বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০] ! পর্ব : ৮

[১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু মারা না গিয়ে বেঁচে উঠলে কিভাবে চালাতেন তিনি আজকের বাংলাদেশ! বহুদলীয় শাসনে বাংলাদেশ কি ভাল আছে এখন! একদলীয় শাসনের চীনের থেকে? তার রূপক গল্প হচ্ছে এটি! বড় বিধায় প্রত্যহ রাত ৮-টায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হবে জীবন চিন্তনের এ গল্প!]

:

বাংলাদেশ নামক সপ্তপদী সমস্যায় নিমজ্জমান আর ঘনবসতির এ নির্ধনীভূত দেশটির যেন সমস্যার আর অন্ত ছিলনা। চারদিকে শুধু অসুখ, কান্না আর না পাওয়ার যন্ত্রণা! এ যন্ত্রণার অনেকগুলো সৃষ্ট ছিল আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত কুসংস্কারের কারণে, কোনটির উৎপত্তি অশিক্ষার কারণে, আবার দরিদ্রতার কারণে আক্রান্ত হচ্ছিল হাজারো সপ্তপদী সমস্যায়। দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ফতোয়া প্রদানের কারণে সৃষ্ট হচ্ছিল নতুন নতুন সমস্যার, যা কখনো আমাদের সংবিধান ও রাষ্ট্রযন্ত্রকেও মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছিল সাধারণ মানুষের কাছে কঠিনতর পরীক্ষায়! ফতোয়া দিয়ে অনেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় চেয়ে অধিক ভাড়া আদায় করতো যানবাহনে। মোট কথা রাষ্ট্রীয় আইনকে অবজ্ঞা করা ও তাকে না মানার ধৃষ্টতা যত্রতত্র লক্ষ্যণীয় ছিল। ফতোয়ার কারণে এ যুগেও অনেক দম্পতি ৭-৮টি সন্তান ধারণ করে ‘‘পরিবার পরিকল্পনাকে’’ ইসলাম বিরোধী এবং মুসলমানদের উচিত তা না মানা ইত্যাদি যুক্তি প্রদর্শন করতো। ‘যেনা’, ‘পরকিয়া’ ইত্যাদি অপবাদে গ্রাম্য ফতোয়ার মাধ্যমে নারীকে ‘জুতাপেটা’ ‘চুলকাটা’ ইত্যাদি শাস্তি প্রদান করা হতো। এভাবে একটি সাংবিধানিক স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে ক্রমান্বয়ে আরেকটি শ্রেণি তৈরী হচ্ছিল, যারা অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ এমনকি নিজ স্ত্রী-সন্তানদেরকেও একই চিন্তাধারা লালন-পালন করতে শেখায়। এটি দেশের জন্যে একদিন ‘বিষফোঁড়া’ হিসেবে দেখা দেয়ার উপক্রম হলে, বঙ্গবন্ধুর সরকার রাষ্ট্রের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ‘ফতোয়া বিভাগ’ ছাড়া অন্য সকল শ্রেণির নাগরিকের জন্য ফতোয়া প্রদান নিষিদ্ধ করে কঠোর আইন জারী করেন। বর্ণিত পদক্ষেপের কারণে এখন যত্রতত্র ফতোয়াবাজী বন্ধ হয়েছে ও মানুষ তার সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার ফিরে পেয়েছে।

