বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০] ! পর্ব : ৫

[১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু মারা না গিয়ে বেঁচে উঠলে কিভাবে চালাতেন তিনি আজকের বাংলাদেশ! বহুদলীয় শাসনে বাংলাদেশ কি ভাল আছে এখন! একদলীয় শাসনের চীনের থেকে? তার রূপক গল্প হচ্ছে এটি! বড় বিধায় প্রত্যহ রাত ৮-টায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হবে জীবন চিন্তনের এ গল্প!]

:

পচাত্তর ও একাত্তরের ঘাতকরা পবিত্র বাংলাদেশ থেকে নির্মূল হওয়ার প্রেক্ষিতে সামনে দেশ গড়ার প্রশ্নটি চলে আসে স্বাভাবিক গতিতেই। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ নির্দেশে গঠিত ‘‘১০০-সদস্যের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি’’ জারীকৃত ও সংসদ অনুমোদিত তৃতীয় প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ আসে সামনে। যে কারণে ৩য় আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল তার মুখবন্ধে বলা হয়েছিল – সমাজের সর্বত্র দুর্নীতি ও সমাজ বিরোধী কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা প্রতিরোধে বর্তমানে প্রচলিত ঢিলেঢালা আইনের পরিবর্তে সাময়িক সময়ের জন্য ‘কঠোর আইন’ প্রণয়ন করা। যাতে ঘুষ, দুর্নীতি, মজুদদারী, হাইজ্যাক, গুপ্তহত্যা, লুটপাট, কালোবাজারী, স্বজনপ্রীতি, ভেজাল, হরতাল, ধর্মঘট, ট্রেড ইউনিয়নবাজি, সিন্ডিকেট, টেন্ডারবাজি বন্ধের জন্যে জারীকৃত ৩ নং প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রবর্তিত হয় ‘‘রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকারক ব্যক্তি নিধন আইন-১৯৭৫’’। এ আইনে দেশের জন্যে যে কোন ধরণের ‘ক্ষতিকর’ কাজের জন্যে সরাসরি বিচার করে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। যেমন কোন ড্রাইভার বিনা লাইসেন্সে, জাল লাইসেন্সে কিংবা ট্রাফিক আইন ভেঙে অন্যকে চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি করছে কিংবা কাউকে আহত করেছে কিংবা কোন ব্যক্তি অফিসে ফাইল আটকিয়ে ঘুষ দাবী করছে কিংবা খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছে বা ইভ টিজিং করছে কিংবা ফতোয়া দিচ্ছে নারীর প্রতি ইত্যাদি। এমন ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্যে অবশ্যই ক্ষতিকর বিধায়, স্পটেই তাকে ধরে খোলা-মাঠে বা স্টেডিয়ামে বিচার বসিয়ে তাৎক্ষণিক কঠোর শাসিত্ম কার্যকর করা এবং তা সরাসরি রেডিও-টিভিতে ব্যাপক প্রচার করা যে, ‘এরূপ অপরাধ করলে শাস্তি কি হতে পারে’। সরাসরি দেখানোর মাধ্যমে জনগণকে আইনভঙ্গের ভয় ও শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করা।

