স্ট্যানলি কা ডাব্বা : ডাব্বার আড়ালে জীবনের রহস্য

স্ট্যানলি কা ডাব্বা সিনেমার একটি দৃশ্য
 
স্কুলে যেতে হতো প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। প্রথম প্রথম নদীতে ট্রলার চলতো – ফলে তাতে চেপে স্কুলে যেতাম৷ ভাড়া ২ টাকা; যেতে-আসতে ৪ টাকা। বাড়ি থেকে মা ১০ টাকা দিতো। যা থেকে যাতায়াত খরচ বাদ দিয়ে বাকি টাকায় টিফিন পিরিয়ডে কিছু খেয়ে নেয়া। স্কুলে ভর্তির পর প্রথম প্রথম প্রথম টিফিন ব্যাপারটির সঙ্গে পরিচিতি ছিলো না। ফলে শহুরে আধুনিক ছেলেমেয়েদের লাঞ্চ বক্সের দিকে তাকিয়ে থেকে স্কুলের পাশের দোকান থেকে ৫ টাকা দিয়ে বুট ভাজা কিনে পকেটে পুরে নিতাম এবং টিফিনের ৩০ মিনিট সেগুলো চিবিয়ে গ্লাস ভরে পানি পান করেই পরের ক্লাসগুলোতে উপস্থিত হতাম। এভাবে অবশ্য বেশিদিন যায় নি। অন্যের লাঞ্চ বক্স দেখে বাড়ি ফিরে লাঞ্চ নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরেছিলাম। কিন্তু তখন মায়ের হাতে টাকা না থাকায় নতুন লাঞ্চ বক্স কেনা হয় নি, টিফিন পিরিয়ডে খাওয়ার জন্য খাবার নেয়াও হয় নি।
স্কুলের সময়টা ধীরে ধীরে বেড়েছে, পরিচিত হয়েছি – বন্ধু জুটেছে। তাদের মধ্যে অনেকে লাঞ্চ বক্সে করে খাবার নিয়ে আসতো। কখনো ওরা বললে ভাগ বসাতাম কিংবা টাকা না থাকায় বুট চিবুনোর বদলে নিজেই ভাগ চেয়ে বসতাম। কখনো দিতো কখনো না মুখের উপরেই না বলে দিতো। তখন খারাপ লাগতো। অবশ্য ছোট বয়স – অত কিছু বুঝার উপায় কই!
যাক সে সব কথা। এসব কথা হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেলো, ‘স্ট্যানলি কা ডাব্বা’ সিনেমা দেখতে দেখতে।
কিন্তু আমার জীবন আর সিনেমার স্ট্যানলির জীবমের বাস্তবতা আলাদা। তবে দুজনেরই ডাব্বা বা লাঞ্চ বক্স না থাকার রহস্য একই। জীবন বাস্তবতায় স্ট্যানলি এক মেরুতে আমি আরেক মেরুতে। পরিবার, সংসারে থেকেও একেবারেই ভিন্ন কারণে কপালে লাঞ্চ বক্স জুটে নি৷ কিন্তু স্ট্যানলির ডাব্বা না থাকার সঙ্গে পরিবার, সংসার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। তবুও নানা ছলনায় সে বন্ধুদের কাছ থেকে ডাব্বা না থাকার রহস্য যলমন লুকিয়েছে, তেমন লুকিয়েছে নিজেকে।
কিন্তু স্ট্যানলি তার সরল শিশুসুলভ আচরণ দিয়ে জয় করে নিয়েছে ক্লাসের বন্ধুদের মন। ডাব্বা কেনো নেই? এ প্রশ্ন না করেই বন্ধুরা তাকে ভাগ দিয়েছে।
কিন্তু এখানে হিন্দি বিষয়ের শিক্ষক বাবুভাই বার্মা স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের ডাব্বায় ভাগ বসান। ফলে তিনি স্ট্যানলিকে যেনোতেনো উপায়ে সরাতে চান যাতে তার ভাগে খাবার অক্ষত থাকে। এমনকি স্ট্যানলিকে ডাব্বা ছাড়া স্কুলে আসতে না করেন!
এক পর্যায়ে স্ট্যানলি স্কুল আসা বন্ধ করে দিলে মি. বার্মার উপলব্ধি হয়। এবং বেশ কঠিনভাবেই স্ট্যানলি মি. বার্মার আদেশের জবাব দেন চার বাটিওয়ালা ডাব্বা ভরে খাবার এনে।