এদেশের সংসদভবন, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী-চন্দ্রিমা উদ্যান, প্যারেড স্কোয়ার ও সরকারি পার্কসহ নানাবিধ জমিতেই লাগানো হতো আম, জাম, লিচু, নারিকেল, তাল ইত্যাদি ফলবান বৃক্ষের বদলে, নানাবিধ ‘অফলবান’ অজানা দেশী-বিদেশী গাছ-গাছালী। আর অপুষ্টির এদেশে ফল আমদানী করতে হতো ভারত-ভুটান-অস্ট্রেলিয়া তথা বিদেশ থেকে। বিষয়টি অনুধাবন করে সরকারি সিদ্ধান্তে ঐসব সরকারি জমির ‘অগাছগুলো’ কেটে সেখানে নানাবিধ দেশীয় ফলবান বৃক্ষের বন সৃষ্টি করা হয়। এখন ঢাকা শহরে বসবাসকারী মানুষের ফলের চাহিদা ঢাকার বর্ণিত পার্কগুলো থেকেই মেটানো সম্ভব হচ্ছে। প্রত্যেকটি সরকারি পার্কে এখন নানাবিধ ফলের গাছ সুশৃঙ্খলভাবে লাগানোর ফলে, পার্কের সৌন্দর্যও আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। জমি স্বল্পতার বাংলাদেশে ঢাকা-চট্টগ্রাম ডবল রেলপথ নির্মাণে কোন লাইনেই আর নতুন করে জমি দখলের প্রয়োজন না হওয়াতে, সরকার ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের সকল রেলপথ ডবল করার সিদ্ধান্ত নেয়, যে কারণে সড়কের উপর চাপ কমে। দেশের সেনাসদস্যদের ঢাকার যানজট নিরসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমে সরকারি দপ্তরসমূহে নিয়োগ করে সরকার চমৎকার ফল পেয়েছে, ঢাকার আগারগাঁ পাসপোর্ট অফিস এর গ্রহণযোগ্য উদাহরণ। বিভিন্ন সংগঠনের নামে রাস্তায় রাস্তায় হাজারো গেট নির্মাণ আর শুভেচ্ছার নামে পোস্টার-ব্যানার লাগিয়ে অপচয় বন্ধে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কারণে, দেশ এখন ঐসব সংক্রামক অপচয়-রোগ থেকে মুক্ত হয়েছে। এ ছাড়াও সরকার নাগরিক বৈষম্য হ্রাসে দেশের সকল ট্রেন, লঞ্চ-স্টিমার, হাসপাতাল, এমনকি জেলখানায়ও একই শ্রেণি চালু করাতে দেশের সকল নাগরিক এখন একই মানের সেবা পাচ্ছে বিধায় তারা সকল বৈষম্য ভুলে রাষ্ট্র গঠনে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। দেশ থেকে সকল স্তরের ‘ভিআইপি’ বা ‘ডিভিশন’ নামক ব্যবস্থাটি তুলে দেয়া হয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশের সকল নাগরিকরাই এখন সরকারি হাসপাতালে একই শ্রেণির উচ্চ পর্যায়ের সেবা প্রত্যাশা করতে পারে।

:

বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর জন্যে সরকার ভারত ও সোভিয়েত সহযোগিতায় ভুটানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করে। ভারতের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা ও সুসম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে ভুটানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ও ভুটানে ভাগচাষে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সরাসরি ভারতের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে চলে আসছে সড়ক ও রেলযোগে। বিনিময়ে বাংলাদেশ তার সড়ক, আকাশ, রেল ও নৌপথ ব্যবহারে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার চুক্তি করেছে। বাংলাদেশও ভারতের সড়ক, রেল, আকশ ও নৌপথ ব্যবহার করে নেপাল, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেছে। ঘাটতি মোকাবেলায় সোলার, হাওয়া বিদ্যুৎ, স্রোত বিদ্যুৎ, তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সরকার ২০২০ সনের প্রথম দিকে দেশের সকল ঘরেই বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে সমর্থ হয়েছে। রুশ প্রযুক্তির সহায়তায় প্রত্যন্ত গ্রামে ছোট ছোট সৌর ও হাওয়া বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। তা ছাড়া দেশীয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত ‘স্টেপ আপ ট্রান্সফর্মারের মাধ্যমে’ ১২-ডিসি ভোল্টকে ২২০-ভোল্ট এসিতে রূপান্তরের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলেও সকল এসি যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্ভব হয়েছে। এ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কম বিদ্যুৎ সরবরাহকে বেশি বিদ্যুতে পরিণত করাও সম্ভব হচ্ছে। যে কারণে বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের কোন সংকট নেই বললেই চলে, লোডসেডিংও এখন অতীত ইতিহাস। ব্যস্ত সড়কগুলোতে চলন্ত গাড়ির ঘর্ষণে সৃষ্ট বিদ্যুৎ-কে কিভাবে আহরণ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায়, তার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণাগারের তরুণ বিজ্ঞানীরা।

