বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০] ! পর্ব : ৩

:
[১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু মারা না গিয়ে বেঁচে উঠলে কিভাবে চালাতেন তিনি আজকের বাংলাদেশ! বহুদলীয় শাসনে বাংলাদেশ কি ভাল আছে এখন! একদলীয় শাসনের চীনের থেকে? তার রূপক গল্প হচ্ছে এটি! বড় বিধায় প্রত্যহ রাত ৮-টায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হবে জীবন চিন্তনের এ গল্প!]
:
ইতিহাসের রক্তাক্ত ক্যানভাস থেকে নবজীবনে ফিরে আসায় বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানায় বিশ্বনেতৃবৃন্দ প্রায় সকলে। ফিদেল ক্যাস্ত্রো, ইয়াসির আরাফাত আর ইন্ধিরা গান্ধী ১৮-আগস্ট সরাসরি চলে এলেন ঢাকায় মুজিবকে দেখতে। ৩-বিশ্ব নেতা একত্রে যখন বঙ্গবন্ধুর কেবিনে উপস্থিত হলেন, মনে হলো ধবল ছায়ার নক্ষত্ররাও তখন কষ্টের কথকতা ভুলে হাততালি দিয়ে উঠলো, যার ঢেউয়ের বিস্মৃতি ঘটলো হাসপাতাল কেবিন থেকে পুরো ঢাকা শহরের মানুষের মাঝে। একেক করে ৩-বিশ্ব নেতাই বঙ্গবন্ধুর মাথায় হাত রাখলেন ও বিদায়ের আগে তাঁর হাতে হাত রেখে সাহস যোগালেন মুজিবকে পরম আন্তরিকতায়! মানুষের ভালবাসায় চোখ ভিজে হৃদয়ের অলিন্দে কথা আটকে গেল বঙ্গবন্ধুর! বেতার আর টিভিতে সকল অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে কেবল পিজি-র দিকে তাদের চোখ তাক করে রাখলো। পত্র-পত্রিকাগুলো বিকেলে বিশেষ সংখ্যা বের করতে থাকলো সর্বশেষ আপডেট দিয়ে। বিবিসি-সিএনএনসহ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার সাংবাদিকরা চষে বেড়ালো পিজির করিডোরগুলো দিবারাত্র ২৪-ঘন্টা। পিজির বারান্দাগুলো হয়ে উঠলো দারুচিনি দ্বীপের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের রাতের মতো! বঙ্গবন্ধু শুয়ে রইলেন পিজি-তে নরম ধূসর সুবিশাল আকাশ বিছানায় নতুন আলোকজ্জ্বল রৌদ্রদীপ্ত সূর্যালোক প্রত্যাশায়।
সেনাবাহিনীর চৌকস দলগুলো অত্যাধুনিক অস্ত্র আর নাইটভিশনের সানগ্লাস পরে ঘাতক সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ, খন্দকার আ. রশীদ, শরিফুল ইসলাম ডালিম, নুর চৌধুরী, মেজর পাশা, রাশেদ চৌধুরী, আহমদ শরিফুল হোসেন, আবদুল মাজেদ, মো. কিসমত হোসেন, নাজমুল হোসেন আনসার, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ, দফাদার আবুল হাসেম মৃধা এবং অনুঘটক তাহেরুদ্দিন ঠাকুর ও নাটের গুরু খন্দকার মোশতাককে ধরার জন্যে চিরুণী অভিযান শুরু করলো সর্বত্র। বিমানবন্দর ও বর্ডার এলাকায় নিদের্শনা ছাড়াও ঘাতকদের ছবিসহ পোস্টার লাগানো হলো দেশের সর্বত্র। পুরস্কার ঘোষণা করলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পচাত্তরের আগস্টের শেষ সপ্তাহের দিকেই বিভিন্ন নালা, গর্ত, পরিত্যক্ত বাড়ি ও ম্যানহোল থেকে একে একে ঘাতক বাহিনীর লোকজনকে টেনে বের করা হলো অপ্রকৃতিস্থ রোগাক্রান্ত ইঁদুরের মতো। জনতা স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নিলো ঘাতকদের গ্রেফতারে। কোথাও কোথাও জনতার হাতে গণধোলাইর পর পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করলো ক’জন ঘাতককে পদাহত অবস্থায়। ঘাতকদের মধ্যে যারা সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিল, তাদের বিচার কোর্ট মার্শালে করার কথা উঠলে, লাখো জনতার প্রতিবাদ মিছিলে ঢাকার রাজপথ উত্তপ্ত হয়। জনতা সরাসরি বিশেষ ট্রাইবুনালে প্রকাশ্যে বিচার দাবী করে আন্দোলন করতে থাকে, যদিও তখনো বঙ্গবন্ধু পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সরকার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা ও সুস্থ্যতার প্রতীক্ষা করতে থাকে।
:
