বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০] ! পর্ব : ৪

[১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু মারা না গিয়ে বেঁচে উঠলে কিভাবে চালাতেন তিনি আজকের বাংলাদেশ! বহুদলীয় শাসনে বাংলাদেশ কি ভাল আছে এখন! একদলীয় শাসনের চীনের থেকে? তার রূপক গল্প হচ্ছে এটি! বড় বিধায় প্রত্যহ রাত ৮-টায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হবে জীবন চিন্তনের এ গল্প!]
:
৩-দিন পর ১০ নভেম্বর ১৯৭৫ প্রকাশ্য স্টেডিয়ামে রায় কার্যকরণ দৃশ্য ধারণের জন্যে দেশী-বিদেশী সকল টিভি ও পত্রিকার সাংবাদিকরা উপস্থিত হন। লক্ষ-লক্ষ মানুষ স্টেডিয়ামে ঢুকতে না পেরে পাশের ভবনগুলোর ছাদে ও বাইরে অবস্থান করতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই অবস্থান নেন স্টেডিয়ামে একাত্তরের যোদ্ধার পোশাকে রণ-সাজে। বিটিভি ছাড়াও বিবিসি, সিএনএন বিচারের রায়ে হত্যার অনুষ্ঠানটি সরাসরি তাদের টিভিতে প্রচার ও বড় পর্দায় ঢাকার রাস্তায় দেখানোর ব্যবস্থা করে। ঐতিহাসিক এই রায় বাস্তবায়নের পূর্বমুহূর্তে বঙ্গবন্ধু তার কয়েকজন সহচরসহ স্টেডিয়ামে উপস্থিত হলে, ঘাতকরা করজোড়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে অব্যাহত ক্ষমা চাইতে থাকে। দর্শক গ্যালারি থেকে ঘাতকদের স্বজনরা উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করে ‘আজীবন বঙ্গবন্ধুর গোলাম’ হয়ে থাকার শর্তে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ধরে তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে পুরুষোত্তম পুরুষ বঙ্গবন্ধু বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘‘তোরা আমার স্ত্রী, সন্তান, ভাইসহ অনেককে হত্যা করেছিস, আমার শিশুপুত্র রাসেলকেও খুন করেছিস, আমাকেও মৃত্যুর দরজায় নিয়ে গিয়েছিলি, প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়ানো শিশু রাসেল তোদের কি ক্ষতি করেছিলো? ১৫ আগস্ট ভোরে আমার ও আমার পরিবারের নামে রেডিও-টিভিতে অনেক মিথ্যাচার করেছিলি তোরা। আমি কি বাঙালির মাঝে কোন দুর্নীতি করেছি কখনো? আমার কি লন্ডন-আমেরিকাতে কোন বাড়ি আছে এ বাংলাদেশ ছাড়া? ধানমন্ডির বাড়ি করেছি আমি পাকিস্তান আমলে লোন করে! যে ঋণ এখনো শোধ হয়নি আমার। ব্যাংকে আমার একাউন্টে মাত্র একান্ন হাজার টাকা আছে। আমার ছেলেরাতো খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো! তারা ব্যাংক ডাকাতি করবে কেন কার জন্যে? তাদেরকে তো ডাকাত হিসেবে মানুষ করিনি আমি! তোরা পবিত্র ইসলামকেও অপবিত্র করেছিস একাত্তর এবং পচাত্তর সনে। ইসলামে কি নিরীহ মুসলমান অন্ত:সত্ত্বা নারী-শিশুকে হত্যার কথা কোথাও আছে’’?
