীলঙ্কায় ভারত পরিকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করে এবং ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে হাম্বারটোটা বন্দরকে চীনের কাছ থেকে দখল মুক্ত করে। উল্লেখ্য ভারত সরকার এই বিষয়ে শ্রীলঙ্কাকে পূর্ণ সহযোগিতা করার আশ্বাস প্রদান করেছে এবং আগামী দিনে শ্রীলঙ্কার উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে সেটা নিশ্চিত করেছে।

□ তাহলে প্রশ্ন হল শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, মালদ্বীপ প্রভৃতি দেশে ভারত বিরোধী মনোভাব ও চীন প্রীতি দেখা যায় কেন?

পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ভারত বিদ্বেষী মনোভাবের প্রধান কারণ হল ধর্মীয় বিদ্বেষ। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের এক বৃহৎ সংখ্যক মানুষ ভারতকে হিন্দুদের দেশ মনে করে। আসলে 1947 সালের 14-15 ই আগস্ট ধর্মের ভিত্তিতে যে দেশ ভাগ হয়েছিল সেই ঘৃণা থেকে এখনও অনেকেই বের হতে পারেন নি। যদিও বাস্তব এটাই ভারত এক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ এবং ভারতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি মুসলমান, অনেক বেশি স্বাধীনতায় বসবাস করে। তবে যে দেশের ভিত্তিই ধর্ম, ঘৃণা ও বিদ্বেষ থেকে সৃষ্টি হয়েছে তাঁরা ভারত বিদ্বেষী হবে এটা আশ্চর্যের কোন বিষয় নয়! তবে দুঃখজনক বিষয় হল, যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের অত্যাচার থেকে ভারতের সহযোগিতায় মুক্ত হয়েছিল সে বাংলাদেশের একটা বড় অংশের মানুষ আজ ভারত বিদ্বেষী! আসলে এ থেকেই প্রমাণিত হয় দ্বিজাতি তত্ত্বের বিষ এখনও বাংলাদেশের সমাজে কতটা ছড়িয়ে রয়েছে!

তবে এই সমস্ত দেশে ভারত বিদ্বেষ ও চীনা প্রীতির অপর কারণ হল চীন বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে নিজেদের পক্ষে ও ভারত ও অন্যান্য পশ্চিমা বিশ্বের ভাবমূর্তি খারাপ করার জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। পৃথিবীর বড় বড় সংবাদ মাধ্যম ও বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মচারীদের অর্থের মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে। যার নিদর্শন হিসাবে আমরা দেখতে পাই শ্রীলঙ্কার হাম্বারটোটা বন্দর। এই বন্দর চীন সরকার ব্যাপক ঘুস দিয়ে সেদেশের সরকারের কাছ থেকে হাসিল করে, যার ফল স্বরূপ আমরা দেখতে পাই শ্রীলঙ্কা নিজের দেশের অঞ্চল চীনের কাছে বন্ধক দিতে বাধ্য হয়! প্রকৃতপক্ষে এটাই দুঃভাগ্যজনক যে এসব দেশের বেশ কিছু দুর্নীতি পরায়ণ রাজনীতিবিদ দেশের স্বার্থের পরিবর্তে ব্যাক্তিগত স্বার্থের কথা বেশি চিন্তা করে যাঁর ফল এই দেশগুলির জনগণকে ভোগ করতে হয়।

