পর্ণমোচী : মগজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিন্তার উদ্রেক

পর্ণমোচী সিনেমার একটি দৃশ্য

পর্ণ এবং সেক্স এডুকেশন – গুলিয়ে ‘গ’ হয়ে যায় কারণ সুতোর গোঁড়া একই ; যৌনতার প্রতি প্রবলাগ্রহ।

বয়ঃসন্ধিকাল – প্রত্যেককেই এ সময়টা পাড় করতে হয়। কিন্তু আমাদের মত মধ্যবিত্ত মানসিকতার দেশে, যারা কেবল সার্টিফিকেট লাভের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুথিবিদ্যায় আবদ্ধ করে রেখেছেন, সেখানে এ সময়টাকে থোড়াই পরোয়া করা হয়। কিংবা সম্মান জলে ভেসে গেলো ভেবে চোখ ঢেকে কানে তুলো গুজে দেয়া হয় যৌন শিক্ষা নিয়ে আলাপ করার অবতারনা হলে। অথবা বাঙলাদেশ বা এরম ইসলামিস্ট রাষ্ট্রগুলোতে তো এ বিষয়কে পাপ বলেই গন্য করা হয়। অথচ বয়ঃসন্ধিকালে শিশুর ভবিষ্যৎ মানসিকতার গঠন হয় – ভুল পথে চলবে নাকি সঠিক পথে।

সেক্সুয়ালি পৈশাচিক মানসিকতার জন্মই হয় কেবল যৌন শিক্ষা নিয়ে নাক ছিঁটকানো এবং ধর্মীয় অনুশাসনে পাপ কর্ম হিসেবে দেখার ফলে। অথচ কিশোর বয়সেই যৌনতা সম্পর্কে অবগত থাকলে যৌনতার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত কৌতুহল জন্মানোর কোনো কারণই ঘটে না৷

এই যে আমাদের উপমহাদেশে এত এত ধর্ষণ, তার মূলেই রয়েছে যৌনতা সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা পাড়ার তমুক দাদার কাছ থেকে ভুল শিক্ষা নেয়া৷ এক্ষেত্রে পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হয় প্রথম৷ যাতে ভুল লোকের হাতে পড়ে সন্তানের মগজ বিগড়ে না যায়। আর দ্বিতীয় ভাগে এগিয়ে আসতে হয় শিক্ষকদের। যারা একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যৌন শিক্ষা দিবে৷ তবে আমাদের ক্ষেত্রে তা উল্টো হয় সামাজিকতা, ধর্মীয় অনুশাসনের মত কুশিক্ষার ফলে। আমরা দাম্ভিকতা নিয়ে বলি ‘দাদা, এটা ভারতবর্ষ- বিদেশ নয়’। বিদেশে মানুষ থাকে, ভারতবর্ষে বাস করে এলিয়েন! এদের যৌন শিক্ষার প্রয়োজন নেই!

আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা – এসব ভারতবর্ষে বেমানান, বিদেশী সংস্কৃতির অপচেষ্টা দেশীয় সংস্কৃতির গাঁঢ় মারার জন্য। অথচ মূর্খরা রোজ রাস্তায় নারীর দিকে কুতকুতিয়ে তাকিয়ে ভোগ করছে, সুযোগ বুঝে পশ্চাৎদেশ হাতাচ্ছে আরো পেলে কাপড় খুলে…

সুতরাং শিক্ষা কেবল শিক্ষা। আধুনিকায়ন, উত্তরাধুনিকায়ন, বিদেশী-দেশী সংস্কৃতি এসব নিয়ে চটকদারি করতে গিয়ে প্রজন্মের ওর প্রজন্ম পার্ভাট জাতি জন্ম দিয়ে ভারতবর্ষ নরক হয়ে গেছে।
তাই যৌন শিক্ষা আর দশ রকম শিক্ষার মতই স্বাভাবিক। বড়দের গায়ে পা লাগলে সালাম/প্রণাম করতে হয় যেমন করে বাবা-মা সন্তানকে মগজে সেঁধিয়ে দেয় – যৌন শিক্ষাটাকে ছোটবেলা থেকেই দেয়া উচিত৷

