ভারত চীন সম্পর্ক ও বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব- পঞ্চম পর্ব

পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে বলা যায় বর্তমানে পৃথিবীর ভূরাজনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয় যে কোনো সময় পৃথিবীতে বড় কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। একদিকে যেমন ভারত, আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইজরায়েল, নিউজিল্যান্ড, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য সমূহ প্রভৃতি দেশগুলি একদিকে রয়েছে অন্যদিকে চীন, পাকিস্তান, ইরান, মালয়েশিয়া, উত্তর কোরিয়া, তুর্কি প্রভৃতি দেশ অন্যগ্রুপে রয়েছে। এখন প্রশ্ন হল রাশিয়ার মতো দেশ নিরপেক্ষ থাকবে কিনা? বিশেষজ্ঞদের মতে চীনের সঙ্গে যদি আমেরিকার সংঘর্ষ হয় সেক্ষেত্রে রাশিয়া চীনের পক্ষ নিতে পারে আবার ভারতের সঙ্গে চীনের সংঘর্ষ হলে রাশিয়া ভারতের পক্ষে থাকতে পারে, আবার কেউ কেউ মনে করেন রাশিয়া নিরপেক্ষ থাকবে। তাই রাশিয়ার অবস্থান কি হবে সে বিষয়ে আগাম কিছু অনুমান করা শক্ত!

বস্তুত বর্তমান পৃথিবীতে এমন বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে যেখানে পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তপ্ত এবং সেখান থেকে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। 1) ভারত – চীন সীমান্ত সমস্যা। 2) চীন -তাইওয়ান সমস্যা। 3) ইজরায়েল – প্যালেস্টাইন সমস্যা। 4) তুর্কী – গ্রীস ও ফ্রান্স সমস্যা। 5) আমেরিকা- চীন সংঘাত। 6) চীন – দক্ষিণ চীন সাগর সমস্যা। 7) ইজরায়েল – ইরান সংঘাত। 8) ভারত – পাকিস্তান সীমান্ত সমস্যা। 9) সৌদি আরব – ইরান সমস্যা। 10) আমেরিকা – রাশিয়া সমস্যা ইত্যাদি। সেইসঙ্গে বেশ কিছু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ক্ষমতা দখল করায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জটিল হচ্ছে। একদিকে আমেরিকায় ট্রাম্প, চীনে শি জিন পিং, ব্রিটেনে বরিস জনসন, ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তুরস্কে রিসেপ তৈয়েব এরদোগান, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, ইজরায়েলের বেঞ্জামিন নেতানইয়াহু প্রভৃতি।

এই সমস্ত জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের ক্ষমতায় আসার ফলে ধীরে ধীরে পৃথিবী যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে যেখানে একদিকে ছিলেন আমেরিকার রুজভেল্ট, ব্রিটেনের উইনস্টন চার্চিল, রাশিয়ার জোসেফ স্ট্যালিন অন্যদিকে জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার, ইটালির বেনিটো মুসিলিনি, জাপানের হিদেকি তোজো প্রভৃতি! তাই বিশ্বে এক অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ধীরে ধীরে ঘনীভূত হচ্ছে এবং যে কোনো সময় বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে! বস্তুত এই রকম বেশ কিছু পরিস্থিতির লক্ষণ ও দেখা যাচ্ছে! মনে রাখতে হবে ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’ 28 শে জুন 1914 থেকে 11 ই নভেম্বর 1918 পর্যন্ত চলেছিল এবং এই বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীর মোট 37 টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল এবং সরকারি মতে প্রায় 4 কোটির অধিক মানুষ এই যুদ্ধে মৃত্যু বরণ করেছিল, বেসরকারি মতে সংখ্যাটি ছিল আরও অনেক বেশি! অন্যদিকে 1 লা সেপ্টেম্বর 1939 থেকে 2 রা সেপ্টেম্বর 1945 সাল পর্যন্ত ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ চলেছিল, এই বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীর মোট 61 টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল। এবং আনুমানিক এই যুদ্ধে প্রায় 6 কোটির অধিক মানুষের মৃত্যু হয়, যদিও বেসরকারি মতে সংখ্যাটি ছিল আরও অনেক বেশি! তাই এই যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়েই পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তির উদ্দেশ্যে মানুষ ‘জাতিসংঘের’ মতো সংস্থা গড়ে তোলে! এর ফলস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সেই মাপের বড় যুদ্ধ সংগঠিত না হলেও যুদ্ধ কখনও থেমে থাকেনি!

মানব সভ্যতার ইতিহাস বড়ই নির্মম সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চাই না কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস বলে সভ্যতার উষা লগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত 50 বছর কোন যুদ্ধ হয়নি এমন শতক দেখা যায় না। এ থেকেই প্রমাণিত হয় মানুষের মধ্যে একটা যুদ্ধের প্রবৃত্তি রয়েছে যা এক্ষেত্রে ও দেখা যায়! এখন প্রশ্ন হল মানুষের এমন প্রবৃত্তি দেখা যায় কেন? এর উত্তরে বলতে হয় পৃথিবীতে যখন লোভ লালসা, অর্থনৈতিক শোষণ, লুন্ঠন, সাম্রাজ্যবাদ ও অতি জাতীয়তাবাদী ভাবনা দেখা যায় তখন বিশ্বে এই ধরনের সমস্যা দেখা যায়! বর্তমানে শি জিন পিং এর নেতৃত্বে চীনের যে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা দেখা যাচ্ছে তা পৃথিবীর সুস্থিতিকে বিপন্ন করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে আধুনিক যুগের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হল চীন, আধুনিক যুগের হিটলার হল শি জিন পিং এবং আধুনিক পৃথিবীর নাৎসি জার্মানি হল চীন!

বিশেষজ্ঞদের মতে হিটলার ও শি জিন পিং এর মধ্যে বহু বিষয়ে মিল রয়েছে হিটলার যেমন সমস্ত বিরোধীদের হত্যা করে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখল করেছিল তেমনি শি জিন পিং ও তাঁর সমস্ত বিরোধীদের একে একে হত্যা করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্বেসর্বাতে পরিণত হয়! এমনকি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আজীবন চীনের ক্ষমতা দখল এবং নিজের মতাদর্শকে চীনের সংবিধানে যুক্ত করেছে! হিটলার যেমন ইহুদিদের বিরুদ্ধে কনসেনেট্রশন ক্যাম্প শুরু করেছিল এবং প্রায় 60 লক্ষ ইহুদিদের হত্যা করেছিল, তেমনি শি জিন পিং ও প্রায় 15-20 লক্ষ উইঘুরু মুসলমানদের শিক্ষার নামে কনশেনট্রেশন ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য করেছে!

অথচ মজার বিষয় হল কাশ্মীর কাশ্মীর করে মুখে ফেনা তুলে দেওয়া পাকিস্তান, তুর্কি, মালয়েশিয়া এইসব দেশগুলি উইঘুরু মুসলিমদের বিষয়ে টু শব্দটি ও করেনা। এমনকি সৌদি আরব, UAE সহ মুসলিম দেশগুলির সংগঠন ‘ওআইসি’ ও উইঘুরু বিষয়ে টু শব্দটি করে না বরং এই সমস্ত মুসলিম দেশগুলি চীনের এই কার্যকলাপকে সমর্থন করে। অন্যদিকে উইঘুরু মুসলমানদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে মুসলমানদের চোখে তথাকথিত বিধর্মীদের দেশগুলিই! তাহলে এ থেকেই প্রমাণিত হয় ‘মুসলিম উম্মাহ বা মুসলিম মুসলিম ভাই ভাই’ এগুলি আসলে সাধারণ মুসলমানদের বোকা বানানোর কৌশল মাত্র! পৃথিবীর কোন দেশই নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ছাড়া অন্য বিষয়ে কথা বলে না। তাই ওআইসি ও চীন সম্পর্কে একটি ও শব্দ খরচ করে না, ওআইসি এটা ভালো করেই জানে চীনের বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁদের ভাগ্যে দুঃখ রয়েছে! একই কথা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুমিনদের ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য, তাই যারা কথায় কথায় ভারত বিদ্বেষে মুখর হয়ে ওঠে তারাই চীনের উইঘুরু মুসলমানদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোন কথা বলে না, এথেকেই তাঁদের দ্বিচারিতা প্রমাণিত হয়!

