নীল বাত্তে সান্নাতা : একা এক মায়ের লড়ে যাওয়ার আখ্যান

সিনেমার একটি দৃশ্যে স্বরা ভাস্কর ও রিয়া শুক্লা
‘নীল বাত্তে সান্নাতা’ পরিশ্রমের গল্প। একা এক মায়ের সন্তানকে নিয়ে লড়ে যাওয়ার গল্প।
অপু বা অপেক্ষা; চান্দা -যিনি মানুষের বাসায় ঝি-এর কাজ করেন, মশলা তৈরীর কারখানায় এমনকি জুতা তৈরীর কারখানায়ও কাজ করেন একটু বাড়তি আয়ের জন্য৷ সে বাড়তি আয় মেয়ে অপুর পড়ালেখার জন্য, আরাম আয়েশের জন্য। অথচ অপুর মন পড়ালেখায় নেই। রণবীর কাপুরের ভক্ত, সিনেমা প্রেমী, ঘুরে ফিরে নিজের মত চলবার মত ১৫ বছর বয়সী মেয়ে।
‘ইঞ্জিনিয়ারের সন্তান ইঞ্জিনিয়ার হবে, ডাক্তারের সন্তান ডাক্তার আর ঝি-এর সন্তান ঝি’ এমন বিশ্বাস নিয়ে পড়াশুনা করার ইচ্ছেটাকে মেরে ফেলেন অপু। কিন্তু মা! সে তো মেয়েকে তার মত ঝি-এর জীবনে দেখতে চান না৷ তাই বিভিন্নভাবে মেয়েকে পড়াশুনায় মনোযোগী করতে চেষ্টা করেন৷ শেষমেশ মেয়ের স্কুলে ভর্তি হন তার মনিবের পরামর্শে৷ যাতে লজ্জা পেয়ে মেয়ে পড়াশুনা করে। প্রথম দিকে মায়ের তার স্কুলে ভর্তি হওয়া নিয়ে আপত্তি থাকলেও মা যখন স্কুলে ভর্তি হন তখন তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন অপু। কিন্তু আপত্তি বেড়ে গেলো পরীক্ষায় অংকে মায়ের নাম্বার বেশি পাওয়ার পর। মা-মেয়ে একই স্কুলে, একই ক্লাসে এ বিষয়টির চেয়েও মারাত্মক লজ্জার একজন ঝি তার চেয়ে বেশি নাম্বার পেয়েছে – এটা মেনে নেয়ার মত নয়৷ ফলে অপু পড়াশুনা করবে, পরীক্ষায়ও পাশ করবে – শর্ত পাশ করার পর মাকে স্কুল ছাড়তে হবে। শর্তানুসারে তাই হলো। কিন্তু এরপর সেই আগের অপু ফিরে এলো। টিভির প্রতি ঝুঁকে পড়া, পড়ায় মন নেই। ফের পরীক্ষায় ফেল!
এসব ছাড়াও সিনেমায় মা-মেয়ের আরো বেশ কিছু দ্বন্দ্বকে মমতা আর ক্ষোভের মিশ্রণে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নির্মাতা।
আসলে, আমরা ছোটবেলায় পড়াশুনা শুরু করি মা-বাবা চায় সে কারণে। তাদের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য। কিন্তু আমাদের উচিত নিজের জন্য, নিজের স্বপ্নের জন্য লড়াই করা। মা-বাবা তাদের জন্য, তাদের স্বার্থের জন্য আমাদের ব্যবহার করেন না। অথচ সে সময়ে বিষয়টি আমরা বুঝতে পারি না।
তাছাড়াও, মা-বাবা আমাদের স্বপ্নকে পূরণ করার লক্ষ্যে যেভাবে নিজের ইচ্ছে, শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেন সেটা বুঝতে পারলেও অন্তত আমরা মা-বাবার জন্য না হোক নিজেদের ভালোর জন্য পরিশ্রম করেন।
আমি – দিন এনে দিন খাওয়া পরিবার থেকে এসেছি। জীবনে এখনো কিছু করতে পারি নি। কিন্তু যতটুকু করছি তার অবদান আমার মা-বাবার। আমার বাবা একজন রং মিস্ত্রি। মানুষের বাড়ী রাঙিয়ে সুন্দর করে দেন। কাক ঢাকা ভোরে তিনি বেড়িয়ে যান এবং কখনো সকালে খেয়ে কিংবা না খেয়ে হেঁটে হেঁটে কাজে যান৷ মাসের পর মাস ডাল, ডিম খেয়ে আমি সহ আমার দুই ভাইয়ের পড়াশুনার জন্য টাকা দেন। আমরা যাতে একটু ভালো পোষাক পরতে পারি সে জন্য ১০/১২ বছর তিনি নতুন পোষাক নেন নি। মা, নিজে পড়েন নি। কিন্তু যখন যেটা প্রয়োজন হয়ে, আজ অমুক বিষয়ে এক্সট্রা টিউশন করতে হবে ; করো, টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না! আমাদের স্কুল থাকে বলে তিনি কখনো তার বাবার বাড়ি যেতেন না। নিজের জুতা কিনলে বাড়তি টাকা লাগবে বলে, জুতা বহুবার সেলাই করে পরতেন। নিজে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে খেয়ে আমাদের থালায় ভালো খাবার তুলে দিয়েছেন, যাতে আমাদের আফসোস না থাকে। আমি জানি না আমার মা-বাবার স্বপ্ন আমি পূরণ করতে পেরেছি কিনা বা এখনো না পারলেও কবে পারবো। তবে মায়ের অবদান সব কিছুকে ছাঁপিয়ে যায়। সন্তানের জন্য তার সেক্রিফাইস থ করে দেয় সব কিছুকে। ঠিক এ বিষয়টাই উপলব্ধি করেছেন সিনেমার অপেক্ষা।
আমাদের সবার চেনা এক গল্পের একটি সিনেমা ‘নীল বাত্তে সান্নাতা।’
অশ্বীন আইয়ার তিওয়ারি সুন্দরভাবে গল্পকে চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন৷
অভিনয়ের ক্ষেত্রে চান্দা সহায় চরিত্রে স্বরা ভাস্কর ও অপেক্ষা সহায় চরিত্রে রিয়া শুক্লা অনবদ্য অভিনয় করেছেন৷ নাটকধর্মী সিনেমার সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সংলাপ। আর এ সিনেমায় প্রত্যেকটি চরিত্রই সরল সংলাপ উপস্থাপন করে নিজস্ব অভিনয় গুন দেখিয়েছেন।
প্রিন্সিপাল শ্রীবাস্তব চরিত্রে পঙ্কজ ত্রিপাঠী নিজেকে ভিন্ন আঙ্গিকে নতুনভাবে চিনিয়েছেন। এবং বুঝিয়েছেন শিক্ষক মানে রুঢ়, কড়া চক্ষুর নয় – বন্ধুর মত, মজার মানুষ৷
গল্প, অভিনয়, দৃশ্যপট অঙ্কন – সব মিলিয়ে বেশ দারুণ একটি সিনেমা ‘নীল বাত্তে সান্নাতা।’
সবেশেষে, মা প্রকৃতির সুন্দর সৃষ্টি। তবে সময় থাকতে এ বিষয়টি প্রত্যেক সন্তানেরই বুঝা উচিত৷
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

91 − = 85