বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০] ! পর্ব : ৬

[১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু মারা না গিয়ে বেঁচে উঠলে কিভাবে চালাতেন তিনি আজকের বাংলাদেশ! বহুদলীয় শাসনে বাংলাদেশ কি ভাল আছে এখন! একদলীয় শাসনের চীনের থেকে? তার রূপক গল্প হচ্ছে এটি! বড় বিধায় প্রত্যহ রাত ৮-টায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হবে জীবন চিন্তনের এ গল্প!]
:
বর্ণিত শাস্তি কার্যক্রম গ্রহণ শেষে প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাক্ষেত্রে হাত দিলেন বঙ্গবন্ধু। অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে বাঙালিকে বিশ্বে মর্যাদার লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্যে গ্রামীণ-শহুরে মাদ্রাসা-টোল-মঠ, ক্যাডেট, কেজিস্কুলসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই পর্যায়ের সরকারি বিদ্যালয়ে রূপান্তরের নির্দেশ জারী করলেন রাষ্ট্রীয়ভাবে। প্রাথমিক স্কুলগুলোকে শিশুদের আনন্দের কেন্দ্রে পরিণত করা, সকল মাধ্যমিক স্কুলগুলোকে কৃষি ও টেকনিক্যাল স্কুলে রূপান্তর করে স্কুলগুলোকে উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত করার নির্দেশ দিলেন তিনি। শিক্ষকতায় জাতির মেধাবীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্য একই বেতনস্কেলে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একই মানের শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করলেন একটি কমিশনের মাধ্যমে। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ডিজিটাল বই’র ব্যবস্থা হলো সোভিয়েত টেকনিক্যাল সহযোগিতায়। প্রতি জেলায় ১-টি করে ‘পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন করা হলো, বাধ্যতামূলক ফ্রি এডুকেশন চালু হলো সর্বত্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা, মানবিকতা, সমাজ বাস্তবতা, অবৈধ ধন আহরণের মোহ ত্যাগ, ভোগবাদীর পরিবর্তে ত্যাগবাদী মানসিকতা, ধনমুখী শিক্ষার সামাজিক কুফল বর্ণনার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হলো। পাঠ্যসূচিতে তুলনামূলক ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলো সবার জন্যে, যাতে বাংলাদেশীদের ৪-টি ধর্ম ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য প্রধান ধর্মগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে পারে আধুনিক মানুষ হিসেবে। স্কুলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ‘তুলনামূলক ধর্মশিক্ষা’ বাধ্যতামূলক করা হয়। শিক্ষিত জাতি হিসেবে বাঙালি যেন ধর্মের গুরত্ব অনুধাবন করতে পারে ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন না হয়, ভবিষ্যত নাগরিকের জন্যে এটি তারই আগাম প্রস্ত্ততি।
বাংলা ভাষা বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘‘ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে সৃষ্ট ‘শতম’ ভাষার পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের মাধ্যমে ‘আর্য’ থেকে ‘সংস্কৃত’ হয়ে প্রাচীন প্রাচ্য, গৌড়ী প্রাকৃত, অপভ্রংশ, বঙ্গ কামরূপীর মাধ্যমে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সয়ে আজকের বাংলাকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষারূপে। অনেক কষ্টে অর্জিত এ ভাষার আধুনিকায়নের দিকেও তাকাতে হবে আমাদেরই। রচনা করতে হবে এ ভাষাটির আধুনিক একটি ব্যাকরণ। বর্ণগুলোকে করতে হবে সুসংহত, বিজ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক ও সহজতর। এ ভাষাটির ভাষিক গোষ্ঠী শুধু আমরা একা নই, আমরা আর পশ্চিম বাংলার মানুষ ছাড়াও ত্রিপুরা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম এমনকি ভুটান (ফুল্টসলিং)-এর মানুষেরাও এ ভাষাটি ব্যবহার করে। আমরা বাঙালিরা অতীতে কোন কর্মকাণ্ড একক ঐকমত্যে না পৌঁছতে পারলেও, কেবল এ ভাষাটির প্রতি মমত্ববোধের কারণেই বায়ান্নতে আমরা একত্র হয়েছিলাম এবং