যাক চীনের এই দমন পীড়ন ও শি জিন পিং এর সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা পৃথিবীর নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সমস্যা হিসাবে দেখা যাচ্ছে। বস্তুত হিটলারের নাৎসি জার্মানির সঙ্গে শি জিন পিং এর চীনের বহু অংশে মিল দেখা যায়! তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তর 6,33,786 বর্গ কিমি আয়তনের ও প্রায় 9 কোটি জনসংখ্যার নাৎসী জার্মানির থেকে আয়তনে ও জনসংখ্যায় প্রায় 15 গুণ বড় দেশ (95,96,961 বর্গ কিমি আয়তনে ও 140 কোটির জনসংখ্যা) চীন বর্তমানে পৃথিবীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য এক হুমকি স্বরূপ হয়ে উঠেছে! তাই বিশ্বকে এখন থেকেই চীন বিষয়ে আগাম সতর্ক থাকতে হবে! বস্তুত কার্যক্ষেত্রে ও আমরা দেখি চীনের বিরুদ্ধে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলি ধীরে ধীরে একত্রিত হচ্ছে এবং সামরিক ও বাণিজ্যিক বয়কটের মাধ্যমে চীনের প্রভুত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

চীনের মধ্যে ও শি জিন পিং এর এই আগ্রাসী বিদেশনীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে কিন্তু চরম দমন পীড়নের মাধ্যমে শি জিন পিং এই বিদ্রোহ দমন করছে। চীনা বিশেষজ্ঞদের মতে শি জিন পিং এর আক্রমণাত্মক বিদেশনীতির ফলে চীন ধীরে ধীরে ‘বিশ্বের শত্রুতে’ পরিণত হচ্ছে তাই লক্ষ লক্ষ মানুষের ত্যাগ তিতিক্ষার ফলে যে আধুনিক চীন গড়ে উঠেছিল তা খুব দ্রুতই ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে! বর্তমানে চীন পৃথিবীর এক ‘ঘৃণিত রাষ্ট্রে’ পরিণত হচ্ছে! এখানে একটি কথা উল্লেখ্য চীনের সাধারণ মানুষ কিন্তু ‘চীনা কমিউনিস্ট পার্টির’ শাসনের পক্ষে নয়। চীনা জনগণ এই কমিউনিস্ট পার্টির শাসন থেকে মুক্তি চাই, কারণ তাঁদের চরম দমন পীড়নের ফলে চীনের সাধারণ মানুষের, স্বাধীন ভাবে জীবন নির্ধারণের অধিকার নেই! যার ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাই চীন হংকংয়ে ‘বিশেষ সুরক্ষা আইনের’ নামে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ কেড়ে নিলে সেখানে বিদ্রোহ দেখা দেখা যায়। বলাইবাহুল্য চীন 1989 সালে ‘তিয়েনমিয়েন স্কোয়ারে’ গণতন্ত্রপ্রেমি হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে হত্যা করে এবং এই নারকীয় ঘটনাকে দমন পীড়নের মাধ্যমে চেপে দেওয়ার চেষ্টা করে! চীনের এই সমস্ত কার্যকলাপের ফলে আন্তর্জাতিক আইন লঙঘিত হচ্ছে, যার ফলে বিশ্বের সামনে চীনের ভাবমূর্তি আরও খারাপ হচ্ছে!

বস্তুত 1997 সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে হংকং চীনের অধীনে আসার সময় এই বিষয়ে চুক্তি হয় আগামী 50 বছর হংকং এ গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। চীনের এই নীতিকে বলা হয় ‘One China two principle Policy’ কিন্তু চীন জাতীয় সুরক্ষার নামে ‘হংকং’ এর এই বিশেষ অধিকার কেড়ে নিলে বিশ্ব এ বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। 1999 সালে পোর্তুগিজদের হাত থেকে চীনের অধীনে আসা ‘ম্যাকাও’ এর সঙ্গে ও একই রকম সমস্যা দেখা যায়! যাইহোক হংকং বিষয়ে ব্রিটেন কড়া প্রতিক্রিয়া দেয় এবং চীন ও এ বিষয়ে ব্রিটেনকে পাল্টা হুমকি দিতে থাকে! এরফলে উভয় দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছেে তাই ব্রিটেন তাঁদের দেশের 5 G চুক্তি থেকে চীনা কোম্পানি Huawei কে বিতাড়িত করেছে, সমস্ত বাণিজ্য চুক্তি নতুন করে খতিয়ে দেখছে এবং আমেরিকার সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের নৌবহর পাঠানোর কথা চিন্তা করছে। শিন জিয়াং প্রদেশের উইঘুরু মুসলমানদের অত্যাচারের কথা গোটা বিশ্ব জানে। এদিকে চীনে নতুন করে দক্ষিণ মোঙ্গোলিয়া অঞ্চলে ‘মোঙ্গোল ভাষা’ নিষিদ্ধ করে ‘মান্দারিন’ ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এর ফলে দক্ষিণ মঙ্গোলিয়া অঞ্চলে ব্যাপক বিদ্রোহ দেখা যাচ্ছে। বলাইবাহুল্য চীন শক্ত হাতে এই বিদ্রোহগুলি দমন করার চেষ্টা চালাচ্ছে!

1950 সালের 6 ই অক্টোবর চামডো নদী পেরিয়ে চীন তিব্বত আক্রমণ করে ও তিব্বত দখল করে। তিব্বতিরা দালাই লামার নেতৃত্বে ভারতে আসে ও ‘হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায়’ ‘তিব্বতের নির্বাসিত সরকার’ গঠন করে। সেই থেকে তিব্বতিরা ভারতে বসবাসরত এবং তিব্বতের স্বাধীনতার জন্য আজ ও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তিব্বতিরা ভারতকে তাঁদের ‘দ্বিতীয় মাতৃভূমি’ মনে করে কারণ আজ পর্যন্ত তিব্বতিরা ভারতেই বেড়ে উঠেছে এখানে তাঁদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা লালিত পালিত হয়! তিব্বতিরা আর পাঁচটি ভারতীয়দের মতো ভারতে সরকারি চাকরি ও সেনাবাহিনীতে ও অংশগ্রহণ করতে পারে। তাই চীনের সঙ্গে ভারতের সংঘর্ষে তাঁরা ও ভারতীয় সেনার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ মাতৃকার রক্ষার্থে এবং তিব্বতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে!

চীনের আর একটি গুরুতর সমস্যা হল তাইওয়ান সমস্যা। আধুনিক চীনের ইতিহাস শুরু হয় 1911 সালে মাঞ্চু রাজবংশের পতনের মধ্য দিয়ে। এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন সান ইয়াৎ সেন, তিনি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 1912 সালে তিনি ‘কুয়োমিন টাং’ দল গঠন করেন। তাঁকে আধুনিক চীনের ‘জাতির জনক’ বলা হয়। 1925 সালে তাঁর মৃত্যুর পর 1926 সালে চিয়াং কাইশেক পার্টির নেতৃত্ব দখল করে এবং চীনের সর্বেসর্বাতে পরিণত হয়। চীনের ক্ষমতা কারা দখল করবে এই নিয়ে কুয়োমিন টাং দের সঙ্গে সমাজতন্ত্রিদের মতবিরোধ দেখা যায়। 1921 সালের 23 শে জুলাই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সৃষ্টি হয় এবং এতদিন কুয়োমিন টাং পার্টির সঙ্গে যে সরকার চলছিল তা থেকে 1927 সালে সমাজতন্ত্রিরা বের হয়ে যায় এবং আলাদা দল গঠন করে। চীনের ক্ষমতা কারা দখল করবে এই নিয়ে 1928 সালে চীনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। একদিকে ছিল মাও এর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দল, অন্যদিকে ছিল চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বে কুয়োমিন টাং দল। বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে 1949 সালের 1 লা অক্টোবর মাও সে তুং এর নেতৃত্বে ‘সমাজতান্ত্রিক চীন’ গড়ে ওঠে। অন্যদিকে মাও এর হাতে পরাজিত হয়ে চিয়াং কাইশেক ‘তাইওয়ান দ্বীপে’ আশ্রয় নেয় এবং ‘গণতান্ত্রিক চীন’ গঠন করে।

সেই থেকে চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সংঘর্ষ লেগেই রয়েছে। ‘তাইওয়ান’ চীনের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে চাই কিন্তু চীন ‘One China policy’ অনুযায়ী তাইওয়ানকে স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকার করে না। চীন ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছে সৈন্য আক্রমণের মাধ্যমে তাইওয়ান দখল করা হবে অন্যদিকে তাইওয়ান চীনের অধীনতা থেকে মুক্ত হতে সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাইওয়ান এই উদ্দেশ্যে আমেরিকার সঙ্গে সমঝোতা করে চলেছে এর ফলে তাইওয়ানের সুরক্ষার জন্য আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগরে তাঁর নৌবহর প্রেরণ করেছে এর ফলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। চীন এমন এক দেশ যেখানে চীনা জনগণ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শাসন থেকে মুক্তি চাই। ম্যাকাও, হংকং, তাইওয়ান, তিব্বত, দক্ষিণ মঙ্গোলিয়া, পূর্ব তুর্কি এই সকল অঞ্চল চীন জোর করে দখল করে রেখেছে এবং এরা চীনের অধীনতা থেকে মুক্তি চাই। এমনকি চীনা জনগণ চীনের বাইরে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে তাঁরা চীনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ করে। চীন গোটা বিশ্বে যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখায় তা চীনের আর্থসামাজিক অবস্থার সঠিক প্রতিফলন নয়!