বর্তমানে আমরা কেপি শর্মা ওলির নেপাল সরকারের ক্ষেত্রে এর উৎকৃষ্ট নিদর্শন দেখতে পাই। বিশেষজ্ঞদের মতে ওলি নিজের দুর্নীতি ঢাকার জন্য চীনের অনুগত নীতি গ্রহণ করেছে এবং এর ফলে নেপাল ও ভারতের মধ্যে যে ‘রোটি বেটি সম্পর্ক’ রয়েছে তা বিঘ্নিত হচ্ছে, বলা অসঙ্গত হবে না যে এরফলে নেপালের জনসাধারণ এক বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হবে। একদিকে ওলি চীনের কথায় ভারত বিদ্বেষী জিগির তুলছে অন্যদিকে চীন ধীরে ধীরে নেপালের বেশ কিছু অংশ দখল করে চলেছে, অবশ্য সেদিকে ওলির বিশেষ নজর নেই। Five finger policy অনুযায়ী চীনের বহু দিনের স্বপ্ন নেপাল দখল করার। ওলি যদি একই রকম কর্মসূচি বজায় রাখে তাহলে নেপাল অচিরেই চীনের অধীনে আসতে বাধ্য এবং ‘দ্বিতীয় তিব্বত’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারে! তবে বিশেষজ্ঞদের মতে নেপাল বর্তমানে চীনের অধীনে এক অনুগত রাজ্যে পরিণত হয়েছে। চরম দুর্নীতি পরায়ণ ও ভারত বিদ্বেষী ওলি সরকার এই বিপদ সম্পর্কে দেখেও না দেখার ভান করছে। যে দেশের রাজনীতিবিদরা দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যাক্তিগত স্বার্থের কথা বেশি চিন্তা করে, সেদেশের ভাগ্যে দুর্দশা নেমে আসে, তাই আগামী দিনে নেপালের কি হবে সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন?

এবার আসা যাক পাকিস্তানের কথায়। পাকিস্তান ভারত ও আমেরিকার বিরোধীতায় অন্ধ হয়ে চীনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পাকিস্তানে বলা হয় ‘হিমালয় সে উঁচি পাক চীন দোস্তি জিন্দাবাদ’! এখন প্রশ্ন হল এই পাক চীন বন্ধুত্বের ফলে উভয় দেশের মধ্যে কি প্রভাব পড়ছে? পাকিস্তান তাঁর পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে চীনের সঙ্গে CPEC পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। 2015 সালের এই চুক্তি অনুসারে চীন পাকিস্তানে $46 বিলিয়ন ডলার পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে খরচ করবে। বর্তমানে এই ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে $62 বিলিয়ন ডলার, কিছু কিছু রিপোর্টে এটাও প্রকাশিত হয়েছে যে এই ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে 2024-2025 অর্থবর্ষে $85.8 বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হবে। আসলে চীনের প্রদত্ত অতি উচ্চ হারে চক্রবৃদ্ধি সুদের কারণে ঋণের পরিমাণ ক্রমবর্ধমান। এই পরিকল্পনার প্রধান সমস্যা হল পাকিস্তান সরকার পরিস্কার করে জানায়নি কত টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং কত টাকা ঋণ হিসাবে নেওয়া হয়েছে এবং এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য কি?

অন্যদিকে চীন তাঁর নীতি অনুযায়ী পৃথিবীর অন্য দেশের মতোই পাকিস্তানকে ও পরিস্কার জানায়নি এই পরিকল্পনা অনুসারে মোট খরচ কত এবং কত টাকা ঋণ হিসাবে পাকিস্তানকে দেওয়া হচ্ছে এবং সুদের হার কি সেটাও পরিষ্কার নয়! এর ফলে পাকিস্তান ধীরে ধীরে চীনের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে। পাকিস্তানের মোট অর্থনীতি যেখানে $286 বিলিয়ন ডলার সেখানে পাকিস্তান এই ঋণ শোধ করবে কিভাবে? তাই বিশেষজ্ঞদের মতে পাকিস্তান আগামী দিনে চীনের উপনিবেশে পরিণত হতে চলেছে। এর নিদর্শন স্বরূপ আমরা দেখতে পাই বেলুচিস্তানের গওদর বন্দর এরই মধ্যে চীনের অধীনে চলে গেছে এবং বেলুচিস্তানের একটি বিরাট অংশে চীনা কলোনি গড়ে উঠছে। তাই বেলুচিস্তানবাসীরা মনে করছে পাকিস্তান চীনের কাছে বেলুচিস্তানকে বন্ধক রেখে দিয়েছে।

