ইসলামী রাষ্ট্র থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়ে উঠা সুদান

১৯৯৩ সালের ১২ই আগষ্ট ওসামা বিন লাদেন, আল কায়েদা, হামাস, হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনি ইসলামি জিহাদ, আবু নিদাল সংগঠন এবং জামায়াত আল-ইসলামিয়্যাসহ স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ এনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সুদানকে চিহ্নিত করেছিলো, সেই সুদান আজ দীর্ঘ ৩০ বছরের ইসলামিক শাসনের বলয় থেকে বেরিয়ে এগিয়ে চলেছে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের দিকে! এ এক অভূতপূর্ব যাত্রা, যার পথ শুরু থেকেই মসৃণ ছিলনা। সুদানের তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তা কর্ণেল ওমর আল বশির দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থানের সূচনা করে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণার পরক্ষণেই সুদানে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং ইসলামি আইন চালু করেছিলেন। এর পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সুদানকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। যে কলঙ্ক দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সুদানকে বয়ে নিতে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট আল বশির শান্তিপ্রক্রিয়া ফলপ্রসূ করতে ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে একটি চুক্তি করেন। চুক্তির শর্ত ছিলো ; দক্ষিণাঞ্চল স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে ও স্বাধীনতার জন্য ছয় বছর পরবর্তী সময়ে গণভোটের উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে দূর্ভাগ্যবশত চুক্তির পর দক্ষিণের এক নেতা বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলে দেশটিতে আবার গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। দেশটিতে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হলে তিনি এ বাহিনী মোতায়েনের কঠোর বিরোধীতা করেছিলেন।

 

সুদানের উল্লেখযোগ্য সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের ইতিহাস :

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ১৯৯৩ সালে সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রয়দাতা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর, ২০১৩ সালে পুরোপুরিভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিলো এই দেশটির ওপর। ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তিউনিসিয়াস্থ মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলার জন্য সুদান ভিত্তিক আল – কায়েদার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়। এর আগে ১৯৯৬ সালে মিশরের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারককে হত্যার চেষ্টাকারীদের আশ্রয় দেয়ায়, মিশর কর্তৃক নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হয়েছে সুদানকে


একই বছর নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ দপ্তরে বোমা ফেলার অভিযোগ ওঠে সুদানের দুই কুটনীতিকের বিরুদ্ধে। এছাড়াও নব্বই দশক জুড়ে কেনিয়া, তিউনিসিয়া এবং ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীন বিদ্রোহকে সমর্থন জুগিয়েছিলো এই দেশটি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ইঙ্গিত ও অগ্রগতির আলোকে, জাতিসংঘের সুরক্ষা কাউন্সিল ২০০১ সালে খার্তুমের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। কিন্তু এ সত্ত্বেও খার্তুম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী তালিকায় ছিলো, কেনোনা খার্তুম তখনও হামাস এর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলো, যে সংগঠনটিকে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ সন্ত্রাসবাদী হিসেবে মূল্যায়ণ করে থাকে। একই সাথে মার্কিনীদের অভিযোগ, সুদান অন্যান্য দেশ থেকে জঙ্গিদের ইরাকে ট্রানজিটের ব্যবস্থা করে দিয়ে ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ তরান্বিত করেছিলো।
.

আল কায়েদা ও বিন লাদেনের সাথে সুদানের যোগসূত্র :