বিশেষজ্ঞদের মতে এর বেশিরভাগই চরম অমানবিকতা ও শ্রমিক শোষণের ফল, তাই চীনের এই চোখ ধাঁধানো উন্নয়নের উল্টোদিকে প্রদীপের নীচে গভীর অন্ধকার ও ভয়াবহতা বিরাজ করছে! চীনের জনগণের উপর অত্যাচার কতটা তীব্র তা এ থেকেই বোঝা যায় চীনই একমাত্র দেশ যেখানে গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ। প্রশ্ন হল চীন সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে কি লুকাতে চাই? কি এমন জিনিস আছে যা চীন বিশ্বের কাছ থেকে লুকোতে চাই? বস্তুত এ থেকেই বোঝা যায় চীনের অভ্যন্তরীণ অবস্থা কতটা ভয়াবহ! তবে এটা সত্য চীন কখনও নিজের অপরাধ স্বীকার করে না। বস্তুত সরকারি মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে চীনের অভ্যন্তরের খবর পাওয়া খুবই মুশকিল, তবে এটা অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে চীন কিছু একটা অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে চলেছে যা বিশ্বের কাছে প্রকাশ করতে চাই না এবং এর ফলেই এত গোপনীয়তা!

বিশেষজ্ঞদের মতে চীন করোনা ও এই সমস্ত সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতেই এখন সাম্রাজ্যবাদী, বিস্তারবাদী নীতির প্রসার ঘটাচ্ছে, যার ফল স্বরূপ ভারতের সঙ্গে চীনের সংঘাত দেখা যাচ্ছে। যার চরম নিদর্শন দেখা যায় গত 15-16 ই জুন, 2020 মধ্যরাতে যখন চীন অতর্কিতে গলওয়ান উপত্যকায় হামলা করে। এই হামলাতে 20 জন ভারতীয় সৈনিকের মৃত্যু হয় অন্যদিকে ভারতের দাবি এই ঘটনায় চীনের 43 জন সৈনিকের মৃত্যু হয়, তবে বেসরকারি মতে এই সংঘর্ষে আরও অধিক সংখ্যক চীনা সৈনিক মৃত্যু বরণ করে! যদিও চীন তাঁর সৈনিকদের মৃত্যুর সংখ্যা স্বীকার করেনি! সেই থেকেই উভয় দেশের মধ্যে তিক্ততার সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আবার নতুন করে ভারত ও চীনের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা যাচ্ছে গত 29 শে আগস্ট রাতে চীন অতর্কিতে প্যাংগং লেকের দক্ষিণাংশে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করে কিন্তু ভারতীয় সেনার তৎপরতায় চীনা কৌশল ব্যার্থ হয়। অন্যদিকে 31 শে আগস্ট চীন অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনের এই কৌশল ব্যার্থ করে। তবে ভারত ‘ব্ল্যাক টপ’ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে এতে সীমান্তে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে!

□ এখন প্রশ্ন হল ভারত ও চীনের সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে গালওয়ানে যে সংঘর্ষ দেখা যায় তাঁর বিরুদ্ধে ভারত সঙ্গে সঙ্গে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করল না কেন? বিরোধীদের মতে মোদী সরকার চীনের নাম না নিয়ে পরিস্কার কিছু বলেনি কেন? ভারত কেন চীনের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য গালওয়ান উপত্যকার ঘটনার পর মোদীর শারীরিক ভাষা দেখলে বোঝা যায় তিনি চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণের পক্ষপাতী কিন্তু তিনি যা বললেন তা হল ‘ভারত নিজের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর, ভারতীয় সেনা মারতে মারতে মরেছে এবং সেনার এই বলিদান ব্যার্থ যাবে না!’ অনেকে একে মোদীর দুর্বলতা বলে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এবং তাঁদের যুক্তি হল মোদী খুব শক্ত কোন বাক্য প্রয়োগ করলেন না কেন? তা প্রশ্ন হল মোদী এমন বক্তব্য দিলেন কেন?

এর কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে এর উওর খুঁজতে গেলে ইতিহাসের পাতা থেকে বলতে হয় ভারতের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন প্রথমবার পূর্ব পাকিস্তানে পাক বাহিনীর অত্যাচার ও গণহত্যার সম্পর্কে জানতে পারেন তখন 1975 সালের 25 শে এপ্রিল ক্যাবিনেট মিটিংয়ে তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মানিশওকে পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণের জন্য বলেন। জেনারেল ‘মানিক শাও’ ইন্দিরা গান্ধীর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তিনি বলেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ না মানার জন্য তিনি নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিতে রাজি আছেন। মানিকশাও বলেন এখন ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়, এখন যুদ্ধ শুরু হলে দুই দিকে পাকিস্তান, অন্যদিকে চীন ও আমেরিকার আক্রমণে ভারত যুদ্ধে নিশ্চিত ভাবেই পরাজিত হবে। তাই যুদ্ধ নিশ্চয়ই হবে তবে তার জন্য তৈরী হওয়ার সময় দিতে হবে। এই সময় ইন্দিরা গান্ধী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র সেনাবাহিনীকে প্রদান করেন এবং গোটা বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে জনমত গঠন করেন। এভাবে সেনাবাহিনীকে আরও একটু সময় দেওয়া হয় এবং সম্পূর্ণ পরিকল্পনা মাফিক সেনাবাহিনী এগোনোর ফলে 1971 সালের 3 রা ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতকে আক্রমণ করলে মাত্র 13 দিনের যুদ্ধে ভারত পাকিস্তানকে হারিয়ে 1971 সালের 16 ই ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে এক নতুন দেশ বাংলাদেশের সৃষ্টি করে!

তাই বর্তমান প্রেক্ষাপট অনেকটা 1971 এর যুদ্ধের সঙ্গে তুলনীয়। আসলে গালওয়ান উপত্যকায় যে ঘটনাটি ঘটেছিল তাঁর পিছনে চীনের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল। চীন পুরো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়েই এই আক্রমণ করেছিল। তাই ভারত যদি সঙ্গে সঙ্গে বড় ধরণের কোন আক্রমণ সংগঠিত করত সেক্ষেত্রে বড় যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর স্বাভাবিক ভাবেই তৈরী না থাকার ফলে ভারত এই যুদ্ধে হেরেও যেতে পারত সেই সঙ্গে ‘ইনটেলিজেন্স ব্যুরো’ তাঁর রিপোর্টে প্রকাশ করেছে ভারত চীনকে আক্রমণ করলে পাকিস্তান ও ভারতকে আক্রমণ করতে পারে তাই দুই দিক থেকেই যুদ্ধের সম্ভবনার ফলে ভারতের সমূহ বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। পরমাণু অস্ত্র সজ্জিত ভারত, পাকিস্তান ও চীন এদের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দিলে তাঁর ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে তাই এই বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন ছিল।

বস্তুত ভারতের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় প্রয়োজন ছিল, তাই ভারত সরকার একদিকে সেনার মাধ্যমে রোখার কথা বললে ও অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্ত সমস্যার সমাধান করার কথা বলে। অর্থাৎ কূটনীতির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে আর বলাইবাহুল্য এর ফলে ভারত বেশ কিছু মূল্যবান সময় পেয়ে যায়, এই সময়ের মধ্যে ভারত তাঁর সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য তৈরী করতে থাকে। একদিকে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবস্থা করা অন্যদিকে সীমান্ত অঞ্চলে ব্যাপক পরিকাঠামো উন্নয়নের ফলে সীমান্তে সাপ্লাই লাইন মজবুত করা!