তাই তাঁরা ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ নামে এক সেনাবাহিনী গঠন করে পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্তির জন্য লড়াই করছে। অন্যদিকে একই রকম সমস্যা POK তে দেখা যাচ্ছে তাঁরা ও পাকিস্তানের থেকে মুক্তির জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সিন্ধ ও খাইবার পাখতুন খোওয়া প্রদেশে ও একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে পাকিস্তান বলতে পাক পাঞ্জাবকেই বোঝানো হয়। তাই পাকিস্তানের আগামী দিনে কি হবে সেটাই বড় প্রশ্ন। দেশটির আদেও অস্তিত্ব থাকবে, নাকি দেশটি চীনের অধীনতা গ্রহণ করবে সেটা ও বড় প্রশ্ন! চীনের ঋণের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে পাকিস্তানের মোট ঋণের পরিমাণ $256 বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ $286 বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মধ্যে $256 ডলার ঋণ। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির 90% ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। তাই পাকিস্তান যে কোন দিন দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার পতন ঘটতে পারে। এমতাবস্থায় পাকিস্তান কিভাবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে এবং ঘুরে দাঁড়াবে সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন?

এবার আসি বাংলাদেশের কথায়। ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক বরাবরই মধুর। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে সেদেশের একশ্রেণীর ধর্মান্ধ গোষ্ঠী চাই না ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মধুর হোক। তাঁরা চাই ভারতের পরিবর্তে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মজবুত হোক সেই উদ্দেশ্যে তাঁরা বরাবরই বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিতে থাকে। এরই ফলস্বরূপ দেখা যায় বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কিছুটা ভারত বৈরিতা মনোভাব গ্রহণ করছে এবং চীনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করছে। এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী মনে করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করলেই মনে হয় বাংলাদেশের চরম উন্নতি সম্পন্ন হবে।

বলাইবাহুল্য চীন বরাবরের মতোই পরিকাঠামো উন্নয়ন, পুঁজির বিনিয়োগ ইত্যাদির নামে বাংলাদেশকে ঋণের ফাঁদে ফেলতে চাই। তবে এবার দেখার বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশীয়া ইত্যাদি দেশের থেকে কতটা শিক্ষা নেয়? এটা সত্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কিছু বিবাদিত বিষয় রয়েছে যেগুলি উভয় দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে যেমন- তিস্তা চুক্তি। এই চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সক্রিয় বিরোধীতার কারণে সম্পন্ন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র সরকার, রাজ্য সরকারের পরামর্শকে গুরুত্ব দেয় যার ফলে ভারত সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছা সত্ত্বেও দুই বার এই চুক্তি সম্পন্ন হয়নি।

তবে তার মানে এই নয় ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক মজবুত নয় বরং ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে সদা আগ্রহী। এছাড়া ও অন্যান্য বহু সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে। উল্লেখ্য আলোচনার মাধ্যমেই বহু বিতর্কিত ছিটমহল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যার ফলস্বরূপ বাংলাদেশে অধিক জমি যায় এবং এরফলে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ অধিক লাভবান হয়। এই ছিটমহল চুক্তি উভয় দেশের মধুর সম্পর্কের নিদর্শন। তবে চীনপন্থী, পাকিপ্রেমি ও ভারত বিদ্বেষী গোষ্ঠী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে চাই এখন দেখার বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়গুলি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে? কোন দেশ অন্য দেশের সঙ্গে কিরূপ বৈদেশিক সম্পর্ক রাখবে এটা সম্পূর্ণ সেদেশের ব্যাক্তিগত বিষয় তবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জনগণ ও তাঁদের রাজনীতিবিদদের ঠিক করতে হবে তাঁরা বাংলাদেশ চীন সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখবে না পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো চীনের উপনিবেশে পরিণত হবে?

বস্তুত চীনের কাজ হল অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা ও ভারত বিদ্বেষী মনোভাবের বিকাশ ঘটানো ও চীনপন্থী মনোভাব বৃদ্ধি করা। এরই ফলস্বরূপ ভারতের চারিদিকে ভারত বিদ্বেষী মনোভাবের রাষ্ট্র দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হল ভারত সরকার এই সমস্যা গুলিকে কিভাবে দেখছে এবং এই সমস্যা সমাধানে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে?