:

সরকারি দপ্তরের ভোগান্তি নিরসনে সরকার প্রত্যেকটি সরকারি অফিসে ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করে, যে কারণে অফিসে না এসেই ৫০% কাজ অনলাইনে সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছে। সার্ভিস প্রত্যাশী জনসাধারণকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার্ভিস না দিলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রত্যেক নাগরিককে তার অভিযোগপত্র গ্রহণের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র প্রদান ও টেলিফোন-ইমেইলে ফলাফল জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৩-দিনের মধ্যে কোন ফাইল নিস্পত্তি করতে ব্যর্থতার জন্যে জবাবদিহিতা ও ফাইল নিষ্পত্তি না হওয়ার যথাযথ ব্যাখ্যা ‘সরকারি দপ্তর তদারকি টিমে’র কাছে জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিদের বেতন এখন মাসের ১-তারিখ তাদের ব্যাঙ্ক হিসেবে সরাসরি জমা হচ্ছে এবং সরকারি চাকুরেরা তাদের শেষ কর্মদিবসে অবসর ভাতাসহ যাবতীয় পাওনাদি অনলাইনে পরিশোধের হিসেব নিয়ে অফিস ত্যাগ করতে পারছে। প্রফিডেন্ট ফান্ড বা পেনশনের জন্যে তাদেরকে অবসরের পর এখন আর বিভিন্ন অফিসে ধরণা দিতে হয়না।

:

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু দেশের সমাজ বাস্তবতা অনুধাবন করে প্রত্যেকটি ইউনিয়নে ১-টি করে পুলিশ স্টেশন স্থাপন করেছেন, যেখানে পুলিশ সদস্যদের ৫০% এখন মহিলা। সকল সরকারি দপ্তরকে একই ভবনে আনা ও অপচয় রোধের জন্যে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে ‘কেন্দ্রীয় বাংলাদেশ ভবন’ নির্মাণ করে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়সহ ঢাকার সকল সরকারি অফিস ঐ একই ভবনে স্থানান্তর করেছে। বিশ্বে আমাদের রপ্তানী প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে চীনের সমপর্যায়ের দেশে বাংলাদেশকে পরিণত করার কর্মপন্থা নির্ধারণ করার জন্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেনাবাহিনীকে দেশের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্তকরণ ও নিজস্ব প্রযুক্তিতে আধুনিকায়ন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের হাসপাতালগুলোকে উন্নত ও একই মানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ জনস্বার্থে সকল হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবাকে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তর করা হয়েছে।

:

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সকল যানবাহন ও অস্ত্র এখন দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মিত নৌ-বাহিনীর যুদ্ধ জাহাজগুলো জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত সংস্থায় ভাড়া দিয়ে বাংলাদেশ আয় করছে বছরে বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ইতোমধ্যেই দেশের সকল তরুণ-তরুণীর জন্যে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জাতিসংঘে ও বিদেশে একটি অসাম্প্রদায়িক সুসভ্য জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মর্যাদা উন্নীত হয়েছে বিধায়, বিশ্বের অনেক দেশই এখন বাংলাদেশীদের ‘অনলাইন ভিসা’ ও তাদের বন্দরগুলোতে ‘অন এ্যারাইভাল ভিসা’ প্রদান করছে। বিশ্বের অনেক বিতর্কিত দেশের নাগরিকদের মতো বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের এখন আর বিভিন্ন বিমানবন্দরে হয়রানী ও সন্দেহের চোখে দেখা হয়না। শিক্ষা ও টেকনোলজিতে দক্ষতা অর্জনের কারণে ইউরোপ, ক্যানাডা, অষ্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে বাঙালি দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা জনশক্তি আমদানীর সময় প্রথমেই বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দক্ষ জনশক্তির চাহিদার কারণে বিদেশের চাকুরী দাতারাই এখন ভিসার সঙ্গে ফ্রি এয়ার টিকেট সরবরাহ করছে দক্ষ বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্যে।

:

[৯ম পর্ব পোস্ট করা হবে আগামিকাল রাত ৮:০০ টায়]

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

94 − 91 =