‘পর্ণমোচী’ যে গাছ পুরনো পাতাকে ঝরিয়ে নতুন পাতায় নিজেকে সাজিয়ে নেয়। উপরে যতগুলো কথা বললাম তা পর্ণমোচী’র সূচনালগ্নের কথা। ও হ্যাঁ, পর্ণমোচী’কে পরিচয় করিয়ে দেই প্রথমে। কৌশিক কর নির্মিত একটি বাঙলা সিনেমা। বয়ঃসন্ধিকালে একজন কিশোর/কিশোরী ঠিক কোন মানসিকতার মধ্যে বিরাজ করে এবং তা কি রূপ লাভ করে তার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে এ সিনেমায়। সিনেমায় একজন ১৩-১৪ বছর বয়সী কিশোরের যৌনতার প্রতি আগ্রহ, পর্ণগ্রাফির প্রতি ঝুঁকে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে একটি দূর্ঘটনার পর তা কোথায় কি আকারে রূপ লাভ করে তা পরিপক্ক হাতে নির্মাতা কৌশিক কর উপস্থাপন করেছেন।

তবে এই গল্পে সিনেমা নির্মাণের পূর্বে নির্মাতা এটি দিয়ে একটি থিয়েটার নাটক মঞ্চায়ন করেছেন। ফলে একই গল্পে সিনেমা কেনো? এমন প্রশ্ন হয়েছে, তার ঠিকঠাক জবাবও দিয়েছেন নির্মাতা। কেনো, কি কারণে প্রশ্নের উত্তরে আমার যাওয়ার ইচ্ছে নেই – সিনেমাতেই বরং থাকি।

পর্ণমোচী মূলত ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়ের সিনেমা। কেনো এমনটা বললাম? কারণ তাবৎ বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরের প্রতিনিধি হয়ে সিনেমায় আবিভূত হয়েছেন তিনি৷ তাছাড়াও গল্পের কেন্দ্র যেহেতু অনল চরিত্রটি সেক্ষেত্রে এ চরিত্রে অভিনয় করা ঋতব্রতই মূখ্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঋতব্রতকে সুতো ধরে অন্যান্য চরিত্রগুলো সিনেমার একেকটা ফুল বলা চলে। অনিন্দ্য পুলক চট্টোপাধ্যায়, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, অঙ্কিতা চক্রবর্তী, কনীনীকা ব্যানার্জী ঋতব্রত (অনিল) নামক সুতোকে ঘিরে সুন্দর একটি মালা (পর্নমোচী) দৃশ্যায়ন করেছেন৷ ঋতব্রতের চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে তাকে বেশ কসরত করতে হয়েছে যা স্ক্রিনে দৃশ্যমান। বিশেষ করে এক্সপ্রেশন – যেটাকে নিয়ন্ত্রন করতে হয়েছে মানসিকভাবে এবং ফুটিয়ে তুলতে হয়ে শরীরে এবং সংলাপে৷ ঋতব্রত দারুণভাবে সে কঠিন কাজটা করেছেনও। এদিকে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের অল্প সময়ের উপস্থিতি বেশ ভালো। আহামরি কিছু না করার সুযোগ লেখক না দিলেও চরিত্রের মধ্য দিয়ে অভিনেতা কেবল অভিনয়টাই নয়, গোপনীয়তাকে গোপন করে ছেলের কাঁধে বাবার পরম বিশ্বস্ত হাতটা রেখেছেন।

অঙ্কিতা চক্রবর্তী ফুটে উঠেছেন দেড় ঘন্টা পর থেকে শেষ মুর্হুতে৷ আর শান্তিলাল মুখার্জী! অভিনয়ে এই লোকটা চরিত্রকে নিজের করেন নাকি নিজেকে চরিত্রের করেন? সে হিসেবে আজকে আর না গিয়ে কনীনীকা আর শান্তিলালের সঙ্গে সমাজের প্রচলিত দ্বন্দ্ব যা হাজার বছর ধরে নারী ও পুরুষের মাঝে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই হিসেবে বেঁচে রয়েছে তা নিয়ে বলি।

