বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০] ! পর্ব : ৯

[১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু মারা না গিয়ে বেঁচে উঠলে কিভাবে চালাতেন তিনি আজকের বাংলাদেশ! বহুদলীয় শাসনে বাংলাদেশ কি ভাল আছে এখন! একদলীয় শাসনের চীনের থেকে? তার রূপক গল্প হচ্ছে এটি! বড় বিধায় প্রত্যহ রাত ৮-টায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হবে জীবন চিন্তনের এ গল্প!]

:

দেশের সকল নাগরিকদের জন্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ব্যবস্থা, যাতায়াত ও পরিবহণ, বাসস্থানের ক্ষেত্রে সমতার নীতি গ্রহণ করাতে নাগরিকদের মধ্যে সম্প্রীতি, শ্রদ্ধাবোধ ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের প্রত্যেকটি মানুষ সহমর্মিতার নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ছোটখাটো বিরোধের মিমাংসার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। ওজনে কম দেয়ার যে বদ অভ্যেস বাঙালি জাতির মধ্যে ছিল, মানুষের মাঝে নৈতিকতার প্রচার ও কঠোর আইনের কারণে এখন দেশে কেউ-ই আর কাউকে ওজনে কম দেয় না। লিচু আগে যেখানে ১০০-টি কিনে ৭০-৮০টি পাওয়া যেতো, সেখানে এখন ১০০ লিচুতে ১০০-টিই পাওয়া যায়। দর কষাকষির বিধানও দেশ থেকে আসেত্ম আসেত্ম রহিত হয়েছে। যেখানে আগে একটি প্রকৃত ১০০-টাকার জিনিস দু-তিনশো টাকা চেয়ে ক্রেতাকে ঠকানোর রীতি প্রচলিত ছিল, সেখানে এখন বঙ্গবন্ধু সরকারের কঠোর নীতি অনুসরণের কারণে কেউ-ই এখন ৯৯ টাকার জিনিসও আর ১০০-টাকা চায়না।

:

আরেকটি বদ অভ্যেস ছিল এ জাতির, তা হলো বিল পরিশোধ কিংবা অন্য কোন কারণে ব্যাংক, ডাকঘরে ৯৮-৯৯ টাকার স্থলে পুরো ১০০ টাকাই রেখো দিতো, ‘ভাংতি নাই’ অযুহাতে প্রায় প্রত্যেক টাকা পরিশোধকারীকে এভাবে ঠকানো হতো, বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর কানে গেলে তিনি এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা জারী ও বেতার ভাষণেও বিষয়টির উলেস্নখ করাতে, বর্তমানে কেউই আর ৯৯-টাকার স্থলে ১০০ টাকা রাখেনা। মানুষের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতার প্রসার ঘটাতে কেউই এখন আর কোন বিল বাকি ফেলে না। খাবারে ভেজাল দেয়া, হাইড্রোস, কৃত্রিম রং ও ফরমালিনসহ যেসব রাসায়নিক জিনিস মেশানোর পুরণো রীতি ছিল বাংলাদেশে, তা এই ২০২০ সনে কোথাও আর দেখা যাচ্ছেনা। মেয়েদের গায়ে আক্রোশমূলক এসিড নিক্ষেপের ঘটনা বিগত ১০-বছরেও ঘটেনি একটিও। বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমমূলক বক্তৃতা ও কঠোর পদক্ষেপে তা নিরসন হয়েছে পুরোপুরি। সাপে-কাটা রোগীদের আগে কুসংস্কারের কারণে ওঝার মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করানো হতো, যাতে বিষাক্ত সাপে-কাটা রোগী সবই প্রায় মারা যেতো। বর্তমানে সরকারের কুসংস্কার বিরোধী প্রচারণার কারণে ও ওঝা-বৈদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় মানুষ এখন বর্ণিত রোগের জন্যে ‘এন্টিভেনাম’ জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করে প্রায় সবাই ভাল হচ্ছে। পীর-ফকির, ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজ, জোঁকের তেল, ধনেস-পাখির তেল, চালপড়া-জুতাপড়া, জ্বীন-ভুতের চিকিৎসার পুরণো পদ্ধতি সরকারের সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তকরণ ও নিষিদ্ধ করে কঠোর আইন প্রণয়নের কারণে, সবই এখন ২০২০ সনে দেশ থেকে দূর হয়েছে। মানুষ এখন ওগুলো থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছে।