এর ফলে সীমান্তে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয়, প্রাপ্ত সময়ে ভারত রাশিয়া, আমেরিকা, ইজরায়েল, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি দেশ থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র আমদানি করে এবং নতুন নতুন বহু আধুনিক সমরাস্ত্র দেশে বানাতে থাকে এর ফলে ভারতের মিলিটারি আরও মজবুত হয়। তাই এখন আর চীন অতর্কিতে 1962 সালের মতো আক্রমণ করতে পারবে না। বলাইবাহুল্য 1962 সালে ‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’ এর কথায় বিশ্বাস করে ভারত কোন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়নি তাই অতর্কিতে আক্রমণের ফলে ভারত 1962 এর যুদ্ধ হেরে যায় কিন্তু এবার আর সেই ভুল হবে না। 1962 এর যুদ্ধে ভারতের হারের আর একটি কারণ ছিল এই যুদ্ধে ভারত নিজের বায়ুসেনা ব্যাবহার করেনি তাই নেহেরুর সিদ্ধান্ত হীনতা ও শান্তি নীতি এই যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের কারণ হয়েছিল।

ভারত এবার চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একদিকে যেমন কূটনীতির মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ভিতরে ভিতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও পরিকাঠামো উন্নয়ন করে চলেছে। বস্তুত ভারত সরকার এক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে চীনকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে নিজে না প্রস্তুত হওয়া সবচেয়ে বড় অপরাধ! আর চীনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায় চীন মুখে এক কথা বলে কিন্তু কাজ অন্য করে তাই চীনকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় না! তাই বিশেষ সচেতনতা প্রয়োজন।

একশ্রেণীর মানুষ শান্তি প্রতিস্থাপনের কথা বলবেন, তাঁরা মনে করে সরকার যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে এটা ঠিক নয়। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি অবশ্যই সীমান্তে শান্তি প্রয়োজন কিন্তু প্রতিবেশি যদি চীন ও পাকিস্তানের মতো দেশ হয় তাহলে কি মুখে শুধু শান্তির কথা বললেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব? চীনের লক্ষ্য হল দেশ দখল করা, তা যদি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতে হয় তাহলে শান্তি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা কিভাবে সম্ভব? তাই অবশ্যই যে কোন সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। চীন ভারতের শান্তিবাদী নীতিকে ভারতের দুর্বলতা মনে করে। 1962 সালে ও ভারত শান্তির মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সুষ্ঠ সমাধান চেয়েছিল কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় চীন ভারতকে আক্রমণ করে ও কোন প্রস্তুতি না থাকার কারণে ভারত চীনের কাছে আকসাই চীন হারায়! দ্বিতীয় বার এইরকম ভুল যেন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে!

অনেকে আবার মনে করেন যুদ্ধ হবে না এটা ভারত ও চীনের রাজনৈতিক স্বার্থে গৃহীত কিছু পদক্ষেপ। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি যদি যুদ্ধ না হয় তাহলে ভালো কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি যুদ্ধ না হয় সেটাই সবচেয়ে বড় আশ্চর্য ঘটনা হবে! চীনের ইতিহাস বলে তাঁরা এভাবে ছোট ছোট আক্রমণ করে আগে বিরোধী দেশের সামরিক শক্তি সম্পর্কে ধারণা করে তারপর অতর্কিতে আক্রমণ করে। 1962 সালে ও যুদ্ধের আগে বেশ কয়েক বছর সীমান্তে ছোট খাটো সংঘর্ষ লেগেই ছিল একদিকে চীন শান্তির কথা বললেও ভিতরে ভিতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে অন্যদিকে চীনকে বিশ্বাস করে যুদ্ধের জন্য কোন প্রস্তুতি না নেওয়ার ফলে ভারত এই যুদ্ধে পরাজিত হয়। তাই চীনের সঙ্গে বোঝাপড়ার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কৌশল হল একদিকে আলোচনা করতে থাক এবং অন্যদিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাক, বলাইবাহুল্য বর্তমান ভারত সরকার অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই লক্ষ্যেই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে!

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য ভারত ও চীনের সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য হল চীন কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগামী পঞ্চাশ বছর কি হবে তা ভেবে নীতি নির্ধারণ করে। অন্যদিকে ভারত ও যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশনীতির ও পরিবর্তন হয়। তাই 1962 সালে ভারত চীনের যুদ্ধের ফলে ভারত চীনকে যে শত্রু দেশ মনে করে এই মনোভাবের পরিবর্তন হয় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে তাঁর আমল থেকেই ভারতের সঙ্গে চীনের নতুন করে সম্পর্ক স্থাপিত হয় তারপর থেকে এই অবস্থান ভারতের সব প্রধানমন্ত্রীই বজায় রাখে এমনকি জাতীয়তাবাদী মোদী ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির দিকে আগ্রহী ছিল তাই চীন যে ভারতের সবচেয়ে শত্রু দেশ এটা নেহরুর মতো মোদী ও বুঝতে পারেননি কিন্তু গালওয়ান ঘটনার ফলে মোদী সরকার বুঝতে পারে চীনের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব নয় তাই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তাই সরকার দ্রুত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে এবং সীমান্তে দ্রুত পরিকাঠামো উন্নয়ন ঘটাতে থাকে। চীন এটা বুঝতে পারে মোদীর নেতৃত্বে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পন্ন সরকার যুদ্ধের জন্য এক পা ও পিছবে না!বিশেষজ্ঞদের মতে ভারতীয় সেনার এই প্রত্যাঘাত চীনকে অবাক করেছে তাই পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁরা ও ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করেছে কিন্তু তাঁর মানে এই নয় যুদ্ধ রুখে গেছে বরং সদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকাই চীনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার উৎকৃষ্ট কৌশল!

আর যারা বলে মোদী চীন বিষয়ে কোন কথা বলছে না তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি পৃথিবীর ইতিহাসে যখন কোন বড় পদক্ষেপ কিছু গ্রহণ করা হয় তখন দেশের বড় নেতৃত্ব চুপ থাকে। যাঁরা মোদীর চুপ করে থাকাকে দুর্বলতা মনে করেন তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন গালওয়ান সংঘাত ইত্যাদি বিষয়ে শি জিন পিং এর একটি ও বক্তব্য কি প্রকাশিত হয়েছে? বস্তুত যে যত বড় ও পরিণত নেতা যে তত গোপনে কাজ করে। বস্তুত মোদীর এই চুপ থাকার অর্থ ভারত সরকার খুব বড় কোন পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে! আর গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ায় মোদী স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে তাঁর ভাষণে বলেন ‘বিস্তারবাদ ও আতংকবাদের সমাপ্ত হবে’, অর্থাৎ বকলমে চীন ও পাকিস্তানকে আক্রমণ করেন এবং দায়িত্ববান রাজনৈতিক নেতা হিসাবে এদের সম্পর্কে বিশ্বকে সচেতন করেন! তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভোটের স্বার্থে কোন কথা বলা এক জিনিস আর দেশনেতা হিসাবে বলা অন্য জিনিস। বলাইবাহুল্য মোদী এখানে বিরোধীদের প্ররোচনায় ভুল পথে পা দেননি, মোদী কিছু না বললেও ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘ব্লাক টপ’ দখল করে অর্থাৎ এ থেকেই বোঝা যায় দেশের সরকার ও প্রধানমন্ত্রী কি চাইছে! তাই যেটা গোপনেই করা সম্ভব তাঁর জন্য প্রকাশ্যে কিছু বলে শত্রুকে সচেতন করার কোন কাজের কথা নয়! তাই মোদী এখানে সঠিক কৌশল অবলম্বন করছেন।

□ এখন প্রশ্ন হল ভারত ও চীনের যুদ্ধ হলে কি হবে?