মরণের অধিদেবতাকে পাশ কাটিয়ে সকল প্রতিকূলতাকে পদদলিত করে প্রায় দু’মাস পর হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে এলেন মৃতকল্প বঙ্গবন্ধু। তিনি মনেপ্রাণে চাইছিলেন হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে সরাসরি সোরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে জনগণের ভালবাসার প্রতিদান দেবেন, সাতই মার্চের মতো। কিন্তু শরীর ঋণাত্মক হওয়াতে ডাক্তারদের পরামর্শে হাসপাতাল ত্যাগ করে গিয়ে ওঠেন গণভবনে। ধানমন্ডির সড়ক ৩২-এর ৬৭৭ নম্বরের বাড়িটির স্মৃতি তাকে বার বার কাঁদালেও, তিনি আর কখনো ৩২-নম্বরে ওঠেননি বসবাসের জন্যে। যদিও পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে রূপান্তরিত হয় বাঙালির তীর্থভূমি হিসেবে রূপান্তরিত হয় এ বাড়িটি। স্ত্রী, ভাই, ৩-ছেলে, গুণগ্রাহী ও আত্মীয়-স্বজন হারিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রতিজ্ঞা করেন, বাকি জীবনটা তিনি এ জাতির জন্যেই উৎসর্গ করবেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে। আর যারা তাঁর ও তাঁর দলের নাম ভাঙিয়ে চাটুকারিতা করে, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের ও তাঁর পরিবারের জন্যে বদনাম কুঁড়িয়েছে, তাদের তিনি ক্ষমা করবেননা কিছুতেই। সুতরাং এমন কঠোর আইন তিনি সংসদে পাশ করাবেন যে, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রাতির হার যেন শূন্যের কোটায় নেমে আসে অচিরেই বাংলাদেশে।
:
বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করলেন, যেহেতু এদেশে ফ্রি-স্টাইল গণতন্ত্রের নামে মানুষের উপর জোর করে চেপে বসেছিল ঘুষ নির্ভর সেকেলে আমলাতন্ত্র, মারাত্মক অপচয়মূলক সরকারি কর্মকাণ্ড! হরতাল, লুটপাট, ভাংচুর, ভেজাল, দুর্নীতি, যানজট, মূল্যবোধহীন ভোগবাদী মানসিকতা, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ আরো কত কি প্রতিনিয়ত। হরতাল না করতে চাইলে তাকে আগুনে পুরিয়ে দেয়ার ঘটনাও এদেশে গণতন্ত্রের নামে মানুষ দেখতে পায়। বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র প্রচলিত ছিল, তা অনেকটা স্বার্থবাদী ও ধনিক শ্রেণির, মানে ‘শোষকের গণতন্ত্র’ হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রচলিত গণতন্ত্রে এখানের গরিব অসচেতন জনগণ কেবল নির্বাচনের দিন ‘একটি ভোট প্রদানের গণতান্ত্রিক অধিকার’ ভোগ করতো এবং কখনো কখনো তা-ও ছিনতাই হয়ে যেত।
:
এদেশে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাও অনেকটা ধনিক শ্রেণির জন্য সহজতর ছিল। এদেশের প্রচলিত সিস্টেমে একজন অর্থবান ব্যক্তি অর্থ দিয়ে তার পক্ষে বড়, বিখ্যাত, কুটতর্কে পারদর্শী ‘বিলাত-ফেরত’ আইনজীবী নিয়োগ করতে পারলেও, একজন ভূমিহীন কৃষক-শ্রমিকের পক্ষ নিজের অধিকার আদায়ে তা সম্ভব ছিলনা, যে কারণে অর্থবানের পক্ষে রায় চলে যেত অনেকটা যৌক্তিক ও সহজবোধ্য কারণেই। এদেশের পুরণো গণতান্ত্রিক আইনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের খুনীদের বিচার করে ফাঁসি কার্যকর করতে অন্তত ৩০/৩৫ বছর সময় লেগে যেতো। অবাধ গণতন্ত্রের জন্যেই এদেশে হুঁ-হুঁ করে জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে দেশকে ‘কার্যত অচল’ করে দেয়ার পায়তারা চলছিল, তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিলনা জন্মদানের ‘জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারে’র কারণে, আবার সাংবিধানিকভাবে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত হলেও, ধর্মীয় কারণে অনেক নারী সম্পদে অর্ধেক অধিকার, আবার অন্য ধর্মাবলম্বী নারীরা সম্পদে ভাগ পেতো পুরুষের তুলনায় ০% ভাগ। যে কারণে প্রচলিত শাসনের বিপরীতে সমাজের সর্বস্তরের প্রতিনিধি সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ নির্দেশে গঠিত হয় ১০-বছর মেয়াদী ‘‘১০০-সদস্যের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি’’। বিশ্বস্ত ও সৎ সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, তোফায়েল আহমেদ, হাসানুল