ভারত সরকার চীনের এই কৌশল সম্পর্কে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখে। ভারত সরকার চীনের এই নীতির বিরুদ্ধে হাতের উপর হাত রেখে বসে রয়েছে এমন মনে করার কোন কারণ নেই। ভারত সরকার চীনের ‘String of pearls’ এর বিপরীতে ‘String of flowers’ ও ‘Necklace of Diamond’ নীতি তৈরি করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে এটি একই পরিকল্পনা, আবার অনেকেই মনে করে এটি ভিন্ন পরিকল্পনা। যাইহোক ভারত সরকার ও চীনের মতো কখনও এই নীতি প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। তবে চীনের ‘String of pearls’ নীতি রুখতে ভারত সরকার ও গোপনে কাজ করে চলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে ‘String of flowers’ নীতির মূল উদ্দেশ্য হল ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্য হ্রাস করা ও ভারতের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা। এই লক্ষ্যে ভারত সেল, মালদ্বীপ, মাদাগাস্কার, অ্যাসাম্পসন দ্বীপ, মেইরুট, মরিশাস প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে ব্যাপক অংশ গ্রহণ করছে এবং এই দেশগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন ও বন্দর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারত সরকারের লক্ষ্য হল এই দেশগুলির বন্দর থেকে সহজে বাণিজ্যের সুবিধা পাওয়া এবং প্রয়োজনে চীনের মত পরাশক্তিকে হারাতে সামরিক কর্মকান্ডে যেন এই বন্দরগুলি ব্যবহার করা যায় তা সুচিন্তিত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে ভারত সরকার চীনের ‘String of pearls’ নীতির বিপরীতে চীনকে ঘিরে ধরতে ‘Necklace of Diamond’ নীতিতে কাজ করে চলেছে। এই নীতি অনুসারে ভারত সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি, ইন্দোনেশিয়ার সাবাং, ইরানের চাবাহার বন্দর, ওমানের ডুকাম, অ্যাসাম্পসন আইল্যান্ড ও সেইসেল দ্বীপ উন্নয়ন, মাঙ্গোলিয়ায় বন্দর নির্মাণ, ভিয়েতনাম, জাপানে বন্দর নির্মাণ ও সামরিক চুক্তির মাধ্যমে চীনকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলার নীতিতে কাজ করছে। ভারত সরকারের এই পদক্ষেপে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের একক আধিপত্যের স্বপ্ন সফল হয়নি বরং বলা যায় চীন যেখানেই বন্দর নির্মাণ করেছে ভারত ও তাঁর কাছাকাছি নিজের বন্দর নির্মাণ করে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় চীন ভারতকে ঘিরে ধরতে পাকিস্তানের গওদর বন্দর উন্নয়নের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

আসলে 1971 সালের ভারত পাক যুদ্ধের সময় 1971 সালের 4 ঠা ডিসেম্বর ভারতীয় নৌ বাহিনী ‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট’ শুরু করে। এই অপারেশনে আইএনএস নিপাত, আইএনএস বীর, আইএনএস নিরঘাট ইত্যাদি যুদ্ধ জাহাজ করাচি বন্দর ধ্বংস করে দেয়! ভারতের আক্রমণে করাচি বন্দর ছয় দিন ধরে জ্বলতে থাকে এছাড়া পাকিস্তানের সাবমেরিন ‘পিএনএস গাজি’ ভারতের ‘আইএনএস বিক্রান্তকে’ ধ্বংস করতে আরব সাগরীয় অঞ্চল হতে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে কিন্তু গাজি কোন জেহাদ শুরু করার আগেই ‘আইএনএস রাজপুত’ গাজিকে ‘বিশাখাপত্তনমের’ কাছে বঙ্গোপসাগরের জলে সলিল সমাধি ঘটায়!