:

পচাত্তর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ব্যাপক ফতোয়া ও ধর্মান্ধতার জাগরণ ঘটলে, বঙ্গবন্ধু পাঠ্যসূচিতে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দেন। সকল মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও অসাম্প্রদায়িকতার স্বপক্ষ সরকারি উদ্যোগে রেলি, ক্যাম্পিং, সভা, সেমিনার, পোস্টারিং ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় অব্যাহতভাবে। যত্রতত্র ফতোয়া প্রদান ও ফতোয়ার মাধ্যমে কাউকে শাস্তি প্রদান, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, একঘরে করাকে মারাত্মক ‘সামাজিক অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আন্ত.ধর্ম বৈঠক ও বিশেষ ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে অন্য সকল ধর্মের লোকজনের যাতায়াত করার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সকল ধর্মানুসারীদের বিভিন্ন উৎসবাদির পরিবর্তে ‘বাংলা নববর্ষ’কে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঐদিন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্যে নানাবিধ আনন্দ আর বিনোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার কারণে, বাংলা নববর্ষ এখন বাংলাদেশের প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে। এদিন সারাদেশে সকল বাঙালি একযোগে নববর্ষের দিন তাদের উৎসব পালন করে অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। যা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য অসাম্প্রদায়িক নেতৃত্বের কারণে।

:

দেশের অভ্যন্তরে সকলের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এখন। সংবিধানের ধারাগুলো নাগরিকরা তাদের জীবনে বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছে বিগত বছরগুলোতে। নারীদের পুরুষের সমান সম্পদের অধিকার দেয়া হয়েছে, নারী-পুরুষের মর্যাদা, চাকুরী ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ৫০% মহিলা কোটা, বাঙালি-উপজাতীয় নির্বিশেষে সবাই বাংলাদেশী হিসেবে সমানাধিকার, প্রত্যেকের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার, সামাজিক উৎসবের স্বীকৃতি পেয়েছে সকল নাগরিক জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে। সকল পর্যায়ের ট্রেড ইউনিয়ন, ছাত্ররাজনীতি, চাঁদাবাজী বন্ধ হওয়ার কারণে মানুষের জীবনে স্বসিত্ম এসেছে। রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রে প্রতিবেশির মর্যাদা, মানুষের মর্যাদা, অন্যের অধিকার হরণ থেকে বিরত থাকা, যে কোন ভাবে ধনপ্রাপ্তির লোভ, ভোগবাদের কুফল নিয়মিত প্রচার করার কারণে মানুষের মধ্যে হারানো মূল্যবোধ ফিরে এসেছে, যা এদেশে লালন করতো পুরণো দিনের বাঙালিরা তাদের পরিবারগুলোতে।

:

বাংলাদেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের ডাটাবেশ তৈরী করা হয়েছে, যা ভোটাধিকারসহ সকল কাজে ব্যবহার বাধ্যতামূলক এখন। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশের বিস্ময়কর সামাজিক উন্নয়নের কথা প্রচার করা হচ্ছে প্রায়ই। বঙ্গোপসাগরে ইলিশ চাষে সাফল্যের বিশ্বময় স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক ইলিশ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, মিঠাপানির মাছ এখন প্রায় সকল নদীতেই চাষ হয়, বিশেষ করে ইলিশ এখন সাগর ছাড়াও প্রায় খামারেই চাষ হচ্ছে। সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন জনচাহিদার তুলনায় ৩-গুণ বেড়েছে। ‘‘মাছে-ভাতের বাঙালি’’র পুরণো প্রবাদ নতুন করে বাংলাদেশে ২০২০ সনে পুন.প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রপ্তানী পণ্যের তালিকায় মাছসহ নানাবিধ নতুন নতুন পণ্যের সংযোজন, দেশের ৯৯% জনতাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর কার্যক্রম, সমাজের সর্বত্র নারীর ৫০% বিচরণ তথা নারী উন্নয়ন, সেনা-বিমান-নৌ বাহিনীতে নারী সেনা নিয়োগ, টেক্সি-বাস-ট্রেন ড্রাইভার হিসেবে অসংখ্য নারীর কর্মসংস্থান তথা কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারী, অলিম্পিকে পদক প্রাপ্তি, সাফ-কমনওয়েলথ গেমসে সাফল্য প্রদর্শন, পরিবার পরিকল্পনায় ১-সন্তান নীতি, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, কৃষিতে সবুজ বিপস্নব, জমিতে বছরে ৪-টি ফসল উৎপাদন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক নিরাপত্তা তথা ভিজিএফ-ভিজিডি কার্যক্রম, সুখী মানুষের তালিকায় বাংলাদেশের উচ্চ অবস্থান, অল্পতে তুষ্ট জাতি হিসেবে বাঙালির স্বীকৃতি, দুধ-মাংস-ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম দেশে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ও ভুটানের সঙ্গে ভাগ ও লিজে জমি চাষ করার চুক্তির কারণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রায় সকল পর্যায়ের কৃষিপণ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে ও বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্যসহ নানাবিধ পণ্য রপ্তানী করছে বাংলাদেশ।

:

পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তাদের বিপদের সময়ের যাচাইকৃত বন্ধু, বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের পরীক্ষিত বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো নিবিড় করেছে। তা ছাড়াও পুঁজিবাদী উন্নত দেশগুলো ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক ভাল করেছে। আঞ্চলিক সড়ক ও রেল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার এখন। সার্কভুক্ত সব দেশগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকরা বিনা ভিসায়ই ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছে। বিশ্বের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানীকারক দেশগুলোর মধ্যে প্রধান হওয়াতে অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সকল দেশের কাছে বাংলাদশ গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যেই দুর্নীতিমুক্ত হয়ে সময় নির্ধারণ, ভাড়া ও যাত্রীসেবার কারণে বিশ্বে ‘অনন্য মর্যাদাপূর্ণ এয়ারলাইন্স’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতি বছর বিমানের লাভের পরিমাণ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের যাত্রী পরিবহণের অন্তত ৫% এখন বিমান এককভাবে পরিবহণ করে থাকে। বিশ্বের অনেক নামকরা এয়ারলাইন্স বিমানের সঙ্গে যৌথভাবে ফ্লাইট অপারেশনে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

:

এটি সম্ভব হয়েছে দুর্নীতিমু্ক্ত জাতীয় বিমান সংস্থাকে পরিচালনা করার কারণে। জনগণের মাঝে নৈতিকতার প্রসার ও কঠোর আইন প্রয়োগের কারণে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৩০-৫০% সিস্টেম লসের নামে কর্মচারী-গ্রাহক মিলেমিশে চুরি করতো, তা এখন শূন্যের কোটায় বলা যায়। ‘সিস্টেম লস’ নামক চুরি বন্ধ হওয়াতে সরকার ইতোমধ্যেই গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের দাম কমিয়েছে বেশ ক’বার পর্যায়ক্রমে। এর আগে প্রচলিত নন-জুডিশিয়াল স্টাম্পগুলোতে অন্ধ বৃটিশ আমলের অনুকরণে কেবল বাংলাদেশ ও টাকার মূল্যমান কথাটি লেখার জন্যে যেখানে প্রায় ৪-ইঞ্চি যায়গা ব্যবহার করতো, নতুন স্টাম্পে সেখানে মাত্র বর্ণিত লেখালেখিতে ১-ইঞ্চি যায়গা ব্যবহারের কারণে একটি মারাত্মক অপচয় থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে।

:

[১০ম পর্ব পোস্ট করা হবে আগামিকাল রাত ৮:০০ টায়]

 

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 14 = 15