এটিই বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারত ও চীনের যুদ্ধ হলে কি হবে? এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই চীনা সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায় একদিকে চীনের যখন প্রায় 20 লক্ষ সেনা রয়েছে তখন অন্যদিকে ভারতের কাছে ও প্রায় 14 লক্ষ সেনা রয়েছে। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সমস্ত কিছুতেই চীনের সংখ্যা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি। চীন ভারতের চেয়ে পাঁচ গুণ বড় অর্থনীতির দেশ এবং চীনা মিলিটারি বাজেট ভারতের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি। তাহলে প্রশ্ন হল ভারত চীনের সঙ্গে যুদ্ধে লড়াই করবে কিভাবে? এখানে একটি কথা উল্লেখ্য চীন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারে কিন্তু চীনের সেনাবাহিনী পৃথিবীর দ্বিতীয় শক্তিশালী সেনাবাহিনী নয়। সমস্যা হল সাধারণ মানুষ দেশের অর্থনীতি ও সেনাবাহিনীর শক্তিকে এক করে দেখে।

এ বিষয়ে আমেরিকা পৃথিবীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে কারণ একদিকে আমেরিকা অর্থনৈতিক দিক থেকে পৃথিবীর সুপার পাওয়ার সেইসঙ্গে সামরিক দিক থেকে ও আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। অন্যদিকে রাশিয়া অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল দেশ হলেও সোভিয়েত সামরিক শক্তির কারণে রাশিয়া পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সামরিক সেনাবাহিনীর অধিপতি! তাই চীনের আসল শক্তি নিহত রয়েছে চীনের অর্থনীতিতে চীনকে মারতে হলে চীনের অর্থনীতিকে শেষ করতে হবে তাহলে চীন এমনিতেই মরে যাবে। আর ভারত সরকার ঠিক এই কাজটিই করে চলেছে ভারত প্রথমে চীনের 49 টি মোবাইল অ্যাপ নিষিদ্ধ করে বর্তমানে আরও 118 টি চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে আগামী দিনে 250 এর অধিক চীনা অ্যাপ ভারত সরকারের নজরে রয়েছে এগুলি ও ভারত সরকার নিষিদ্ধ করতে পারে। এখন অনেকেই এ বিষয়ে হাসাহাসি করছে যে চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করলে চীনের কি হবে? বা ভারত চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করলে চীনেরই বা কি এসে যায়?

তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি যুদ্ধ শুধুমাত্র গোলাগুলি দিয়েই হয় না বর্তমান বিশ্বে বহু রকম যুদ্ধ চলছে যেখানে একটি ও গুলি না চালিয়ে অপর দেশকে ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব। বর্তমান পৃথিবীতে একদিকে অর্থনৈতিক যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, মিডিয়া যুদ্ধ, সাইবার যুদ্ধ, কূটনৈতিক যুদ্ধ, প্রচলিত যুদ্ধ ইত্যাদি সব রকম যুদ্ধই দেখা যায়। তাই শুধুমাত্র প্রচলিত যুদ্ধেই একটি দেশকে কাবু করা যেতে পারে এমন নয়। তাই ভারত বর্তমানে চীনের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আর কূটনৈতিক যুদ্ধে ভারতের চেয়ে শক্তিশালী দেশ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। ভারতের কূটনীতির ফলে ভারতই একমাত্র দেশ যে দেশের সঙ্গে আমেরিকা ও রাশিয়া, আরব ও ইজরায়েল, সৌদি আরব ও ইরান এরকম প্রতিটি পরস্পর বিরোধী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রয়েছে। বিশ্ব কূটনীতিতে এমন মজবুত অবস্থান খুব কম দেশেরই রয়েছে!

এখন প্রশ্ন হল এই চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করার ফলে কি হবে? ভারত জনসংখ্যায় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ এবং পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি। তাই ভারতের বাজার হাতছাড়া হওয়ার ফলে চীনা কোম্পানি গুলির কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে তাই চীনের মূল শক্তি অর্থনীতিতে তীব্র আঘাত লাগছে। শুধু তাই নয় ভারত যা করছে আমেরিকা এবার সেগুলি করার দিকে এগোচ্ছে ভারত টিকটক নিষিদ্ধ করার পর এখন আমেরিকা ও টিকটিক সহ বিভিন্ন অ্যাপ নিষিদ্ধ করার দিকে এগোচ্ছে এবং আমেরিকা যা করে ইউরোপ পরবর্তীতে তাই করে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এভাবেই ভারতের কূটনীতির ফলে চীন আজ বিশ্বের একঘরে দেশে পরিণত হচ্ছে এবং চীনা কোম্পানিগুলি দেউলিয়া হওয়ার অবস্থার দিকে এগোচ্ছে। বলাইবাহুল্য এরফলে চীনা অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং চীনে বেকারত্ব বাড়ছে।

ভারতের দ্বিতীয় বড় পদক্ষেপ হল ‘Make in India and Make for World’ এই নীতির ফলে ভারত বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি গুলিকে চীন থেকে কারখানা সরিয়ে নিয়ে ভারতে আনার কথা বলছে এরফলে চীন থেকে বড় বড় কোম্পানি গুলি ভারত ও অন্যান্য দেশে বিনিয়োগ করছে। ভারতের এই পদক্ষেপে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, আমেরিকা প্রভৃতি দেশ ও তাঁদের বিনিয়োগ অন্য দেশে করার দিকে এগোচ্ছে। তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনা পণ্যের উপর শুল্ক নীতির ফলে চীনের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যেখানে 2018 সালে চীন আমেরিকায় $539.5 বিলিয়ন ডলার পণ্য রপ্তানি করে সেখানে আমেরিকা মাত্র $120.3 বিলিয়ন ডলার পণ্য চীনে রপ্তানি করে অর্থাৎ এই অর্থবর্ষে আমেরিকার $419.1 বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য ঘাটতি হয়। চীনের নীতি হল বিদেশি দ্রব্য রপ্তানি করব বেশি করে কিন্তু আমদানি করব না এই বিষয়গুলি বিবেচনা করে আমেরিকা চীনা পণ্য শুল্ক বৃদ্ধি একে ‘Trade war’ বলা হয় এর ফলে 2019 সালে চীন আমেরিকাতে পণ্য রপ্তানি করে $452.2 বিলিয়ন ডলার অন্যদিকে আমেরিকা চীনে রপ্তানি করে $106.6 বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ এই বাণিজ্য যুদ্ধে আমেরিকার $345 বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য ঘাটতি হয়। অর্থাৎ আমেরিকা শুধু শুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমেই (419-345)= প্রায় $74 বিলিয়ন ডলার বাঁচায় যা বহুদেশের মোট অর্থনীতির চেয়ে ও বেশি। উল্লেখ্য CPEC এর মোট ব্যয় $62 বিলিয়ন ডলার যার ফলে পাকিস্তান কার্যত চীনের উপনিবেশে পরিণত হচ্ছে!

তাই যারা মনে করে এই Trade war এ চীনের কিছু হবে না তাঁরা বিভ্রান্তিতে রয়েছে আমেরিকার এরূপ পদক্ষেপের ফলে চীনের বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এবার আশা যাক ভারতের কথায় 2018-19 অর্থবর্ষে চীন ভারতে $70.3 বিলিয়ন ডলার পণ্য রপ্তানি করে অন্যদিকে ভারত মাত্র $16.7 বিলিয়ন ডলার পণ্য রপ্তানি অর্থাৎ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে এই অর্থবর্ষে ভারতের $53.6 বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য ঘাটতি হয়। 2019-20 অর্থবর্ষে চীন ভারতে $65.3 বিলিয়ন ডলার পণ্য রপ্তানি করে অন্যদিকে ভারত চীনে $16.6 বিলিয়ন ডলার পণ্য রপ্তানি করে অর্থাৎ এই অর্থবর্ষে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি কমে $48.7 বিলিয়ন ডলার হয়। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ভারত থেকে যে অর্থ চীন আয় করে সে অর্থই চীন ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যাবহার করবে তাই ভারতব্যাপী জনগণ চীনা পণ্য বয়কটের ডাক দিয়েছে। ভারতব্যাপী একটা শ্লোগান জনপ্রিয় হচ্ছে তা হল ‘সেনা জবাব দেগি বুলেট সে জানতা দেগি ওয়ালেট (wallet) সে’! অর্থাৎ সেনাগুলি দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করলেও জনগণ চীনা পণ্য বয়কটের মাধ্যমে চীনের অর্থনীতিতে আঘাত হানবে।

বলাইবাহুল্য চীনের করোনা ও এই বিস্তারবাদী নীতির বিরুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে জনমত শুধু ভারত ও আমেরিকায় গড়ে উঠছে না বরং অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ব্রিটেন, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্য সমূহের বিভিন্ন দেশগুলি ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দিকে এগোচ্ছে! তাই চীনের যে অপার সমৃদ্ধি তা আর বেশি দিন স্থায়ী থাকবে না। চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে বিদেশে তাঁর পণ্য রপ্তানি করবে কিন্তু কোন দেশের পণ্য চীনে বাণিজ্য করতে দেবে না, চীনের এই অসম নীতির প্রতি বিশ্ব এখন সচেতন হচ্ছে যার ফল চীনকে ভোগ করতে হবে!