যানজট নিরসনে রাস্তায় আর্মির সকল পর্যায়ের সেনাদের তদারকিতে সকল ফুটপাত মুক্ত করা, যাতে পথচারীরা ফুটপাত ছাড়া রাস্তায় না হাঁটে এবং হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বিধায় হেঁটে চলার পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালাতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নির্দেশ দান। রাস্তার কেবল ১-টি বাম-লেনে লাইন ধরে রিক্সাসহ সকল অযান্ত্রিক যান চলাচলের ব্যবস্থা, ২য় লেনে ট্রাক-বাসসহ বড়-গাড়ি এবং ৩য় লেনে ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার চলাচলের কঠোর ব্যবস্থা। যাত্রীবাহী বাস কোথাও অপেক্ষা না করে কেবল ১-মিনিটে যাত্রী নামিয়ে-উঠিয়ে আবার গন্তব্যে যাত্রা করা, বিশেষ খালি স্থান বা মাঠ ছাড়া রাস্তার পাশে কোন রিক্সা-বাস-গাড়ি-ট্যাক্সি ইত্যাদির পার্কিং তথা না দাঁড়ানো। গাড়ি বা রিক্সা যাত্রী নামিয়েই আবার যার যার গন্তব্যে বা পার্কিংয়ে চলে যাবে এ আইনে তা নিশ্চিত করা। আইন ভঙ্গকারীকে ‘‘রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকারক ব্যক্তি নিধন আইন’’-এ ফেলে তার গাড়ি রাষ্ট্রের অনুকুলে তাৎক্ষণিক বাজেয়াপ্ত ও ব্যক্তিকে নিধন করার ব্যবস্থা করা। আন্দোলনের নামে দোকান, বাস-গাড়িসহ রাষ্ট্রের কোন সম্পদ ধ্বংস করা হলে, তা ধ্বংসকারীদের জায়গাজমি ক্রোক করে বিক্রির মাধ্যমে আদায় করার ব্যবস্থা, ক্ষতিপুরণ হিসেবে তা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে প্রদান এবং ব্যক্তিকে ‘‘রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকারক ব্যক্তি নিধন আইন’’-এ শাস্তি দেয়া। যে সকল বাস, ট্যাক্সি ইত্যাদিতে নির্ধারিত ভাড়া বা মিটারের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দাবী করবে, তাদেরকে ‘‘রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকারক ব্যক্তি নিধন আইন’’-এ শাস্তি দেয়া ও গাড়ি রাষ্ট্রের অনুকুলে তাৎক্ষণিক বাজেয়াপ্ত করে পুলিশকে ব্যবহারের জন্য দেয়ার ব্যবস্থা করা। মোটকথা প্রতারণা, ঘুষ, ভেজাল, ওজনে কম দেয়া, চাঁদাবাজী, ফুটপাত দখল করাসহ যে কোন ক্ষতিকর কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে ‘‘রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকারক ব্যক্তি নিধন আইন’’-এ শাস্তি দেয়া। এ ধরনের কঠোর শাস্তির কারণে হয়তো দেশের কিছু মানুষ মারা যাবে কিন্তু পরবর্তী জেনারেশন ও বর্তমান আইন মেনে চলা সৎ নাগরিকগণ এ আইনের সুফল ভোগ করবে অনেকদিন।

:

সর্বোপরি ‘জনসেবা’কে যে সকল সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘ব্রত’ হিসেবে গ্রহণ না করে, কেবল মানুষকে হয়রানি ও ঘুষের জন্যে ওঁৎ পেতে থাকে, তাদের ধরার জন্যে নিবেদিনপ্রাণ তরুণ গোয়েন্দাদের গোপনে নিয়োগ করা এবং হাতেনাতে ধরার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘‘রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকারক ব্যক্তি নিধন আইন’’-এ তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদান তথা নিধন করা। চলমান ক্ষয়িষ্ণু চিন্তাধারায় যে কোন ভাবে অর্থ কামানোর চরম ‘ভোগবাদী’ আদর্শের পরিবর্তে, সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে কম খেয়ে হলেও শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার আদর্শ শিক্ষা দেয়া এবং বর্ণিত অপরাধ হ্রাসের পর সাময়িকভাবে প্রচলিত ‘‘রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকারক ব্যক্তি নিধন আইন’’ বাতিল করে, বিশ্বের গণতান্ত্রিক আইন পুন. প্রবর্তন করা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বর্ণিত কঠোর আইনটি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে অল্পদিনেই পতিতাবৃত্তি, ভিক্ষাবৃত্তি, ঘুষ, ভেজাল, দুর্নীতি, সরকারি সম্পত্তির খেয়ানত, ভূমি আত্মসাত, অবরোধ, হরতাল, হত্যা, গাড়ি ভাঙচুর বন্ধ হয় এবং দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসে সর্বত্র। আবার মানুষ অন্তহীন বেদনার রাজ্যে ধানজোৎস্নায় প্রজাপতির খেলা খুঁজে পায়।

 

পচাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠাতে বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশ্যে বলেন, ‘‘বায়াত্তর থেকে পচাত্তর পর্যন্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে দাঁড় করাতে নানাভাবে সময় নষ্ট হয়েছে আমাদের। আমরা দেশকে আজ থেকে ঘাতক-রাজাকারমুক্ত অসাম্প্রদাvায়ক বাংলাদেশের ঘোষণা দিলাম। এখন ৮-কোটি মানুষকে রক্ষা ও বিশ্বের বুকে দুর্নীতিমুক্ত জাতি হিসেবে মাথা তুলে সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড়ানোর জন্যে কৃষি, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ক্ষেত্রে উন্নয়ন ছাড়া আমাদের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে একটি সম্মানজনক অবস্থানে নেয়ার আগ পর্যন্ত এদেশে নিজের স্বার্থসিদ্ধির নামে ছাত্ররাজনীতি, ট্রেড-ইউনিয়নবাজী, হরতাল, অবরোধ-ধর্মঘট, যত্রতত্র সভা-সমিতি, পোস্টারিং, ধর্ম-ব্যবসা, মাইকিং ইত্যাদি বন্ধ থাকবে। আমদানী নির্ভর দেশ থেকে বাংলাদেশকে রপ্তানীমুখী দেশে পরিণত করতে হবে ১০-বছরের মধ্যে। জনগণের মৌলিক স্বার্থগুলো দেখবে সমাজের সর্বস্তর থেকে নেয়া ১০০-সদস্যের সৎ ও নিরপেক্ষ কমিটি। এই কমিটি ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত যে কোন নাগরিক ‘দুর্নীতি উচ্ছেদ ও প্রতিরোধ কমিটির’ কাছেও প্রতিকারের জন্যে যেতে পারবে। মোট কথা দেশ কারো স্বার্থে পরিচালিত হবেনা, হবে সাধারণ মানুষের স্বার্থে। দুর্নীতি আর অনিয়ম করলে সরকারে আছে এমন ব্যক্তি কিংবা কাউকেই ছাড় দেয়া হবেনা। এটি আমার ২য় জন্মে দেশ শাসন সুতরাং ভয়ভীতির প্রশ্নই আসেনা। ২য় মৃত্যুকে মুজিব কখনো ভয় করবে না, এ ব্যাপারে কারো সঙ্গে আপোষ করবে না শেখ মুজিব’’। দেশ গঠনের সকল কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্যে তিনি জনগণের প্রতিশ্রম্নতি আদায় করেন। অপ্রাপ্তির অমানিশায় ভাসমান মানুষ আবার সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বজ্র নিনাদে দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘরে ফিরলো।