সিনেমার দূর্দান্ত বিষয় হলো এর গল্প এবং তার সুন্দর চিত্রায়ন। অমল গুপ্ত এর আগে ‘তারে জামিন পার’ লিখে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। ‘স্ট্যানলি কা ডাব্বা’ লেখনিতেও যেমন সুনিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন তেমন নির্মাণে দেখিয়েছেন অসাধারণ দক্ষতা। ‘তারে জামিন পার’ও আমির খানের সঙ্গে যৌথভাবে অমল গুপ্ত নির্মাণ করেন।
এছাড়াও অভিনয়ে যে অমল গুপ্ত কম যান না – সেটি প্রমাণ পাওয়া যায় এ সিনেমায়। বাবুভাই বার্মা চরিত্রে বেশ দারুণ অভিনয় করেছেন তিনি। তবে সব কিছুকে ছাঁপিয়ে গিয়েছে স্ট্যানলি চরিত্রে অভিনয় করা পার্থ গুপ্ত।
আমাদের সমাজের প্রত্যেকটি স্ট্যানলির প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠেছে পার্থ গুপ্ত। জীবনের চরম বাস্তবতাগুলো পাশে সরিয়ে রেখে মেতে উঠেছে বন্ধুদের সঙ্গে হাসিতে।
সংলাপ, এক্সপ্রেশন দিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করা প্রতিটি বাচ্চাই বেশ ভালো অভিনয় করেছে। যেটা পুরো সিনেমাকে সুন্দর ও গোছালো ভাবে উপস্থাপন করে। পুরো সিনেমা জুড়ে অভিনয় ফলানোর কসরত করে নি কেউ। ফলে চোখে লাগার মত ত্রুটি নেই বললেই চলে৷ তাছাড়া প্রত্যেকের সাবলীল অভিনয় বিশেষ করে স্ট্যানলি চরিত্রের পার্থ গুপ্তকে বরাবর একজন অভিজ্ঞ অভিনেতা-ই মনে হবে।
সিনেমার একটি দৃশ্য
এদিকে জীবনের বাস্তবতা ও ডাব্বা না থাকার কাহিনীর বাইরে সিনেমায় ফুটে উঠেছে বাচ্চাদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের বিষয়টি। ইংরেজি শিক্ষিকা রোজি (দিব্যা দত্ত) চরিত্রটির মাধ্যমে বন্ধুসুলভ আচরণ এবং হিন্দি শিক্ষক বাবুভাই বার্মা (অমল গুত) এবং সাইন্সের শিক্ষিকা মিস আইয়ার (দিব্যা জাগদাল) এর রুক্ষ্ম আচরণের তফাৎ তুলে ধরে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে শিশুদের সঙ্গে শিশুদের মন মত আচরণটা জরুরী, ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়া জরুরী। অ্যাকাডেমিক পড়ার বাইরেও কিছু বিষয় থাকে যেগুলোতে বাচ্চাদের আগ্রহ বেশি। ফলে কেবল পাঠপুস্তক নয় সে সব বাইরের বিষয়গুলোতে বাচ্চাদের যুক্ত করা এবং মনযোগ দিয়ে বাচ্চাদের সে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া উচিত।
 
সিনেমায় গানের ব্যবহার খুব বেশি নয়। যতটুকু ছিলো গল্পের প্রাসঙ্গিকতা ধরে তা ফুটে উঠেছে।
সিনেমাটোগ্রাফিতে আহামরি চাকচিক্যতা ফুটিয়ে তোলার মাথা ব্যথা ছিলো না। যার ফলে বেশ সাধারণভাবেই গল্পের সঙ্গে মিশে গিয়েছে।
 
শেষমেশ, অমল গুপ্তের একটি শিশুসুলভ মন রয়েছে বলেই তার থেকে কয়েকটি শিশুদের মনস্তত্ব বুঝার মত সিনেমার গল্প কলমের ডগায় এসেছে। এবং লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের খেলায় ডানা মেলে ইচ্ছে মত খেলেছে, দৌঁড়েছে। সিনেমার সাধারণ ঘটনা প্রবাহ নিয়ে নিজের কতকগুলো কথা জুড়ে দিয়েছে। আড়ালে রেখে দিয়েছি স্ট্যানলি কা ডাব্বা ও চার বাটিওয়ালা ডাব্বা ভর্তি খাবারের রহস্য।
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 + = 42