ভালোবাসা কারে কয়?

 

লেখা শুরুর পূর্বে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি অভিজিৎ রায় এবং সে সমস্ত শহীদদের, যারা ভালোবাসার (সমকামিতা) জন্য জীবন দিয়েছেন প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে…

আমাদের পরতে পরতে যৌনতা। যেদিকে তাকানো যায় যৌনতার বাইরে কিছুই দেখা যায় না, কেবলমাত্র টেলিফোন ডিরেক্টরি ছাড়া। মানে বার্নাড শ বলেছিলেন, যৌনতা সব জায়গাতেই কম বেশি পাওয়া যায়, কেবল টেলিফোন ডিরেক্টরি ছাড়া।

মানব সভ্যতা, শিল্প-সাহিত্য থেকে শুরু করে শহরের অলিতে গলিতে, চায়ের দোকানে সব জায়গাতেই যৌনতা। মহাকবি কালীদাসের মেঘদূত, সে কি পেরেছে যৌনতাকে সরিয়ে রেখে মহাকাব্য হতে? কিংবা হালের কবি, লেখকরা – যৌনতার গর্ভ থেকে শব্দ বের করে আনছে প্রতি সময়, গল্প লিখছে যৌনতার কোলে বসে। পৃথিবীর যত যুদ্ধবিগ্রহ তার মূলে যৌনতা। তাছাড়া আমাদের সংস্কৃতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে যৌনতা। ঐতিহ্যবাহী পুরীতে বিভিন্ন মন্দিরে স্থান পেয়েছে যৌনকর্মে লিপ্ত নারী-পুরুষ সহ পশুদের মূর্তি। শুধু কি পুরী! উপমহাদেশের অধিকাংশ পুরাকীর্তি দাম্বিকতার সঙ্গে যৌনতার ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ সুতরাং আপনি চাইলেই যৌনতাকে এড়িয়ে চলতে পারবেন না। আমরা প্রকৃতিগতভাবে সকলেই যৌনতারে সঙ্গে গলা জড়াজড়ি করে রয়েছি। তবে এ থাকাকে আমাদের এ উপমহাদেশে স্বীকৃতি দিয়েছে স্রেফ বংশবিস্তারের মাধ্যম হিসেবে। ফলে স্বাভাবিক যৌনতার বিষয়টি এ অঞ্চলে এক প্রকার সমাজ বহির্ভূত এবং পাপ কাজ। তারচেয়েও বড় পাপের সমলিঙ্গের যৌনতা। ঘৃণিত, বিকারগ্রস্থ, কুরুচিপূর্ণ কাজ হিসেবে গণ্য সমকামিতা। এমনকি নাক ছিটকাতে ছিটকাতে প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ বলে অভিহিত করা হয়ে গেছে। কিন্তু আদতে সমকামিতা প্রকৃতিবিরুদ্ধ?

এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় লিখেছে সমকামিতা নামক একটি বই। সেখানে তিনি কয়েকটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করা হয়েছে, সমকামিতা জন্মগত এবং প্রাকৃতিক। তবে অনেকের ক্ষেত্রে আচরণগতও। মানুষের মস্তিস্কে হাইপোথ্যালমাস নামে একটি অঙ্গ রয়েছে। যা মানুষের যৌন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে। সিমন লিভের শরীরবৃত্তীয় গবেষণা থেকে জানা গেছে এই হাইপোথ্যালমাসের interstitial nucleus of the anterior hypothalamus (INAH3) অংশটি সমাকামিদের ক্ষেত্রে আকারে অনেক ভিন্ন হয়। তাছাড়াও আমাদের ক্রোমজমের একটি অংশ সমকামিতা ত্বরান্বিত করে। যেটি ডিন হ্যামার গবেষণা করে বের করেছেন। ফলে সমকামিতা প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনকর্ম এটি বলার কোনো অবকাশ নেই। এরপরেও যারা বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা সমকামিতাকে মহাপাপ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। কিন্তু কোরানের বেশ কিছু সুরায় স্পষ্ট করে বেহেশতে গেলমানের (কিশোর বালক) ভোগের কথা বলা হয়েছে। তবু যারা সমকামিতা নিয়ে নাক ছিটকায় তাদেরকে মানসিক প্রতিবন্ধী বৈ ভিন্ন কিছু বলা যায় না। আর যৌনতা স্রেফ বংশ বিস্তারের লক্ষ্যে নয়। এ বিষয়টি বুঝা জরুরী। কেননা এককোষী প্রাণী, কিছু পতঙ্গ, কিছু সরীসৃপ, কিছু উদ্ভিদ অযৌন জনন প্রক্রিয়ায় বংশ বিস্তার করে থাকে। ফলে বিস্তারের লক্ষ্যে যৌনতা বিষয়টি এ উপমহাদেশের মূর্খ প্রলাপ।