তার পরিণতিতে আমরা একাত্তরে স্বাধীনতার মত একটি বীরত্বসূচক যুদ্ধেও অংশ নিয়ে দেশটিকে স্বাধীন করেছি সম্ভবত ভাষাটির মর্যাদাবোধ রক্ষার্থেই। তাই এ ভাষাটিকে আধুনিক ভাষা হিসেবে বিশ্বে দাঁড় করানোর দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে এবং সে পথ যত বন্ধুরই হোক না কেন। যেহেতু আমাদের বর্তমান ব্যবহৃত বাংলা ভাষাটির মধ্যে রয়েছে অনেক সেকেলে অযৌক্তিক চিন্তা-সূত্র, যা পরিহার করে আমাদের ভাষাকে আধুনিক করা আবশ্যক, যাতে ভাষাটি বিশ্ব উপযোগী, সময় উপযোগী, যৌক্তিক এবং কম্পিউটার ব্যবহার উপযোগী হয়। মন, সের, ছটাকের বর্তমান আধুনিকায়নের সঙ্গে প্রচলিত জোড়া, গণ্ডা, পন (ইলিশ মাছ) বিড়া, চল্লি (পানের পরিমাপ একক) হালি (ডিম), ডজন (কমলা, কলা), কুড়ি (লিচু, তাল), পাখি, কানি (জমি), রিম (কাগজ), মাইল, গজ, ফুট ইত্যাদি সপ্তপদী পরিমাপের একক পরিহার করে, সবার কাছে সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য একক পদ্ধতি (যেমন প্রতি পিস) চালু করা আধুনিক একটি ভাষার জন্যেই অত্যাবশ্যক।
:
তা ছাড়া আমাদের ব্যবহৃত শব্দমালায় অনেকটা অপ্রয়োজনীয় বিধায় ভাষা থেকে ‘ঊ, ঈ, ক্ষ, ঋ, ণ, শ, ষ, য, ঞ এবং ঁ বর্ণগুলোও বাদ দেয়ার প্রশ্ন এসেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, বাংলা ভাষার বয়স প্রায় হাজার বছর হলেও, এ ভাষার কোন নিজস্ব ব্যাকরণ নেই কিংবা এখন পর্যন্ত তা রচিত হয়নি। মূলত খৃস্টপূর্ব ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীর সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ ‘পাণিনি’ রচিত ‘সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ’ চালানো হচ্ছে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ হিসেবে, যখন বাংলা ভাষার জন্মই হয়নি এ বিশ্বে। প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরণো অনাধুনিক ব্যাকরণ আমরা ব্যবহার করছি বিধায়, আমাদের ব্যবহৃত ভাষার সঙ্গে ব্যাকরণের অনেক কিছুতেই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ ব্যাকরণটি রচিত হয়েছিল ভাষাটি জন্ম বা ব্যবহারের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে! বর্ণিত ব্যাকরণের ণ-ত্ব/ষ-ত্ব বিধান, সন্ধি প্রকরণ, বিসর্গ ও ব্যঞ্জন সন্ধি, কৃৎ-তদ্ধিত-সংস্কৃত প্রকৃতি-প্রত্যয় (-তা, -ত্ব, -ইমা ইত্যাদি), কারক-বিভক্তি, উপসর্গ-অনুসর্গ, ক্রিয়ার কাল, ধাতুর রূপ, ক্রিয়ামূল-ধাতু, দ্বন্দ্ব-বহুব্রীহি-দ্বিগু সমাস ইত্যাদির বিভাজন, সূত্র ইত্যাদি সবই সংস্কৃত ব্যাকরণ থেকে হুবহু ধার করা। যে কারণে সংস্কৃত থেকে আগত ‘‘√বচ্+তি=উক্তি’’ কিংবা ‘‘√ক্ষি+ত=ক্ষীণ’’ আবার ‘‘ইহ+ইক=ঐহিক’’ কিংবা ব্যঞ্জন সন্ধিতে ‘উৎকৃষ্+ত=উৎকৃষ্ট’, ‘যজ্+ন=যজ্ঞ’ কেন কিংবা কিভাবে হয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কিন্তু বাঙালি শিক্ষার্থীরা ঠিক বুঝতে না পেরে কেবল ‘মুখস্ত’ করছে। আর বিজ্ঞান ও যৌক্তিক শিক্ষার এ যুগ কি ‘মুখস্ত বিদ্যা’র যুগ হবে বোধগম্যতা বাদ দিয়ে? একইভাবে ‘খাওয়া’ ক্রিয়াপদ অতীতকালে ‘খাইছিলাম’ হলেও, ‘যাওয়া’ ক্রিয়াপদে কেন ‘যাইছিলাম’ না হয়ে ‘গিয়েছিলাম’ হচ্ছে, তারও কোন সদুত্তর শ্রদ্ধেয় ‘পাণিনি’র ব্যাকরণে নেই। এই ‘অপারগতা’কে ঐ ব্যাকরণ বলছে ‘নিপাতনে সিদ্ধ’। তা ছাড়া আধুনিক রূপতত্ত্ব, অর্থতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্বকে সময়োপযোগী তথা আধুনিক কম্পিউটার-ইন্টারনেটে ব্যবহার উপযোগী করার জন্যে এর বর্ণগুলোকে ল্যাটিন-ইংরেজী হরফে ব্যবহারের চিন্তাও করা হচ্ছে’’। নানাদিক মাথায় রেখে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণ ও কম্পিউটার-ইন্টারনেটে সহজ ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষক্ষ্য পশ্চিম বঙ্গ সরকারের প্রতিনিধি সমন্বয়ে ‘বাংলাভাষার আধুনিকীকরণ কমিটি’ গঠন করলেন।
:
এ কমিটি যুক্তাক্ষরের আধুনিকায়নসহ বেশ ক’টি অপ্রয়োজনীয় বর্ণ বাদ দেয়াসহ বাংলা বানান রীতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন করলেন। তারা বাংলা ভাষায় প্রচলিত আড়াই হাজার বছরের পুরণো অবৈজ্ঞানিক সংস্কৃত ভাষার পাণিনির বর্ণনামূলক ব্যাকরণের পরিবর্তে, বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও রীতি অনুযায়ী বিজ্ঞানভিত্তিক ও যৌক্তিক নতুন বাংলা ব্যাকরণ রচনা করালেন। বঙ্গবন্ধুর অক্লান্ত চেষ্টায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিম বঙ্গেও একই রীতির বাংলা বানান-লিখন পদ্ধতি অনুসৃত হতে থাকলো। দু’দেশেই একই বাংলা-কি বোর্ড, ফন্ট ও পত্র-পত্রিকায় একই বানান রীতি অনুসরণ শুরু হলো। বিশ্বের ১০০-টি ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদ এবং বাংলা ভাষাকে ১০০-টি ভাষায় অনুবাদের প্রোগ্রাম বের করলো বাংলাদেশী কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা। যে কারণে বাংলা ভাষা অল্প দিনেই বিশ্বে আধুনিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলো ও জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবেও গৃহীত হলো। প্রোগামিং ল্যাঙ্গুয়েজ, ক্যালকুলেটর ও ইন্টারনেটের ভাষা বাংলা হলো। বৃটেন ও বেশ ক’টি দেশের স্কুলের পাঠ্যক্রমে ২য় ভাষা হিসেবেও বাংলার স্বীকৃতি মিললো। একটি প্রকল্পের আওতায় পুরণো রীতিতে মুদ্রিত সকল বাংলাভাষার পুস্তককে ডিজিট্যাল বইতে রূপান্তর কার্যক্রম ইতোমধ্যেই ৮০% শেষ হয়েছে, যা আগামী ৩-বছরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজ তত্ত্বাবধানে।
:
কুর্মিটোলায় নতুন বিমানবন্দর স্থানান্তরের কারণে ঢাকার তেজগাঁ পুরনো বিমান বন্দরের অব্যবহৃত স্থানে দেশের বেকারদের জন্যে আন্তর্জাতিক মানের টেকনিক্যাল ‘প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়’ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে অষ্টম শ্রেণী পাসের পর দেশের বেকার তরুণ-তরুণীরা ২-বছরের জন্যে বিশ্বমানের ‘টেকনিক্যাল বিদ্যা’ শিখবে; সাথে শিখবে ইংরেজী, আরবী, জার্মান, ফরাসী, ইটালী, কোরিয়ান ইত্যাদি আধুনিক বিশ্বের ভাষাসমূহ। যাতে তারা টেকনিক্যাল বিদ্যাটির সাথে সাথে বিদেশী ভাষাটিতেও দক্ষতা অর্জন করে সহজে বিদেশে গিয়ে উচ্চ বেতনে চাকুরী পেতে পারে। সরকারী পর্যায়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করে, বাংলাদেশ থেকে বিদেশী ভাষা জানা দক্ষ কুক, নাপিত, কার্পেন্টার, মেশন, ওয়েল্ডার, মোবাইল টেকনিশিয়ান ইত্যাদি হাজারো টেকনোলজির দক্ষ জনশক্তি সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় বছরে অন্তত ৫০-লাখ প্রেরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার।
:
শিক্ষাক্ষেত্রে ‘আধুনিক গেস্নাবাল’ ভাষাদক্ষ নাপিত, কুক, রাজমিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী, মোবাইল টেক্্নিশিয়ান তৈরীর বদলে, নানাবিধ অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে লক্ষ লক্ষ ‘উচ্চ শিক্ষিত বেকার’ তৈরী করে রাষ্ট্র ও পরিবারের বোঝা তথা দেশের জন্য মারাত্মক অপচয় হিসেবে প্রচলিত সনাতনী শিক্ষা পরিহার করা হয়েছে, যে শিক্ষাধারায় ‘সংস্কৃতি’ কিংবা ‘দর্শনশাস্ত্রে’ টেনেটুনে পাস করা বেকার ‘এমএ’ ডিগ্রীধারী ব্যক্তিরা অনেকেই পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্যে বোঝা ছিল, এদের কর্মসংস্থান নিয়েও রাষ্ট্রের বিরাট সমস্যা হতো। বর্ণিত ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে, শিক্ষার মানের অভুতপূর্ব উন্নয়ন ঘটলো ও বাংলাদেশের ডিগ্রীকে বিশ্বের সকল দেশ ‘কোয়ালিটি ডিগ্রী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিল। বিশ্ব শ্রম বাজারে ভাষা ও কর্মদক্ষ অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি লাভ করলো। শিক্ষাকে ‘অর্থনৈতিক পণ্য’ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাজারে ‘রপ্তানীর’ সামর্থ অর্জন করলো।
:
[৭ম পর্ব পোস্ট করা হবে আগামিকাল রাত ৮:০০ টায়]
 
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 78 = 86