তাঁর আবেগময়ী কথায় অন্ধকার ব্রহ্মান্ডের অতলান্ত উপত্যকার মতো পুরো স্টেডিয়াম কান্না আর শোকে নিমজ্জিত হয়। বদ্ধঘরের হৃদয়ের রুদ্ধ দেয়াল ভেঙে পুরো স্টেডিয়াম কাঁদলো বঙ্গবন্ধুর কান্নায় অঝোরে! বাকরুদ্ধ করুণ কণ্ঠে হাঠৎ সদ্য হাসপাতালত্যাগী বঙ্গবন্ধু পুন. বলে উঠলেন -‘‘তারপরও তোরা দেখ। বিশ্ব দেখুক। বাঙালির নেতা শেখ মুজিব কত বড় হৃদয়ের মানুষ! যে ক্ষমা করতে জানে মহাখুনীকেও, যা তোদেরকে ক্ষমা করে দিলাম’’! বঙ্গবন্ধুর শ্বাসরুদ্ধকর কথার রেষ শেষ না হতেই বজ্র নিনাদে ভীম গতিতে স্টেডিয়ামের হাজারো জনতা ও বাইরে অপেক্ষমান লাখো মানুষ প্রচণ্ড ক্ষোভ আর রোষে স্টেডিয়াম গেট ভেঙে প্রবেশ করলো মাঠে। পৃথিবীর সমস্ত আগুন একত্রে জ্বলে ওঠার মতো ট্রিলিয়ন রণমূর্তিতে লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা-জনতার আক্রমণ, চিৎকার আর ভীড়ে পুলিশ-বিচারক-ডাক্তার-ফাঁসির-মঞ্চ-স্টেজ সব লণ্ডভণ্ড হয়ে হারিয়ে গেল মানুষের মাঝে! দুয়ার ভাঙা মিছিলের মতো প্রবল বিদ্রোহ যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো পুরো স্টেডিয়ামে। জনগণের রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার জন্যে ঘাতকরা পালাতে চাইলেও, তারা কেবল হাত-বদল হতে থাকলো স্টেডিয়ামের এ-মাথা থেকে ও-মাথায় লক্ষ মানুষের হাতে হাতে। আসামীদের স্বজনরা এক ফাঁকে পালিয়ে গেল ক্ষমা প্রার্থনার দাবী পরিত্যাগ করে হাজারো মানুষের দৃষ্টির অগোচরে। গলিত লাভার মতো স্টেডিয়াম ভর্তি মানুষের ক্ষোভ অবদমিত হলে দেখা গেল, জটলার বৃক্ষতলে বিশাল স্টেডিয়াম মাঠের যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দণ্ডপ্রাপ্ত ঘাতকদের ছিন্নভিন্ন লাশগুলো।
:
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচল বিক্ষোভ আর উত্তাল জনচাপে ১২ নভেম্বর ১৯৭৫ ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল’ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়নের জন্য আদালত তাদের কাজ শুরু করে। বিচারের প্রাক্কালেই বিচার বন্ধের জন্যে নানাশক্তিধর বিদেশী কয়েকটি রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর সরকারের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি ও তা অব্যাহত রাখে দেশে-বিদেশে। তারা বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ, সরকারকে উৎখাত, বাংলাদেশী জনশক্তির জন্য নতুন ভিসা ইস্যু বন্ধ করার হুমকি প্রদান করলেও, বঙ্গবন্ধু সাহসী প্রত্যয়ে সব বাঁধা অগ্রাহ্য করে সাধারণ মানুষের দাবীর প্রেক্ষিতে আইনী সংস্কারের মাধ্যমে এ বিচারটিও শুরু করে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জনসমক্ষে। বিচার শুরুর আগে এ ট্রাইবুনাল সম্পর্কেও কোনরূপ নেতিবাচক মন্তব্য, টকশো ও বিচারের বিপক্ষ মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ করে সরকার। আগের মতোই স্টেডিয়াম মাঠের একটি মঞ্চে বিচারকগণ, বিচার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, আসামী, আইনজীবি ও দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরা অবস্থান নেয়। পাশেই আরেকটি মঞ্চে একাত্তরে শহীদ পরিবারবর্গের স্বজনরা, প্রত্যক্ষদর্শী, সাংবাদিক গবেষক শাহরিয়ার কবির, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. এমএ হাসান, বেগম সুফিয়া কামাল, ড. মুনতাসীর মামুন, জাহানারা ইমাম, ড. আনোয়ার হোসেন, নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, হাসান ইমাম, হুমায়ুন আহমেদ, আনিসুল হক, সৈয়দ সামছুল হক, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কর্নেল তাহের, ড. আনিসুজ্জামানসহ স্বাক্ষী হিসেবে সংশ্লিষ্ট অনেকেই উপস্থিত থাকেন। গ্যালারিতে দর্শক হিসেবে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা, সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট সকলের