 

সিনেমায় শ্রী রামচন্দ্র সিরাজ চরিত্রে অভিনয় করেন মনোজ বাজপেয়ী

 

সমকামিতা নিয়ে উপরের এত কথা বলার কারণ হলো, ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মারাঠি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং আধুনিক ভাষা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শ্রী রামচন্দ্র সিরাজের ঘরে জোরপূর্বক ঢুকে তার এবং তার সঙ্গী, যার সঙ্গে স্বেচ্ছায় তিনি যৌন সম্পর্কে জড়িত হতেন – সে রিক্সাঅয়ালা যুবকের ভিডিও ধারন করে এবং তাদের দুজনকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিপীড়ন করে। পর দিন সমকামিতার অভিযোগে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর প্রেক্ষিতে রামচন্দ্র সিরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে মামলা করেন। যে মামলায় শ্রী রামচন্দ্র সিরাজ জয়ী হন এবং অধ্যাপক হিসেবে চাকরী ফিরে পান। কিন্তু মামলায় জয়ী হওয়ার ঠিক ৯দিন পর অর্থাৎ ১০ এপ্রিল সিরাজকে তার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তের পর সিরাজের শরীরে বিষের চিহ্ন পাওয়া যায়। এরপর একটি মামলা দায়ের হয় এবং ছয়জনকে সন্দেহ বশত গ্রেফতার করা হয়েছিলো। কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়া সে মামলা বন্ধ করে দেয়া হয়।

 

আলীগড় সিনেমার একটি দৃশ্যে মনোজ বাজপেয়ী

শ্রী রামচন্দ্র সিরাজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে ২০১৫ সালে হানসেল মেহেতা আলীগড় নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করেন। সিনেমাটি সিরাজ ও তার সঙ্গীর সঙ্গে ঘটা ঘটনা, মামলা এবং মৃত্যু নিয়ে সিনেমার চিত্রনাট্য সাজানো হয়েছে। সিনেমায় শ্রী রামচন্দ্র সিরাজ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মনোজ বাজপেয়ী। সমকামীরা স্বভাবে বেশ শান্ত এবং যথেষ্ট মানবিক হয়ে থাকে। মনোজ বাজপেয়ী তার অভিনয় দিয়ে সে বিষয়টিকে এত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে কয়েকটি দৃশ্যে দর্শককে নির্বাক, এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে হয়। এছাড়াও তার সরল চলন এবং বাক্যালাপ দর্শকের হৃদয়ে ভালোবাসার জন্ম না দিয়ে পারে না। সিনেমায় সাংবাদিক সিবাস্তিয়ানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রাজকুমার রাও। একেবারে আলাদা রাজকুমার রাও। হাঁটা-চলা, সংলাপ এমনকি চিরচেনা রাজকুমার রাও এ সিনেমায় মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়ে উপস্থিত হয়েছে। বাকি চরিত্রের প্রভাব সিনেমা জুড়ে বেশ কম। ফলে বিশেষ করে বলবার কিছু নেই।

তবে সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে অভিনেতাদের আবেগ সিনেমার বড় সম্পদ। শ্রুতিমধুর সংলাপের জন্য অপূর্ব আস্রানি প্রশংসার দাবিদার।

সিনেমায় যৌনতাকে স্বাভাবিকভাবেই দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে রাজকুমার রাও ও তার কলিগ নমিতা চরিত্রে দিলনাজ ইরানীর মধ্যে চুমুর দৃশ্য দিয়ে বুঝানো হয়েছে যৌনতা সাধারণ, স্বাভাবিক বিষয়। এ নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করার কিছু নেই। মাথা ব্যথা হওয়ার কোনো কারণ নেই।

 

ছবি : সংগ্রহীত

 

ইতি টানতে গিয়ে বলতে হয়, শরীর যেহেতু আমার অনুভূতিও আমার এবং সেটা কোথায় প্রকাশ পাবে কোথায় পাবে না সেটাও নিশ্চই আমিই করবো! তাহলে অন্যদের কেনো এত সমস্যা? অবশ্য এ উপমহাদেশে এখন ৩৭৭ ধারা, যে আইনে সমকামিতা সহ সকল প্রকার পায়ুপথে যৌনকাম নিষিদ্ধ তা ইতোমধ্যে বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু বিষয়টি তো আইনের নয়, মানসিকতার। সুতরাং আইনের সঙ্গে সঙ্গে মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য কাজ করাটা জরুরী।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

86 − = 76