যদিও পাকিস্তান এটা মানতে অস্বীকার করে, পাকিস্তান না মানলেও সত্যের কোন পরিবর্তন হবে না! ভারতীয় নৌ বাহিনীর এরূপ আক্রমণের ফলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও সাপ্লাই লাইন ভেঙ্গে যায়। যার ফলে ভারত খুব সহজেই 1971 সালের যুদ্ধে জিতে যায় এবং পৃথিবীতে ‘বাংলাদেশ’ নামে এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়! ‘অপারেশন ট্রাইডেন্টের’ কথা মাথায় রেখে ভারত প্রতি বছর 4 ঠা ডিসেম্বর ‘Indian Navy Day’ পালন করে। পাকিস্তান সর্বদা ভীত থাকে যদি আবার কখনও ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ হয় তাহলে পাকিস্তানের একমাত্র বন্দর ‘করাচি’ আবার ভারতের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে তাই তাঁরা বিকল্প বন্দর তৈরীর চেষ্টা করছে। তাই পাকিস্তান তাঁদের বন্দর ভারতীয় নৌ বাহিনী থেকে দূরে রাখতে করাচি থেকে 460 কিমি দূরে গওদর বন্দর তৈরী করছে। অন্যদিকে চীন ‘মালাক্কা ডিলিমা’ কাটিয়ে উঠতে CPEC পরিকল্পনার মাধ্যমে গওদর বন্দর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীনের ইচ্ছা এই বন্দর তেল সমৃদ্ধ ‘হরমুজ প্রণালীর’ খুব কাছে অবস্থিত হওয়ার কারণে চীন ‘গওদর বন্দর’ দিয়ে খুব সহজেই মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য করতে পারবে এবং এখানে মিলিটারি বেস তৈরী করে ভারতকে আরব সাগরীয় অঞ্চলে ঘিরে ধরবে!

তবে ভারত ও চুপ করে বসে নেই তারা গওদরের মাত্র 72 কিমি দূরে ইরানের ‘চাবাহার বন্দর’ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এরফলে ভারত হরমুজ প্রণালীর একদম উপরে অবস্থিত। তাই চীন ও পাকিস্তানের ভারতকে নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। ভারত ‘চাবাহার বন্দর’ থেকে গওদর বন্দরের উপর নজর রাখতে পারবে এবং প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। ভারত চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে রেল ও সড়কপথে বন্ধুরাষ্ট্র আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে এবং এখান থেকে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপ পর্যন্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে যা ভারতের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করবে। উল্লেখ্য ভারতের এই স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভান্টেজ চীনকে চাপে রেখেছে। তাই চীন চাই ভারতকে চাবাহার বন্দর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় চীন এই সুযোগে ইরানের সঙ্গে $400 বিলিয়ন ডলারের গোপন চুক্তি করেছে এর লক্ষ্য হল চীন অর্থনৈতিক দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে ওঠা ইরানকে অর্থ দেবে এবং এর ফলে আগামী 25 বছর ইরান চীনকে স্বল্প মূল্যে তেল রপ্তানি করবে। সেইসঙ্গে ভারতকে চাবাহার পরিকল্পনা থেকে বাইরে করার জন্য চীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত ও বসে নেই ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে ভারত চাবাহার বন্দর উন্নয়নে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বজায় রেখেছে।

তবে এটা সত্য ইরানকে বিশ্বাস করা কঠিন কারণ একদিকে মোল্লাতন্ত্র এবং অন্যদিকে মার্কিন বিধিনিষেধের কারণে ইরান আরও চীনের কাছাকাছি আসবে এটাই স্বাভাবিক। তাই ভারতের প্রয়োজন চাবাহারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্য কোথাও বন্দর নির্মাণ করা। প্রকৃতপক্ষে ভারত সরকার ঠিক এই কাজটিই করে চলেছে। এই লক্ষ্যে ভারত ওমানে বন্দর স্থাপন করছে যাতে ইরানের সঙ্গে সমস্যা হলেও যেন খুব সহজেই গওদরে পাকিস্তান ও চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এছাড়া ও ভারত মধ্য এশিয়ার অপর দুই শক্তিশালী দেশ সৌদি আরব ও UAE এর সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করছে। ভারত সরকারের লক্ষ্য হল আগামী দিনে ইউএইতে বন্দর নির্মাণের মাধ্যমে আরব সাগরীয় অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখা।

এছাড়া ভারত মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে চীনা প্রভাব নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে। কিছুদিন আগে মালদ্বীপকে ভারত সরকার সেদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য $500 মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদান করেছে এর ফলে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত হবে। মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা উভয় দেশ ঘোষণা করে তাঁরা এমন কিছু কাজ করবে না যাতে ভারতের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়। এই ঘটনাগুলি ভারতের কূটনীতি ও সামরিক নীতির জয় হিসাবেই বিবেচিত হবে। এছাড়া ভারত আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের সুরক্ষা বজায় রাখতে প্রধান বন্দর গুলি ছাড়া, লাক্ষাদ্বীপ ও আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে দ্রুত সামরিক বন্দর গড়ে তুলছে এরফলে সামুদ্রিক অঞ্চলে ভারতের শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকবে!