প্রথমত, একটি দৃশ্যে শান্তিলাল মুখার্জী পর্ণ দেখছেন। পাশেই তার স্ত্রী চরিত্রের কনীনীকা শুয়ে। শোয়া থেকে উঠে কনীনীকা শান্তিলালকে বললো,
– রোজ রাতে এইসব উল্টোপাল্টা জিনিস না দেখলেই নয়? আজকাল তো আমার দিকে তাকাচ্ছো না গো!
এর প্রেক্ষিতে শান্তিলাল কনীনীকার দিকে ল্যাপটপ ঘুরিয়ে বলেন,
– আয়, দেখ। মালটা রাশিয়ান। বুক দেখেছিস? পেট, পাঁছা! আর নিজেরটা দেখেছিস? শালা ধুমশি।
এর জবাবে কনীনীকার কেবলই নিরব তাকিয়ে থেকে শুয়ে পড়া৷
আরেক দৃশ্যেই শান্তিলাল-কনীনীকার শারীরিক সম্পর্ক হয়। স্রেফ কয়েক সেকেন্ড। এরপরই কনীনীকা জানালো, সেও পর্ণ দেখেছে। এবং তার কাছে একটি বিষয় দারুণ লেগেছে – ‘ওই ছেলেগুলোর কি স্ট্যামিনা’! এই কথার জবাবে শান্তিলাল তাকে একটি থাপ্পড় দিলো!
অর্থাৎ সেক্স, চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছে সবটাই যেনো পুরুষের বংশগত অধিকার। নারী এখানে পাশ ফিরে শুয়ে থাকো, কিছু বললেই গালে জুটবে চড়! প্রবলভাবে পুরুষতন্ত্র জিইয়ে রাখার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এ দুটি চরিত্রের মাধ্যমে৷

নির্মাতা হিসেবে কৌশিক করের প্রথম কাজ। ভুলত্রুটি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়, রয়েওছে অনেক কিছু।
মিউজিকগুলো ঘটনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। আলোছায়ার বিষয়টাও কোনো ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি লাগে নি।
সিনেমাটি নিয়ে এতগুলো কথা বললাম, কিন্তু মূল ঘটনাকে কৌশলেই এড়িয়ে গেলাম। কারণ এত কিছু জন্ম শুধু ওই একটি ঘটনার কাছে যাওয়ার জন্য। এমনকি সিনেমার নামের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে হলে দর্শক হিসেবে আপনাদের সে দৃশ্যকে অবলোকন করতে হবে৷ তবে সাদা চোখে ঘটনাটি প্রথমে দৃষ্টিগোচর না হলে মগজে হালকা নাড়া অনুভব আপনি করবেন। আর এটাই নির্মাতা হিসেবে কৌশিক করের স্বার্থকতা৷ তবে সিনেমার মূল স্বার্থকতা হলো, কাঁটা দিয়ে কাঁটা’ তোলায়। পর্ণকে উপজীব্য করে এ সিনেমা পর্ণের বিরুদ্ধেই সোচ্চার৷

অবশেষে ইতি টানবো। তবে শিক্ষকদের একটি বিষয় দিয়ে। অনিলের স্কুলের এক শিক্ষক যৌন শিক্ষা নিয়ে আলোচনা শেষ করতেই যখন অন্য দুজনকে জিজ্ঞেস করলো, আমার কাছে কিন্তু আজ প্রন আছে, দেখবেন?
উৎসুক হয়ে বাকি দুজন দেখতে চাইলো। এবং পর পরই বেরিয়ে এলো চিংড়ি।
এ দেখে তো দুজন বোকা হাসি হেসে দিলো। এরপরের জবাবটাই বুঝিয়ে দিলো বিষয়টা আমাদের মাথায় থাকে।
অর্থাৎ যথাযথ শিক্ষাটা মগজে যথা সময়ে ইনপুট না করলে মগজ ক্র্যাক হয়ে যাবে৷ যার ফল সমাজকে ভয়াবহ এক বিপদের দিকে ধাবিত করবে যুগ যুগ ধরে।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

77 − = 71