আত্মীয়-স্বজনরা। ধারাবাহিক ২০-দিনের শুনানী, স্বাক্ষী-প্রমাণ, পুরণো পত্র-পত্রিকার ছবি ও রিপোর্ট, রেডিও-টিভির স্বাক্ষাৎকার, ভারত ও পাকিস্তান সেনাদের থেকে প্রাপ্ত তালিকা, নানাবিধ দলিল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে একাত্তরের সকল রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীতে যোগদানকারী ও নানা উপায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটসহ মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সকল বাঙালি-অবাঙালিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে ট্রাইবুনাল। যার সংখ্যা প্রায় ৩৭,০০০। এমনকি অনুপস্থিত আসামী হিসেবে পাকিস্তানী ১৯৫-জন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেও মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে উপর্যুক্ত আদালত! যেহেতু পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দিয়েও বর্ণিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা থেকে বিরত ছিল এতোদিন! বর্ণিত ১৯৫-জন দণ্ডপ্রাপ্ত পাকিস্তানীর সাজা কার্যকরণে সহায়তার জন্য ইন্টারপোল, জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ফোরামের সহযোগিতা প্রার্থনা করে বাংলাদেশ।
:
পরদিন ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫ রায় কার্যকরণের নির্ধারিত তারিখ থাকলেও, আসামী পক্ষের কোন আত্মীয়-স্বজনই আর সেদিন সেখানে উপস্থিত হয়নি বিচারস্থলে। ফলে এককভাবে কেবল একাত্তরের শহীদ পরিবারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা আর সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে ২৩-নভেম্বর গ্রেফতারকৃত সকল স্বাধীনতা বিরোধীকে প্রকাশ্য স্টেডিয়ামে গুলি করে রায় কার্যকর করা হয়। আদালতের বিশেষ নির্দেশে উপস্থিত শহীদদের স্বজনদের নিজ হাতে গুলি করে সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিলে, শহীদদের পক্ষে তাদের উপস্থিত সন্তান, মা-বাবা, ভাই ও স্বজনরা নিজ হাতে প্রকাশ্যে গুলি করে একাত্তরের কয়েকজন ঘাতককে। প্রতীক হিসেবে একাত্তরের শহীদ রুমির মা জাহানারা ইমাম সরাসরি হননীয় ১-জন ঘাতককে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে আদালতের নির্দেশ কার্যকর শুরু করেন।
:
এরপর পিতৃহন্তারক ঘাতককে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেন ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ ও জাফর ইকবাল, সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ও সাংবাদিক সিরাজউদ্দীনের পুত্র শাহীন রেজা নুর। ট্রাইবুনালে মৃতদণ্ডপ্রাপ্তদের জীবনের শেষ ইচ্ছানুসারে তাদের লাশ পাকিস্তানে পাঠাতে চাইলে পাকিস্তান গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে, ইসলামের নবীর নির্দেশনা তথা হাদিস মোতাবেক নিহত ঘাতকদের সকলের লাশ একত্রে একটি অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করা হয় এবং কূপটি ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসেবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেয় আদালত। অপরপক্ষ যারা পলাতক হিসেবে পাকিস্তান কিংবা অন্য রাষ্ট্রে আশ্রয় গ্রহণ করে, তাদের বাংলাদেশী নাগরিকত্ব বাতিল ও বাংলাদেশে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করণের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে বর্ণিত আসামীরা কখনো বাংলাদেশে প্রবেশ করলে, তাদের মৃত্যুদণ্ড তাৎক্ষণিক কার্যকরের জন্যও আদালত নির্দেশ প্রদান করে। এভাবে হনন ইতিহাসের জঘন্যতম এক অধ্যায়ের ইতিতে কলঙ্কমুক্ত হয় বাংলাদেশ, বর্ষামেঘের ঘনঘটায় হঠাৎ রোদ্দুরে ঝিলিক দেয় নক্ষত্রের সোনালী সূর্যের আলোকিত প্রভাত!
:
[৫ম পর্ব পোস্ট করা হবে আগামিকাল রাত ৮:০০ টায়]
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

65 − = 56