ভারত চীনের বিস্তারবাদী নীতির বিরুদ্ধে project mausum নীতি শুরু করেছে এর উদ্দেশ্যে হল প্রতিবেশি দেশগুলির সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। আশিয়ান দেশগুলির সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করে তোলার উদ্দেশ্যে India’s Act East policy শুরু করেছে। এরফলে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য বিস্তারের নীতি ধাক্কা খাবে এবং ভারতের সহযোগিতায় ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স ইত্যাদি দেশ চীনের বিরুদ্ধে শক্তভাবে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে সফল হয়েছে। আগামী দিনে ভারত তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। হংকং প্রশ্নে বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ চীনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করছে অর্থাৎ সমস্ত দিক থেকেই চীন ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে!

এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও চীনের বিস্তারবাদী নীতি থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত একত্রে Quadrilateral grouping শুরু করেছে। এরফলে একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যে সম্পর্ক মজবুত হবে তেমনি চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজ সম্পন্ন হবে। এরই মধ্যে আমেরিকা ঘোষণা করেছে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বিমান বাহিনীকে আরও উচ্চ প্রযুক্তির বিমান ও বিমান প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের শক্তিশালী করা হবে। উক্ত দেশগুলি নিজেদের মধ্যে স্থল সেনা, নৌবহর ও বিমান মহড়া হবে এর ফলে উক্তদেশ গুলির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ভারত ও অস্ট্রেলিয়া পরস্পর একটি সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে এরফলে ভারত প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ার কোকোস নৌবন্দর ব্যবহার করতে পারবে অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ভারতের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ব্যবহার করতে পারবে, বলা অসঙ্গত হবে না এই চুক্তির ফলে চীন বেশ কিছুটা চাপে থাকবে। চীনের বিস্তারবাদী নীতির প্রতি বিশ্ব এখন সচেতন তাই ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ন্যাটো দেশগুলি চীনা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একত্রিত হচ্ছে বলাইবাহুল্য এগুলি চীনের পক্ষে সুখকর অনুভূতি নয়।

ভারত ও আমেরিকার কূটনীতির ফলে চীন ধীরে ধীরে বন্ধু শূন্য রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। একদিকে ভারতের সঙ্গে যখন পৃথিবীর উন্নততর গণতান্ত্রিক দেশগুলি সম্পর্ক মজবুত করছে তখন অন্যদিকে চীন ধীরে ধীরে বিশ্বের ঘৃণিত রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে! বর্তমানে চীনের বন্ধু রাষ্ট্র বলতে পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও তুরস্কের মতো দুর্বল কিছু অর্থনীতির দেশ রয়ে গেছে এর ফলে চীন ধীরে ধীরে বিশ্ববাজারে এক ঘরে হয়ে যাচ্ছে। যা তাঁর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর! বস্তুত এইসমস্ত কারণে চীনের সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী ও কমিউনিস্ট পার্টির একাংশ শি জিন পিং এর নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ সংগঠিত করছে কিন্তু ‘আধুনিক যুগের হিটলার’ শি জিন পিং সমস্ত বিদ্রোহকে শক্ত হাতে দমন করছে!