চীনের ইতিহাসে দেখতে পাই চীন আগে ভারতের চেয়ে ও গরীব দেশ ছিল কোটি কোটি মানুষ খাদ্যের সংকটে মারা যেত। চীনের এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে মাও সে তুং এর মৃত্যুর পর দেন জিও পিং এর আমলে 1978 সালে চীনে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয়, ভারতে 1991 সালে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয় তাই ভারত এই ক্ষেত্রে চীনের থেকে কিছুটা পিছনে রয়ে যায়। একদিকে একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অন্যদিকে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফলে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়। সেই সঙ্গে রিচার্ড নিক্সন সহ তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের চীন ও পাকিস্তানপন্থী নীতি ও ভারত বিদ্বেষের কারণে চীন, আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য নীতির সুযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে পৃথিবীর অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। আর বর্তমানে সেই চীনই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসাবে দাড়িয়েছে।

আমেরিকার বিদেশ সচিব ‘মাইক পম্পেও’ যথার্থই বলেছেন “পূর্বতন প্রেসিডেন্টদের ভুল নীতির কারণেই চীন বর্তমানে এত বড় সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। তিনি এটাও উল্লেখ করেন আমেরিকা মনে করত চীন মুক্ত বাণিজ্যের সংস্পর্শে এলে তাঁর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে এবং চীনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রসার ঘটবে। তিনি উল্লেখ করেন এটি আমেরিকার নীতি নির্ধারণে খুব বড় ভুল ছিল এবং এই অবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। আমেরিকা এর বিরুদ্ধে কাজ করে যাবে এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।” এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য আমেরিকা প্রস্তাব দেয় চীনকে রুখতে ভারত, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার চতুর্ভুজ শক্তির অক্ষকে দক্ষিণ চীন সাগরের অন্যান্য দেশ ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, ফিলিপিন্স ইত্যাদি দেশকে যুক্ত করে এক নতুন ধরণের NATO গড়ে তুলতে হবে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় বিশ্বের রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে চীন যদি মনে করে চীন ও পাকিস্তানের মিলিত আক্রমণে ভারতকে যুদ্ধের ময়দানে সহজেই হারানো সম্ভব তাহলে তা চীনের বড় ভুল হবে! বস্তুত বলা চলে যুদ্ধের ময়দানে ভারত ও পিছিয়ে নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে চীনের সৈনিক সংখ্যা বেশি হলেও তাঁদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই, তাই কার্যক্ষেত্রে এগুলির গুরুত্ব কম অন্যদিকে ভারতীয় সৈনিক যুদ্ধে লড়াই করা সৈনিক তাই তাঁর কার্যকারিতা অনেক বেশি। স্বাধীনতার পূর্বে এই ভারতীয় সৈনিকদের উপর নির্ভর করেই ব্রিটেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী হয়। স্বাধীনতার পর 1947, 1965, 1971 ও 1999 সালে মোট চারবার ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ সংগঠিত হয়। অন্যদিকে 1962 সালে ভারত চীন যুদ্ধ ও সংগঠিত হয়। তাই স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ভারত পাঁচ বার যুদ্ধে লড়াই করেছে তাই এত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও দক্ষ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করা চীনের পক্ষে সহজ নয়!

অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে প্রায় 2 লক্ষ সৈনিক রয়েছে যাঁরা পাহাড়, পর্বতের যুদ্ধে বিশ্বসেরা তাই এই বিষয় গুলি চীনকে চাপে রাখার জন্য যথেষ্ট। তাই যে চীনা সংবাদপত্র গুলি আগে যেখানে ভারতকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল তাঁরা এখন সব বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলছে, যদিও মাঝে ভারতকে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করছে তবে ভারত হুমকিতে মাথা নোওয়া বার দেশ নয়। বলা যায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভারতই একমাত্র দেশ যারা চীনা আধিপত্যের কাছে মাথা নত করেনি এবং পরম পরাক্রমে চীনের সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভারতের এই শক্তিশালী অবস্থান বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে অবাক করেছে ও চীনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে!

চীনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল একটা প্লেয়ার নেট প্র্যাকটিস যতই করুক যতক্ষণ না খেলার ময়দানে যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে, ততক্ষণ যে প্রকৃত খেলোয়াড় হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ খেলার মাঠে যে শিক্ষা অর্জন হয় নেটে তা অর্জন হয় না। তাই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হীন চীনা সেনাবাহিনীর তুলনায় যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ভারতীয় সেনাবাহিনী কয়েক কদম এগিয়ে রয়েছে। এবার প্রশ্ন হল চীনা যুদ্ধ বিমান ও যুদ্ধাস্ত্রের কথা। চীন দাবি করে তাঁদের যুদ্ধ বিমান পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বিমান কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা দেখা যায় চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তাই চীন যা দাবি করে বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর মিল নেই। চীনা মাল দেখতে সুন্দর কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা বেশি দিন চলে না। কথায় আছে চীনা মাল টেকে কম। তাই চীন যতই দাবি করুন তাদের আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে কিন্তু সেগুলি পরিক্ষিত নয় তাই চীনা যুদ্ধাস্ত্র কেমন হবে তা কেউ জানে না।

এবার পণ্যের কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যেমন- আমেরিকা নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কারের জন্য প্রসিদ্ধ, আমেরিকা নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে যেমন- গুগল, ফেসবুক, টুইটার, আধুনিক যুদ্ধবিমান, পরমাণু প্রযুক্তি ইত্যাদি। ইতালি যেটা তৈরি করে কম উৎপাদন করে কিন্তু গুণগত মানের দিকে তা অতি উচ্চমানের হয় যেমন- ফারারি গাড়ি। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান অতি উচ্চমানের ইলেকট্রনিক উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ যেমন- দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসং মোবাইল কোম্পানি ইত্যাদি! এখন প্রশ্ন হল চীন কি জন্য বিশ্বে প্রসিদ্ধ?

চীন বিশ্বে প্রসিদ্ধ কোন কিছু কপি করার জন্য, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে না পারলেও চীন পৃথিবীতে যা দেখে তাই কপি করে। তাই ইউটিউব, টুইটার ইত্যাদি দেখে চীন সেদেশে নিজেদের এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছে। চীন মূলত বিশ্বে যে জন্য বিখ্যাত তা হল চীনে শ্রম শোষণ এবং ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট থাকার কারণে চীন যে কোনো জিনিস অনেক বৃহৎ পরিমাণে সস্তা দামে উৎপাদন করতে পারে। উৎপাদিত পণ্যের গুণমান বিশেষ না হলেও সস্তা দামে চীন বিশ্বের বাজারকে নিজেদের কব্জায় এনেছে। বর্তমানে পৃথিবী এ বিষয়ে ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছে ও ব্যাবস্থা নিচ্ছে। তাই চীনা পণ্যের মতো চীনা যুদ্ধাস্ত্রগুলি ও গুণমানে উন্নত নয়, সবচেয়ে বড় কথা হল এগুলি কোন যুদ্ধে পরিক্ষীত নয় যা চীনকে চাপে ফেলতে বাধ্য।

অন্যদিকে ভারতের যুদ্ধাস্ত্রগুলি মূলত পৃথিবীর পাঁচটি শক্তিশালী দেশ থেকে নেওয়া এগুলি হল আমেরিকা, রাশিয়া, ইজরায়েল, জার্মানি ও ফ্রান্স। তাই এই সমস্ত দেশের বহু পরিক্ষীত যুদ্ধাস্ত্র গুলি ভারতকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে এক আলাদা সুবিধা প্রদান করে। সেই সঙ্গে ভারতে উৎপাদিত বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাত মজবুত করছে যেমন- ভারতে উৎপাদিত ‘তেজস যুদ্ধ বিমান’ ও অন্যান্য মিসাইল সিস্টেম ইত্যাদি যুদ্ধের ময়দানে ভারতের শক্তি বৃদ্ধি করে। পাহাড়ি যুদ্ধে ভারতকে হারানো শক্ত! এরসঙ্গে আরও বেশকিছু বিষয় যুক্ত রয়েছে ভারতের যুদ্ধ বিমানবন্দর গুলি সমতলের কাছাকাছি অবস্থিত তাই এখান থেকে অনেক বেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ও অনেক বেশি তেল নিয়ে অনেক বেশি সময় ধরে ভারতীয় বিমান বাহিনী আকাশে উড়তে পারে অন্যদিকে চীনের বিমানবন্দর গুলি অনেক উঁচুতে থাকার কারণে বেশি তেল ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে উড়তে সক্ষম নয় যা যুদ্ধের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করবে। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে গোর্খা, শিখ, জাঠ, মারাঠা, তিব্বতি ইত্যাদি রেজিমেন্ট দেখা যায় এরা খুবই দেশপ্রেমিক তাই এরা দেশের জন্য হাসতে হাসতে প্রাণ বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত, প্রয়োজন পড়লে জাতি, ধর্ম, নির্বিশেষে 130 কোটি ভারতবাসী এই যুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে এসে দাঁড়াবে। এবার প্রশ্ন হল চীনের জনগণ কি চীনা সেনাবাহিনীর পাশে এসে দাঁড়াবে?