হক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীসহ সকল দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে তিনি প্রথমেই ১০০-সদস্যের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ১-টি কমিটি গঠন করার ‘প্রজ্ঞাপন’ জারী করান, যাতে সমাজের সকল শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক, শ্রমিক, আইনজীবি, গাড়িচালক, সরকারি কর্মচারী, ব্যাঙ্ক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রমুখ সবাই থাকবেন। প্রজ্ঞাপন মোতাবেক কমিটি গঠিত হয় কালবিলম্ব না করেই। জনস্বার্থে দেশ পরিচালনার মতো কঠিন কাজে আগ্রহী নির্লোভ সকল পেশাদারির ভেতর থেকে সর্বসম্মত গণভোটের ভিত্তিতে এ ১০০ প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়, কেবল অতীতে দুর্নীতির রেকর্ডধারীদের ঐ কমিটিতে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। বঙ্গবন্ধু থাকেন কমিটির বাইরে ‘জাতির অভিভাবক ও নির্দেশক’ হিসেবে। কমিটি গঠিত হওয়ার প্রথম সভায়ই তারা বঙ্গবন্ধুকে আক্রমণ ও তাঁর পরিবারবর্গকে হত্যাকারী ঘাতকদের বিচারের জন্যে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে ১ নং ‘প্রজ্ঞাপন’ জারী করে সংসদে পাঠান আলোচনা ও অনুমোদনের জন্যে। পরদিন একই পদ্ধতিতে অনুমোদিত হয় একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন নং ২। ঘুষ, দুর্নীতি, মজুদদারী, হাইজ্যাক, গুপ্তহত্যা, লুট, কালোবাজারী, স্বজনপ্রীতি, ভেজাল, হরতাল, ধর্মঘট, ট্রেড ইউনিয়নবাজী, সিন্ডিকেট বন্ধের জন্যে জারী করা হয় ৩ নং প্রজ্ঞাপনটি। এভাবে দেশ চালানোর উপযোগী কঠোরতর আইন দিয়ে অল্প দিনেই দেশকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনেন বঙ্গবন্ধু।
:
কোটি মানুষের দাবীর প্রেক্ষিতে পচাত্তরের নভেম্বরের ১ম সপ্তাহেই শুরু হয় ‘‘বঙ্গবন্ধুকে আক্রমণ ও তার পরিবারবর্গকে হত্যাকারী ঘাতকদের বিচার’’। বিদেশী শক্তির নানাবিধ চাপের মাঝেও দ্বিধাগ্রস্ততা ও বিচলতা ঝেড়ে ফেলে ঘাতকদের ব্যাপারে আপোষহীন অনঢ়তা দেখান বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকার। সাধারণ মানুষের অন্দোলন, সর্বাত্মক স্বতস্ফূর্ততা আর দাবীর প্রেক্ষিতে বিশেষ ট্রাইবুনাল বসে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। এ জন্যে আইন সংশোধন করা হয় যথাযথভাবে। ট্রাইবুনালের ব্যাপারে কোনরূপ সমালোচনা, বিদ্রুপ, মিছিল-হরতাল নিষিদ্ধ করা হয় আইন করে। স্টেডিয়াম মাঠের একটি স্টেজে বিচারকগণ, বিচার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, আসামী, আইনজীবি ও দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরা অবস্থান নেয়। গ্যালারিতে দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকে সাধারণ মানুষ ও আসামীদের আত্মীয়-স্বজন। ধারাবাহিক ৭-দিনের শুনানী, স্বাক্ষ্য-প্রমাণ, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, আসামীদের ভুল স্বীকার ও ক্ষমাপ্রার্থনায় ষড়যন্ত্রকারী ও ঘাতক সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ, খন্দকার আ. রশীদ, শরিফুল ইসলাম ডালিম, নুর চৌধুরী, মেজর পাশা, রাশেদ চৌধুরী, আহমদ শরিফুল হোসেন, আবদুল মাজেদ, মো. কিসমত হোসেন, নাজমুল হোসেন আনসার, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ, দফাদার আবুল হাসেম মৃধা এবং অনুঘটক তাহেরুদ্দিন ঠাকুর ও নাটেরগুরু খন্দকার মোশতাককে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। উপস্থিত জনতা নেচে-গেয়ে, শীস বাজিয়ে প্রচণ্ড উল্লাস আর করতালিতে রায়কে স্বাগত জানায় ইতিহাসের কালিমা মোচনে। বর্ণিত প্রকাশ্য তড়িৎ রায়ে জনতার জীবন শেকলের জমাট দরজা ভেঙে মগজের ঘুম তাড়ানিয়া স্বপ্ন টুটে স্বপ্নসিঁড়ির পথ উন্মুক্ত হয়।
:
[৪র্থ পর্ব পোস্ট করা হবে আগামিকাল রাত ৮:০০ টায়]
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

78 + = 87