‘আর না’ বলে নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও

 

বাবার হাতে মা নির্যাতিত হচ্ছে। প্রতিদিন, প্রতি রাতে। কোনো না কোনো কারণে। সন্তানের চোখের সামনে মা’কে মারছে। সন্তানের বয়স তখন কত? ৮/১০ বছর বয়স। এই কচি বয়সে একটা ভয়ার্ত রূপে বাবাকে সে দেখছে, দেখছে ভয়ে চুপসে যাওয়া মা মিনতি করছে, যাতে আর না মারে! প্রতিদিন, প্রতি রাত মায়ের জীবন ভয়ে চুপসে কাটে। এতো গেলো স্বামীর হাতে রোজ মার খাওয়ার ঘটনা। প্রত্যেকটা নারীর জীবনে এক একটি রাত আসে মৃত্যুর আহবান নিয়ে।
আমার মায়ের জীবনেও এসেছিলো। তবে ভিন্নভাবে। আমার বাবা-মায়ের বিয়ের প্রায় ৮ বছর পর আমার জন্ম। গ্রামে সচরাচর পরিবারগুলো বিয়ের এক বছরের মাথায় বংশের বাতি জ্বালাতে নববধূকে চাপাচাপি করে। আমার মাকেও করেছিলো। কিন্তু চাপাচাপিতে যখন কাজ হচ্ছিলো না, সময় কেবল বাড়ছে – তখন নানাভাবে মানসিক অত্যাচার শুরু হয় তার উপর। বাবার পরিবার, আশেপাশের লোকজন নানা কটু কথা শোনাতো রোজ। তার মধ্যেই আমার জন্ম হলো। তবু মানসিক অত্যাচার কমলো না। ভিন্ন আদলে তা চলতে থাকলো।
এ ঘটনা তো আমার জীবনের একখণ্ড। এমন বা এরচেয়েও ভয়াবহ ভাবে নারীকে পরিবার, আশেপাশের আত্মীয়ের দ্বারা রোজ নির্যাতিত হতে হয়।
গৃহেই নয় শুধু নারী প্রতি নিয়ত বাইরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তার মধ্যে ধর্ষণের বিষয়টি আমরা জানছি। কিন্তু মানসিকভাবে নিপীড়নের বিষয়টি এবং গৃহেই নারীর উপর চলা নির্যাতন থেকে যাচ্ছে লোক চক্ষুর অন্তরালে।

দারিদ্রতা, আর্থিক সমস্যা, মানসিকতার পরিবর্তন, নৈতিকতার অভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অভাব এসব কারণে গৃহ নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন নারীরা। শুধু নারীরাই নয়, শিশুরাও এ নির্যাতন থেকে মুক্ত নয়। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয় নারীরা। পৃথিবীর সর্বত্র গৃহ নিপীড়ন ঘটলেও এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপে দেশগুলোতে এ নিপীড়নের মাত্রা ভয়াবহ রকমের। রাশিয়ায় প্রতিবছর ৬ লক্ষ নারী নিজ গৃহে নির্যাতনের শিকার হন। যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত সার্বিয়ায় প্রতি ৩ জন নারীর মধ্যে ১ জন এই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। এ দিকে, জার্মানিতে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মহিলা নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে মহিলাদের সাহায্যার্থে গড়া ওঠা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে এসে আশ্রয় নেয়।
ঘরের বাইরে নারী নিপীড়ন নিয়ে প্রতিবাদ জোরালো হলেও গৃহে নারী নিপীড়ন নিয়ে সে রকম জোরালো কোনো পদক্ষেপ এখনো দেখা যায় নি। এর কারণ, প্রথমত এ সকল নিপীড়ন লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে থাকে। দ্বিতীয়ত, নারীরা মান সম্মানের কথা চিন্তা করে বাইরে এ বিষয় নিয়ে আসতে চায় না। তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে নিপীড়ক এবং নিপীড়িত উভয়েই বিষয়টিকে এড়িয়ে যান।