এখানে প্রথমেই একটা কথা উল্লেখ্য ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি বা PLA’ কিন্তু চীনের সেনাবাহিনী নয় এটা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সেনাবাহিনী এবং এর সর্বোচ্চ পদে কোন জেনারেল নয় বরং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি এটা নিয়ন্ত্রণ করে তাই এর কার্যক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। এবার প্রশ্ন হল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সেদেশের জনগণের উপর যেরকম অত্যাচার করে সেখানে সমস্ত চীনা জনগণ চীনের পাশে থাকবে কিনা সেটাও বড় প্রশ্ন? চীনের এক সন্তান নীতির কারণে ও চীনে সমস্যা দেখা যাচ্ছে কারণ চীনে যদি কোন সৈনিকের মৃত্যু হয় দুটি পরিবার অনাথ হয়ে যায় এরফলে চীনের জনগণ তাঁদের সৈনিকদের সেনাতে পাঠাতে আগ্রহী নয় অন্যদিকে ভারতে এ সমস্যা নেই ভারতে কোন পরিবারের একটা সন্তান যুদ্ধে মারা গেলে তাঁর পরিবার এটা ভাবে আমার আর একটা ছেলে গিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগদান করবে এবং দেশের জন্য লড়াই করবে। এক সন্তান নীতির কারণে চীনে বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি তাই কর্মক্ষম জনসংখ্যা কম থাকায় চীনের অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি হয় যা যুদ্ধের মতো ক্ষেত্রে চীনের জন্য বড় সমস্যা হিসাবে দেখা দিতে পারে!

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল গালওয়ানে ভারতের 20 জন সৈনিক মারা যাওয়ার পর ভারত সরকার প্রতিটি সৈনিকের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে, তাঁদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানানো হয়, তাঁদের পরিবারকে তাঁদের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়! গোটা দেশ এই সেনাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এবং চীনের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের পাশে দাঁড়ায় ও চীনা পণ্য বয়কটের গণআন্দোলন শুরু হয়! অন্যদিকে এই ঘটনায় বহু চীনা সৈনিক মারা গেলেও চীনা সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের সৈনিকদের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেনি এবং তাঁদের সৈনিকদের কোন সন্মান প্রদান করা হয়নি। এই বিষয়গুলি নিয়ে চীনের সৈনিক মহলের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যে কোন দেশের সৈনিক তাঁর দেশের জন্য প্রাণ দেয় ভারত যেখানে তাঁর সৈনিকদের পূর্ণ মর্যাদায় বিদায় জানাচ্ছে সেখানে চীন, পাকিস্তানের মতো চুপি চুপি তাঁদের সেনাকে দাফন করছে এর কুপ্রভাব সেনাবাহিনীর মনোবলের উপর পড়ে!

তাই ভারতীয় সেনা যেভাবে নিজের দেশের জন্য বলিদান দিতে প্রস্তুত এক্ষেত্রে চীনা সেনাবাহিনীর কিছুটা হলেও পিছপা রয়েছে। তাই ভারতের সঙ্গে চীনের যুদ্ধ হলে চীনের অপূরণীয় ক্ষতির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে! আসলে চীন ভারতের চেয়ে সামরিক দিক থেকে অনেক শক্তিশালী দেশ এরূপ মনোভাব 1962 সালের যুদ্ধের পর থেকে মানুষের জনমানসে দেখা যায়, আর চীন সেটা ব্যবহার করে।1962 এর যুদ্ধে ভারত প্রস্তুত না থাকার কারণে যুদ্ধে হারে তবে এখন আর তা সম্ভব নয়। চীনের কাজ হল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের অর্থের বিনিময়ে চীনের পক্ষে কথা বলার জন্য প্রস্তুত করা, তাই আমেরিকার বৃহত্তম সংবাদ মাধ্যমগুলিতে ও চীনপন্থী খবর প্রকাশিত হয়। ভারতে ও একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা এমন সংবাদ প্রকাশ করে যেন চীন এক বিরাট মহাশক্তি এবং এরা ভারতীয় সেনা ও দেশের জনগণের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করে। চীনের এই যুদ্ধ কৌশলকে ‘psychological war’ বলা হয়! তাই এই সমস্ত ধান্দাবাজ বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের থেকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন!

তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য শত্রুকে কোনও দিন দুর্বল ভাবতে নেই। চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হল, যে কোন জিনিস প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে 30 লক্ষ জার্মান সৈন্য মারা গেলে ও 2 কোটি রাশিয়ান সৈনিক মারা যায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার কাছে জার্মানি পরাজিত হয়। তাই চীনের সেনাবাহিনীর যুদ্ধে অভিজ্ঞতা কম হলেও সংখ্যায় বেশি এটা কিন্তু ফেলে দেওয়ার বিষয় নয়। কথায় আছে ধারে কাটে বা ভরে কাঁটে। তাই এই সংখ্যাকে কোন ভাবেই অবজ্ঞা করা যাবে না। সেইসঙ্গে আধুনিক পরিকাঠামো চীনা সৈনিকদের দ্রুত সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ করে দেয় এটাও চিন্তার বিষয়। তবে ভারত সরকার ও বসে নেই সীমান্তে দ্রুত রাস্তা ও বিমানবন্দর নির্মাণ করে ভারত সরকার ও আসন্ন সমস্যার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। তাই সদাসতর্ক থাকা প্রয়োজন!

একশ্রেণীর পাকিস্তানী ও বাংলাদেশিরা মনে করে
চীন যদি ভারত আক্রমণ করে তাহলে পাকিস্তান ও যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে এবং উভয় দেশের সেনার হাতে ভারত খুব সহজেই যুদ্ধে হেরে যাবে এবং ভারত খন্ড খন্ড হয়ে যাবে। তাদের উদ্দেশ্যে বলি বিষয়টি এত সহজ নয় ভারত আগে থেকেই এই বিষয়ে সচেতন রয়েছে তাই পাকিস্তান যদি চীনের সঙ্গে আক্রমণ করে তাহলে পাকিস্তানের কপালে ও দুঃখ রয়েছে! যে পাকিস্তান অর্থনৈতিক দিক থেকে দেউলিয়া হওয়ার অবস্থায় রয়েছে তাঁরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করবে কিভাবে?

আর চীন ও পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের পক্ষে আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ যুদ্ধের ময়দানে নামতে পারে তাই এই পরিকল্পনার ব্যার্থ হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য কোন দেশের সাহায্যের উপর ভরসা করা উচিত নয় এবং ভারত নিজেই পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে একই সঙ্গে যুদ্ধ লড়তে প্রস্তুত। ভারতের CDS জেনারেল বিপিন রাওয়াত যথার্থই বলেছেন ভারত Two front war বা (নেপাল সমেত) আড়াই ফ্রন্ট ওয়ার লড়াইয়ে প্রস্তুত! তাই আগামী দিনে কি হবে তা বিশ্ব রুদ্ধশ্বাসে দেখছে!

চীনের বিরুদ্ধে ভারতের এই শক্ত অবস্থান পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে সাহস যোগাচ্ছে। ভারতের এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, তাইওয়ান ইত্যাদি দেশগুলি ও চীনের বিরুদ্ধে ভারতের সহায়তায় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সদস্যের দেশগুলি মনে করছে ভারত যেভাবে চীনের সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর প্রতিটি দেশকেই এভাবেই ভারতের পাশে দাঁড়ানো উচিত! তাই বলাইবাহুল্য চীনের পক্ষে এই অসম লড়াই চালিয়ে যাওয়া খুব একটা সহজ হবে না এবং একথা বলা অসঙ্গত হবে না চীনের জন্য কঠিন সময় আসতে চলেছে!

সৎবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী জানা যায় চীনে ভয়াবহ বন্যা, করোনা ও বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করার জন্য চীনে ভয়ংকর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে তাই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ‘Clean your Plate campaign’ শুরু করেছে। চীনের ইতিহাস বলে মাও এর আমলে 1959-1961 সাল পর্যন্ত প্রায় 4 কোটি মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যায় ইতিহাসে এই ঘটনা ‘Great leap forward’ নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে মাও সে দেশের জনগণের কাছে তাঁর প্রশাসনিক ব্যার্থতা ঢাকবার জন্য 1962 সালে ভারত আক্রমণ করে। ইতিহাস সাক্ষী চীনে আবার ঠিক সেই একই রকম খাদ্য সংকট দেখা যাচ্ছে! বিশেষজ্ঞদের মতে আরও নানা সমস্যা থেকে চীনা জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে শি জিন পিং এর এই আক্রমণাত্মক বিদেশনীতি ও ভারত আক্রমণের পরিকল্পনা! তাই ভারত সরকার ও দেশের জনগণকে সচেতন থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

বস্তুত বলা যায় চীনের এই আগ্রাসী বিদেশ নীতির ফলে চীনা জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরফলে একদিকে যখন চীনের জনগণ খাদ্যের সংকটে মারা যাচ্ছে, তখন শি জিন পিং বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে রয়েছে! তাঁর এই কর্মকাণ্ডের ফলে চীন ‘বিশ্বের শত্রুতে’ পরিণত হচ্ছে, গোটা বিশ্বে চীনা জনগণের প্রতি একটা নেতিবাচক ধারণার প্রসার ঘটছে, যাঁর ফল চীনা জনগণকে ভোগ করতে হবে! এমন নয় যে চীনা জনগণ এবিষয়ে সচেতন নয় তাঁরা ও কমিউনিস্ট পার্টির এই বজ্র আটুনি থেকে মুক্তি চাই কিন্তু চরম দমন পীড়নের কারণে তাঁরা ও রাজনৈতিক বন্দি হিসাবে চীনে বসবাস করতে বাধ্য। সুযোগ পেলে চীনা জনগণ ‘দ্বিতীয় সোভিয়েত পতনের’ মতো ঘটনা ঘটাবে না তা কে বলতে পারে?

তাই চীনের প্রয়োজন বিস্তারবাদী চিন্তাকে সরিয়ে নিজের দেশের জনগণের জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা! ভারত এক শান্তিপূর্ণ দেশ তবে এরই সঙ্গে ভারত তাঁর নিজস্ব স্বাধীনতা রক্ষায় জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত! ভারতীয়দের অদম্য লড়াইয়ের ফলেই 190 বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় এবং ভারত স্বাধীনতা অর্জন করে, তাই ভারতবাসী দেশমাতৃকা রক্ষার্থে লড়াই করতে জানে! একশ্রেণীর বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিরা মনে করে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হলে ভারতের মুসলমানরা চীন ও পাকিস্তানের পক্ষ নেবে। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি এগুলি অলীক কল্পনা মাত্র। হ্যাঁ এমন কিছু মানুষ থাকতে পারে, তবে দেশমাতৃকা রক্ষার্থে ও ভারতের প্রতি ভালোবাসায় ভারতীয় মুসলমানরা ও দেশের আরও পাঁচটা অংশের মানুষের চেয়ে কোন অংশে কম যায় না তাঁরা ও সুযোগ পেলে দেশ রক্ষার্থে সকল ভারতবাসীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে!

যাঁর প্রমাণ আমরা 1947, 1965, 1971 ও 1999 এর ভারত পাক যুদ্ধ ও 1962 এর ভারত চীন যুদ্ধে দেখতে পাই। তাই ভারতের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের যুদ্ধ হলে 130 কোটি ভারতবাসী দেশের জন্য সর্বোচ্চ বলিদান দিতে প্রস্তুত! যা চীন ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা যায় না কারণ এই দেশগুলির জনগণ দেশের শাসক শ্রেণীর দ্বারা আক্রান্ত। চীনে উইঘুরু, মোঙ্গল, তিব্বতি ইত্যাদিরা আক্রান্ত আবার পাকিস্তানে বালোচ, সিন্ধি, পাখতুন, পাক কাশ্মীরি, মুহাজির ইত্যাদি সম্প্রদায় পাক সরকার ও সেনাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত! তাই যুদ্ধ শুরু হলে এই সম্প্রদায়ের মানুষরা তাঁদের সরকারের পাশে দাঁড়াবে কিনা সন্দেহ? তবে ভারতের 130 কোটি জনগণ যখন সরকার ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে তখন এই দেশকে থামিয়ে দেওয়া অসম্ভব!

তাই 130 কোটি ভারতবাসী যখন কোন কিছু করার কথা চিন্তা করে তখন তা সফল না হয়ে পারে না! আর ভারত সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এবার যদি যুদ্ধ হয় তবে নির্নায়ক লড়াই হবে ভারত পাকিস্তানের কাছ থেকে পিওকে ও চীনের কাছ থেকে আইসাই চীন পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করবে। আর পিওকে ভারতের অন্তর্গত হলে চীনের বহু প্রতিক্ষিত সিপিইসি পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ব্যার্থ হয়ে যাবে! তাই আগামী দিনে কি হবে বলা মুশকিল তবে যে কোন পরিস্থিতির জন্য দেশবাসীকে সদাপ্রস্তুত থাকতে হবে!

চলবে…

তথ্যসূত্র:-

1. উইকিপিডিয়া।

https://en.m.wikipedia.org/wiki/China

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Nazi_Germany

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Chinese_Communist_Party

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Central_Tibetan_Administration

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Indo-Pakistani_War_of_1947%E2%80%931948

2. The diplomat.

https://thediplomat.com/2020/09/china-doesnt-understand-europe-and-it-shows/

https://thediplomat.com/2020/09/chinas-crackdown-on-mongolian-culture/

https://thediplomat.com/2020/09/how-china-strengthens-the-quad/

https://thediplomat.com/2020/09/germany-joins-the-indo-pacific-club/

https://thediplomat.com/2020/09/cracks-in-china-europe-relations-run-deep/

https://thediplomat.com/2020/09/inside-hong-kongs-besieged-legislative-council-democrats-refuse-to-surrender/

https://thediplomat.com/2020/09/india-china-tensions-spike-in-the-himalayas/

3. The Guardian.

https://www.google.co.in/amp/s/amp.theguardian.com/world/2020/aug/18/china-xi-jinping-facing-widespread-opposition-in-his-own-party-claims-insider?espv=1

https://www.google.com/amp/s/amp.theguardian.com/world/2020/aug/18/cai-xia-chinese-insider-hits-out-at-xi-jinping-he-killed-a-party-and-a-country

https://www.theguardian.com/global-development/2020/feb/07/coronavirus-chinese-rage-death-whistleblower-doctor-li-wenliang

4. Eurasian times.

India-China War: China Has No ‘Military Advantage’ Over ‘Battle-Hardened’ Indian Army – CNN

5. CNN.

https://www.google.co.in/amp/s/amp.cnn.com/cnn/2020/06/17/asia/india-china-military-comparison-hnk-intl-scli/index.html?espv=1

6. Global watch analysis.

https://global-watch-analysis.com/limpetoiyable-politique-de-sterilisation-des-femmes-ouighoures-par-le-gouvernement-de-pekin/?lang=en

https://global-watch-analysis.com/la-chine-leader-mondial-de-la-proliferation-nucleaire-et-de-virus/?lang=en

https://global-watch-analysis.com/la-pandemie-du-covid-19-exacerbe-le-ressentiment-anti-chinois/?lang=en

7. Global times.

https://www.globaltimes.cn/content/1200076.shtml

https://www.globaltimes.cn/content/1199734.shtml

https://www.globaltimes.cn/content/1199709.shtml

https://www.globaltimes.cn/content/1199924.shtml

https://www.globaltimes.cn/content/1200423.shtml

8. Times of India.

https://m.timesofindia.com/business/international-business/the-deficit-that-triggered-the-worlds-biggest-trade-war/articleshow/69352735.cms

https://m.timesofindia.com/business/india-business/indias-trade-deficit-with-china-at-5-year-low/amp_articleshow/76521335.cms

https://m.timesofindia.com/business/international-business/finally-china-agrees-to-work-on-balance-of-trade/articleshow/71560730.cms

9. Indian Express.

https://indianexpress.com/article/opinion/columns/tibet-india-china-border-himalayas-galwan-valley-6577886/

https://indianexpress.com/article/opinion/columns/communist-party-of-china-president-xi-jinping-politics-6589729/lite/

10. Economic Times.

https://www.google.com/amp/s/m.economictimes.com/news/defence/us-aiming-for-nato-like-alliance-with-india-australia-japan-to-counter-china/amp_articleshow/77867159.cms

11. Decant chronicle.

https://www.deccanchronicle.com/nation/current-affairs/100920/indian-army-occupies-more-heights-around-ladakh-lake.html

12. CNBC.

https://www.cnbc.com/2020/09/03/india-bans-118-chinese-apps-after-ladakh-border-tension-flares-up.html

13. Strat news global.

Xi-Tler? Xi Jinping Emulating Adolf Hitler!

14. Statista.

https://www.statista.com/chart/amp/17982/us-trade-in-goods-with-china-since-1985/

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1