 

মুক্তিযোদ্ধাদের কাজে লাগানোর জন্যে বঙ্গবন্ধু পচাত্তরের শেষ দিকেই তাদের একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করার নির্দেশ দেন। তালিকা সমাপ্তির পর সকল মুক্তিযোদ্ধাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান বঙ্গবন্ধু। তিনি নিজে একাত্তরের চেতনায় তাদের দেশ গড়ার শপথ পাঠ করান। স্বাধীনতার সুফলকে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্যে তিনি দেশের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মুক্তিযোদ্ধাদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা করেন। সে লক্ষ প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে একাত্তরের চেতনায় ঘরে ফিরে গিয়ে জনস্বার্থে দেশ গড়ার জন্যে যার যার ইউনিয়নে একটি ‘ইউনিয়ন উন্নয়ন কমিটি’ গঠনের নির্দেশ দেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা নিজ নিজ এলাকার আত্মত্যাগী মনোভাব নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে জনস্বার্থে খাল খনন, সেচ কার্যক্রম, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর ভাঙন প্রতিরোধ, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, দুর্বল-বিধবা-বৃদ্ধদের সহায়তা কার্যক্রম, আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নে পুলিশ বাহিনীকে সহযোগিতা, গ্রাম্য ছোটখাটো বিরোধ মিমাংসার দায়িত্ব, ঘুষ-দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারি উন্নয়ন কর্মকান্ডে চুরি প্রতিরোধ ইত্যাদি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে। এর সুফল কিছুদিনের মধ্যেই পাওয়া যায় হাতে-হাতে, দেশ থেকে অনিয়ম অনাচার অধিকাংশ দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। বিছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সারা দেশের সাধারণ মানুষ এই কমিটির সাথে সম্পৃক্ত হন নিজ স্বার্থেই এবং নিজ নিজ এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটান অল্পদিনেই। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত দাবীর প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্লোগান ‘জয়বাংলা’কে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রীয় শ্লোগান’ হিসেবে গ্রহণ ও অবিলম্বে তা সংসদে অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্যে প্রজ্ঞাপন জারীর নির্দেশ দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অপর দাবী, সম্রাট আকবর প্রবর্তিত বাঙালি জাতির ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন পুরণো ‘বঙ্গাব্দে’র পরিবর্তে স্বাধীনতার প্রথম বছর থেকে ‘মুক্তিসন গণনা’র নির্দেশ দিলেন বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয়ভাবে। অর্থাৎ ১৯৭১-কে ধরা হলো ১-মুক্তিসন। যেমন ১৯৭১ -এর পহেলা বৈশাখ হলো মুক্তিসনের ১ম বছরের পহেলা বৈশাখ। যা ২০২০ সনের পহেলা বৈশাখ হলো ৫০-মুক্তিসন। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা উল্লিখিত কমিটি গঠনের মাধ্যমে নানারূপ ‘অপকম’র্ তথা ‘আখের-গুছানো’ শুরু করলে, বঙ্গবন্ধু কঠোর হাতে তা দমন করেন। ঘটনার সত্যতা পেয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে প্রথমে তাদের নাম বাদ দিয়ে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেন ও ফৌজদারী আইনে তাৎক্ষণিক জেলে প্রেরণ করে ভবিষ্যতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের স্বীকৃতি স্থগিত করে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করে গেজেট প্রকাশ করেন।

:

[৬ষ্ঠ পর্ব পোস্ট করা হবে আগামিকাল রাত ৮:০০ টায়]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

78 − = 74