আল-কায়েদার সাথে সুদানের ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। ১৯৯১ সালে আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন সৌদি আরব ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে তিনি খারতুমে চলে আসেন। যেখানে তিনি সুদান সরকার কর্তৃক সুরক্ষিত একটি বাড়িতে ছিলেন। একই সময়ে সুদানের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যে ইসলামিক আইন জারি হয়েছিল। বিন লাদেন যখন সুদানে ছিলেন, তখন আল-কায়েদা বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। ১৯৯২ সালে দলটি সোমালিয়া যাওয়ার পথে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ইয়েমেনের দুটি হোটেলে বোমা নিক্ষেপ করে। ১৯৯৫ সালে আল-কায়েদা মিশরের রাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে হত্যার প্রয়াসে অংশ নিয়েছিলো। ১৯৯৫ সালে রিয়াদ এবং ১৯৯৬ সালে খোবার টাওয়ারগুলিতে বোমা হামলার অভিযোগ ছিলো বিন লাদেনের বিরুদ্ধে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের চাপের মুখে সুদান ১৯৯৬ সালে বিন লাদেনকে বের করে দেয় এবং তিনি আফগানিস্তানে তার ঘাঁটি পুনঃস্থাপন করেন। পরবর্তী চার বছর পরে সুদান সরকার সুদানের আল-কায়েদার সমস্ত ঘাঁটি উপড়ে ফেলতে শুরু করে। তবে ২০০৬ সালে, সুদানের সাথে বিন লাদেনের সম্পর্ক পুনরায় উত্থিত হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ দারফুর যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণের প্রস্তাব দেওয়ার পরে বিন লাদেন একটি টেপ প্রকাশ করেছিলেন, যাতে তাঁর অনুসারীদের জাতিসংঘের সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সুদান যেতে বলা হয়েছিলো। পরের বছর বিন লাদেনের ডেপুটি আইমান আল জাওয়াহিরি এবং লাদেন নিজেই অনুরূপ বার্তা পুনরাবৃত্তি করেছিলেন।

সুদানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ হামদোক এবং সুদান গণ-মুক্তি আন্দোলনের উত্তর বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল-আজিজ আল-হিলু সুদানকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র করতে ইথিওপিয়ার রাজধানী অ্যাডিস আবাবার-এ একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন
সুদানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ হামদোক এবং সুদান গণ-মুক্তি আন্দোলনের উত্তর বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল-আজিজ আল-হিলু সুদানকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র করতে ইথিওপিয়ার রাজধানী অ্যাডিস আবাবার-এ একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন

অবশেষে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার পথে সুদান :

বহু সমীকরণ, ধ্বংসযজ্ঞ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরে ৩০ বছর যাবৎ ইসলামি শাসন ব্যবস্থার পরিমণ্ডলে থেকে সন্ত্রাসবাদী ও ইসলামিক জেহাদি কার্যক্রমে অভ্যস্ত আফ্রিকার এই দেশটি অবশেষে ধর্মনিরপেক্ষ সুদান গড়ার ঘোষণা দিয়েছে যা সেকুলারিজমের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো খবর। গত ৩রা সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং তারিখে সুদানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিতে ইসলামী শাসনের ৩০ বছরের অবসান ঘটিয়ে তাদের রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র করতে সম্মত হয়েছে। সুদানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ হামদোক এবং সুদান গণ-মুক্তি আন্দোলনের উত্তর বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল-আজিজ আল-হিলু এই নীতিটি গ্রহণ করে বৃহস্পতিবারসুদানকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত করার জন্য ; সমস্ত নাগরিকের অধিকার সন্নিবেশিত একইসাথে ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখতে সংবিধান অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়। সুদান গণ-মুক্তি আন্দোলনের উত্তর বিদ্রোহী দলটি, দারফুর ও সুদানের অন্যান্য অংশে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক ওমর আল-বশিরের অধীনে লড়াইয়ে সমাপ্তির আশা জাগ্রত করার পরে সরকার এই বিদ্রোহী বাহিনীর সাথে একটি শান্তি চুক্তি করার এক সপ্তাহেরও কম সময় পরে এই চুক্তিটি হয়েছে। দেশটির সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে সুদানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট-নর্থের বৃহত্তর দলই এমন ধরনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছে, যা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে না।

.

সুদানের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার এই সিদ্ধান্ত সন্দেহাতীতভাবে ইতিবাচক ও উত্তর আফ্রিকার জন্যও কল্যাণকর। যেসব রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষতার বিজ্ঞাপন দিয়ে দিনের পর দিন রাষ্ট্রকেই ধর্মের মোড়কে পুরতে চাইছে, ৩০ বছর ধরে ইসলামিক শাসনে চলা ক্ষতিগ্রস্ত এবং অনগ্রসর সুদান তাদের জন্য জীবন্ত ও প্রমাণিত উদাহরণ। আমাদের বুদ্ধিজীবি, প্রগতিশীল কিংবা চেতনাবাজ মহলদেরও এখনও সময় আছে হুঁশে ফিরে আসার। নয়তো আমরাই বিদ্রোহীর কবির সেই পঙতিতে পরিণত হব!
.
বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে,
আমরা তখনও বসে –
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি,
ফিকাহ ও হাদীস চষে..

 

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

82 − 80 =