বিশেষজ্ঞদের মতে শি জিন পিং করোনা সংক্রান্ত ব্যার্থতা, অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া ও তাঁর বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করতে ও বিশ্বের নজর করোনা থেকে ঘোরাতে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ও বিস্তারবাদের নীতি গ্রহণ করেছে। চীনের এরূপ কর্মকান্ডের ফলে পৃথিবী কার্যত দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে একদিকে ভারত, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির জোট। অন্যদিকে চীন, পাকিস্তান, উওর কোরিয়া, ইরান, তুর্কী, মালয়েশিয়া ইত্যাদি অগণতান্ত্রিক স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলি এক শিবিরে একত্রিত হচ্ছে। অনেকেই একে নতুন ধরণের ‘Axis of Evil’ নামে ও সম্বোধন করছে! বিশ্ব কার্যত আজ বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে চলে যাচ্ছে তাই গোটা পৃথিবীতে আজ সাজো সাজো রব দেখা যাচ্ছে! যুদ্ধ কখনও মানুষের মঙ্গল সাধন করতে পারে না কিন্তু চীনের এই উগ্র সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের জন্য বিশ্ব আজ এক বিশ্বযুদ্ধের মোহনায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাই আগামী দিনে কি হবে তা বলা শক্ত! তাই এখন থেকেই বিশ্বকে এই চীনা ড্রাগন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে ও একে শক্তহাতে প্রতিরোধ করতে হবে! তা না হলে বিশ্বকে এর চরম মূল্য দিতে হবে!

চলবে…

তথ্যসূত্র:-

1. উইকিপিডিয়া।

https://en.m.wikipedia.org/wiki/String_of_Pearls_(Indian_Ocean)

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Economy_of_Pakistan

https://en.m.wikipedia.org/wiki/National_debt_of_Pakistan

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Operation_Trident_(1971)
https://en.m.wikipedia.org/wiki/PNS_Ghazi

2. Global watch analysis.

https://global-watch-analysis.com/pakistan-comment-faire-face-aux-investissements-predateurs-du-corridor-economique-chinois/?lang=en

https://global-watch-analysis.com/nepal-le-nouvel-etat-satellite-de-chine/?lang=en

3. The true picture.

India’s Necklace of Diamonds – Garlanding China

4. India Today.

https://www.indiatoday.in/magazine/special-report/story/20150406-indian-ocean-narendra-modi-significant-toeholds-817904-2015-03-27

5. The news.

https://www.google.co.in/amp/s/www.thenews.com.pk/amp/704791-cpec-where-do-we-stand?espv=1

6. India times.

https://www.google.co.in/amp/s/www.indiatimes.com/amp/news/india/here-is-all-you-should-know-about-string-of-pearls-china-s-policy-to-encircle-india-324315.html?espv=1

7. Swarajyamag.

https://www.google.co.in/amp/s/swarajyamag.com/amp/story/defence%252Fhere-is-how-india-is-making-smart-and-silent-moves-to-counter-chinas-string-of-pearls-strategy?espv=1

8. Fortune India.

https://www.google.co.in/amp/s/www.fortuneindia.com/amp/story/opinion%252Fis-indias-necklace-of-diamonds-complete%252F102665?espv=1

9. Times of India.

https://www.google.co.in/amp/s/m.timesofindia.com/world/south-asia/will-have-india-first-policy-china-port-deal-a-mistake-lanka/amp_articleshow/77754433.cms?espv=1

https://www.google.co.in/amp/s/m.timesofindia.com/india/india-to-build-largest-infra-project-worth-500m-in-maldives/amp_articleshow/77535503.cms?espv=1

https://m.timesofindia.com/india/iran-dismisses-report-of-dropping-india-from-chabahar-railway-project/articleshow/76991582.cms

10. Global times.

https://www.globaltimes.cn/content/1198627.shtml

https://www.globaltimes.cn/content/1199069.shtml

https://www.globaltimes.cn/content/1197027.shtml

11. Dawn.

https://www.dawn.com/news/1424401/imf-and-cpec-debts

12. Hit brother.

https://www.hitbrother.com/chinese-military-bases-in-the-indian-ocean-region-ior/amp/

13. Indian Express.

https://www.google.co.in/amp/s/indianexpress.com/article/opinion/editorials/iran-china-deal-american-sanctions-6513772/lite/?espv=1

14. Eurasian Times.

India, Australia Could Sign Pact For A Military Base In Andaman’s and Cocos Islands – Experts

15. বাংলাদেশ প্রতিদিন।

https://www.bd-pratidin.com/first-page/2020/08/29/561279

https://www.bd-pratidin.com/open-air-theater/2020/08/29/561526

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 48 = 52