সম্প্রতি, করোনা ভাইরাস নিয়ে সারাবিশ্ব উদ্বিগ্ন। ভয়ের ছাপ তৈরী করেছে এ মহামারী ভাইরাস। কিন্তু এ মহামারীর মধ্যেই গৃহে নারী নিপীড়ন বেড়েছে হু হু করে। মহামারী সময়ের পূর্বে বিশ্বে এক তৃতীয়াংশ নারী নিপীড়নের শিকার হতেন যেখানে সেখানে এ সংখ্যা বেড়েছে মারাত্মকভাবে। তবে গৃহে নারীর উপর নিপীড়ন পরিসংখ্যানে আমাদের সামনে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপিত হয় না।
রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে জানান যায়, লকডাউনের পর ভারতে নারী নিপীড়ন বেড়ে দ্বিগুণ হারে। তুরস্কে নারী হত্যার হার বেড়েছে , দক্ষিণ আফ্রিকায় ৯০ হাজার লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও অস্ট্রেলীয় সরকারের কাছে অনলাইনে ৭৫ শতাংশ নারী সাহায্য চেয়েছে। নারী নিপীড়নের সংখ্যা ফ্রান্সেও কম নয়। সেখানে ৩৫ শতাংশ নারী গৃহে নিপীড়নের শিকার হয়েছে। যুক্তরাজ্যে বেড়ে ৬৫ শতাংশ। মহামারী, দুর্যোগকালীন সময়গুলোতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় নারী নিপীড়ন বেড়ে যায়। বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায় গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যেখানে ২০১৮ সালে ছিলো ৭৩২ জন। তবে ২০২০ সালে নারী নিপীড়ন নিয়ে এখন পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থা থেকে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায় নি। তবে বিভিন্ন পত্রিকার তরফ থেকে জানা গিয়েছে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ধর্ষণ, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও অপহরণের ২৮টি মামলায় হয়েছে।
কিন্তু পরিসংখ্যান সঠিকভাবে পাওয়া গেলে এ সংখ্যা বিগত সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও দ্বিগুণ হবে। তাহলে কাদের দ্বারা নারীরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে এ সময়ে?
উত্তর সোজাসাপ্টা, পরিবারের সদস্য দ্বারা, স্বামীর দ্বারা।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে আমি বলেছি, স্বামীর দ্বারাও নারী ধর্ষণের শিকার হয়। আমার আশেপাশের পাণ্ডাকূল দাঁত কেলিয়ে, আমাকে পাগল আখ্যা দিয়ে বলেছেন, স্বামীর দ্বারা স্ত্রী কখনো নির্যাতিত হতে পারে না। কেনো পারে না? তারা সামাজিকভাবে বিয়ে করেছে বলে? আর বিয়ে করেছে বলেই নারীর অনিচ্ছায় জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক করার অধিকার স্বামীকে দেয়া হয়েছে?

নারীরা গৃহে বেশি নির্যাতনের শিকার হন, অনিচ্ছাকৃত জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কে অসম্মতি জানালে, যৌতুকের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে, সময়কালে সন্তান জন্ম দিয়ে বংশের প্রদীপ জ্বালাতে না পারলে। এর বাইরেও নারী তার ইচ্ছানুসারে বাইরের কাজে যেতে চাইলে নারীকে নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়।
এছাড়া তো অর্থনৈতিক কারণ নারী নিপীড়নের অন্যতম কারণ। যেমন এই করোনাকালে নারীর উপর নিপীড়ন বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে অর্থনৈতিক সঙ্কটকে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে নারীর উপর চড়াও হচ্ছে পুরুষরা। কিন্তু বিষয়টিকে কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলেই হবে না। দেশের বেশিরভাগ পরিবারের দায়িত্ব পুরুষের উপর বর্তালেও অনেক পরিবারের হাল মেয়েরা ধরে। তারাও এ সঙ্কটে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কিন্তু কোনো নারী কি পুরুষকে নিপীড়ন করেছে? কোনো পুরুষের উপর মানসিক অত্যাচার হওয়ায় সে আত্মহত্যা করেছে? তাহলে এটাকে কেবল অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণ বললে ভুল হবে। বিষয়টা মূল্যবোধের অভাব। পুরুষই পরিবারের কর্তা হবে – এমন ভাবনা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যেটি সেটি হলো, গৃহ নিপীড়ন নিয়ে কথা বলা। ব্যক্তিগত, সাংসারিক ব্যাপার বলে, মান সম্মানের দিকে তাকিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার মানসিকতা দূর করতে হবে। নারী নিপীড়ন – হোক বাইরে বা ঘরে এটা মোটেও ব্যক্তিগত বা সাংসারিক ব্যাপার নয়। এটি সামাজিক অপরাধ। সুতরাং নারী নিপীড়ন রোধে নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে, কথা বলতে হবে। সম্প্রতি, প্যান কমনওয়েলথ প্ল্যাটফর্মে বিশ্বের অনেক তারকারা এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন। তার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অভিনেত্রী জয়া আহসান কথা বলেছেন। তিনি বলেন, হতে পারে এই অত্যাচার যৌন নিপীড়ন। হতেই পারে মারধর, হিংসা। অনন্তকাল ধরে যা নীরবে সহ্য করে আসছেন নানা বয়সের মেয়ে। আজ পর্যন্ত ঘটনাগুলোর প্রতিবাদ হয়নি! অত্যাচার থামানোরও চেষ্টা করেনি। বরং সাফাই গেয়েছে, ব্যক্তিগত ঘটনা বলে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা চলেছে।

এ বাইরে কথা হবে কেন? বলে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু কেনো কথা বলা উচিত তা আমরা প্রত্যেকেই হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছি। দিনকে দিন একটি নিপীড়ক সমাজের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি। যার জন্য প্রতিবাদটা এই মুহূর্তে জরুরী। ‘আর না’ বলে গৃহে হোক আর বাইরে – নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 69 = 79